thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪,  ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

আমাদের সভ্য চোখ

২০১৫ সেপ্টেম্বর ২৮ ২০:৩৬:৫৭
আমাদের সভ্য চোখ

আবদুর রাজ্জাক শিপন

সম্প্রতি এমপি ইলিয়াছ মোল্লার একটি উক্তি আলোচিত হয়েছে। আফ্রিকান ‘কালো কালো’ মানুষদের অসভ্য বলেছেন তিনি। তিনি বলছেন, ‘আমাদের আর্মি সেখানকার (আফ্রিকার) কালো কালো মানুষদের সভ্যতা (শব্দটা যদিও সভ্য হবে) করার জন্য গেছে এবং আমি মনে করি তারা সে কাজ করেই আসবে।’
ইলিয়াস মোল্লার সভ্যতার সবকদান বিশ্লেষণে আমরা খানিক পরে যাই, তার আগে বিদেশের মাটিতে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কিছু অর্জনে চোখ ফেরানো যাক। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশ আর্মির অর্জনগুলো ছিল অসামান্য। সিয়েরা লিওনের রাস্তা, কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়েছিল। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সিয়েরা লিওনকে নতুন করে বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেখানকার সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। সেখানকার শিশুদের মুখে বাংলা বোল ফুটতে থাকে। বাংলা পায় সিয়েরা লিওনের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা ।

‘মুনামি’ শব্দের অর্থ আমার বন্ধু। ‘আমার বন্ধু’ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী সদস্যদের দেখেন যুদ্ধবিধ্বস্ত আইভরি কোস্টের মানুষ। আইভরি কোস্টের ফুটবলাররা বিশ্বকাপে আমাদের দর্শক চোখ চমকে দেন, আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের চমকে দিয়েছিল আরও আগেই। গল্পটা একই রকম। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইভরি কোস্টের মানুষের হৃদয়ও জয় করেছেন। আর কে না জানেন, মানুষের হৃদয় জয় করার কাজটি পৃথিবীতে একদমই সহজ নয়। কঠিন। বেশ কঠিন। সেই কঠিন কাজটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাফল্যের সঙ্গে সহজ করে নিয়েছেন যোগ্যতা আর দক্ষতায়। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করতে গিয়ে প্রায়শই লাশ হয়ে প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসছেন কেউ কেউ। তবু, নিজদের পেশার প্রতি তারা থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল, দায়িত্বে অটল। ভাগ্যিস, জনপ্রতিনিধি ইলিয়াস মোল্লাহর মত আফ্রিকানদের গায়ের রঙটাই শুধু তারা দেখেননি। তাঁদের দেখার চোখ আরেও উজ্জ্বল। কালো চমড়ার ভেতর একটি সুন্দর হৃদয় থাকে মানুষের। সেই মোক্ষম জায়গায় তাঁরা দৃষ্টি হানতে পেরেছেন।

২.
ইলিয়াস মোল্লা যখন বার বার 'কালো কালো মানুষ' বলে, হাস্যরসে তাচ্ছিল্যভরে আফ্রিকানদের কথা উচ্চারণ করছেন তখন তিনি নিজের অজান্তেই বর্ণবাদী আচরণ করে ফেলেছেন। তিনি হয়তো জানেন না, বাদামি চামড়ার জন্য তার দেশের মানুষদেরও কোথাও কোথাও হেনস্থা হতে হয়। কোথাও কোথাও তাদের গালি শুনতে হয়, ‘বাঙালি হাইওয়ান’ বা বাঙালি জন্তু বলে।

ইলিয়াস মোল্লা যখন কালো কালো বলে আফ্রিকানদের হেয় করছেন, ঠিক ওই সময়ে, অনেক মানুষের কানে একটি কিশোরের আর্তনাদ পৌঁছে গেছে, কিশোরটির পায়ুপথে গ্যাস দিয়ে তাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে, তার আগের গ্যারেজ মালিক। কিশোরটি আর্তনাদ করছিল, ‘মামা আর দিয়েন না, আমি মরে যাব!’ কিশোরটি এই বর্বর কুৎসিত নির্যাতনের পর মরে গেছে! এই কিশোর নির্যাতনের কোন ভিডিও নেই। তাই সেই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়েও যায়নি, সঙ্গতকারণেই অসম্ভব নির্লিপ্ততা রপ্ত করা আমাদের অনুভূতি এই ক্ষেত্রে সে অর্থে নাড়াও খায়নি। না হয়, এটিও আরেকটি হৃদয়বিদারক রাজন কাহিনীই!
এই কিশোরটিরও স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা করার। কে জানে, হয়তো তার কিশোর মন স্বপ্ন দেখতো, বৈমানিক হওয়ার, আকাশে ওড়ার! পেটের দায়ে পারেনি। গ্যারেজে কাজ নিয়েছিল। গ্যারেজ মালিক প্রায়শ অকথ্য নির্যাতন করতো বলে এই গ্যারেজ ছেড়ে অন্য গ্যারেজে কাজ নেয়। কিশোরের অপরাধ ছিল এটিই ।

৩.

ইলিয়াস মোল্লা যখন আফ্রিকানদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন তখন আজাদ নামের গ্রামের ছেলেটিকে পিটিয়ে, তার পরিবারের উপর নির্যাতন চালিয়ে তাদের বিপর্যস্ত করে দিয়েছে, র‌্যাব পুলিশ! এই অসহায় ছেলেটি এসেছিল নারায়ণগঞ্জ থেকে। নিজেদের সহায় সম্বল সম্পত্তি জবর দখল হয়ে যাবার প্রতিবাদে অসহায়ের শেষ আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। সে 'ন্যায়বিচার চাই' প্ল্যাকার্ড হাতে গণভবনের গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল। অঘোষিতভাবে এবং প্রায় ওপেন সিক্রেট হিসেবে দেশের পুলিশ, প্রশাসনযন্ত্র যখন কেবলই সবলের হাতের ক্রীড়নক এবং অনেক আগেই মনীষী সলোন যা বলে গেছেন, ‘আইন মাকড়শার জালের মত, ছোটরা পড়লে আটকে যায়, বড়রা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে,’ এই কথার সত্যতা বজায় রাখতে, আর তা প্রমাণ করতে যখন আমাদের আইন প্রশাসন বার বারই যথেষ্ট আন্তরিক, তখন অসহায় আজাদ হয়তো আশা করেছিল, প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তার শেষ পন্থা। আমাদের দেশে এরকম কত কোটি আজাদ, আমজাদ, নসিমন বা নাজমারা রয়েছে, পরিসংখ্যান খাতায় সে তথ্য না থাকলেও, আমাদের খোলাচোখে আমরা দেখতে পাই, আজাদ আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। যাদের প্রচুর টাকা নেই। রাজনৈতিক ভালো যোগাযোগ নেই। যারা থানাতে অভিযোগ দাখিল করতে গেলে দায়িত্বরত অফিসার গড়িমসি করেন। অভিযোগ কখনো কখনো লিপিবদ্ধ হয়ও কার্যকর হয় না। উল্টো অভিযোগকারী ফেঁসে যান প্রতিপক্ষ যদি যথেষ্ট অর্থ-প্রতিপত্তির মালিক হয়। পর্দার আড়ালের ঘটনাগুলোর বাইরেও কিছু ঘটনা লাইম লাইটে চলে আসে। লেখালেখি হয়, প্রতিবাদ সভা হয়, আন্দোলন হয়, প্রচুর উত্তপ্ত বাক্যালাপ হয়, সারাদেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে থাকে, সুবিচার আশা করে, সুবিচার তবু ধরা দিতে চায় না সবসময়। সাগর-রুনির মৃত্যুর কয়েকবছর পরও তাদের খুনীদের চিহ্নিত করা যায়নি। ধূম্রজাল তৈরি করা হয়েছে এবং সে ধূম্রজালে আটকে আছে আইন প্রশাসনযন্ত্র । সাগর-রুনির খুনীদের চিহ্নিত করে, বিচারের আওতায় আনার দাবিতে দেশের সাংবাদিককুল অবিরাম লেখালেখি করেও সফল হতে পারেননি। নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকী হত্যার বিচারের দাবি শুধুমাত্র তার পিতার নয়, প্রায় সমগ্র দেশবাসীর দাবি ছিল, ত্বকী হত্যার বিচার হয়নি। হরতালের বলি বিশ্বজিত হত্যার চিত্রটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল । খুনীরা চিহ্নিত হয়েছিল। ফলে, পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়। বিচারও হয়। কিন্তু খুনীরা আজ কোথায়?

রানা প্লাজার দুঃসহ স্মৃতি আমাদের গোল্ডফিশ মেমোরি এখনও ধরে রাখতে পেরেছে বলেই আশা করি। এক রানা প্লাজার জন্য বাংলাদেশের মানুষ যত কেঁদেছে, স্মরণকালে মানুষের অশ্রুবর্ষা আর কিছুতেই অত নামেনি । সেই রানা প্লাজার মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী, রানাকে গ্রেফতার করে হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয় । রানার বিচারের কি অবস্থা?

এরকম সব চিত্র আর বাস্তব অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে অসহায় আজাদ প্রধানমন্ত্রীর উপর তার শেষ আস্থাটুকু রাখতে চেয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছানো আজাদের কম্ম নয়। আজাদ তাই প্রধানমন্ত্রীর রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে প্রতিবাদের একটি ভাষা আমাদের শিখিয়েছিল। ফলে, তার পরিবারকে বিপর্যস্ত হতে হয়েছে।

৪.

ইলিয়াস মোল্লা যখন আফ্রিকানদের অসভ্য বলছেন সানোয়ারা গার্মেন্টস কর্মীরা তখন পুলিশের বেদম প্রহারে জর্জরিত ছাল ওঠা পিঠ নিয়ে হাসপাতালে । সারাদেশ যখন ঈদ আনন্দে মেতেছিল, নিজের পরিবারকে সুন্দর উজ্জ্বল ঝলমলে কাপড় উপহার দেয়াতে ব্যস্ত ছিল, এই গার্মেন্টস কর্মীরা তখনও বেতন-ভাতা পায়নি বলে রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল । হা-ভাতেরা তখনও ঈদ আনন্দে ভালো খেতে পরতে পায়নি । বেতন-ভাতা চাওয়ার অপরাধে, তাদের পেটের ক্ষুধা মেটাতে পুলিশি মার খাওয়ানো হচ্ছে!

আফ্রিকানদের সভ্য করছেন দাবি তোলা, ইলিয়াস মোল্লার মত জনপ্রতিনিধিরা হয়তো এইসব কৃশকায়, প্রায় কৃষ্ণকায় গার্মেন্টস কর্মীদের ক্ষুধার বিপরীতে পুলিশের মার খাইয়েই পেট ভরাতে চান। ক্ষুধা ক্ষুধা বলে চিৎকার করা ক্ষুধাকাতর অসভ্য শ্রমিকদের এভাবেই হয়তো সভ্য গড়ে তুলতে চান তারা। তবে, একটু খেয়াল করলে তারা দেখতে পাবেন, এইসব শ্রমিকদের দেহের অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ এইসব জনপ্রতিনিধিদের মতই, শ্রমিকদের ক্ষুধা তৃষ্ণাবোধ, সুবেশী জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে বেশি নয়। শুধু একটাই ফারাক, শ্রমিকদের ঘর্মাক্ত দেহের নোনা গন্ধে যখন অর্থনীতির সচল চাকা দ্রুতগামী হয়, সে চাকাতে ভর করে তখন জনপ্রতিনিধিরা সুগন্ধি মেখে সুবেশে ঘুরে বেড়ান।

অন্যদের ‘অসভ্য’ বলবার আগে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে, নিজের প্রতিবিম্ব শ্লেষে বিকৃত হাসি দিলে, তখন নিজেদের সভ্যতার ব্যারোমিটার চরম আশ্লেষে তিরতির কেঁপে ওঠে, আর তরতর করে সভ্যতা নেমে যায়!

লেখক : গল্পকার

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে