thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

বঙ্গবন্ধু হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে ভাটা

২০১৫ আগস্ট ১৫ ০২:০৩:৩১
বঙ্গবন্ধু হত্যার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে ভাটা

এম এ কে জিলানী, দ্য রিপোর্ট : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ৬ আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেই। এই বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্স সৃজনশীল কাজের বিপরীতে ‘ঘুমন্ত ভূমিকা’ পালন করছে। সরকারের কূটনীতিকরাও গত ৫ বছরে বিশেষ কোনো ভূমিকা দেখাতে পারেনি। দ্য রিপোর্টের অনুসন্ধানে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশে পলাতক ৬ জনের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল খন্দকার আব্দুর রশিদ পাকিস্তান বা লিবিয়ার বেনগাজিতে, লে. কর্নেল নূর চৌধুরী কানাডায়, লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম কানাডা বা নাইরোবি বা পাকিস্তানে, লে. কর্নেল এম এ রাশেদ চৌধুরী আমেরিকার লস-এঞ্জেলসে, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ পাকিস্তানে ও রিসালদার মোসলেমউদ্দিন পাকিস্তানে অবস্থান করছেন। পলাকত এই আসামি সকলেরই পাকিস্তানের পাসপোর্ট রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক সূত্র দ্য রিপোর্টকে জানায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে টাস্কফোর্সের ব্যর্থ ভূমিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুব্ধ। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই উদ্যোগ নিয়েছেন। চলতি আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে শেখ হাসিনা এই বিষয়ে পারদর্শীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর বর্তমান টাস্কফোর্সের অস্তিত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। সামনে এই টাস্কফোর্স নাও থাকতে পারে।

পলাতক ৬ আসামির মধ্যে ৩ জনকে অদূর ভবিষ্যতে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানা গেছে। গোপনীয়তার স্বার্থে নামগুলো প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বাকি ৩ জনকে ফিরিয়ে আনা যাবে কিনা বিষয়টি এখনও পরিষ্কার না।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম টার্মে (৯০ দশকের পর) এই বিষয়ে সমন্বয়কের কাজ করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান। তিনি এই বিষয়ে একাধিক সাফল্যও দেখিয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্বের ক্ষমতাধর অনেক নেতাকে বাংলাদেশ সফরে আনার ক্ষেত্রেও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন সাবেক এই কূটনীতিক।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউ রহমান এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে এত সময় লাগার কথা নয়। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রের লস-এঞ্জেলসের একটি আদালতে পলাতক আসামি লে. কর্নেল এম এ রাশেদ চৌধুরীর ট্রায়াল চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন-কানুন খুবই গোছানো। তাকে তো আইনের আওতায় ওই দেশ থেকে আনা তেমন কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু কেন আনা যাচ্ছে না তা টাস্কফোর্সই ভাল বলতে পারবে। আর কানাডায় রয়েছেন লে. কর্নেল নূর চৌধুরী। কানাডা ফাঁসির দণ্ড বিশ্বাস করে না। কিন্তু কানাডা থেকে তাকে ফিরিয়ে আনতে অন্য পদ্ধতি রয়েছে। টাস্কফোর্স সেই পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে।’

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দেশে ফিরিয়ে না আনতে পারার কারণ হিসেবে দুইটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউ রহমান।

ওয়ালিউ রহমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এই বিষয়ে দুইটি কারণ রয়েছে। এক, শূন্য দশকে ক্ষমতার পালাবদলে বিএনপি দেশ শাসনের দায়িত্ব পায়। এর আগে আওয়ামী লীগ শাসনামলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে আনতে অগ্রগতি হয়েছিল। অনেক নথিপত্র জোগাড় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় (শূন্য দশকের পর সর্বশেষ বিএনপির শাসনামল) আসার পর ওইসব নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়। এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি লে. কর্নেল নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছিল। তিনি তখন জার্মানিতে ছিলেন। কিন্তু ফিরিয়ে আনার অন্তিম মুহূর্তে বাংলাদেশের পক্ষে জার্মানির সাবেক রাষ্ট্রদূত শসসের মবিন চৌধুরী তার নিজের গাড়িতে করে নূর চৌধুরীকে জার্মানি থেকে কানাডায় পার করে দেন।’

ওয়ালিউর রহমান আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, এই বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের ঘুমন্ত কার্যকলাপ। এই টাস্কফোর্স এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো সৃজনশীলতা (ক্রিয়েটিভ এবং ইনোভেটিভ) দেখাতে পারেনি। পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে সবার আগে প্রয়োজন দৃঢ়তার সঙ্গে সৃজনশীলতা। ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে গঠিত এই টাস্কফোর্স নিয়মিত বৈঠকই করতে পারেন না, তো কীভাবে কাজ হবে। এ ছাড়া আইন, স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে গঠিত এই টাস্কফোর্সে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে।’

এই বিষয়ে জানতে চাইলে টাস্কফোর্সের প্রধান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘প্রসেস ইন অন। এর বেশি একটি ওয়ার্ডও বলা যাবে না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামির ফিরিয়ে আনার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আমরা কাজ করছি। এরই মধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের তথ্যসহ ছবি পাঠানো হয়েছে।’

দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে টাস্কফোর্সের ব্যর্থতা এবং ঘুমন্ত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা ঘুমিয়ে নেই। কাজ করছি। এর বেশি বলা যাবে না।’

ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয় করা বাংলাদেশ পুলিশের এআইজি মাহবুবুর রহমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। প্রতিনিয়ত তথ্য আপডেট করা হচ্ছে। কিন্তু ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জাতীয় সংদের সদস্য খালিদ মাহমুদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া সাংগঠনিকভাবেও আমরা এই বিষয়ে চেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা আশাবাদী, পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের দণ্ড বাস্তবায়ন করতে পারবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই বিষয়ে কূটনৈতিক বা সরকারের অন্য কোনো ব্যর্থতা নেই। কয়েকটি রাষ্ট্র আত্মস্বীকৃত এই খুনীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। যা খুবই গর্হিত কাজ।’

এদিকে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, ঢাকায় অবস্থিত কানাডা দূতাবাস থেকে জানান হয়, দেশটি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে কাপুরুষোচিত হামলার মাধ্যমে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ আইনী প্রক্রিয়া ও কালক্ষেপণের পর আদালত ১২ জনকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর রায় দেয়। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলার বিচার কাজ শেষ হয়।

এই ১২ জনের মধ্যে ৫ জনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি রাতে। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি লে. কর্নেল আজিজ পাশা পলাতক অবস্থায় দেশের বাইরে মারা যান। বাকি ৬ আসামি এখনও দেশের বাইরে পলাতক।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ আসামি হচ্ছেন— অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন (আর্টিলারি কোর),লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার ইউনিট), লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ (পলাতক), লে. কর্নেল নূর চৌধুরী (পলাতক), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম (পলাতক), লে. কর্নেল এম এ রাশেদ চৌধুরী (পলাতক), লে. কর্নেল আজিজ পাশা, মেজর বজলুল হুদা, বরখাস্ত হওয়া সেনা কর্মকর্তা কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ (পলাতক) এবং রিসালদার মোসলেমউদ্দিন (পলাতক)।

(দ্য রিপোর্ট/জেআইএল/এএসটি/আইজেকে/এইচএসএম/এনআই/আগস্ট ১৫, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ আয়োজন এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ আয়োজন - এর সব খবর



রে