thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৩ মহররম ১৪৪০

রক্তাক্ত স্মৃতিতে শোক কাতরতা

২০১৫ আগস্ট ১৫ ০৩:১১:০১
রক্তাক্ত স্মৃতিতে শোক কাতরতা

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : নির্মম হত্যাযজ্ঞের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আবার এসেছে ১৫ আগস্ট। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নিহত হওয়ার দিন, জাতীয় শোক দিবস। ৪০ বছর আগের রক্তাক্ত স্মৃতিতে শনিবার শোকে কাতর হবে জাতি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার বুলেটের নিষ্ঠুরতায় জীবন দেন বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সদস্যরা। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের রায় হয়েছে। পাঁচজন ফাঁসিতে ঝুললেও বাকিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জাতীয় শোক দিবস পালনে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা কর্মসূচি পালন করবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুরই কন্যা শেখ হাসিনা।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে ১৫ আগস্ট শাহাদাতবরণকারী জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যদের অম্লান স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেন, ‘এ ঘটনা কেবল বাঙালীর ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ককে হত্যা করা নয় বরং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে মুছে ফেলা এবং পরাজিত শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য।’

জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতাকে হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে সকলকে দেশ গঠনে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বলেন, ‘ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তার স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও তিতিক্ষার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনাদর্শ বাঙালী জাতির অন্তরে প্রোথিত হয়ে আছে।’

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সরকারি ছুটি শনিবার। সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হবে।

রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির মধ্যে শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। সশস্ত্র বাহিনী গার্ড অব অনার প্রদান করবে। এ সময় বিশেষ মোনাজাত ও কোরআন তিলাওয়াত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী সকাল সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে জাতির পিতার পরিবারের সদস্য ও অন্য শহীদদের কবরে এবং সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন। এ সময় ফাতেহা পাঠ ও সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার প্রদানসহ বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশে সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা করা হবে।

জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলসহ জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, হামদ ও নাত প্রতিযোগিতা এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হবে।

আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচির মধ্যে সূর্যোদয়ের সময় বঙ্গবন্ধু ভবন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দলের সর্বস্তরের কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল সাড়ে ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে এবং সাড়ে ৭টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, কবর জিয়ারত, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত ও মিলাদ মাহফিল, ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনকের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, ফাতেহা পাঠ, মোনাজাত এবং ১১টায় মিলাদ ও বিশেষ দোয়া মাহফিল, দুপুরে অসচ্ছল দুস্থ মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ, বাদ আসর মহিলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল।

এ ছাড়া রবিবার বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সভাপতি হিসেবে এতে যোগ দেবেন। এ ছাড়া সিপিবি, গণফোরাম, জাসদ, ন্যাপ ও গণতন্ত্রী পার্টি এবং আওয়ামী লীগের সব সহযোগী সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।

সে কালরাতে যারা শহীদ হন

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে কাপুরোষোচিত আক্রমণ থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরাও রেহাই পাননি। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামে যিনি ছায়ার মতো পাশে থেকে মনোবল যুগিয়েছিলেন, সেই সাহসিনী বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও ঘাতকদের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাননি। বরং মাথা উঁচু করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হয়ে চলে গেলেন দেশের তরে।

ঘাতকের বুলেট থেকে বঙ্গবন্ধুর তিন ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, শেখ জামাল ও নিষ্পাপ শিশুপুত্র শেখ রাসেলও রেহাই পাননি। বঙ্গবন্ধুর পুত্রবধূ সুলতানা কামাল দেশের একজন খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ এবং আরেক পুত্রবধূ রোজী জামালও শহীদ হন।

বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের পায়ের সমস্যা নিয়েও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তার মতো শান্ত ও বিচক্ষণ প্রগতিশীল মানুষকেও ঘাতকরা হত্যা করেছে ওই রাতে। বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে তার জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হককেও ধানমণ্ডির বাড়িতে হত্যা করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার মেয়ে বেবী, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করে ঘাতকরা।

ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বিভিন্ন ঘরে ও একাধিক বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং নিকট আত্মীয়সহ মোট ২৬ জনকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানীতে অবস্থান করায় তারা প্রাণে বেঁচে যান।

এক চিলতে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯১৭ সালের ২০ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার (যিনি আদালতের হিসাব সংরক্ষণ করেন) ছিলেন এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন ছাত্রনেতা। ক্রমে তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতৃত্বের উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তুখোড় বক্তা। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এক সময় ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন।

ছয় দফা দাবির মধ্যে প্রধান ছিল বর্ধিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, যার কারণে তিনি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অন্যতম বিরোধী পক্ষে পরিণত হন। ১৯৬৮ সালে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার বিচার শুরু হয়, কিন্তু তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। এর পরও তাকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় শেখ মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা চালায়। একই রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীকালে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। রহিমুদ্দিন খান সামরিক আদালতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তবে তা কার্যকর হয়নি।

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এসে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।

(দ্য রিপোর্ট/এইউএ-আরএমএম/এনডিএস/এজেড/আগস্ট ১৫, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

শোকাবহ ১৫ আগস্ট ২০১৫ এর সর্বশেষ খবর

শোকাবহ ১৫ আগস্ট ২০১৫ - এর সব খবর



রে