thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫,  ৯ মহররম ১৪৪০

কাজী জামশেদ নাজিম

রঘুর বাবা যে সেরা বাবা

২০১৫ জুন ২১ ২১:৩১:০০
রঘুর বাবা যে সেরা বাবা

একদিন চিরনিদ্রায় যেতে হবে। দিনটি কবে? কার মৃত্যুর আগে? বাবা নাকি মা। নাকি রঘুই এ মায়াবাজার ছেড়ে যাবে! মানুষ স্বপ্ন দেখে। ভাল থাকার স্বপ্ন, গাড়ি-বাড়ির স্বপ্ন।রঘু প্রহর গোনে। মৃত্যুর প্রহর। স্বল্প দিনে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর বার্তা পেয়েছে। ফেসবুকই রঘুকে বার্তাগুলো দেয়।

ক’দিন আগের কথা। রাজুর বাবা মারা গেলেন। রাজু রঘুর বন্ধু। বাবার মৃ্ত্যুর বার্তা ফেসবুকে রাজুই পোস্ট দিয়েছিল। পোস্টে শতাধিক লাইক পড়েছে। রঘুও একটা লাইক দিয়েছে। কেন দিয়েছে জানা নেই। মৃত্যুর খবর কেন সবাই পছন্দ করেন? ফেসবুকের লাইক অর্থ কী? ফেসবুকবাসী জন্ম-মৃত্যু’র সব বার্তায় লাইক দেয়। তাহলে কি মানুষ মৃত্যুর খবরও পছন্দ করে? আনন্দিত হয়? কত লাইক পরবে রঘুর মুত্যুর বার্তায়। কে-ইবা এ পোস্ট দেবে?

ফেসবুক একটি মাধ্যমের নাম। পরিচিতির মাধ্যম। প্রতিনিয়ত মানবসন্তানরা পরিচিত হচ্ছে। নারী-পুরুষ, ছোট্ট-বড়, ধনী-গরিব এখানে ভেদাভেদ নেই। সবার সর্ম্পক এক। বন্ধু! ফেসবুকে বাবা-ভাই, মা-বোনরাও আছেন। তাদের জন্যভিন্ন তালিকা করা হয়নি।ফেসবুকে অনেকের কল্যাণ বয়ে এসেছে।হারিয়ে যাওয়া অনেক বন্ধুকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

ফেসবুকে অদৃশ্য মানবেরও জন্ম দিয়েছে। ভালবাসা নামক খেলাটি খেলছে তারা। এমন মানবদের সৃষ্ট অদৃশ্য এক মানসীর নাম প্রজাপতি। রঘুর কাল্পনিক ভালবাসায় জন্ম হয় প্রজাপতির। মাসের মাথায় প্রজাপতির মৃত্যু হয়। আসলে ভালবাসারহস্যময়। ভালবাসা কখন কাকে কী করবে কেউ জানে না। ভালবাসা আর ভাললাগা এক নয়। কাকে কখন কী দেখে ভাল লাগবে তাও কেউ জানে না। ভাললাগার মাত্রাটি সীমানা ছাড়িয়ে একজন মানুষ ভালবাসতে শেখে। কারও চোখ ভাললাগে, কারও হাসি ভাললাগে, কারও চুল ভাললাগে। তাই বলে সবাইকে সবার ভালবাসাও ঠিক নয়।

প্রজাপতি নামটি রঘুর চলার অদৃশ্য সম্বল। স্বল্প দিনেও ভালবাসার সুখের সংসার ছিল। ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। একদিন প্রজাপতিকে দেখতে ব্যাকুল রঘুর মন। রঘু জানে তার মনকে। অমতে গেলে সব কাজেও মন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মনকে শান্ত করতে হবে- ছুটে গেছে রঘু। গুলশান-২ এর আমেরিকান স্কুল। ঘড়ির কাঁটা তখন সোয়া ২টা। শরীরের লবণাক্ত পানি রোদের সাথে ঝরে পড়ছে। রঘুর মুখের রং আরও কালো হয়ে উঠেছে। আশপাশে বসার স্থান নেই। নেই কোনো চায়ের দোকান।

রাস্তার চারপাশে সারিবদ্ধ গাড়ি। আশপাশের চিত্র প্রমাণ করে ধনীর সন্তানগুলোর জন্য স্কুলটি তৈরি।স্কুলের নিষ্পাপ সন্তানদের জননীরা ঢের সুন্দরী। দেশী-বিদেশী প্রসাধনী তাদের রূপসজ্জা বাড়াতে সহায়তা করেছে।

স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীর জননীদের ভিড়। কে আসছে, কে যাচ্ছে- কেউ কারও খবর নেয় না। গাড়িগুলো আসছে আর যাচ্ছে। রঘু তাকিয়ে আছে। প্রজাপতির খোঁজে দৃষ্টি ঘুরছে। এক জননীর দিকে রঘু তাকিয়ে আছে— এই বুঝি প্রজাপতি! বেশ গতিতে প্রাইভেটকারের দড়জা ভেজালো। আচল আটকে গেছে। একটু হাঁটতে কাঁধ থেকে আঁচল বেশখানিক সরে গেছে। সুযোগ হাতছাড়া করেনি বৃদ্ধ রিকশাচালক। মেদহীন ফর্সা পেট দেখে নিয়েছে। রঘুও দেখছে। পেট নয়, রিকশাচালকের চোখ। খুব কাছে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধা, অন্তরের অন্তঃস্থলের দৃষ্টিতেই দেখছেন ওই জননী উন্মুক্ত কিছু। রিকশাচালকের দোষ কী? ওতো সুন্দর দেখছে। এ সুন্দরের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রং ফর্সাকারী প্রসাধনীর কোম্পানি। পৃথিবীতে তারা বাস্তবায়ন করেছে— ফর্সা চামড়াই সূন্দর! সুন্দর তো সবাই দেখবেই!

ফোন বেজে উঠল। বাড়ির কল। বাড়ির কল মানে রঘুর মা। অসুস্থ মা আর বৃদ্ধ বাবার শরীর ভাল না। অসময়ে বাড়ির কল আসা মানে বিপদসঙ্কেত। কল দেখলেই মুখ কালো হয় রঘুর। মানসিক প্রস্তুতি রাখে- বাবা না হয় মায়ের মৃত্যের খবর। এ ভাবনাটা মাথা থেকে নামাতে পারছে না। ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এভাবে কেটে যাচ্ছে রঘুর দিন-মাস-বছর।

কল শেষ। ব্যাক করল না। রঘু জানে কিছু না হলে দ্বিতীয়বার কল দেবে না। মোবাইলটি পকেটে। স্কুলের উল্টোদিকে শপিংমল। ভেতরে হাঁটছে রঘু। আনমনে নানা চিন্তা। ঠাণ্ডা মেশিনের বাতাস। কিছুটা ভাল লাগছে। বিপত্তি সুন্দরী নারী। হাতাকাটা ব্লাউজে ফর্সা ডানা ফুটে উঠছে। নিশ্চিত কোনো বড়লোকের বউ। বিধাতা সুন্দরীদের ক্ষেত্রে একটু সহানুভূতি দেখিয়েছেন। রঘুদের ঘরে এমন বউ মানায় না। তাহলে সুন্দরের অবমূল্যায়ন হবে। রঘুর সঙ্গে এমন সুন্দরী রিকশায় চড়তে পারে না, সাদা চামড়া কালো হবে। সুখের থেকে নারীরা বুঝি সুন্দরকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই বিধাতা তাদের পৌঁছে দিচ্ছে বৃত্তের ভেতর। সুখ থাক আর না থাক অর্থ আছে। আছে শীতল গাড়ি-বাড়ি।

