thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

‘না দিলে লইয়্যা লইব’

২০১৫ এপ্রিল ২৯ ১১:৪৯:০৯
‘না দিলে লইয়্যা লইব’

বাহরাম খান, চট্টগ্রাম থেকে : চট্টগ্রামের ভোটকেন্দ্রগুলোতে মঙ্গলবার সকাল থেকেই ভোটারদের সতর্ক উপস্থিতি ছিল। সংখ্যায় খুব বেশি না, আবার কমও নয়। তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে এবং ভেতরে সর্বত্র চোখে পড়ার মতো উপস্থিতি ছিল সরকার সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছিরের সমর্থকদের। কোথাও দেখা যায়নি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলমের সমর্থকদের। এমনকি ভোট কেন্দ্রের ভেতরেও।

ভোট শুরু হওয়ার সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে ভোট ‘ডাকাতি’র অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। তবে, নির্বাচন ‘সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ’ হয়েছে বলে দাবি করছে আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম শহরের ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডের বাংলাদেশ মহিলা সমিতি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ ভোটারদের এক নম্বর রুমে হাতি প্রতীকের কার্ড ঝুলানো দুজন দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে যেতে চাইলে তারা জানান, ভেতরে লোকজনের খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে পরে যান। ভোটের ঘরে ভাত খাওয়া হবে কেন? এমন প্রশ্ন করে সাংবাদিক পরিচয় দিলে ভেতরে যেতে দেন তারা।

ভেতরে গিয়ে পোলিং অফিসার, ভোটার বা অন্য কোনো প্রার্থীর এজেন্ট দেখা যায়নি। ভোট দেওয়ার জন্য কাপড় দিয়ে তৈরি গোপন বুথের ভেতরে দুজন সিল মারছেন, অন্য আরেকজন সিল দেওয়া ব্যালটগুলো ভোটার বাক্সে ফেলছেন। তাদের মধ্যে দুজন সাধারণ পোশাকে ছিলেন, অপরজন ছিলেন আনসার বাহিনীর পোশাক পরা।

বাক্সে ব্যালট পেপার ভরতে থাকা ব্যক্তির ছবি তোলার সময় বুথের মধ্যে সিল মারতে থাকা দুইজন তাড়াতাড়ি করে ওই ঘর থেকে বের হয়ে যান। এরপর অল্পক্ষণের মধ্যে এই কেন্দ্রের অন্যান্য রুমে থাকা কয়েকজন যুবক এসে দ্য রিপোর্টের এই প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান এবং ঠিকমতো কাজ করার পরামর্শ দেন।

ওই সময় কেন্দ্রের বাইরে অলস সময় কাটাচ্ছিলেন কেন্দ্রটির প্রিসাইডিং কর্মকর্তা শহীদুল হক চৌধুরী। তার কাছে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা যা দেখতেছেন পরিস্থিতি তাই। এর বাইরে আমার কিছু বলার নেই।’

তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। চট্টগ্রামের মানুষ উৎসবের মধ্য দিয়ে ভোট দিয়েছেন। কোনো কেন্দ্রে সমস্যা হয়নি। সব নির্বাচনেই কম-বেশি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামেও তেমন কিছু ঘটনা ঘটেছে।’

সরজমিনে দেখা পরিস্থিতি এবং বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুল বাতেন বলেন, ‘যেখানেই সমস্যা হয়েছে সেখানেই খুব তাড়াতাড়ি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আমরা পাঠিয়েছি। তারা খুব তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।’

সকাল ১০টার দিকে এনায়েত বাজার এবাদুল্লাহ পণ্ডিত বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ভোটার লাইনে ১৫-২০ জনের মতো ছিলেন। তাদের পাশে আরও তিনগুণ বেশি হাতি মার্কার প্লাকার্ড বহনকারী যুবকদের উপস্থিতি। তাদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাইকে ডেকে বলছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় অন্য কোনো দলের জন্য কাজ করা যাবে না। যারাই কমলালেবু প্রতীক নিয়ে কাজ করতে আসে তাদেরকেই ধরবা, ডাইরেক ধরবা, কোনো ছাড় নাই।’

সাড়ে ১০টার দিকে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে নারী ভোটারের মোটামুটি উপস্থিতি দেখা গেলেও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা খুবই কম দেখা যায়। সাংবাদিকদের দেখে এক নারী এগিয়ে এসে অভিযোগ করেন, ‘আমি আসলাম ভোট দিতে, আমার ভোট নাকি দেওয়া হয়ে গেছে। এইটা কেমন কথা?’

অভিযোগ প্রসঙ্গে কেন্দ্রের পোলিং অফিসারদের কাছে জানতে চাইলে তারা একে অপরের ওপর দায়িত্ব চাপালেও সদুত্তর মেলেনি ভোটবঞ্চিত ওই নারীর প্রশ্নের।

১১টার দিকে খবর পাওয়া গেল দেওয়ান হাটের বায়তুশ শরীফ কেন্দ্রে মারামারি হচ্ছে। সেখানে যাওয়ার পর বিএনপি সমর্থিতদের অভিযোগ, ‘এখন আইসা লাভ কী? যা হওয়ার তা হইয়াই গেছে।’ ওই খানে উপস্থিত ছিলেন ডবলমুরিং থানা বিএনপির সভাপতি এস এম সাইফুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবাইকে বের করে দিয়ে তারা সিল মারছে। করার কিছু নাই ভাই। পুলিশ তাদেরকে পাহারা দিচ্ছে।’

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহরের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ‘গণ্ডগোল’ এবং সরকার সমর্থকদের ভোট ‘কারচুরি’র অভিযোগ আসছিল।

সরজমিনে ঘুরে কোনো কেন্দ্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

এমন পরিস্থিতিতে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার পর কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বেশ তৎপরতা দেখা যায়। বিশেষ করে যে সব কেন্দ্রে বড় গেট ছিল সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে ছোট গেট খোলা রেখে ভোট কার্যক্রম চলে। ওই সময় কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কমতে দেখা যায়। অনেকেই ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরে যান।

তবে কেন্দ্রগুলোর বাইরে সরকার সমর্থক মেয়র প্রার্থীর লোকজন সকালের তুলনায় বাড়তে থাকে। এরপর থেকেই সিটি নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে তার হিসাব মেলাতে সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি চট্টগ্রামবাসীর।

সোমবার রাতে পেশাগত কাজে ব্যবহারের জন্য একটি ব্যাগ কেনার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের স্থানীয় একজন সাংবাদিকসহ শহরের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে পরিচিত রিয়াজ উদ্দিন মার্কেটে যাই। পণ্য কেনার সময় প্রসঙ্গক্রমে দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় মঙ্গলবারের ভোট পরিস্থিতি নিয়ে।

কে জিততে পারেন এবার? ‘পাস ফেল বইলা লাভ নাই। নাছির মেয়র হইব লেইখ্যা রাখেন।’ ভোটাররা যদি তারে ভোট নাও দেয়? ‘না দিলে (ভোট) লইয়্যা লইব, আমার কথা বুঝেন নাই’?

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তা আবদুল বাতেন রাত ৩টা ২০ মিনিটে মেয়র হিসেবে বেসরকারিভাবে আ জ ম নাছিরের নাম ঘোষণা করেন। তিনি (হাতি প্রতীক) পেয়েছেন মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ ভোট। এ ছাড়া ভোট বর্জনের ঘোষণাকারী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম (কমলা লেবু) পেয়েছেন ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ ভোট। ৪১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চসিক এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩ জন এবং নারী ভোটার ৮ লাখ ৭৬ হাজার ৩৯৬ জন।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এনডিএস/এইচএসএম/এএল/এপ্রিল ২৯, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর

রাজনীতি - এর সব খবর