thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

বিস্ময় হয়েই থাকছেন মুস্তাফিজ

২০১৫ জুলাই ২১ ২২:১৯:২৩
বিস্ময় হয়েই থাকছেন মুস্তাফিজ

রবিউল ইসলাম, চট্টগ্রাম থেকে : তিনি এলেন। জায়গা পেলেন। জয় করলেন। সবটাই যেন ঠিক স্বপ্নের মতো। ক্রিকেট বিশ্ব তো বটেই, বাংলাদেশের অনেকেই তার নাম-ঠিকানা জানতেন না। সেই কোথাকার মুস্তাফিজ এখন বাংলাদেশের ক্রিকেট সেনসেশন। এক বিস্ময়কর নাম। তার বোলিংয়ের ভাষা এখনো কারো জানা হয়নি। জানলেই কী, তার আছে এমন এক অস্ত্র যা দিয়ে জানাকেও অজানা করে দিতে পারেন। পারছেনও। টানা ৩ ম্যাচ খেলেও তার বোলিংয়ের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে ভারত। হতে চলছে টেস্ট ক্রিকেটের নাম্বার ওয়ান দক্ষিণ আফ্রিকাও। তারাও কিন্তু ৬ নাম্বার ম্যাচে মুস্তাফিজের প্রতিভা ভাস্বর বোলিংয়ে নাকাল হচ্ছেন।

সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া গ্রামের তারুণ্যদীপ্ত পেস বোলার মুস্তাফিজে ভারতের বিপক্ষে ফাঁদ পেতে ছিল বাংলাদেশ। ইনিয়ে-বিনিয়ে-ফিনিয়ে বল না খেলে, সহজ বলে হিটিংয়ে গিয়ে ভয় ধরাতে চেয়েছিল ভারত। কিন্তু তার সবটাই গুড়েবালি। ভারতের বিপক্ষে শতভাগ সাফল্য অর্জনের পর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেও মুস্তাফিজ এক বিস্ময় বোলার। তার এক ওভারের জাদুময়ী বোলিংয়েই চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের হয়ে গেছে।

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলে পেসসঙ্কটের এই মহাক্রান্তিকালে মুস্তাফিজুর রহমান যেন এক নব ধ্রব হিসেবে আর্বিভূত হয়েছেন। বাংলাদেশ দলের প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদও বলেছিলেন, দেড় বছর পর মুস্তাফিজকে খেলানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু টেস্ট দলে পেসার সঙ্কটের কারণেই দ্রুত তাকে দলভুক্ত করতে হয়েছে।

নির্বাচক ও অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দিতে একটুও সময়ক্ষেপণ করেননি মুস্তাফিজ। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম তার বোলিং প্রতিভা দেখে বিমুগ্ধ। ৯২ টেস্টে মাত্র ৩বার একদিনে অলআউট করার রেকর্ড আছে বাংলাদেশের সামনে। মঙ্গলবার মুস্তাফিজের অবিশ্বাস্য এক স্পেলেই গোত্তা খেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এক ওভারে যেভাবে কোমর ভেঙে দিয়েছেন, সেই ভাঙা কোমর নিয়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সফরকারীরা।

এমন দিনে মুস্তাফিজও দারুণ খুশি। তিনি জানতেন টেস্টে উইকেট পাওয়া কঠিন। ভাল জায়গায় এবং ডট বল বেশি না করলে উইকেট পাওয়া সম্ভব নয়। পেস-পার্টনার শহীদের সঙ্গে শুরু থেকেই চেষ্টা করেছেন পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করার। সেখানেই সাফল্যের বাতিঘর খুঁজে পেয়েছেন। মুস্তাফিজ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ওয়ানডে এবং টেস্টের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমি টেস্টের এই সাফল্যকেই এগিয়ে রাখব। ওয়ানডে ম্যাচে জায়গায় বল রাখতে পারলেই হয়, তখন ব্যাটসম্যানরা মারতে গিয়ে উইকেট দিয়ে আসে। কিন্তু টেস্টে সহজে উইকেট পাওয়া যায় না। ভাল বলগুলো ব্যাটসম্যানরা ছেড়ে দেন, অনেক কষ্ট করে উইকেট নিতে হয়।’

প্রথম ৩ স্পেলে ১২ ওভার বল করে ৩০ রান দিয়ে উইকেটশূন্য ছিলেন মুস্তাফিজ। তখনও কেউ ভাবেনি দিনশেষে মুস্তাফিজই নায়ক বনে যাবেন।

মুস্তাফিজ তার তৃতীয় স্পেল শেষ করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। সব ঘটনা শেষ দুই স্পেলে। বিশেষ করে চতুর্থ স্পেলে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘প্রথম স্পেলে খুব ভাল হচ্ছিল না বোলিং। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। অন্য প্রান্তের বোলারদের সঙ্গে তাল মিলানোর চেষ্টা করছিলাম। ভাল বোলিং না হলেও অন্তত যেন ডট বল করতে পারি। আমি জানতাম দুই প্রান্ত থেকে চাপ দিলে উইকেট চলে আসবে।’

মুস্তাফিজ শেষ দুই স্পেলে বোলিং করেছেন ৫.৪ ওভার। ৭ রান খরচায় ২ মেডেনসহ নিয়েছেন ৪টি উইকেট। এই উইকেটের মধ্যে হাশিম আমলার উইকেটটিকেই গুরুত্বপূর্ণ মানছেন তিনি। কেননা, এটি তার প্রথম টেস্ট উইকেট। পরের বলে ডুমিনিকে তুলে নিয়ে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছিলেন মুস্তাফিজ। কিন্তু হয়নি। তবে এক বল বিরতি দিয়ে ঠিকই তুলে নিয়েছেন তৃতীয় উইকেটটি। এ প্রসঙ্গে মুস্তাফিজ বলেছেন, ‘হ্যাটট্রিক হয়নি, চেষ্টা ছিল। বলটা যেভাবে করতে চেয়েছিলাম সেভাবেই হয়েছে। কিন্তু ব্যাটসম্যান ভাল খেলেছেন। তাই উইকেট পাইনি।’

অভিষেক ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে মুস্তাফিজ বলেছেন, ‘আমার কাছে সেরা উইকেট হাশিম আমলারটাই। ওয়ানডে-টোয়েন্টি২০-টেস্ট ৩টি ভিন্ন ফরম্যাটের আলাদা আলাদা খেলা। সেই হিসেব করলে অভিষেক ম্যাচে পাওয়া প্রথম সবগুলো উইকেটই সমান গুরুত্বপূর্ণ।’

মঙ্গলবার জাতীয় দলের সাদা পোষাকে বাংলাদেশের ৭৮তম ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেক হয়েছে মুস্তাফিজের। জাতীয় লিগে ১০ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাই আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে বলে মনে করছেন সাতক্ষীরার তরুণ এই ক্রিকেটার। বলেছেন, ‘প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ভাল করায় টেস্টে আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের ধারণাটা পেয়েছি। কিভাবে বোলিং করতে হয়, সেখান থেকেই আইডিয়া পেয়েছি।’

বাংলাদেশ নিয়ে মুস্তাফিজ বলেছেন, ‘প্রথম ৩০ ওভারে সবাই একটু এলোমেলো ছিল। সেভাবে বোলিং করতে পারেননি। কিন্তু লাঞ্চের পর দক্ষিণ আফ্রিকাকে আমরা চেপে ধরি। ওই সময় আমরা অনেক কম রান দিয়েছি। ওটাই আসলে কাজে লেগেছে।’

সীমিত ওভারের ম্যাচগুলোতে মুস্তাফিজ যেভাবে অফকাটারে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করেছেন, চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাটসম্যানদের বিপদে ফেলতে তেমন কোনো অফকাটার ব্যবহার করেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ওয়ানডেতে অফকাটার ওভারে ২-৩টা চেষ্টা করি। এখানে ২-৩ ওভার পরপর একটা চেষ্টা করেছি। টেস্টে ব্যাটসম্যানদের রানের তাড়া কম থাকে। এজন্য বেশি চেষ্টা করিনি। তবে বাতাস কাজে লাগানোর জন্য রাউন্ড দ্য উইকেট বোলিং করেছি। ওদিক থেকে সুইং পাচ্ছিলাম না।’

পাকিস্তান সিরিজের টোয়েন্টি২০ থেকে ভারত হয়ে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজের বোলিং প্রতিভার যে স্ফুরণ ঘটিয়ে চলছেন মুস্তাফিজ, এমনটা এর আগে খুব কম পেসারই পেরেছেন। মুস্তাফিজকে তাই বিস্ময় ছাড়া ভিন্ন কোনো নাম দেওয়ার সুযোগ নেই।

সাদা পোষাকে বাংলাদেশের দুর্দিনে মুস্তাফিজ পথ দেখাবেন, হয়তো দায়িত্ব নেবেন। হয়তো তার হাত ধরেই ওয়ানডে ক্রিকেটের মতো টেস্ট ক্রিকেটেও বদলে যাবে বাংলাদেশ। তিনি জয়ের সঙ্গী হবেন সব ফরম্যাটেই। আসুন, মুস্তাফিজদের ঘিরে আমরা তেমন এক স্বপ্নই দেখি। স্বপ্ন দেখি টেস্টেও টিম বাংলাদেশের।

(দ্য রিপোর্ট/আরআই/এএস/জেডটি/এনআই/জুলাই ২১, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

খেলা এর সর্বশেষ খবর

খেলা - এর সব খবর



রে