thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

বাবা দিবস

‘বাবা তুমি কি প্রধানমন্ত্রী’

২০১৫ জুন ২১ ০০:২০:৫৫
‘বাবা তুমি কি প্রধানমন্ত্রী’

পাভেল রহমান, দ্য রিপোর্ট : দীঘি নামের ছোট্ট মেয়েটির কথা মনে আছে? আসুন একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের সংলাপ মনে করার চেষ্টা করি। সংলাপটি ছিল এ রকম- ‘বাবা জানো? আমাদের বাসায় যে ময়না পাখিটা আছে না, ও না আজকে আমার নাম ধরে ডেকেছে। আর এই কথাটা না মা কিচ্ছুতেই বিশ্বাস করছে না। কেমন লাগে বল তো বাবা? আমি কি তাহলে ভুল শুনেছি? তুমি আজকে বাসায় এসে মাকে অবশ্যই বকে দেবে। আচ্ছা বাবা রাখি তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো কিন্তু।’

হ্যাঁ, পাঠক প্রার্থনা ফারদিন দীঘির গল্পই বলছি। একটি মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনচিত্রের তিন বছর বয়সী সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন ক্লাস সিক্সের ছাত্রী। বিজ্ঞাপনের ধারাবাহিকতায় মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে চলচ্চিত্র অভিনয়ে এসে চমকে দেয় সবাইকে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই দীঘি অভিনয় করে ৩৬টি চলচ্চিত্রে। শিশুশিল্পী হিসেবে অর্জন করে তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

দিনটি ছিল ১৯ জুন। পশ্চিম রাজাবাজার মসজিদের পাশের একটি দোকানে জিজ্ঞাসা করতেই একজন দেখিয়ে দিলেন দীঘির বাসা। তপ্ত দুপুরে চিত্রসাংবাদিক আমির শোয়েবকে নিয়ে চারতলার দোরঘণ্টি বাজাতেই দরজা খুলে দিলেন দীঘির চাচা পিন্টু। চোখ ঘুরিয়ে দেখছি বসবার ঘরে শেলফজুড়ে সাজানো পুরস্কার। এরই মধ্যে দীঘির বাবা সুব্রত এসে বসলেন। বললেন, “এগুলো সব দীঘির পুরস্কার। এর মধ্যে একটা জাতীয় পুরস্কার খোয়া গেছে। কয়েক দিন আগে দীঘির পুরস্কারের শেলফটি গোছাতে গিয়ে দেখি তিনটি পুরস্কারের একটি নেই। পরে দেখলাম ‘এক টাকার বউ’ চলচ্চিত্রের জন্য যে পুরস্কারটি পেয়েছিল সেটি নেই। এরপর অনেক খোঁজা হয়েছে বাসায়, কিন্তু কোথাও নেই।”

আমাদের আসার উদ্দেশ হল বাবা দিবস উপলক্ষে দীঘি ও সুব্রতর সঙ্গে আড্ডা দেওয়া। কিছু সময়ের মধ্যেই বসবার ঘরে এলো দীঘি। সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। দীঘিকে দেখেই কানে তখন বেজে চলেছে বিজ্ঞাপনচিত্রের সেই ছোট্ট মেয়েটির কণ্ঠ- ‘বাবা জান? আমাদের বাসায় যে ময়না পাখিটা আছে না?’

অভিনয়টা মিশে আছে রক্তের সঙ্গে। দীঘির বাবা চলচ্চিত্র অভিনেতা সুব্রত ও মা চিত্রনায়িকা দোয়েল। ২০১১ সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান দোয়েল। এরপর থেকে দীঘির কাছে সুব্রতই বাবা ও মা। সকালে ঘুম থেকে উঠানো থেকে রাতে ঘুম পাড়ানো পুরো কাজটিই করেন সুব্রত।

এই গল্পটা দীঘির মুখ থেকেই শোনা যাক, ‘বাবায় আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেন। এরপর ব্রাশ করা থেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, স্কুল থেকে নিয়ে আসা সব কিছুতেই বাবা আমার পাশে থাকেন। আমার তো মা নেই। মা মারা যাওয়ার পর বাবায় আমার কাছে বাবা ও মা। বাবা আমাকে অনেক ভালোবাসেন।’

এই কথার সূত্রে দীঘির বাবা সুব্রত বলেন, ‘মায়ের শূন্যতা তো কখনো পূরণ হবে না। মেয়েটা আমার ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। চেষ্টা করি মেয়েটা যেন হাসিখুশি থাকে। আমার সমস্ত সুখজুড়ে তো এই মেয়েটা। দোয়েল তো মেয়েটাকে আমার কাছে রেখে চলে গেছে।’

কথা বলতে বলতে সুব্রতর চোখ তখন অশ্রু টলমল। দীঘি তখন কিছুটা কাছে ঘেঁষে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বাবার সঙ্গে বাইরে বের হলে না খুবই মজা হয়। বাবাকে তো অনেকেই চেনে। আমরা যখন রিকশায় থাকি তখন ট্রাফিক পুলিশগুলো অন্য গাড়িগুলোকে আটকে রেখে আমাদের আগে যেতে দেয়। পরশু দিনও এ রকম হয়েছে। আমি তখন বাবাকে বললাম, বাবা তুমি কি প্রধানমন্ত্রী। তোমাকে দেখে সবাই এভাবে আগে যেতে দেই?’

মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেললেন সুব্রত। তিনি বলেন, ‘গত পরশু বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলাম। অনেক দিন ধরেই মেয়েটার বায়না ছিল স্টেডিয়ামে খেলা দেখবে। বাংলাদেশের জয় স্টেডিয়ামে বসে দেখেছি। অনেক জ্যাম পেরিয়ে যেতে হয়েছে।’

খেলা দেখা প্রসঙ্গে দীঘি বলেন, ‘আমি তো বিশ্বাসই করতে পারিনি। বাবা এসে বলল, খেলা দেখবে? আমি বললাম, টিভিতে? বাবা দুইটা টিকিট হাতে দিয়ে বলল, স্টেডিয়ামে। আমি তখন লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। এরপর তো স্টেডিয়ামে খুবই মজা করেছি। আমাদের দেখে দর্শকদের অনেকেই সেলফি তুলেছে। আমার খুব ইচ্ছে ছিল মাশরাফির সঙ্গে সেলফি তুলব। সেটা হয়নি।’

আড্ডা তখন বেশ জমে উঠেছে। এরই মধ্যে দীঘির কাছে জানতে চাইলাম, ‘বাবা দিবসে কী চাইবে বাবার কাছে?’ বাবার দিকে তাকিয়ে দীঘির উত্তর, ‘২১ জুন বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ দেখতে নিয়ে যেতে হবে।’ একটু মুচকি হেসে সুব্রত বলেন, ‘ঠিক আছে চেষ্টা করব। যদি টিকিট পাই তবে যাব।’

এবার জানতে চাইলাম বাবা দিবসে বাবাকে কী দেওয়া হচ্ছে? দীঘির উত্তর, ‘এখনো পরিকল্পনা করিনি। তবে বাবাকে সারপ্রাইজ দেব। কিভাবে হবে সেটা এখনই বলব না।’

বাবাকে নিয়ে দারুণ গর্ব দীঘির, ‘বাবাকে এত মানুষ চেনে এটা আমার ভালো লাগে। একদিন স্কুলে জ্যামের কারণে দেরি হয়ে গেছে। গেটে গিয়ে দেখি অনেকেরই দেরি হয়েছে। কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হবে না। বাবা গিয়ে বলল, পরে আমদের ঢুকতে দেওয়া হল। সঙ্গে সবাই ঢুকে গেল। আসলে বাবাকে সবাই ভালোবাসে।’

এই কথার রেশ ধরেই সুব্রত বললেন, ‘আমাকে মানুষ সম্মান করে কারণ আমি দীঘির বাবা। ওর অভিনয় অনেকেই পছন্দ করে। তা ছাড়া স্কুলের সবাই ওকে খুবই ভালোবাসে। আর ওর প্রতি সবার দুর্বলতার আরও একটা কারণ আছে। কারণ ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে দীঘি। স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই ওকে খুবই ভালোবাসে।’

দীঘির অভিনয় তো অনেকেই পছন্দ করে। মায়ের মৃত্যুর পর সিনেমায় তাকে খুব একটা দেখা যায়নি। বর্তমানে অভিনয়ে নেই কেন? এমন প্রশ্নে দীঘি বলল, ‘পড়াশুনার জন্য সময় হয় না। আমি এখন পড়াশুনা নিয়েই থাকতে চাই| মায়ের স্বপ্ন ছিল আমি ডাক্তার হব। বাবা অবশ্য আমাকে কিছু হতেই হবে বলে না।’

দীঘির স্বপ্ন কী? তার উত্তর, ‘জানি না। এখনো ঠিক করিনি। তবে ভালোভাবে পড়াশুনা করতে চাই।’ এভাবেই দীঘি ও সুব্রতর সঙ্গে আরও কিছুটা সময় আড্ডা চলে। এরই ফাঁকে আমির শোয়েবের ক্যামেরায় বন্দী হন বাবা ও মেয়ে।

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/ডব্লিউএস/সা/জুন ২১, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর