thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫,  ১৩ মহররম ১৪৪০

অযত্ন-অবহেলায় জরা-জীর্ণ এক স্টেডিয়াম

২০১৫ আগস্ট ২৬ ২১:৪৭:১০
অযত্ন-অবহেলায় জরা-জীর্ণ এক স্টেডিয়াম

জামান তৌহিদ, সিলেট থেকে ফিরে : স্টেডিয়ামের বয়সটা কম নয়; তৈরি হয়েছিল ১৯৬৫ সালে। সেই হিসাবে ৫০ বছর। বয়সের ছাপটা হয়তো খুব ভাল করে লক্ষ্য না করলে বোঝা যাবে না। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা হয়েছে। এর পরও সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলে জরা-জীর্ণতা আর অবহেলা-অযত্নের চিত্র খুব প্রকটভাবেই চোখে পড়বে। অথচ এই মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অনেক ফুটবল আসর, যার সর্বশেষটি ছিল সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ।

৯ আগস্ট; সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ ফুটবলের উদ্বোধনী। মঞ্চে উপস্থিত প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। একই মঞ্চে উপস্থিত বাফুফের সহ-সভাপতি ও টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান বাদল রায়। তিনি নিজ বক্তব্যে বেশ উৎসাহভরেই বললেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবলে সিলেট হচ্ছে সেকেন্ড হোম বা দ্বিতীয় আবাস।’ দিন দিন ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়লেও সিলেটের মানুষ ফুটবলের প্রতি যে প্রেম ধরে রেখেছে তারও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বাদল রায়। কারণ কিশোর ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক আসরটিসহ এখন অবধি আয়োজিত ফুটবল ম্যাচগুলোতে কখনই দর্শক খরায় পড়তে হয়নি সেখানে। ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের কোনো ম্যাচেও এতটা দর্শক উপস্থিতি চোখে পড়ে না, যতটা সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে দেখা যায়। আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ, নেপাল-বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ ফুটবল ম্যাচ কিংবা সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের আয়োজনে সিলেটকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে স্টেডিয়ামে ম্যাচগুলো আয়োজিত হয়েছে তার দৈনদশা সত্যিই পীড়াদায়ক।

গ্যালারির প্রায় ২০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা। কিন্তু গ্যালারিগুলোর চেহারা খুবই মলিন। বৃষ্টি কিংবা প্রখর রোদের হাত থেকে বাঁচতে নেই কোনো ছাউনির ব্যবস্থাও। নেই উন্নতমানের টিকিট কাউন্টার। প্রয়াত টিপু মজুমদারের স্মরণে যে প্রেস বক্সটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘টিপু মজুমদার প্রেস বক্স’, তারও বেহাল অবস্থা! সাংবাদিকদের বসার জন্য সেখানে নেই উন্নতমানের কোনো আসন, রয়েছে প্লাস্টিকের নড়বড়ে চেয়ার। লেখালেখির জন্য যে সারি করা টেবিলগুলো রয়েছে সেগুলোও অমসৃণ। লেখার সময় ল্যাপটপগুলো বার বার কেঁপে ওঠে, যা মিডিয়াকর্মীদের মনোসংযোগ বার বার নষ্ট করেছে। আগে ল্যাপটপ সামলাতেই অনেককে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছে। আবার দুটি সারির মধ্যে সঙ্কীর্ণ জায়গা। ফলে কেউ বসে থাকলে আরেকজনের হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করতে বা বাইরে যেতে বেজায় কষ্ট! অনেক ক্ষেত্রে উঠে দাঁড়িয়ে জায়গা দিতে হয়েছে। প্রেসবক্স সংলগ্ন যে বাথরুমটি তা আকারে বড়ই। কিন্তু উন্নতমানের নয় অবশ্যই। আবার দরজার ছিটকিনি নষ্ট। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে তারের একটি আলগা জালির মধ্যে ছিটকিনিটি লক করতে হয়।

এই ভবনেই বসেন সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহিউদ্দিন সেলিম। স্টেডিয়ামের ভিআইপি গ্যালারিটিও এখানেই। কিন্তু পুরো ভবনেই পরিষ্কার-পরিছন্নতার বড়ই অভাব। ভিআইপি গ্যালারিটিকে ঠিক যেন ভিআইপিদের যোগ্য মনে হয় না।

মাঠের অবয়বেও রয়েছে দৈন্যদশা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অধীনে থাকা এই স্টেডিয়ামটিতে ফুটবল ও ক্রিকেট ভাগাভাগি করে খেলা হয়। মাঠের কিছু জায়গায় তাই যেমন ঘাস রয়েছে, তেমনি আবার কোথাও কোথাও ঘাস নেই। কারণ সেখানে ক্রিকেটের জন্য তৈরি পিচের মতো চেহারা দেখতে পাওয়া যায়। বৃষ্টি হলে তাই মাঠে কাদার পরিমাণটাও যেন একটু বেশিই হয়, যা বেশ ভালই দেখতে পাওয়া গেছে সদ্য সমাপ্ত সাফ কিশোর ফুটবলে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সিলেটের মানুষ যেখানে ফুটবলকে এতটা ভালবাসে আর যেহেতু আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাহেল কেন মানোন্নয়ন করা হচ্ছে না শহরের রাকাবিবাজারে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের? এর উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাবুল। সিলেট জেলা স্টেডিয়ামের এই গরিবী হালের ব্যাপারে তিনি বলেছেন, ‘আসলে বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিতেও রয়েছে। স্টেডিয়ামের মানোন্নয়নের জন্য অচিরেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চাচ্ছি আমরা। তাদের কাছে মাঠের উন্নয়নসহ গ্যালারির দর্শক ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার পর্যন্ত করার প্রস্তাব রাখছি আমরা। আগে তো বটেই; কিশোর ফুটবলেও সিলেটের মানুষ যেভাবে আবেগ-ভালবাসা দেখিয়েছে তা অকল্পনীয়। ফাইনালের দিনটিতে কয়েক হাজার মানুষকে শুধু স্টেডিয়ামের বাইরেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। সিলেটে ফুটবলের এমন জনপ্রিয়তার কারণে সামনে এখানে আরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে চাই।’

বাবুল আরও জানিয়েছেন, স্টেডিয়ামটির বর্তমান চেহারা যা দেখা যাচ্ছে কিছুদিন আগেও তেমনটা ছিল না। চলতি বছর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের আগে কিছু সংস্কার করতে হয়েছে। আগে সেই অর্থে প্রেসবক্সও ছিল না। সংস্কার করার সময় এই প্রেসবক্স তৈরি করা হয়েছে।

বলে রাখা ভাল, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপকে সামনে রেখে যে সংস্কারকাজ করা হয়েছে তাতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তথ্যমতে এক কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে স্টেডিয়ামের প্রবেশদ্বার, ভিআইপি স্ট্যান্ড ও প্রেসবক্সের পেছনে। বাকি অর্থ খরচ করা হয়েছে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটের পেছনে।

স্টেডিয়ামের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বটা অবশ্যই সিলেট জেলা ক্রীড়া পরিষদ ও জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের। কিন্তু মাহিউদ্দিন সেলিমের সঙ্গে সরসারি ও মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে গেছেন তিনি। তার এমনটা অভ্যাস আছে; এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় অনেক মিডিয়াকর্মীও।

শেষ কথা, সিলেট জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অবস্থাও বেহাল। দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি-উদাসীনতা নিয়ে অভিযোগ-অনুযোগ-ক্ষোভের শেষ নেই স্থানীয় ফুটবল খেলোয়াড়, কোচ, ফুটবলপ্রেমীদের। আর চলতি মাসের শুরুর দিকে নিয়মিত লিগ আয়োজনে ব্যর্থ যে ২৩ জেলার নাম প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), সেখানে সিলেটের নাম রয়েছে।

আশার কথা, এমন জরা-জীর্ণ অবস্থার মধ্যেও যে কোনো ক্রীড়া আসর বসলে ঠিকই ক্রীড়াপ্রেমীদের ঢল নামে এই স্টেডিয়ামে।

(দ্য রিপোর্ট/জেডটি/এএস/এজেড/আগস্ট ২৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ফুটবল এর সর্বশেষ খবর

ফুটবল - এর সব খবর



রে