thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫,  ৭ মহররম ১৪৪০

সিলেটে ক্রিকেট নিয়ে নতুন স্বপ্নকথা

২০১৫ আগস্ট ২০ ১৯:৫৯:২১
সিলেটে ক্রিকেট নিয়ে নতুন স্বপ্নকথা

জামান তৌহিদ, সিলেট থেকে ফিরে : ক্রিকেট এখন আর কেবল খেলা নয়; এটা মিশে গেছে নাম-যশ-খ্যাতি আর জীবন-জীবিকার সঙ্গে। ক্রমেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে। ব্যাটে কিংবা বলে সাফল্য ছড়াতে পারলেই ক্রিকেটারদেরও মিলে যায় তারকাখ্যাতি। সঙ্গে যুক্ত হয় কাড়ি কাড়ি অর্থ আর বিলাসী জীবনও। দেশজুড়েই তাই ক্রিকেটে ঝুঁকছে শিশু-কিশোর ও তরুণরা। শত কষ্টের মধ্যেও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় অনেক মা-বাবা সন্তানকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন ক্রিকেটে। অথচ সেই ক্রিকেট নিয়েই ক্ষোভ-হতাশা আর দুঃখে পুড়ছেন সিলেটের উদীয়মান কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে সাবেক জাতীয় তারকারাও। সিলেটে ক্রিকেটীয় প্রতিভা বিকাশের পর্যাপ্ত ‍সুযোগ-সুবিধা-উদ্যোগ না থাকায় তাদের রাজ্যের হতাশা-দুঃখ।

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জিতেই শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাফল্যগাথা। ওই সময় জাতীয় দলে উজ্জ্বল ছিলেন পেসার হাসিবুল হোসেন শান্ত, যিনি গতির বলে আগুন ঝরিয়ে বাংলাদেশকে সাফল্য উপহার দিয়েছেন। এ দেশে কিশোর-তরুণদের দেখিয়েছেন পেসার হওয়ার স্বপ্নও। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের নেতা মাশরাফি বিন মর্তুজা ওই শান্তকে দেখেই প্রেরণা পেয়েছেন পেসার হওয়ার। সিলেটবাসীকে তো বটেই, বাংলাদেশকেও শান্ত গর্বিত করেছেন। সিলেটের মাটিতে জন্ম নিয়েছেন, সেখানকার আলো-বাতাসে বড় হয়েছেন।

শান্তর পর বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করেছেন পেসার তাপস বৈশ্য, দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান ও ফিল্ডার রাজিন সালেহ কিংবা অলক কাপালির মতো তারকা ব্যাটসম্যান। এর পর লেগস্পিনার এনামুল হক জুনিয়র কিংবা অলরাউন্ডার আবুল হাসান রাজুরা। তবে জাতীয় দলে ঠিক যেন ততটা মজবুত অবস্থান পোক্ত করতে পারেননি। ক্রমেই সিলেটের ক্রিকেটাররা ছায়ার তলে পড়ে যাচ্ছেন। সিলেট থেকে উঠে আসছে না দ্যুতি ছড়ানোর মতো ক্রিকেট তারকা।

সিলেটে সেই মানের ক্রিকেটার না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্য রিপোর্টকে হাসিবুল হোসেন শান্ত বলেছেন, ‘সিলেটে ক্রিকেট তারকা না জন্মানোর পেছনে নানাবিধ কারণ রয়েছে। সেখানে যেমন খেলার মাঠ থেকে শুরু করে পর্যাপ্ত ক্রিকেট টুর্নামেন্টের অভাব রয়েছে; তেমনি আবার ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের তৈরির বিষয়ে সিলেট ক্রিকেট কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা ও যথাযথ উদ্যোগেরও অভাব রয়েছে। প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকলেই প্রতিভাবানকে খুঁজে পাওয়া যায়।’ শান্ত অনেকটা অনুযোগ করেই বলেছেন, ‘সিলেটের কর্মকর্তাদের কাছে ক্রিকেটার তৈরির চেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয়গুলোই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তো বলব, তাদের নানামুখী দলাদলির বলি হয়েছে সিলেটের ক্রিকেট।’

শান্ত-তাপস বৈশ্যদের মতো পেসারদের স্থান হলেও সিলেটে পেসার সঙ্কট রয়েছে। ভবিষ্যৎ গতির বলে আলো ছড়ানোর মতো বোলারদের ঘাটতিও রয়েছে সেখানে। এই বিষয়ে শান্ত বলেছেন, ‘সত্যি করে বলতে গেলে এই বিষয়ে সিলেটের কিশোর-তরুণদের আগ্রহ কম। যারা খেলছে তাদেরও অনাগ্রহ রয়েছে। তারা আসলে কষ্ট করতে চায় না। আমি বলব, সিলেটে ভালমানের ক্রিকেটার না পাওয়ার পেছনে এটাও অন্যতম বড় কারণ।’

ঢাকাবাসী শান্ত জানিয়েছেন, ‘সিলেটে ভবিষ্যতের তারকা তৈরিতে কিংবা বর্তমানে যারা খেলছে, তাদের ঘঁষে-মেজে তৈরি করতে যদি সিলেটের ক্রিকেট কর্মকর্তারা উদ্যোগ নেন, তাহলে আমি সানন্দে তাদের সহায়তা করব।’

রাজিন সালেহর আবাস সিলেটেই। তিনি কারও অপেক্ষায় থাকেননি। নিজ উদ্যোগেই নেমে পড়েছেন সিলেটের বর্তমান প্রজন্মকে ভবিষ্যতের তারকা ক্রিকেটার বানানোর মিশনে। গত ২ মাস ধরে সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ইনডোরে নিজ উদ্যোগেই একটি ক্যাম্প চালাচ্ছেন তিনি। তার ক্যাম্পে রয়েছে বিভিন্ন বয়সী ৫৩ জন কিশোর-তরুণ। প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে মাত্র ১৫০০ টাকা করে নিয়েছেন তিনি। বাকিটা খরচ চালাচ্ছেন নিজ উদ্যোগেই। ক্যাম্প পরিচালনা করতে গিয়ে নিজ একাডেমি থেকে ৬৪টি বলও প্রদান করেছেন রাজিন, যে বলগুলোর প্রতিটির দাম ৪০০ টাকা করে। আর তাকে সাহায্য করছেন অলক কাপালি, তাপস বৈশ্য, এনামুল জুনিয়র ও সিলেটের বহুল আলোচিত কোচ ইমন। তাপস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও রাজিনের এই উদ্যোগে শামিল হয়ে আগ্রহী প্রশিক্ষণার্থীদের এক সপ্তাহের পেস বোলিং কোচিং করিয়েছেন। এনামুল স্পিন কোচিং করাচ্ছেন। অলক কাপালি দেখছেন ব্যাটিং সাইডটা। ইমনও দিচ্ছেন কোচিং।

উদ্যোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাজিন সালেহ দ্য রিপোর্টকে বলেছেন, ‘আসলে সিলেটের ভবিষ্যৎ তারকা তৈরি করতে আমাদের মতো সিনিয়র ক্রিকেটারদের দায়িত্ব নিতে হবে। কেননা, এখানে নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি বা উদাসীনতার বিষয়টি তো রয়েছেই। এখানে খেলার মাঠের তীব্র অভাব রয়েছে। সিলেটে তেমন কোনো ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয় না। এমনকি এখানে লিগটাও নিয়মিত হয় না। আমরা যে সময়টায় উঠে এসেছি তখন প্রচুর টুর্নামেন্ট হতো এখানে। কিন্তু এখন কেবলই শূন্যতা। খেলার সুযোগ না থাকায় অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কেউ কেউ খেলা ছেড়ে বিদেশেও পাড়ি জমাচ্ছে। একটি ছেলে যদি খেলারই সুযোগ না পায় তাহলে সে ভাল ক্রিকেটার হবে কীভাবে; তারকা হওয়া তো পরের বিষয়।’

রাজিন যোগ করেছেন, ‘আমাদের এখানে এমনিতেই মাঠ নেই; নেই ভবিষ্যতের ক্রিকেটার তৈরির যথাযথ উদ্যোগ। আগ্রহী ক্রিকেটাররা যে অনুশীলন করবেন সেই সুবিধাও নেই বললেই চলে। সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে কখনো ফুটবল তো কখনো ক্রিকেট হয়; সেখানে ধারাবাহিকতা নেই। আবার সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ইনডোরটিকে যে আপনি ব্যবহার করবেন তারও উপায় নেই। প্রায় সারাবছরই বিভিন্ন প্রকার মেলার জন্য ইনডোরটিকে ভাড়া দিয়ে রাখা হয়। শেষ অবদি অনুরোধ করেই এই ইনডোরে দুই মাসের ক্যাম্পটি পরিচালনা করার সুযোগ মিলেছে আমার।’

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল, কেবল এই ক্যাম্পটি নয়; সিলেটে ভবিষ্যৎ ক্রিকেট প্রজন্মকে গড়তে ক্লেমন সুরমা ক্রিকেট একাডেমি নামে একটি একাডেমিও পরিচালনা করছেন রাজিন সালেহ। এখানে শিশু-কিশোর-তরুণদের ক্রিকেট শিক্ষা দিচ্ছেন বাংলাদেশের হয়ে ২৪ টেস্ট ও ৪৩ ওয়ানডে খেলা এই তারকা ক্রিকেটার। এই একাডেমিতে পরিচালক হিসেবে রাজিনকে যথাযথ সহায়তা করে যাচ্ছেন জহির হোসেইন। যিনি রাজিনদের মতোই ভবিষ্যতের ক্রিকেট প্রজন্ম গড়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অক্লান্তভাবেই।

সিলেটে ভাল ক্রিকেটার না পাওয়ার পেছনে শান্ত-রাজিনরা যে কারণগুলো উল্লেখ করেছেন এরই প্রতিধ্বনি শোনা গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের কণ্ঠেও। তিনি বলেছেন, ‘এখানে ভাল ক্রিকেটার না হওয়ার অবশ্যই সবচেয়ে বড় কারণটি হলো নিয়মিত কোনো লিগ বা টুর্নামেন্ট না থাকা। লিগ দীর্ঘদিন ধরেই নিয়মিত না। পাশাপাশি তেমন কোনো টুর্নামেন্টেও হয় না। সেই সঙ্গে মাঠের সমস্যাটিও একটি বিষয় তো বটেই।’

নাদেল আশা প্রকাশ করেছেন অচিরেই এই সমস্যাগুলোর কিছু সুরহা হবে। সেই সঙ্গে অবশ্যই সিলেট উপহার দিতে পারবে বিশ্বমানের ক্রিকেটারও। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেছেন, ‘আমি বলছি না যে রাতারাতি সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে। তবে আমার বিশ্বাস ধীরে ধীরে হলেও সিলেটের ক্রিকেটে উজ্জ্বলতা আসবেই। যে সমস্যাগুলো রয়েছে এগুলো সমাধানে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। সিলেটে ক্রিকেট লিগ যেন নিয়মিত হয় তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাঠের সমস্যা সমাধানে এখানকার আউটার স্টেডিয়ামটিকে আমাদের দায়িত্বে নেওয়ার জন্যও চেষ্টা করছি। সিলেট জেলা স্টেডিয়ামটিকে সম্ভবত পুরোপুরি ফুটবলকেই দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে আউটার স্টেডিয়ামের পূর্ণ অধিকার চাইছি আমরা। এর বাইরে বাছাইকৃত শিশু-কিশোর ক্রিকেটাররা যেন পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ পায় তাই শহরের এমসি কলেজের হোস্টেল মাঠটিকেও ব্যবহার করতে চাইছি আমরা। সেখানেও পিচ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তাও চলছে।’

দেশজুড়ে যখন ক্রিকেট উন্মাদনা, তখন সিলেটে ক্রিকেট নিয়ে হতাশা। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা অনেকেই অনেক কিছু বলছেন। তবে কারণ যাই হোক না কেন, সমস্যা সমাধানে চাই আন্তরিকতা। রাজিন সালেহ-অলক কাপালি-তাপস বৈশ্য-এনামুল জুনিয়ররা সেই আন্তরিকতা থেকেই শুরু করেছেন নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটার গড়ার কাজ। তাদের এই প্রচেষ্টা সিলেটের ক্রিকেটে জন্ম দিয়েছে নতুন স্বপ্নকথার। তাদের ছায়ায় সিলেট থেকে আরও অনেক দ্যুতি ছড়ানো ক্রিকেটার পাবে বাংলাদেশ, রাজিনরা তেমন স্বপ্নই আঁকছেন; প্রত্যাশা করছেন কর্মকর্তারাও। আর তাদের সঙ্গে দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরাও দেখছেন নতুন স্বপ্ন।

(দ্য রিপোর্ট/জেডটি/এএস/এজেড/আগস্ট ২০, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ক্রিকেট এর সর্বশেষ খবর

ক্রিকেট - এর সব খবর



রে