প্যান্টের ভেতর জামা গুঁজে পরার অভ্যাস রঘুর নেই। আজ কি কোনো চাকরির ইন্টারভিউ দেবে বলে পরেছিল? নিজের চেহারা কেমন লাগছে— ভাবনায় শপিংমলের বড় আয়নায় তাকিয়েছে। আয়নায় নিজের চেহারা দেখা যাচ্ছে না। পেছন ফিরে অবাক। কানে মোবাইল। মুখে বাঁকা হাসি। কাপড় ধরে হাঁটছে ফুটফুটে একটি বাচ্চা। শপিংমলের গলিটা ট্রেনলাইনের মত। রঘুকে অতিক্রম করা ছাড়া পেছনে যেতে পারবে না। রঘু দাঁড়িয়ে। সামনে আসছে প্রজাপতি। অন্যদিকে দৃষ্টি। আরেকটু সামনে। আর না। দু’জন দাঁড়িয়ে গেল। এতক্ষণে প্রজাপতির মুখে কালোছাপ। ফোনের লাইন কেটে শপিংমল থেকে ধাই ধাই করে বের হচ্ছে। রঘুর গলা শুকিয়ে আসছে। হাত-পা কাঁপছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। এমন কখনো হয়নি। কেন এমন হচ্ছে?

রঘুর পায়ে কচ্ছপগতি। রাস্তায় সিএনজিতে উঠে বসেছে। ভাড়া মিটমাট করেনি। সিএনজিচালক- স্যার কই জাবেন?

-মতিঝিল যাও।

সিএনজিতে হেলান দেওয়া রঘু। হাত দুটি মাথার পেছনে। চোখ বন্ধ। পায়ের উপর পা। মনের ক্লান্তি দূর করতে মুখে সিগারেট। আগুন দেবে— এ সময় পাশের গাড়িতে দৃষ্টি। বাবা তার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে যাচ্ছে। অবুঝ বালক। বাবার দাড়ি ধরে খেলছে আর কিছু একটা বলছে।

চোখ দুটি কেন যেন ভিজে আসছে। রঘুরও বাবা আছে। তার মুখেও দাড়ি আছে। তার দাড়ি ধরে কখনো খেলা করেছে? হয়তো করেছে, হয়তো না। ঠিক মনে পড়ছে না। বাবার সঙ্গে স্কুলেও যায়নি রঘু। লেখাপড়া করছে কিনা, সে খবরও নেয়নি। রঘুর বাবা প্রথম সারির কৃষক। সেই সকালে মাঠে যায় আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। জমির আইলে গামছা পেতে জোহর, আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করে বাড়ি ফেরে। স্কুলজীবনে রঘু অনেকবার বাবাকে ভাত দিতে মাঠে গেছে। সখ করে লাঙ্গল চাষ করছে। কখনো বাবাই মজা করে রঘুকে মইয়ে উঠিয়ে গরু দাবড়িয়েছে।

গরুর প্রতি রঘুর বাবার অনেক ভালবাসা ছিল। সকালে ঘুম থেকে গরুর গোবর পরিষ্কার করা, গরুর খাবার দেয়া, দুপুরে খালের ঘাটে দলবেঁধে গরুকে গোসল করানো তার নিয়মিত কাজ ছিল। এ সময় রঘুও গরুর উপর চড়ে খালের এপার থেকে ওপার যেত। এতে অনেক মজাই ছিল।

সিএনজিচালকের ডাকে ভাবনার জগতকে বিদায় জানালো রঘু। ভাড়া দিয়ে সোজা অফিস। কিছু ভাল লাগছে না। হয়তো প্রজাপতি একটু কথা বললে হাসি ফুটত। কথা বলেনি, তাতেও রঘুর আপত্তি নেই। আপত্তি— হাসিমুখটা কালো হলো কেন? কম্পিউটার অন করছে। কিছু লিখতে পারছে না। অফিসের বসের অনুমতি নিল রঘু। একটু আগেই বাড়ির পথে হাঁটল। অনেক দিন ফুটপাতে রঘু হাঁটে না। এক সময় অনেক হেঁটেছে। তখন ঢাকায় নতুন। গাড়ি ভাড়ার টাকা ছিল না। অফিস টাকা দিত না।

ঘুম আসছে না। টিভি অন করতেই কী একটা খেলার চ্যানেল। টিভি স্ক্রিনে বিদেশীদের গরুর দৌড়ের পাল্লা ভাসছে। অনেক ঘটনাই আছে যা রঘুর জীবন খাতার অতীত পৃষ্ঠা ওল্টাতে বাধ্য করে। টিভির গরুর দৌড় দেখে তার ব্যত্যয় ঘটল না। রঘু প্রজাপতিকে আর কত ভালবাসে? তার বাবার গরুর প্রতি ছিল তার থেকেও হাজার গুণ বেশি ভালবাসা। কাশিমপুরে গরুর দৌড় হয়েছিল। সেখানে রঘুর বাবার গরু দৌড়ে অংশ নেয়। কোনো এক কবিরাজ গরুটাকে তাবিজ করে। গরুটি রোগাক্রান্ত হয়। প্রথমে লেজে ঘা হয়। পরে ঘরুটি মারা যায়। গরুর শোকে রঘুর বাবা সেদিন ভাত খায়নি। কয়েক বছর পর ভারতীয় বড় বড় গরু দেখেও লোভ হয়। দুটি গরু কিনে ক্ষ্যন্ত দেয়। লাল আর সাদা রংয়ের গরু দুটি প্রজাপতির মতোই সুন্দর। ওই গ্রামে কারও মহিষ ছিল না। রঘুর বাবা সে সখও পূরণ করেছেন। রঘু অনেক দিন মহিষের পিঠ চড়ে মাঠে গেছে।

রঘুর প্রতি অবহেলা জন্ম থেকেই। হয়তো মৃত্যুর আগেও এমন হবে। বিধাতা তাকে এমনই রাখবে। এতে রঘুর কিছু যায় আসে না। জীবনের কষ্টের খাল, নদী আর সাগরে সাঁতার কাটতে কাটতে রঘু আজ পরীক্ষিত সাঁতারু। কষ্টকে কষ্ট মনে হয় না। জমিদার বংশ। দাদা শতবিঘা জমির মালিক। কয়েক বিঘা জমির সীমানা নিয়ে বাড়ি। উঠানের সীমানা বিমানবন্দরের থেকে ছোট নয়। বাড়ির ধানের পালা থেকে অনেক দিন রঘু ডাব পেড়ে খেয়েছে। পুকুরের ঘাট বাঁধানো।

প্রজপতি অবহেলা করে তার ভুল ধরণা থেকে। এতে রঘুর আপত্তি নেই। কষ্ট আছে। স্কুলের শিক্ষকরা রঘুকে কোনো অবহেলা করেছিল? ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে নির্ধারিত স্থান ছিল রঘুর। সেখানে কেউ বসত না। এতটুকু মনে পড়ে শিক্ষকরা তার পড়া নিতেন না। কেন? বড় বংশের ছেলে। কিছু বললে বংশের সম্মান যেত?

রঘু দুষ্টু ছিল এটা সত্য। লেখাপড়ায় খুব খারাপ ছিল, তা নয়। কিন্তু খুব জিদ ছিল। জিদ ছিল স্কুলে না যাওয়ার। ক্লাস ফাঁকি দেয়ার। স্কুলের জীবনে কোনো পরীক্ষায় পাস করেনি রঘু। পাস করেনি মানে ৩-৪টি পরীক্ষা দিত না। তাই বলে আবার কোনো ক্লাসে শিক্ষকরা বাদ দেয়নি। উপরের ক্লাসে মই বেয়ে ওঠার মতো উঠছে। কোনোদিন রঘুর বাবা জানতে চায়নি পরীক্ষা কেন দেয়নি। মা কিছু বলেনি।

রঘু তখন ক্লাস সেভেন। ফাইনাল পরীক্ষা। বাড়ি থেকে কলম নিয়ে বের হয়েছে। স্কুলের পাশে কালা মিয়া ডাক্তারের বাগানের গাছের মাথায়। স্কুলের বেল বেঝেছে। হলে প্রবেশ করছে সবাই। রঘু স্কুলের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তত ৫০-৬০ জন মাঠের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা পরীক্ষার হলে যাবে একটু পরে। তাদের বেতন বকেয়া। শিক্ষকরা ১৫ মিনিট শাস্তি দিচ্ছে।

রঘু আজ খুশি। অনেক খুশি। রঘুকে অপমান হতে হয় না। সিক্সের ফাইনাল পরীক্ষার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে। পরীক্ষার হলে বেতন পরিশোধ না করায় সবাইকে দাঁড় করা হয়। রঘুও দাঁড়িয়েছিল। আলমগীর মাস্টারের কাছে গিয়ে বলেছিল, স্যার আপনার সঙ্গে মেজো কাকার কত খাতির। কাল বেতন দেবে। আজ পরীক্ষা দিতে দেন। পরীক্ষা রঘু ওই দিন ঠিক দিয়েছে। কিন্তু কিছু লিখতে পারেনি। হাত-পা কাঁপছে।

স্কুল থেকে সোজা বাড়ি। টাগের্ট একটা। ঠিক বড় ঘরে আগুন দেবে। ওই ঘরে ধানের গোলা। যে বাধা দেবে তাকে মারবে। তাতে যা হয় হবে। বাড়ি আসছে আর রাগ বাড়ছে। কাঠের পুল পার হওয়ার পর হাঁটার গতি বেড়ে গেছে। বাড়ির পেছন দিয়ে সোজা ঘরে। রামদা নেই। কে নিয়েছে? মা বলে রঘুর চিৎকার।

দৌড়ে এসে মা। ভেজা চোখ। রঘুকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে। মার সান্ত্বনা। কিছু হয়নি। তোর বাবার একটা ইট লাগছে। রঘুর চোখে আজ পানি নেই। এটা নতুন কিছু না। বংশ আর গ্রামের ঐতিহ্য। অনেক দিন সকালে রঘুর ঘুম ভেঙেছে ঢাল-সড়কির ঝনঝনানি আওয়াজে। কখনো কখনো রঘুর বাবা-চাচাদের মারামারিতে ঘুম ভেঙেছে। কখনো কারও পক্ষে লাঠি ধরেনি রঘুরা দুই ভাই।

উঠানের চিত্র ভিন্ন। রঘুর দাদার ৮ ছেলে। সবাই বসা। গ্রামের অন্য মানুষও আছে। সিদ্ধান্ত খোঁজা হচ্ছে- কী করবে। মার খেয়েছে রঘুর দাদা। রঘুর বাবার গরু কার ফসল খেয়েছে। এ নিয়ে মাঠে মারামারি হয়েছে। পরে রঘুর দাদাকে পূর্বপাড়ার মানুষ ধরে মেরেছে। রঘুদের বংশ দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ কারও ছায়া মাড়ায় না। তারাও আজ রঘুদের বাড়িতে এসেছে। হাজীসাহেব মার খেয়েছে, মানে পশ্চিমপাড়ার ইজ্জত। পশ্চিমপাড়ার শত্রুতার বরফে বাতাস লেগেছে। সবাই এক। হিন্দুপাড়া থেকে ঢাল-সড়কি আনা হচ্ছে। কাইজ্জায় নামবে। প্রতিশোধ নেবে।

লাঠিয়ালরা দুই সারিতে। সামনে বসবে রঘুর বাবারা তিন ভাই। তার পরে রঘুর বাবার চাচাতো ভাই। পেছনে অন্য গোষ্ঠীর কয়েক শত লোক হুঙ্কার দিয়ে পূর্বপাড়ার দিকে ছুটছে। কিছু সময় পর পর ধর ধর চিৎকার। খালেক মুন্সীর বাড়ির সামনে বসেছে। খালেক মুন্সী রঘুর জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরু।

স্বল্পশিক্ষিত মানুষগুলোর চিৎকার এত সময় অন্য গ্রামে বার্তা পৌছে গেছে। কোনো মায়া নেই। রঘু ছোট। তার কথা কে শুনবে? শুনলে হয়তো সে মাঝে যেত। সবাইকে বাড়ি ফিরিয়ে নিত। ঘটনার বিচার করত। কী হয়েছে পরে দেখা যাবে। ওপার থেকে ইট আসছে। এপার থেকে ইট ছুড়ছে। ইট কোনোপক্ষের নয়। সরকারি রাস্তার-ই ইট। কয়েক মাস হয়েছে রাস্তায় ইট পাতানো হয়েছে। যখন ইট ছিল না তখন রঘুর জন্য ভাল ছিল। বন্যায় রাস্তায় পানি ওঠে। অচল হয়ে যায়। রাস্তা অচল মানে- রঘুর আর স্কুলে যেতে হবে না।

মাগরিবের আজান দিয়েছে। এ সময় দু’পক্ষের কেউ কিছু বলছে। ইটের শব্দ নেই। পালোয়ানরা ফিরছেন। কারও হাতে, কারও পায়ে ইটের আঘাত। রঘুর বাবারও মাজায় গামছা বাঁধা। হাতে ঢাল আর রঘুর রামদা, আর একটা ফলাযুক্ত সড়কি।

সবাই বাড়ি এসে চাচার ঘরে বৈঠকে বসেছে। এবার নতুন কৌশল। মামলা দায়ের করতে হবে। যারা আহত তাদের হাসপাতালে নেবে। মাথা কাটবে। মাথা কাটলে, হত্যাচেষ্টা মামলায় শক্ত ধারা পড়বে। মাথা কাটায় কষ্ট নেই। ডাক্তারকে কিছু ঠাকা দিলে অবস করে কেটে দেবে। রঘুর মেজো চাচা ৫০০ ও ১০০ টাকার দুটি বান্ডিল ব্যাগে ভরে ছুটছে। গন্তব্য হাসপাতাল। পরে থানা।

সংসারের তহবিল রঘুর মেজো কাকার কাছে। তিনি শিক্ষিত। তার প্রতি ছিল সবার অন্ধ বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসেই রঘুর চাচা সংসারের কর্তাবাবু। তার অন্য ভাইদের স্ত্রী ও সন্তানদের চিকিৎসা, শিক্ষা, পোশাক দেয়ার দায়িত্বও ছিল। রঘুর স্কুলের বেতন দেয়নি। খবর নেয়নি স্কুল পরীক্ষারও।

হাজীবাড়ির সন্তান রঘু। এ বাড়িতে বিনোদনের সুযোগ নেই। টিভি দেখা হারাম। রঘু আলিফ লায়লা, টিপু সুলতান, ম্যাগগাইবারের ভক্ত ছিল। নানাবাড়িতে রঘু এ সব দেখেছে। রঘু ছেলেবেলা থেকেই মনকে কষ্ট দেয়নি। রাতে অন্যবাড়ি গিয়ে এ অনুষ্ঠান দেখত। একদিন নাটক (রূগনগর) দেখে ফিরতে বেশ রাত হয়েছিল। সেই শীতের রাতে মাজাপানিতে নামিয়ে রাখা হয়। এটা ছিল টিভি দেখার অপরাধ। ডাঙ্গুলি খেলার অপরাধে মেজো কাকা রঘুকে গাছে ঝুলিয়ে মেরেছে। এসব শাস্তির সময় নীরব থাকত রঘুর বাবা-মা। শাস্তির সময় রঘু কাঁদত না। দাদী এসে তাকে রক্ষা করত। মনোকষ্টে সে ভাত খেত না। অন্যের বাড়ি গিয়ে ঘুমাতো।

যান্ত্রিক নগরী ঢাকার বাসিন্দা রঘু। জীবনযুদ্ধে আজ তার ঢাল-সড়কি নেই। মনে পড়ে রঘুর বাবার কথা- রঘুর বাবা প্রতিদিন খবর নিত- গরুর ঘরে খড় আছে কি-না। মশায় কামড়ায কি-না। কিন্তু একদিনও খবর নেয়নি তার ভাই রঘুর স্কুলের বেতন দিয়েছে কি-না? রঘু কি স্কুলে অপমান হয়েছে, স্কুলে গেছে না-কি কোনো গাছে পালিয়ে আছে? কোনো একলা রাতে রাস্তায় হাঁটে। একবার কি পারত না প্রশ্ন করতে- রঘু বড় হয়ে তুমি কী হবে? তাহলে কি রঘুর কথা সত্য- ‘বাবার সন্তান না হয়ে গরু হলে- হয়তো মানুষ হতাম, রাতে ঘরে ফিরছি কি-না বাবা সে খবর নিত, গরুর বাচার মতো নিজ হাতে গোসল করিয়ে স্কুলে পাঠাত।’

এই রঘু কী বলছিস এ সব? কার ওপর রাগ করে বলছিস? সে তো তোর বাবা, আজ না বাবা দিবস।

হ্যাঁ হ্যাঁ- কী বলছি এ সব। কিসের প্রজাপতি, কিসের কী? কিছু জানি না, কিছু জানতে চাই না। শুধু জানি- রঘুর বাবা যে সেরা বাবা।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে