thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

তুমিই কেবল বুঝতে আমায়

২০১৫ জুন ২১ ১৩:২৯:১৫
তুমিই কেবল বুঝতে আমায়

গ্রামের সহজ-সরল ভাব, সঙ্গে আছে বোকামি। কথা ও কাজে ভীষণ ধীরস্থিরতা। যাকে অলসতাও বলা যায়। লজ্জা-ভয়-দ্বিধায় ভরা মন। তার সরলতা বুঝতে কারোই সময় লাগে না। এই যুগে এমন ছেলেকে অন্য কোনো বাবা হলে অকর্মণ্য বলেই তিরস্কার করতেন।

কত বন্ধু-বান্ধব এড়িয়ে গেছে। কত জায়গায় অবমূল্যায়িত হতে হয়েছে। কিন্তু কী অকৃত্রিম বন্ধু তিনি! জীবনে কখনো তিরস্কার করেননি এসব নিয়ে। কখনো করেননি অবমূল্যায়ন। সরলতা যে ভবিষ্যৎ পথে বাধা হতে পারে— সেটিও বুঝে ছিলেন। তাই নানাভাবে খেলাধুলা ও সামাজিক কাজে জড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মানুষের স্বভাবসুলভ আচরণ খুব দ্রুত পরিবর্তন হয় না। এমনকি কোনোটি সারা জীবনেও না। আমার ক্ষেত্রেও তাই।

তবে সাঈদ হাসানের কবিতার মত বাবাই কেবল বুঝতে পেরেছিলেন আমায়— ‘মা বলত রেগে তোমার ছেলে বড় হয়ে হবে আস্ত একটা বোকা। বাবা বলত, ওগো তুমি দেখে নিও কোনো একদিন কবি সাহিত্যক হবে মোর খোকা।’

মা হয়ত কোনোদিন এমনটি বলেননি। তবে অন্য সবাই বলেছে। ছেলের মধ্যে যত সরলতাই থাকুক সম্ভাবনার দিকটা আর কেউ না বুঝলেও বাবা বুঝেছিলেন। তাই তো জীবনে স্কুল পালানোর একমাত্র চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে তার কঠোরতায়। কোনোদিন কিছু বলেননি। এরপরও কেন যেন অসম্ভব রকম ভয় আমাকে আচ্ছাদিত করে রাখত সব সময়। গ্রামের বাউণ্ডুলে ছেলেদের সঙ্গে একদিনই গিয়েছিলাম তাস খেলতে। সেটিও তার নজর এড়ায়নি। শুধু মায়ের গোচরীভূত করাতেই কত যে ভয় আচ্ছাদন করেছিল মনে, তা বলে বুঝানো যাবে না!

পাটিগণিতের সরল অঙ্কের গরলতায় বেশ পটু তিনি। বাবা শুধু নন, তিনি সরাসরি শিক্ষকও আমার। ক্লাসে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। কী সম্বোধন করব ‘আব্বু’ নাকি ‘স্যার’ এই দ্বিধায় প্রশ্ন করাই হতো না। দেড় দশক আগে ইংরেজি ব্যাকরণের একটি অধ্যায় পড়িয়েছিলেন। এখনো ভুলিনি সেটি। সম্ভবত ‘ইন্ট্রোডাক্টরি দেয়ার’ জীবনে কোনোদিনই ভুলব না!

‘বোকা’ ছেলের চালাক হওয়ার কোনো পথ তৈরি হলে কখনো বাধা দিতেন না তিনি। তাই তো এলাকায় বড় কোনো হাডুডু বা ফুটবল ম্যাচ হলে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। কাছাকাছি কোনো রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী-সাংসদ আসলে নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। রাত ২টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে দুই দশক আগের ‘রওশন এরশাদ দর্শন’ এখনো মন থেকে মুছে যায়নি। এমনকি ছাত্র রাজনীতিতে উৎসাহ দিতেন আমায়। কিন্তু এত ভীতু মানুষের দ্বারা কী ছাত্র রাজনীতি হয়!

স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শুরু। এক বছরের মধ্যেই (২০০৭ সালের দিকে) ছোট চাকরি থেকেও অবসরের সময় হয়ে যায় বাবার। এরপর ৫টি বছর কিভাবে কেটেছে ভাষায় প্রকাশ করে বুঝানো অসম্ভব। কাছের দুই-একজন রুমমেট বা বন্ধু-বান্ধব হয়ত কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন। ভাই-বোন মিলিয়ে ১১ জনের সংসার। তখনও পরিবারে আছেন ৭ জন। যার ৫ জনই কোথাও না কোথাও পড়াশোনা করছে। অথচ সংসারের সকল আয়ের সংস্থান তখন পুরোপুরি বন্ধ। এরপরও কখনো বাবা আমাকে বলেননি তোমার খরচ তোমাকে চালাতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার সময় নিজে থেকে চেষ্টা করেছি স্বনির্ভর হতে। কিন্তু খুব একটা সম্ভব হয়নি। তবে ছুটিতে যাওয়ার পর কখনো হতাশ ভাব দেখিনি বাবার মনে। ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে— এতেই ভুলে গেছেন সব কষ্ট। কিভাবে অর্থের সংস্থান করেছেন তিনি, তা ভেবে আমার কাছেও অবাক লেগেছে। কিন্তু কখনও বিচলিত হননি, হতাশ হননি। হয়ত বিশ্বাস ছিল ছেলের প্রতি। ছুটিতে গ্রামে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা শিক্ষার্থীদের অপার সম্ভাবনার ভবিষ্যতের কথা বলা ছাড়া আর কিছু দিতে পারিনি। এর চেয়ে বেশি কিছু তিনি কখনো চানওনি।

পাঠ জীবন চুকিয়ে যাওয়ার পর ৪টি বছর পার হয়ে গেছে। বাবার সঙ্গে ইদানীং দেখা হয় না খুব একটা। তবে যোগাযোগ নিয়মিতই হয়। এক দিন ফোনে কথা না বললেই বলেন, ‘কী ব্যাপার ফোন-টোন দাও না, কী হয়েছে?’ জানি না তোমার কষ্টের প্রতিদান কতটুকু দিতে পেরেছি বাবা। প্রতিদান দেওয়া তো অসম্ভব। তবে চেষ্টা করছি বাবা যেন কোনো কথা বা কাজে কষ্ট না পায়।

বাবা তোমার অনেক প্রত্যাশা হয়ত পূরণ করতে পারছি না। দূর থেকে বলছি তুমি মন খারাপ করো না। শুধু দোয়া কর ‘বোকা ছেলে’র জন্য। তুমি বেঁচে থাকো আরও যুগ যুগ। জীবনে আর কিছু প্রয়োজন নেই। তোমার মুখখানি দর্শন করলেই সব অপ্রাপ্তির কথা ভুলে যাই। তুমি ভাল থাকো, সুস্থ থাকো। বাবা দিবসে এতটুকুই প্রত্যাশা।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে