thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

বাবা দিবস

একজন পরিচ্ছন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি

২০১৫ জুন ২০ ১৯:১২:৩৪
একজন পরিচ্ছন্ন মানুষের প্রতিচ্ছবি

[‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’— বাবা-সন্তানের সম্পর্ক বোঝাতে এই বাণীর তুলনা নেই। তারপরও পৃথিবী নামের গ্রহে বাবাকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা জানানোর জন্য আলাদা দিবস চালু হয়েছে। প্রতি বছরের জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্ব বাবা দিবস। বাবাকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন]

সাইফুর রহমান সাইফ

তিনি কখনো মাদ্রাসায় পড়েননি। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ। অথচ পরিচিতজনেরা তাকে মৌলভী সাহেব বলে ডাকতেন। এই উপাধি তার সততার, মাদ্রাসা থেকে বিশেষ ডিগ্রি অর্জনের জন্যে নয়। তিনি শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহমান।

হযরত মৌলভী শেখ মুহাম্মদ আবুল কাসিম (রহ.) ছিলেন তার জমানার একজন প্রখ্যাত বুযুর্গ। নওয়াপাড়ার পীর সাহেব ইরানের ফিরোজাবাদের বাদশাহের ছেলে হযরত মুহাম্মদ আলী শাহ (রহ.) কে যশোরের শিল্পশহর নওয়াপাড়ায় আনেন তিনি। বহু ভাষায় শিক্ষিত হযরত আবুল কাসিম (রহ.)-এর সাথে পরিচয়ের পর হযরত মুহাম্মদ আলী শাহ খুলনা থেকে নৌকায় চড়ে বসেন। পথে নানা বিষয়ে কথা হয় দুজনের। এক পর্যায়ে মাটি পছন্দ হওয়ায় নওয়াপাড়ায় নেমে পড়েন তারা। ইসলামী বিশ্বকোষে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

হযরত মৌলভী শেখ মুহাম্মদ আবুল কাসিমের ছেলে হযরত মাওলানা আব্দুল আজিজ। তিনিও ছিলেন একজন বুযুর্গ। তার ছয় ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহমান সবার বড়। আব্বা হযরত মাওলানা আব্দুল আজিজ দুনিয়াদারি নিয়ে ভাবতেন না। সংসারের দেখভাল তাই আব্দুর রহমানকেই করতে হয়। এন্ট্রান্সের পর লেখাপড়া আর এগুইনি তার। এরপর সরকারি চাকরি। মেজো ভাই শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম ছিলেন পোস্টমাস্টার। সেজো ভাই অধ্যাপক শেখ মুহাম্মদ আব্দুস সালাম ছিলেন যশোর সরকারি এমএম কলেজের গণিতের অধ্যাপক (বিভাগীয় প্রধান)। পরেরজন শেখ মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বিভিন্ন বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের চাকরি করেছেন। এরপর প্রফেসর শেখ মুহাম্মদ আব্দুল গফফার ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় অবসর নেন। সবার ছোট ডা. শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

শেখ মুহাম্মদ আব্দুর রহমান ছিলেন স্বাস্থ্য পরিদর্শক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনে চাকরির সুবাদে পাক-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরেছেন। সরকারের একটি পয়সার অপচয় বা তসরুফ তার হাত দিয়ে হয়নি। কাজের বাইরে কখনো সরকারি মটরসাইকেল ব্যবহার করেননি। কর্মস্থল খুলনা থেকে নিজ বাড়ি নওয়াপাড়া আসতে চেপে বসেছেন বাসে বা ট্রেনে। ট্রেনে উঠতে গিয়ে কখনো টিকেট কাটতে না পারলে অন্য কোনো সময় তা কেটে ছিঁড়ে ফেলেছেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপকের চাকরি পান। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি তিনি। ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক লেনদেন থাকায় তার হাত দিয়ে ঘুষ লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু দেশের এই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার মানুষ তিনি নন। তাই ছেড়ে দেন সে চাকরি। অথচ ভালভাবে সংসার চালানোর জন্যে চাকরিটি তার প্রয়োজন ছিল।

অত্যন্ত সাদামাটা এই ব্যক্তির হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এর ভেতর নওয়াপাড়া হিজবুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসা অন্যতম। নওয়াপাড়া তেঁতুলতলা জামে মসজিদ ও রেলওয়ে স্টেশন জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় তার হাতের স্পর্শ আছে। তার প্রায় একক প্রচেষ্টায় সরকারি কর্মচারি কল্যাণ সমিতির অভয়নগর উপজেলা শাখা আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি অবসরে যাওয়া বয়স্ক মানুষদের পেনশনসহ নানাবিধ কাজে উপকার দেয়। অথচ ২০০৯ এর ১১ জুন তার মৃত্যুর সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানটিরও মৃত্যু হয়। একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে তিনি এলাকাবাসীর কাছে বেঁচে থাকবেন চিরদিন।

সাইফুর রহমান সাইফ : সাংবাদিক

saifnewage@gmail.com

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে