thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪,  ২৬ শাবান ১৪৩৮

সাদা সোনার বাজার দখল করছে কাঁকড়া

২০১৫ সেপ্টেম্বর ২৮ ১৯:১৯:৩৮
সাদা সোনার বাজার দখল করছে কাঁকড়া

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, খুলনা : দেশের পাচঁটি উপকূলীয় এলাকায় সাদা সোনা হিসেবে পরিচিতি চিংড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে রফতানির তালিকায় ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে প্রায় অবহেলিত এক জলজ প্রাণী কাঁকড়া। সুন্দরবনের আশপাশের এলাকার কয়েক লাখ মানুষের ভাগ্য বদলে দিচ্ছে এই কাঁকড়া।

বর্তমানে যেখানে বড় সাইজের চিংড়ির সর্বোচ্চ মূল্য কেজিপ্রতি ৫০০-৮০০ টাকা, সেখানে একই সাইজের কাঁকড়া বিক্রি হচ্ছে ১২ শ’ থেকে ১৮ শ’ টাকা পর্যন্ত। ধর্মীয় কারণে দেশের বাজারে তেমন চাহিদা না থাকলেও বিদেশে কাঁকড়ার চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া। ফলে কাঁকড়া এখন দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

খুলনার উপকূলীয় এলাকা দাকোপ উপজেলায় লবণ পানির চিংড়ি ঘের এখন খুব একটা চোখে পড়ে না। লবণ পানির চিংড়ি ঘেরে পরিবর্তে গত কয়েক বছর থেকে তৈরী হয়েছে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ ঘের (ফ্যাটেনিং ঘের)। এই ঘেরে নদীর লবণ পানির সাথেই উঠে আসে কাঁকড়ার পোনা। ফলে চিংড়ির মতো বেশী দামে পোনা কিনতে হয় না। সুন্দরবনের বিশাল এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বড় কাঁকড়ার সরাসরি রফতানি করা হয়। আর ছোট কাঁকড়াগুলোকে ঘেরে ছেড়ে দিয়ে ১৫-১৬ দিনেই মোটাতাজা করে রফতানিযোগ্য করে তোলা হয়।বিদেশে জীবিত কাঁকড়াই রফতানি করা হয়। জেলেরা প্রথমে কাঁকড়া ধরে তার কাঁটাযুক্ত পা দু’টি বেঁধে দেন। তারপর নিয়ে আসেন আড়তে। সেখানে সাইজ বাছাই করার পর উপকূলীয় এলাকা থেকে সরাসরি রফতানিকারক বিমানে করে রফতানি করেন।

দাকোপ উপজেলার কাঁকড়া ঘের মালিক আব্দুর রশিদ দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘কাঁকড়ার ব্যবসা করে প্রথম বছর ৪ লাখ, পরের বছর দশ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। সুন্দরবন থেকে আনা ছোট কাঁকড়া ঘেরে ছেড়ে দিয়ে ১৫-২০ দিনের মাথায় তা বিক্রি করা হয়। কাকড়া চাষে ভাইরাস আক্রান্ত হবার ভয় নেই। বিনিয়োগে ঝুঁকি কম।’কাঁকড়া চাষী মোহাম্মদ লাবলু গাজী বলেন, ‘মৌখালী গ্রামে প্রতি সপ্তাহে ৫০ লাখ টাকার কাঁকড়া কেনা-বেচা হয়ে থাকে। কাঁকড়ার জন্য নতুন মোকাম প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই ব্যবসায় নতুন করে শুধু দাকোপ এলাকায় লাখখানেক লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।’

খুলনার দাকোপ উপজেলার চালনা বাজারে গেলে চিংড়ি মাছের আড়তের চেয়ে বেশী আড়ৎ দেখা যায় কাঁকড়ার। আর বর্তমানে প্রতি বছরই এই আড়ৎ বাড়ছে।

দাকোপ উপজেলার কালাবগীর শেখ শহীদ জানান, সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে জেলেরা দিনে দশ হাজার টাকাও আয় করে থাকেন।

শেখ শহীদ বলেন,‘প্রথমদিকে ধর্মীয় কারণে অনেকেই এই ব্যবসার দিকে ঝুঁকতেন না। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন এই কাঁকড়া চাষ ও ব্যবসার সাথে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা বেশী জড়িত। প্রায় সব বাজারেই এখন মাছের সাথে কাঁকড়াও কেনা-বেচা হচ্ছে। দাকোপ উপজেলার বিভিন্ন স্থান হতে কাঁকড়া ধরে নিয়ে আসা হয় চালনা বাজারের আড়ৎগুলোতে। আগে যেখানে হাতে গোনা ১-২টি আড়ৎ ছিল। এখন সেখানে আড়ৎ হয়ে ১৪-১৫টি।’

চালনা বাজারের আড়ৎদার মুকুলকান্তি মণ্ডল বলেন, ‘কাঁকড়া বর্তমানে অন্যতম লাভজনক ব্যবসা। বিশ্ববাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়ার চাহিদা বেশী। সুন্দরবন থেকে যে কাঁকড়া ধরে আনা হয়, তা প্রথমে বাছাই করা হয়। শক্তগুলো রফতানির জন্য তৈরী আর নরমগুলো মোটাতাজাকরণ করতে ঘেরে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে সেই কাঁকড়াগুলো আবার শক্ত হয়ে গেলে রফতানি করা হয়।’দাকোপ উপজেলার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ করে চাষীরা দ্রুত লাভবান হচ্ছেন। উপজেলার পক্ষ হতে এই কাঁকড়া চাষে উন্নত করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারও বিষয়টি নিয়ে নতুনভাবে পরিকল্পনা করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে সম্ভবনাময় এই কাঁকড়া শিল্পের প্রতি সরকারের এখই দৃষ্টি দিয়ে কাঁকড়া পোনা উৎপাদন ও জীবিত কাঁকড়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা লাগবে। এতে আরও কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে।’

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রথম ১৯৭৭ সালে মাত্র ২ হাজার ডলারের কাঁকড়া রফতানি হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে বেড়ে ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এসে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৭৩ টনে। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪১৬ টনে। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সেই রফতানি হয়েছে ৮ হাজার ৫২০ টন। সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যা দাঁড়িয়েছে আর কাঁকড়া রফতানির বড় অংশ যায় চীনে, তারপর রয়েছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ান, জাপান, সিংগাপুর, কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মিয়ানমার এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ মিলিয়ে মোট ১৮টি দেশে এই কাঁকড়া রফতানি হচ্ছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান প্রফেসর ড. মো. নাজমুল আহসান বলেন, ‘সুন্দরবনের ওপর কাঁকড়া সরবরাহ নির্ভর না করে পোনা উৎপাদন ও ফ্রোজেন করে কাঁকড়া রফতানি করলে আরও বেশী লাভবান হওয়া যাবে। কারণ বর্তমান রফতানি প্রক্রিয়াই ২০ শতাংশ কাঁকড়ার মৃত্যু হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রধান রফতানিকারক দেশ চীন। সরকারিভাবে কাঁকড়ার আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে হিমায়িত কাঁকড়া রফতানি করা হলে এই খাতে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এই কাঁকড়া শিল্পই একসময় দেশের রফতানি পণ্যের এক নম্বর তালিকায় উঠে আসতে পারে।’

(দ্য রিপোর্ট/এএসটি/এইচএসএম/আইজেকে/সা/সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে