thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭, ১১ চৈত্র ১৪২৩,  ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৩৮

কোরবানি তত্ত্ব ও দর্শন

২০১৫ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৩:৩৭:০৬
কোরবানি তত্ত্ব ও দর্শন

ড. এমএ মতিন

কোরবানি মুসলিম উম্মার অন্যতম ‘ইবাদত’। পরীক্ষা, ত্যাগ ও আনন্দের ঐতিহাসিক সংস্কৃতি। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহীম (আ:)-এর সুন্নাত। হজরত বারা’ (রা:) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, “এ দিন (কোরবানির দিন) আমরা প্রথমে (ঈদের) সালাত আদায় করব। সালাত আদায় করে এসে কোরবানি করব। যে ব্যক্তি এরূপ করল সে আমাদের সুন্নাত আদায় করল। এর (সালাত আদায়ের) পূর্বে যদি কোনো ব্যক্তি পশু জবেহ করে সে তার পরিবারের জন্য শুধু গোশতের ব্যবস্থা করল, তার কোরবানি বলে কিছুই হলো না।” [বুখারী]

হজরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার (র:) বলেন, “এটি অতি পরিচিত একটি সুন্নাত।” [বুখারী] হজরত আনাস (রা:) রাসূলুল্লাহ (সা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “সালাত আদায়ের পর যে ব্যক্তি কোরবানি করল সে তার কোরবানি পূর্ণ করলো এবং মুসলিমদের সুন্নাতের অংশিদার হলো।” [বুখারী] কোরবানির হুকুমের ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও মুহাম্মদ (র:)-এর মতে কোরবানি করা ওয়াজিব। ইমাম মালিক (র:)-এর মতে কোরবানি সুন্নাত কিন্তু কোনো মুসলিমের জন্য কোরবানি না করার সুযোগ নাই। হজরত সা’ঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব ও ‘আলকামা (রা:) এর মতে কোরবানি করা ওয়াজিব নয় বরং সুন্নাত। ইমাম আবু ইউসূফ (র:) তাঁদের মতটিই গ্রহণ করেছেন। ইমাম সাফে‘য়ী, আহমাদ ও আবু সাওর (র:)-এর মতে কোরবানি সুন্নাত। আস-সাওরী বলেন, “কোরবানি না করলেও কোনো সমস্যা নাই।”[সারহু সহীহুল বুখারী লি ইবন্ বাত্তাল, পৃ.১১, খ.৬] উপর্যুক্ত মতামতগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় অধিকাংশ শরী‘য়াত বেত্তা কোরবানিকে ওয়াজিব হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যারা ওয়াজিব মনে করেন না তারা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হওয়ার পক্ষে মাতামত ব্যক্ত করেছেন। সুন্নাতের উপরের স্তরই হলো ওয়াজিব। সুতরাং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত ওয়াজিবের পর্যায়ভুক্তই হয়ে যায়।

আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশে হজরত ইবরাহীম (আ:) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাঈলকে (আ:) মিনায় কোরবানি করতে নিয়ে গেলেন। তিনি চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে ‘আল্লাহু আকবার’বলে ছুরি চালিয়ে দিলেন। হজরত জিবরাঈল (আ:) ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ইসমাঈলের স্থলে দুম্বা শুইয়ে দিলেন। ইবরাহীম (আ:)-এর মনে সংশয় সৃষ্টি হলে তিনি বললেন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, এবার আল্লাহর পথে কোরবানি হওয়ার আনন্দে দুম্বাটিও বলে উঠলো ‘আল্লাহু আকবার’; পার্শে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কুদরত অবলোকন করে হজরত ইসমাঈল (আ:) বলে উঠলেন ‘আল্লাহু আকবার’। ইবরাহীম (আ:) জবেহ শেষ করে যখন তাকিয়ে দেখলেন ইসমাঈলের স্থলে দুম্বা কোরবানি হয়েছে, ইসমাঈল (আ:) পার্শে দাঁড়িয়ে রয়েছে তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ার্থে বললেন ‘অলিল্লাহিল হামদ’। জিলহজ মাসের নয় তারিখ ফজর থেকে শুরু করে তেরো তারিখ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আমরা এ বাক্যগুলি সমস্বরে উচ্চারণ করি। আল্লাহ ‘তায়ালার জন্য উৎসর্গ করার বিভিন্ন পদ্ধতি এর পূর্বেও প্রচলিত ছিল। যেমন হজরত আদম (আ:)-এর দুই পুত্রকে উৎসর্গ করতে বলা হলো। তাদের একজন পশু কোরবানি করলেন, অন্যজন কিছু খাদ্য-দ্রব্য উৎসর্গ করলেন। উন্মুক্ত ময়দানে রাখা উৎসর্গীকৃত পশুটিকে আকাশ থেকে আগুন এসে ভস্মীভূত করলো। তাঁরা বুঝতে পারলেন, পশুটিই আল্লাহ কবুল করেছেন। হাবিল কাবিলের এ কোরবানি থেকে বুঝা যায় যে, তখন পশুসহ অন্যান্য বস্তু দ্বারাও কোরবানি করার প্রচলন ছিল। শুধু চতুষ্পদ জন্তু দ্বারা কোরবানির বিধান ইবরাহীম (আ:) থেকেই শুরু হয় বলে অনেক ঐতিহাসিক ধারণা পোষণ করেন।

ঈদুল আজহায় বাহ্যিকভাবে পশু কোরবানি করা হলেও মূলত মনের পশুত্বকে কোরবানি করা হয়। মানব চরিত্রে প্রধানত দু’ধরনের স্বভাব প্রকাশিত হয়। একটি নবী-রসূলের স্বভাব অন্যটি শয়তানের স্বভাব। নবী-রসূলের স্বভাব আল্লাহ তা‘য়ালার শিখানো। শয়তানের স্বভাব মনগড়া। শয়তান নিজের প্রশংসা নিজেই করে। শয়তান অন্যায় করে ও কৃত অন্যায় সঠিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুক্তি দেখায়। সে কোনো বিষয়ে অজ্ঞ হয়েও নিজেকে ওই বিষয়ে পণ্ডিত মনে করে। সে ভুল জেনে, খোঁড়া যুক্তির উপর নির্ভর করে অন্যায় করে। শয়তানি স্বভাবের মানুষরা দুনিয়ার লোভে পড়ে নেশাগ্রস্তের মতো স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে, অনুশোচনাহীনভাবে অপকর্মে লিপ্ত হয়। শয়তান ও তার শীষ্যরা অহংকারী ও আত্মপূজারী হওয়ার কারণে তাদের আচরণে এরূপ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। ব্যক্তি চরিত্রে বিদ্যমান সমস্ত প্রকারের শয়তানি বৈশিষ্ট্য কোরবানি করাই প্রকৃত কোরবানি। সৃষ্টির প্রথম পাপ করে শয়তান। শয়তানের প্রকৃত নাম ইবলিস। মায়ের নাম নীলবিস ও বাবার নাম খবিস। সে একটি বাচ্চা জিন থেকে আজাজিল ফিরিস্তার (ফিরিস্তাদের নেতা) মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হল। আল্লাহ তা‘য়ালা তাকে নির্দেশ দিলেন, “আদমকে সিজদাহ কর।” সে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করল। উপরন্তু যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে বলল, “আমি আগুনের তৈরি, আদম মাটির তৈরি। আগুন ঊর্ধমুখী, মাটি নিম্নমুখী। ঊর্ধমুখী কোনো বস্তু নিম্নমুখী কোনো বস্তুকে সিজদাহ করতে পারে না।” এখানে একটি ভুল তথ্যের উপর যুক্তি প্রয়োগের প্রখরতা প্রতিয়মান হয়। কারণ আগুনের চেয়ে মাটির শক্তি অধিক। মাটি দিয়ে চাপা দিলে আগুন নিভে যায় কিন্তু অগ্নি দহনে মাটি নিঃশেষ হয় না বরং অধিক শক্ত হয়। আগুন ধ্বংসশীল, মাটি সৃষ্টিশীল। সুতরাং শয়তান আত্মঅহংকারের বশবর্তী হয়ে ভ্রান্তিবশত আল্লাহ তা‘য়ালার আদেশ লংঘন করেছে। ভ্রান্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছে। শয়তানের আত্মোপলব্ধির ভিত্তি ছিল তার মনগড়া। শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সুতরাং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির জন্য শয়তানের পথ অনুসরণ করা যৌক্তিক নয়। তাহলে ব্যক্তির ভাল-মন্দ বিচারের ভিত্তি কি হবে? চেতনার শুদ্ধতা কিভাবে অর্জিত হবে? শয়তানের স্বভাব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য এগুলি মৌলিক প্রশ্ন।

এ প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যায় হজরত আদম (আ:)-এর চরিত্রে। তিনি যখন জান্নাতের নিষিদ্ধ ফল ‘গন্দম’-এর রস পান করে বসলেন। তাঁর শাস্তি হলো। তিনি ভুল বুঝতে পারলেন এবং কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। আদি পিতার সে ভাষায় আজও আমরা প্রতি নিয়ত ক্ষমা প্রার্থনা করি। আত্মসমর্পণের কি বিনম্র ভাষা : “হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা আমাদের নিজেদের উপর অত্যাচার করেছি; তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো আমরা অবশ্যই নিশ্চিত ক্ষতির মধ্যে নিপতিত হবো।” হজরত আদমের (আ:) চেতনা বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে শয়তানের বিপরিত। কারণ তিনি অকপটে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কৃতভুলের পক্ষে তিনি কোনো যুক্তি উপস্থাপন করেননি। তাঁর পক্ষে উপস্থাপনযোগ্য অনেক যুক্তি ছিল। তিনি বলতে পারতেন : ১. আমি অজ্ঞাতসারে গন্দমরস পান করেছি, আমি নিরপরাধ ২. হাওয়া আমাকে পান করিয়েছে, এর দায়ভার তাঁর ৩. শয়তান প্ররোচিত করেছে বলেই আমরা এটি পান করেছি, আমরা নির্দোষ ৪. শয়তানকে এখানে প্রবেশ করার সুযোগ দিয়েছে যে প্রহরি, দোষ মূলত তার। কিন্তু আদম (আ:) কোনো যুক্তিই প্রদর্শন করেননি। তিনি শয়তানের পথ পরিহার করেছেন। তাঁর চেতনা তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার দিকে ধাবিত করেছে। কারণ তাঁর চেতনা ছিল ওহী ভিত্তিক। আল্লাহ তা‘য়ালা তাঁকে সৃষ্টি করার পর অনেক কিছু শিখিয়েছিলেন। পরবর্তীতে নবী হিসেবে তিনি আল্লাহ তা‘য়ালার নিকট হতে দশ খানা সহীফা লাভ করেছিলেন। ওহীভিত্তিক জ্ঞানের সঠিক উপলব্দির ধারা আজও বিদ্যমান রয়েছে। শ্রেষ্ঠজীব মানুষের চেতানার ভিত্তি জ্ঞানের সে পবিত্রতম ধারাই হওয়া উচিত। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বোপরি মানবতার শৃঙ্খলা রক্ষা ও মুক্তির জন্য এর কোনো বিকল্প নাই। বিকল্প যা কিছু আছে তা মানবতা ভিত্তিক চেতনা। আত্মঅহংকারের পথ। শয়তানের পথ। লোভ-লালসার পথ। কৃত অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতা। এ পথে সমৃদ্ধি আসে না। প্রকৃত উন্নয়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা অধরাই থেকে যায়। সংঘাত, রক্তপাত, অন্যায়, অবিচার, গুম, হত্যা, সন্ত্রাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। মানবাত্মা থেকে দেহ, দেহ থেকে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বত্র সংক্রমিত হয় এ অজানা ব্যাধি। ভয়াবহ পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে একটি জাতি। সুতরাং সময় এসেছে সমস্ত কু-প্রবৃত্তিকে কোরবানি করার। দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে দুর্বল করার পর এবার ধ্বংস করার পালা। আসুন আমরা আমাদের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা শয়তানি স্বভাব, পশুত্বকে জবাই করার মাধ্যমে কু-প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করি। পাপমুক্ত হই। অফুরন্ত ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে মানবতার বৃহত্তম ঐক্য গড়ে তুলি। প্রতিটি মুসলিম হোক জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি। ঈমানী পরীক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে হোক সফলভাবে উত্তীর্ণ। (আমিন)

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর



রে