thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

বাবা দিবস

‘বাবা আমার শত প্রেরণার উৎস’

২০১৫ জুন ২১ ১৬:০৭:০৯
‘বাবা আমার শত প্রেরণার উৎস’

তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু

‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তায় সকল খানে’— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানের কলিটি বেশ অনুরণিত হচ্ছে আমার কানে। আজ রবিবার (২১ জুন), বাবা দিবস। আমি আমার বাবাকে খুঁজে ফিরি আমার সকল কাজের মাঝে।

বাবাকে নিয়ে লেখার স্বপ্ন-পরিধি আমার কাছে অসীম। অল্প-স্বল্প লিখে শেষ করা যাবে না; যায়ও না। যেমনটা সম্ভব নয় এখানেও। তারপরও বাবা যেদিন সরেজমিন এসে আমাদের দ্য রিপোর্টে পা রেখেছিলেন; আবেগে আপ্লুত হয়েছিলেন; তাঁর চোখ থেকে আনন্দাশ্রু ঝরেছিল; বনে গিয়েছেন দ্য রিপোর্ট পরিবারেরই একজন। সেদিনই লেখার অভিলাষ তৈরী হয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই বাবাই আমার— ‘শত প্রেরণার উৎসমূল। আমার আদর্শ। আমার গৌরবের সারবান।’

ছেলেবেলায় বাবা-মা আর নয় ভাই-বোন নিয়ে আমাদের যে সংসারটি ছিল সেটি ছিল প্রায় রূপকথার মতো একটি সংসার। ঠিক মনে নেই কত দিন তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন। পড়ার টেবিলে পিঠে হাত রেখে জ্ঞানার্জনের কথা সুধিয়েছেন। বিপদে-আপদে তাঁর সুবিশাল বুকে সস্নেহে আগলে রেখেছেন। গল্প শুনিয়েছেন। সত্য বলার সাহস যুগিয়েছেন। অসুস্থ হলে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে শিয়রের পাশে সময় কাটিয়েছেন।

আমার প্রিয়তম বাবা মুহম্মদ কাওসার উদ্দীন ফকিরের জন্ম ১৯৩০ সালে। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার শষ্য-শ্যামলিমা চাচই গ্রামে তাঁর জন্ম। মধুমতি নদীর কূলঘেঁষা ছিল চাচই গ্রাম। কিন্তু আজ নদী সরে গেছে বহু দূর। যেমন আব্বাও সরে গেছেন গ্রাম থেকে বহুদূর যশোর শহরে।

এই ৮৬ বছরে নুয়ে পড়েননি আব্বা। আব্বা এখনো চলাফেরা করেন অনায়াসে। মাঝে মাঝে হাতে লাঠি ধরেছেন। এখনো আমরা; ভাই-বোন তাঁর শাসন-বারণের ছায়াতলেই আছি। সরকারি কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৯৫ সাল থেকে কাটাচ্ছেন নীরবচ্ছিন্ন অবসর। একজন নিরেট স্পষ্টভাষী-মিষ্টভাষী ইস্পাতদৃঢ় মানুষ। কণ্ঠে তাঁর জীবনকে জীবনের মতো করে গড়ে তোলার অনেক গল্প শুনেছি। যা আমাকে সাংবাদিকতার বন্ধুর কষ্ট-কঠিন জীবনে পাথেয় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাকে জীবানাদর্শে ফ্রেমবন্দী রাখতে পেরেই সৎ-সাহসের অভিযাত্রায় শামিল থাকতে পেরেছি।

আমার কাছে আমার বাবা একজন শ্রেষ্ঠ বাবার প্রতিমূর্তি। আমার আজকের এই অবস্থায় উঠে আসার পেছনে তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশী। তিনি আমার সাংবাদিক জীবনের প্রতিটি ধাপেই পাশে দাঁড়িয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। হয়ত সেই কারণেই আমার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এসে বলে গেছেন, ‘আমি একজন গর্বিত ও আনন্দিত বাবা। জীবনে আমি যত আনন্দ উপভোগ করেছি তার চেয়ে শতগুণ বেশী আনন্দ আজ পেয়েছি।’

বড় পরিবারে জন্ম আমার। ভাই-বোন ছিলেন নয়জন। এখন ছয়জন। বাবা সরকারি চাকুরে। কৃষি কর্মকর্তা। কিন্তু যেদিন থেকে বুঝতে শিখেছি; সেদিন থেকেই জেনেছি সরকারি ছাপোষা কর্তাব্যক্তি হলেও তিনি আপাদমস্তক একজন সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব। ঝোঁক ছিল লেখালেখির; যাত্রাপালা দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো; সমাজ-প্রগতির আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া। আমার বাবা-মায়ের একান্ত প্রচেষ্টা; ঘাম-শ্রমে দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণেই ভাই-বোনসহ পরিবারের ১০ সদস্য এখন উচ্চশিক্ষিত।

