thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫,  ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
সরদার বদিয়ার

দ্য রিপোর্ট

 

ভাল থেকো তোমরা

২০১৫ জুন ২০ ১৯:৪৮:২২
ভাল থেকো তোমরা

শনিবার বিকেল ৪টা হবে। অফিসে বসে কাজ করছি। এমন সময় বাবা দিবস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কাল বাবা দিবসে কে-কী লিখবে? হঠাৎই মনে পড়ল দৈনিক সংবাদে থাকতে বাবাকে নিয়ে একটি লেখা ফেসবুকে লিখেছিলাম। এ সময় আমার সহকর্মী ফিচার সম্পাদক ইকবাল জাফর খন্দকার ভাই বললেন, ‘ভাই, সেই লেখাটি বড় করে দেন-না।’

—‘ধ্যাৎ আমি আবার লিখতে পারি নাকি?’ বললাম আমি।

আমাদের দু’জনের কথা শুনে ফেললেন বার্তা সম্পাদক হোসেন শহীদ মজনু ভাই। তিনি বললেন, ‘সরদার লিখতে শুরু করলে আবার লেখা হবে না, কথা হলো?’ এই দুই জনের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় আমার এই চেষ্টা…

কারোর প্রতি আমার বাবার কোনো অভিযোগ ছিল না। কথা বলতেন কম। কিন্তু যখন বলতেন ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠত। নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা কাউকে জানতে দিতেন না। বুঝতে দিতেন না। বড্ড অভিমানী ছিলেন।

মা বলতেন, ‘আমি নাকি বাবার স্বভাবটিই পেয়েছি!’

মা ওই দূর আকাশে চলে যাওয়ার পর, বাবা বড় একা হয়ে পড়েন। ছায়াঘেরা মেঠোপথের গ্রাম ছেড়ে বাবাকে চলে আসতে হয় হৃদয়হীন ইট-পাথরের শহরে।

সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বেড়ে উঠেছে আমাদের গ্রাম। সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার শোভনালী ইউনিয়নের গোঁদাড়া গ্রামে আমাদের জন্ম। সেখানেই বেড়ে উঠা। এর পর আমরা শহরে (কাটিয়া লস্করপাড়া) চলে আসি। গ্রামে থাকতেন বাবা-মা।

আমার বাবা জামাল উদ্দিন সরদার ছিলেন সংস্কৃতিমনা। ছোটবেলায় দেখেছি, বাবার উদ্যোগে আমাদের গ্রামে জারী গান হতো। লাঠি খেলা হতো। প্রাথমিকে পড়ার সময় আমি ও আমার ছোটভাই বখতিয়ার লাঠি খেলা রপ্ত করেছিলাম। ও আজ একটি কলেজের প্রভাষক।

১৯৯৯ সালের ২৫ জুন রাতে আমার মা জবুন্নেছা জামাল আমাদের ছেড়ে চলে যান। মায়ের ক্যান্সার হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, ‘তিন মাস বাঁচবেন।’ এ সময় মা আমাদের শহরের বাসায় থাকতেন। ২ মাস ২৮ দিনের দিন মাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। ওই দিন সন্ধ্যায় মা চলে যান দূর আকাশে।

আমি তখন পত্রিকা অফিসে। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্র পত্রিকায় তখন আমি স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ শুনে ওই রাতেই চলে যাই গ্রামের বাড়িতে।

মাকে ছাড়া শহরে আসার পর একাকিত্ব বাবাকে আরও বেশী করে পেয়ে বসে। আমাদেরকে বুঝতে দিতেন না। হাসি-মুখে বলতেন, ‘আমি ভাল আছি। তোমরা ভেবো না।’

সবাই সংসার, ছেলে-মেয়ে, চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এ কারণে বাবার সঙ্গে আমার সখ্য ছিল একটু বেশী। বাবা নামাজ আর বই পড়ে অধিকাংশ সময় পার করতেন। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হতেন। এই সময় আমার চাচা ও খালার বাসা হয়ে বাসায় এসে সকালের খাবার খেতেন।

বাবা পান খেতেন আর বই পড়তেন। আমার মা-ও খুব পান খেতেন। পান খেলে মায়ের ঠোঁট খুব লাল হতো। মা বলতেন, ‘তোমরাও পান খাওয়া শেখ। নইলে বড় হলে পান আনতে ভুলে যাবে।’

মায়ের পান খাওয়া দেখে এক সময় আমিও পান খেতাম। তখন অবশ্য প্রাথমিকে পড়তাম। শহরে যেমন কেউ বাসায় আসলে চা বিস্কুট খেতে দেয়, আমাদের গ্রামে কেউ কারোর বাড়িতে গেলে পান খেতে দিতেন। মায়ের সাথে আমি কারোর বাড়িতে গেলে আগেই আঙুলের ডগায় চুন নিয়ে নিতাম। যাতে ছোট ভেবে কেউ না আবার পান দিতে ভুলে যান।

পান খেলে আমারও ঠোঁট খুব লাল হতো। মা বলতেন, ‘পান খেয়ে ঠোঁট লাল হলে, তার বউ সুন্দরী হয়। তোর বউও খুব সুন্দর হবে।’

লজ্জায় আমি ভোদৌড় দিতাম। আর মা হাসিতে ফেটে পড়তেন। হাসলে মায়ের গালে টোল পড়ে। যা সুন্দর লাগত-না দেখতে! মা মারা যাওয়ার পর আমি আর কোনো দিন পান মুখে দেইনি।

বাবা সামনে যে বই পেতেন, তাই পড়তেন। মনে পড়ছে, আমি তাওরাত কিতাবটি সবে শেষ করে টেবিলের উপর রাখছি। দেখি বাবা বইটি নিয়ে পড়া শুরু করলেন। এরপর আমি বঙ্কিমের উপন্যাস সমগ্র পড়া ধরি। পরবর্তীকালে বাবা সেটাও পড়া শুরু করেন। কিন্তু বইটি আর শেষ করতে পারেননি।

২০০৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ছিল শুক্রবার। তখন আমি খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। নিউজ পাঠিয়ে লাবণী মোড়ে আমার বন্ধু মোস্তাকের দোকেন বসে আড্ডা দিচ্ছি। মাগরিবের নামাজ শেষে অফিসে যাব বলে ভাবছি। এমন সময় মেজ ভাইয়ের ফোন। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘শিগগির বাসায় যা। বাবা আর নেই।’ বাসায় এসে শুনলাম, মাগরিবের নামাজ পড়ার জন্য বাবা কেবল জায়নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ।

বাসায় এসে দেখি বাবা শুয়ে আছেন ঘরের মেঝেতে। তার নিথর দেহ ঘিরে কান্নার শোরগোল। কেউ কেউ কুরআন শরীফ পড়ছেন। আমি বাবার মুখের দিকে অপলক চোখে চেয়েছিলাম। চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছিল। কোনো কিছুই আমার কর্ণগোচর হচ্ছিল না। কতক্ষণ এভাবে বসেছিলাম মনে করতে পারছি না।

কালো অন্ধকার রাত যে কীভাবে পার হয়েছিল বলতে পারি না। ভোরে ফজরের নামাজ শেষে বাবার মরদেহ নিয়ে রওনা হই গ্রামের বাড়িতে। সেখানে মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় বাবাকে।

বাবা হাঁসি মুখ প্রায়ই আমাকে বলতেন, ‘সব বউমাদের দেখলাম। সেজ বউমাকে দেখব না? সেজ বউমাকে দেখতে যে ইচ্ছে হয়।’ আমার বাবার সেই ইচ্ছে আমি পূরণ করতে পারিনি।

মার মতো বাবাও আমাকে একা রেখে চলে গেছেন— ওই দূর আকাশে।

বাবা-মা, তোমরা ভাল আছ? আমি তোমাদের প্রায়ই দেখি, উজ্জ্বল নত্রক্ষের মাঝে। কথা বলি তোমাদের সঙ্গে প্রতিদিন। তোমরা কি শুনতে পাও আমার কথা? তোমরা ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই। আমি বড় একা। বড় একা...!

তোমরা ভাল থেকো।


লেখক : সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর