thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১০ মহররম ১৪৪০

প্রস্তুতিমুখর অপরূপা সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়াম

২০১৫ আগস্ট ১৬ ২০:০৯:৫১
প্রস্তুতিমুখর অপরূপা সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়াম

জামান তৌহিদ, সিলেট থেকে ফিরে : প্রবেশ করতেই ব্যাপক প্রস্তুতির আয়োজন। চলছে সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে ঢেলে সাজানোর কর্মযজ্ঞ। একদল কর্মী মাঠের কোনেকানে শশব্যস্ত। কেউ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ড্রেনেজ সিস্টেম নিয়ে, কেউবা মাঠের কেন্দ্রস্থলের ২২ গজী সীমানায়। পাখির চোখে তাই তদারকি করছেন ন্যাশনাল পিচ কিউরেটর গামিনি ডি সিলভা। মাঠকর্মীরা মাটি বয়ে নিয়ে ফেলছেন সেখানে। একদল তা সাজাচ্ছেন নির্দেশিত জায়গায়। যেন আন্তর্জাতিকমানের স্পোর্টিং উইকেট তৈরিতে কোনো প্রকার ঘাটতি না থাকে। দেশের অষ্টম টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা পাওয়া সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ব্যাপক আয়োজনে চলছে নবরূপে সাজসজ্জার সুবিস্তর কার্যক্রম।

বাংলাদেশে এর আগে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম (এখন নেই) ও মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়াম, চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম ও জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম, ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম ও খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম এই ৭টি স্টেডিয়াম টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা পেয়েছে। এবারে সেই তালিকায় যোগ হচ্ছে সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়াম। আগামী বছর জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ম্যাচ দিয়ে যার টেস্ট অভিষেক হবে। এরও আগে এখানে অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)ও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের কিছু ম্যাচ। এর আগে স্টেডিয়ামকে কাঙ্ক্ষিত মানে সাজানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

সিলেটের লাক্কাতুরা এলাকায় চা-বাগান আর ছোট ছোট টিলা পাহাড়বেষ্টিত এই স্টেডিয়ামটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৭ সালে। তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম। তবে ২০১৪ সালের আইসিসি টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপ ও আইসিসি প্রমীলা টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে স্টেডিয়ামটির সংস্কার করা হয়েছিল ২০১৩ সালে। ২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্টেডিয়ামটি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছর ১৭ মার্চ টোয়েন্টি২০ বিশ্বকাপের আয়ারল্যান্ড-জিম্বাবুয়ের ম্যাচ দিয়ে যাত্র শুরু হয়েছিল সিলেট স্টেডিয়ামের। যদিও এখন অব্দি খুব বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি এখানে। তবে টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা পাওয়ার প্রাকৃতিক নৈসর্গের ছোঁয়ায় অপরূপা এই স্টেডিয়ামের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়েছেন আইসিসি প্রতিনিধি দল। বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শনে এসে ওই কথা ফলাও করে বলেও গিয়েছেন তারা।

স্টেডিয়ামের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে দ্য রিপোর্টের সঙ্গে কথা বলেছেন ভেন্যু ম্যানেজার জয়দ্বীপ দাস। যিনি নিজেও এক সময় ক্রিকেটার ছিলেন এবং বর্তমানে একজন তালিকাভুক্ত আম্পায়ারও। সদালাপী ও সুদর্শন এই মানুষটি জানিয়েছেন, ‘সিলেট স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ প্রায় শেষের দিকেই। আগামী এক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি সংস্কার কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আমরা আশা রাখছি। কিউরেটর গামিনি ডি সিলভার তত্ত্বাবধানে পিচগুলো তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি চলছে স্টেডিয়ামের ড্রেনেজ সিস্টেম উন্নয়নের কাজও।’

জানা গেছে, স্টেডিয়ামে মোট ৭টি উইকেট তৈরি করা হচ্ছে। মাঠকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, আগে পিচের জন্য মাটি ঢাকার সাভার থেকে আনা হলেও বর্তমানে বগুড়া থেকে আনা হয়েছে উইকেট তৈরিতে ব্যবহৃত মাটি।

ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক কারণেই সিলেট বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা। সেই হিসেবে এখানে ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে বৃষ্টি বিড়ম্বনা। তবে ভেন্যু ম্যানেজার জানিয়েছেন, ‘বৃষ্টি নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ থাকছে না। কেননা, সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের মাঠ ও ড্রেনেজ সিস্টেমকে এমনভাবে সংস্কার করা হচ্ছে; যাতে করে ভারী বর্ষণ হলেও মাত্র ২০ মিনিটেই মাঠকে শুকিয়ে খেলার উপযোগী করা সম্ভব হবে।’

২০১৩ সালে স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সটি উন্নত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমও অত্যাধুনিক করা হয়েছে। দিবারাত্রির কোনো ম্যাচ আয়োজনেও সমস্যা নেই স্টেডিয়ামটির। মাঠের ঘিরে ৪ প্রান্তে রয়েছে শক্তিশালী ফ্ল্যাডলাইটের ব্যবস্থাও।

বর্তমানে ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ হাজার দর্শকধারণ ক্ষমতা থাকলেও জয়দ্বীপ জানিয়েছেন, ‘গ্যালারির আসন বাড়ানো হচ্ছে। সংস্কার শেষে কম করেও ২০ হাজার দর্শকধারণ করতে পারবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই স্টেডিয়াম।’

সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সবচাইতে আকর্ষণীয় বিষয়টি হল ‘গ্রিন গ্যালারি’। দেশের প্রথম ও একমাত্র প্রাকৃতিক গ্যালারির মালিক এই স্টেডিয়ামটি। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ইংল্যান্ডে কোনো কোনো ক্রিকেট ম্যাচে দেখা যায় সবুজ ঘাসের উঁচু মাঠে শুয়ে-বসে খেলা দেখছেন দর্শকরা। সেখানে নেই সচারাচর গ্যালারিতে বিদ্যমান থাকা কোনো চেয়ার। সিলেট স্টেডিয়ামের এই গ্রিন গ্যালারিটি ঠিক সেই আদলেই করা হচ্ছে। মাঠের পাশে থাকা একটি টিলাকে তৈরি করা হয়েছে প্রাকৃতিক গ্যালারি হিসেবে। সেখানে আবার দর্শকরা যেন আরাম করে বসতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে সিঁড়ির ধাপের মতো কয়েকটি সারিও তৈরি করা হয়েছে। জয়দ্বীপের মতে, ‘এই গ্রিন গ্যালাটিতে হাজার দেড়েক দর্শক বসতে পারেন। তবে সংস্কার শেষে এরও ধারণক্ষমতাও বাড়ানো পরিকল্পনা রয়েছে।’ প্রাকৃতিক গ্যালারি হলেও বৃষ্টিতে মাটি ক্ষয়ের কারণে গ্যালারি ধসে পড়ার কোনো শঙ্কা নেই বলেও জানিয়েছেন তিনি। কেননা, এর প্রতিটি ধাপে ইট-কংক্রিকেটের ভিত্তি দেওয়া রয়েছে।

প্রকৃতির মমতায় শুয়ে থাকা সিলেট স্টেডিয়ামটিতে প্রবেশ করার মুখেই মন ভরে যেতে পারে প্রশান্তিতে। মূল ফটকে ঢোকার মুখেই হাতে ডান দিকে থাকা চা-বাগান দৃষ্টি ও মন দুটোকেই যেমন দিতে পারে শান্তি, তেমনি ফটকে ঢোকার পরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তৃপ্তি দিতে পারে যে কাউকেই। সেই রূপ আরও বাড়িয়ে তুলতে স্টেডিয়ামের মূল ভবনের সামনের অংশটিকে আগামী এক বছরের মধ্যে চা-বাগানে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। সঙ্গে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে ২টি ঝরণা।

আগামী নভেম্বরেই মাঠ পরিদর্শনে আসবে আইসিসির পরিদর্শক দল। তাদের রিপোর্টের ওপরই নির্ভর করেছে সিলেট স্টেডিয়ামের টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদা পাওয়া বিষয়টি। যদিও এই বিষয়ে একেবারেই দুশ্চিন্তাহীন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। তিনি বলেছেন, ‘আগামী বছর জিম্বাবুয়ের সফরকালে সিলেটে একটি টেস্ট হচ্ছে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যে সূচি আছে তা প্রস্তাবিত। তবে এখান থেকে পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ খুব একটা নেই।’

টেস্ট ভেন্যুর মর্যাদার ক্ষেত্রে সিলেট স্টেডিয়ামের ভাগ্যে কি রয়েছে তা জানা যাবে নভেম্বরে। তবে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ক্রিকেট ছাড়িয়ে একদিন যদি সিলেট স্টেডিয়াম পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়; তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।

ছবি ও তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা : মনোয়ার জাহান চৌধুরী, সিলেট ব্যুরো প্রধান, দ্য রিপোর্ট

(দ্য রিপোর্ট/জেডটি/এএস/সা/আগস্ট ১৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ক্রিকেট এর সর্বশেষ খবর

ক্রিকেট - এর সব খবর



রে