এত ভাই-বোনের মাঝে বাবাকে ভাগে পেতাম আর কতক্ষণ। প্রায় সবাই নানা ফর্দ নিয়ে অপেক্ষা করত। আগে বড়রা। তারপর কে আগে বাবার কাছে তার কথা বলবে এই নিয়ে কম হয়নি। কর্মস্থল থেকে ফিরে আসা ক্লান্ত বাবাও পরম আনন্দে মেনে নিতেন আমাদের আব্দার। কথা শুনতেন মনোযোগী শ্রোতার মতো।

বিভিন্ন দিবসের ডামাডোলে বাবা দিবসকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ সেখানেই প্রজন্মোত্তর আমাদের অস্তিত্ব, জন্ম-আর বেড়ে ওঠার গল্প। মা দিবস নিয়ে যত আলোচনার আয়োজন, অনুষ্ঠান হয়; ততটার দেখা নেই বাবা দিবসে। অথচ পরম শ্রদ্ধা আর ভালবাসার মানুষটি কিন্তু জন্মদাতা বাবা। ইতিহাস বলছে ১৯০৮ সালের আগে বাবা দিবস পালন হয়নি। আর ১৯১০ সাল থেকে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। বাবা দিবস পালন কবে পালিত হবে; এই নিয়ে কম ঝুট-ঝামেলা হয়নি। শেষমেষ বেশীরভাগ দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বাবা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সেখানে চলমানপ্রবাহের সঙ্গী হয়েছে বাংলাদেশও।

মায়ের তুলনাতো চলেই না; তবে বাবাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সংসার চালানো অর্থ উপার্জন করেন। এ জন্য কি পরিমাণ কষ্ট পোহাতে হয়; তা তিনি একটুও বুঝতে দেন না। সারাদিনের ধকল লুকিয়ে ঘরে ফিরেই সন্তানের প্রতি বাবা তাঁর গভীর ভালবাসা প্রকাশ করেন। আমার বাবা মুহম্মদ কাওসার উদ্দীন ফকির এক্ষেত্রেও একটু ব্যতিক্রম। আমাদের সঙ্গে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতেন না। মার্জিত-বিনয়ী আচরণে মানুষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিতেন। ছোটবেলার মতো এখন আমাদের আগলে রাখার চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে শাসন করেন; সিদ্ধান্ত টেনে যতিচিহ্ন এঁকে দেন। আমরাও বাধ্য সন্তানের মতো তাঁর কথা বাস্তবায়নে শতভাগ উজাড় করে দেই।

বাবার স্বার্থহীন ভালবাসার কোনো মূল্য হয় না। একজন আদর্শবান বাবা সন্তানের খুশীর জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে একটুও দ্বিধা করেন না। আমার বাবাও তাই। আর তাই বাবা দিবসে সন্তান হিসেবে আমার বাবাকে শ্রদ্ধা-ভালবাসায় রাঙিয়ে দিতে চাই।

ছোটবেলার সেই সোনালী দিনের নস্টালজিয়া বার বার শেকড়ের দিকেই টানে। অনেক কিছুর পরও বার বার মনে হয়েছে আমাদের বাবা আমাদের কাছে চিরায়ত বটবৃক্ষের মতো। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষায় মানুষের মতো মানুষ করতেই বাবা সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করেছেন। তাঁর আদর-শাসন আর বারণের মধ্য দিয়েই আমরা বড় হয়েছি। আজ যে যার অবস্থানে পৌঁছেছি।

আমার বাবার তুলনা শুধু বাবা নিজেই। বাবা শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন এক বাণী-সুধা। শুধু তা-ই নয়, আমার বেজায় বইপড়ুয়া বাবা এখনো লেখালেখি করছেন। লিখেছেন মধুমতির ভাঙ্গন, যাত্রাদলের মাধবীসহ কয়েকটি গল্প, উপন্যাসও। লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনী— আকাশে মিথুনের একচল্লিশ ঘণ্টা।

বাবা দিবসে আমার বাবার দীর্ঘায়ু কামনা করি। পাশাপশি সারা বিশ্বের বাবাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা-ভালবাসা নিবেদন করি। মৃত্যু অনিবার্য জেনে লিখে ফেলি ‘যুগ যুগ বেঁচে থাক সবার বাবা বুকের মাঝে অনন্ত কাল’।


(দ্য রিপোর্ট/এএস/জুন ২১, ২০১৫)


পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর