thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

স-ম তালিকায় সৌম্য-মুস্তাফিজ

২০১৫ জুলাই ২৭ ২০:১৬:৩৫
স-ম তালিকায় সৌম্য-মুস্তাফিজ

জামান তৌহিদ, দ্য রিপোর্ট : কথায় বলে, নামে নাকি যম টানে। কে, কবে এই কথা প্রচলন করেছিলেন, তিনি আদৌ প্রমাণসাপেক্ষে এই কথা বলেছিলেন কিনা— এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে। তবে নামের সঙ্গে যমের সম্পর্ক না থাকলেও মানুষের যশ-খ্যাতি-অপবাদে নাম কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ ছাপিয়ে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের দিকে তাকালেও এমনটা আপনিও বিশ্বাস করে বসতে পারেন। ক্রীড়া তারকাদের ক্ষেত্রে ‘স’ কিংবা ‘ম’ বর্ণটি যেন অনুঘটকের মতোই জাদুকরী। দেশের এবং বিদেশের যে সমস্ত তারকারা তাদের সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে দ্যুতি ছড়িয়েছেন, তারা যেন এই ‘স-ম’ আদ্যাক্ষরের জাদুছোঁয়ায় উদ্ভাসিত। তাদের নিজ নামের কোনো ভাগের অদ্যাক্ষরে এই স বা ম-এর উপস্থিতি খুঁজে পেতে পারেন আপনি। নিদেনপক্ষে ওই খেলোয়াড়-সংশ্লিষ্ট দেশ, জন্মস্থান বা নিজেকে আত্মপ্রকাশ করার ক্লাবটির নামের সঙ্গে ‘স-ম’র ছোঁয়া আছেই। কিভাবে? তাই নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন প্রধান জনপ্রিয় খেলা। একদিন ফুটবলও ছিল নাম-যশে আকাশ সীমানায়। সময়ের পরিক্রমায় উঠে এসেছেন অনেক খ্যাতনামা ফুটবলার। সেই তালিকায় উজ্জ্বল একটি নাম ফুটবল জাদুকর সামাদ। সে অনেক বছর আগের কথা; কাহিনীর প্রেক্ষাপট ব্রিটিশ-ভারতে। তবে এই জাদুকরের নামের অাদ্যাক্ষরটি খেয়াল করুন; স বর্ণ দিয়ে। সেই স-বর্ণ নাম দিয়েই পরবর্তী সময়ে এসেছেন সালাহউদ্দিন, সালাম মুর্শেদী, শাহিদুর রহমান সান্টু, সাব্বির, সৈয়দ হাসান কানন আর বর্তমান সময়ের সোহল রানা, সজীব কিংবা সবুজদের মতো ফুটবলাররা। আবার স-এর পাশাপাশি দেশের তারকা ফুটবলাদের নামে ম বর্ণের ছোঁয়াও ব্যাপক। মোনেম মুন্না, গোলরক্ষক মোহসীন, মতিউর মুন্না কিংবা বর্তমান জাতীয় দলের অধিনায়ক মামুনুলরা এই তালিকার ধারক-বাহক। স-ম জাদুর এই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে এখনো। মিশু, মিঠুন, মারুফুল, সজীবরা যেন তাই প্রমাণ করছেন।

প্রমীলা ফুটবলের দিকে তাকালেও রয়েছে এই স-ম জাদু। প্রমীলা ফুটবলে বর্তমানে দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকার নাম সাবিনা। আর প্রমীলা জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্বটা যিনি পালন করছেন তার নাম সুইনু প্রু মারমা।

এবার বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বর্তমান স্কোয়াডটির দিকেই তাকানো যাক। সেখানে উজ্জ্বল তারকাদের মধ্যে রয়েছেন মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মুমিনুল। সবাই স-ম দলের প্রতিনিধি। এই দল আরও ভারী করেছেন সাব্বির, সানি, মুস্তাফিজ ও সৌম্য। এ ছাড়াও দেশের ক্রিকেটে মিনহাজুল, মাসুদ, সুজন, সুমন, মেহরাব, মোহাম্মদ রফিক, মনি, মোহাম্মদ আশরাফুল, সানোয়ার হোসেন নামগুলো কিন্তু কম উজ্জ্বল নয়।

বাংলাদেশ জাতীয় প্রমীলা ক্রিকেট দলের বর্তমান অধিনায়কটিও কিন্তু এই গ্রুপের। তিনি সালমা খাতুন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যুব ক্রিকেট দলটিতে যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং আগামীতে আরেকজন সাকিব আল হাসান হওয়ার সম্ভবনা জাগাচ্ছেন তিনি মেহেদী হাসান মিরাজ।

দেশের অন্যান্য খেলাধুলাতেও যেন স-ম গ্রুপের আধিপত্য লক্ষণীয়। যেমন— আন্তর্জাতিক গলফে বাংলাদেশের ঝাণ্ডাটা যিনি উচ্চে তুলে ধরেছেন তিনি সিদ্দিকুর রহমান। দাবায় যিনি প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার খেতাব জিতেছিলেন তিনি নিয়াজ মুর্শেদ। সাঁতারে বাংলাদেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি নাম মোশাররফ হোসেন। যিনি ১৯৮৫ সালে সাফ চ্যাম্পিয়ন শিপে ৫টি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন, জাতীয় পর্যায়ে গড়েছেন প্রায় অর্ধশত রেকর্ড আর ১৯৮৮ সালের ২২ আগস্ট দিয়েছিলেন ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি। মোশাররফ হোসেনের আগে অবশ্য আরও ২ বাংলাদেশী এই চ্যানেল পাড়ি দিয়েছিলেন। তাদের একজন আবার এই ‘স-ম’ গ্রুপের; মালেক ভাই। পুরো নাম আব্দুল মালেক। অন্যজন ছিলেন আরেক কিংবদন্তি ব্রজেন দাস।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনেও ‘স’ কিংবা ‘ম’-এর প্রভাবটা লক্ষণীয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র বলেই এখানে আপনাকে বিবেচনায় নিতে হবে ইংরেজি ‘এস’ এবং ‘এম’ বর্ণ দুটিকে।

ক্রিকেটে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানকে। তিনি স-ম গ্রুপের নন। তবে তার নামের আগে স্যার উপাধি যুক্ত হওয়ায় তিনি কিছুটি হলেও এই গ্রুপে ঢুকে পড়েছেন। শচিন টেন্ডুলকারের নাম। যিনি ব্যাটিং কীর্তিতে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তার নামটা ইংরেজি এস বর্ণ দিয়েই শুরু। সেই হিসেবে আপনি ‘শচিন’ বলতে পারেন, আবার ‘সচিনও বলতে পারেন। টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক যিনি তিনিও এই দলের; মুত্তিয়া মুরলিধরন। দ্বিতীয়স্থানে থাকা বোলারটির নামের আগেও রয়েছে ‘এস’র ছোঁয়া; শেন ওয়ার্ন। ওয়ানডে ক্রিকেটে যে ৫ সেরা রান সংগ্রাহক রয়েছেন তাদের মধ্যে শচিনসহও ৪ জনই এই গ্রুপের। শচিনসহ বাকিরা হলেন— সাঙ্গাকারা, সনাথ ও মাহেলা। ওয়ানডের সেরা উইকেট শিকারীটিও মুত্তিয়া মুরলিধরন। স্টেটে যে সেরা ৫ রান সংগ্রাহক রয়েছেন সেখানে শচিন সবার উপরে। এ ছাড়া রয়েছেন যথাক্রমে রিকি পন্টিং, জ্যাক ক্যালিস, রাহুল দ্রাবিড় ও সাঙ্গাকারা। সাঙ্গাকারা ও শচিন ‘এস’ বর্ণে রয়েছেন। পন্টিংসহ বাকি দুজনের নামের সঙ্গে এই দুই বর্ণের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও দুজনের দেশ বা জন্মস্থানে ঠিকই রয়েছে। ক্যালিসের দেশ সাউথ আফ্রিকা। আর দ্রাবিড়ের জন্মস্থান হল মধ্য প্রদেশ (ভারত)।

ফুটবলের দিকে তাকালে ম্যারাডোনা-মেসি-মিশেল প্লাতিনি-মাইকেল বালাক-ম্যাথুসরা সমৃদ্ধ করেছেন ‘ম’ তালিকাকে। আবার স্টেফানো-সুয়ারেজ-সাচেজরা সমৃদ্ধ করেছেন ‘স’ তালিকাকে। পেলে বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরা নামের গুণে না হলেও ক্লাবের গুণে স-ম সমৃদ্ধ করেছেন। কেননা, পেলের ফুটবল ক্যারিয়ারের পুরোটা জুড়ে যে ক্লাব প্রভার বিস্তার করেছে সেটির নাম সান্তোস। আর রোলানদো যে ক্লাবটির গুণে উজ্জ্বল হয়েছিলেন তা হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বর্তমানে যে দলটিতে খেলছেন তার নাম আবার রিয়াল মাদ্রিদ; কোথাও না কোথাও ‘ম’ আছেই।

টেনিস বিশ্বে যদি তাকানো যায় তাহলে প্রমীলা টেনিসে ‘স-ম’র জয়-জয়কার। মনিকা সেলেস, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা, স্ট্রেফি গ্রাফ, সেরেনা উইলিয়ামস, মারিয়া শারাপোভা, মার্টিনা হিঙ্গিস, সানিয়া মির্জা নামগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল। অন্যদিকে, পুরুষ টেনিসে বর্তমানে যে ৪ তারকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা হলেন নোভাক জকোভিচ, রজার ফেদেরার, এ্যান্ডি মারে ও রাফায়েল নাদাল। এদের মধ্যে মারে বাদে বাকিদের কারোরই নামের কোনো অংশের অাদ্যাক্ষরে স বা ম নেই বটে; তবে এদের দেশগুলোর নাম দেখুন; ফেদেরারের সুইজারল্যান্ড, নাদালের স্পেন, জকোভিচের সার্বিয়া আর মারের দেশ হল স্কটল্যান্ড। সবগুলো দেশই ‘স’ দিয়ে শুরু।

গলফে বর্তমানে যে পুরুষ তারকাটি এক নম্বর পজিশন দখল করে রেখেছেন তিনিও এই গ্রুপের। তার ডাকনাম ম্যাকলরয়। মুষ্টিযুদ্ধ বা বক্সিং বিশ্বে যে তারকাটি কিংবদন্তি হয়ে রয়েছেন তার নাম মুহাম্মদ আলী। আবার বর্তমানে যে তারকাটি এই জগতের একছত্র অধিপতি তার নামেও রয়েছে ‘ম’-এর জাদু; তিনি মেওয়েদার। পুরো নাম ফ্লয়েড মেওয়েদার।

ফিরে আসুন শিরোনামে; ফিরে আসুন সৌম্য-মুস্তাফিজে। আন্তর্জাতিক মানের বিচারে পেস বোলার বলতে এতদিন বাংলাদেশের জন্য ছিলেন একমাত্র মাশরাফি বিন মর্তুজাই। এরপর অনেকেই এসেছেন; কিন্তু তাতে করে বাংলাদেশের পেস শক্তি যেন ঠিক প্রাণ পায়নি। তবে রুবেল-তাসকিনের বদৌলতে তা গতি পেয়েছিল। আর মুস্তাফিজের আগমনটা যেন পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে বাংলাদেশের গতির বলের শক্তি। স্পিননির্ভর বাংলাদেশ এখন তাই পেস দিয়েই ঘায়েল করতে পারছে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলগুলোকেও।

ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো কোনো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের মূল কৃতিত্বটা তো আসলে মুস্তাফিজেরই। তার বিধ্বংসী বোলিংয়েই তো তিন ম্যাচের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জিতেছে বাংলাদেশ। আর সদ্য সমাপ্ত চট্টগ্রাম টেস্টে তো এই তরুণ মুস্তাফিজের এক বিধ্বংসী ওভারের গুণেই প্রথমবারের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট জয়ের আশা জেগেছিল বাংলাদেশের। যদিও বৃষ্টিতে তা ভেসে গিয়েছে।

মুস্তাফিজের মতোই উদ্ভাসিত সৌম্য সরকার। তবে সেটা ব্যাট হাতে। সাকিব-মুশফিক-তামিম-মাহমুদউল্লাহর পর সত্যিকারের একজন নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যানের নাম বলতে গেলে এখন তরুণ প্রতিভাদৃপ্ত সৌম্যের নামই উচ্চারণ করতে হয়। তামিমের সঙ্গে তার ব্যাটের যুগলবন্দীতেই তো পাকিস্তানকে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইওয়াশ করতে পেরেছে বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষেও তিনি ছিলেন অনন্য। আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐতিহাসিক ওয়ানডে সিরিজ জয়ের ক্ষেত্রেও তো এই সৌম্যই দুইবারের ম্যাচসেরা; সিরিজ সেরাও।

মজার ব্যাপার হল, এই দুই ক্রিকেটার আবার যেখান থেকে উঠে এসেছেন সেই জায়গাটির সঙ্গে রয়েছে ‘স’ কিংবা ‘ম’র ছোঁয়া; জেলাটির নাম সাতক্ষীরা।

(দ্য রিপোর্ট/জেডটি/এএস/সা/জুলাই ২৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

খেলা এর সর্বশেষ খবর

খেলা - এর সব খবর