thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২৫ জুন ২০১৭, ১২ আষাঢ় ১৪২৪,  ২৯ রমজান ১৪৩৮
গৌতম চৌধুরী

অসুরের বাঁশি

২০১৫ অক্টোবর ০২ ১৫:১০:৪৫
অসুরের বাঁশি

ছবি-আঁকিয়েরা মাধ্যমগত বা প্রকরণগত বিভিন্নতা ছাড়াও, বিষয় অনুযায়ী শ্রেণিবিভাজনের সুযোগও তাঁদের রচনায় পান। যেমন, মুখচ্ছবি বা নির্সগচিত্র। কবিতায় উপকরণ হিসাবে নীলিমা ও নরকের কোনও কিছুই পরিত্যাজ্য না হলেও, শিরোনাম-স্বাতন্ত্র্যে নিসর্গকবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা বিরল। এমনকি, রূপসী বাংলা-কেও কি আমরা নিছক নিসর্গকবিতা বলতে পারি! বাংলার নিসর্গপ্রকৃতির সাথে, তার ইতিহাস ও উত্তরাধিকার এমনভাবে সম্পৃক্ত হয়ে আছে এই তানপ্রধান পদাবলীতে, যে সময়ান্তরে তা একটি জাতির অন্তত অর্ধাংশের পুনরুত্থানের মন্ত্র হয়ে উঠল।

আসলে নিসর্গচিত্রীর প্রাথমিক লক্ষ্য দর্শককে আনন্দিত করা, বুঝি বা ততদূর চিন্তাস্পন্দিত করে তোলা নয়। কথাটা মনে এল, একরাম আলি-র সদ্যতন কবিতাবই ঘনকৃষ্ণ আলো পড়ার সময়। যদি খুঁটে খুঁটে নেওয়া যায় একরামের এই কবিতা থেকে, নিসর্গ-উপাদানের তালিকাটা একটু লম্বাই হবে হয়তো। নিসর্গপটের সাথে ঘন আত্মীয়তায় জড়িয়ে থাকা প্রাণীজগতটিও চমকপ্রদ। এবং একথাও ঠিক, এক গভীর সংসক্তি ছাড়া, নিখাদ নাগরিক অভিজ্ঞতায়, এই জ্যান্ত-সবুজ প্রকৃতিকে কবিতায় তুলে আনা যায় না। গ্রাম তেঘরিয়া, ডাক দমদমা, জেলা বীরভূম, এ ব্যাপারে একরামকে মজিয়েছে নিশ্চয়ই। তবু এ-কবিতাকে স্রেফ নিসর্গকবিতা বলা যাবে না। একরামও আদৌ অনাগরিক নন। তিনি চমৎকার জানেন, বিশুদ্ধ নিসর্গবর্ণনায় ছবির দর্শক তৃপ্ত হন হয়তো, কবিতাপাঠক আরও অতিরিক্ততার ভিখারী।

------তাই ঘনকৃষ্ণ আলো পাঠের অন্তিম অভিজ্ঞতায় নিসর্গের উল্লেখই হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এমন কি ২৫টি ছোট ছোট টুকরোয় গড়ে ওঠা এই দীর্ঘকবিতার স্পর্শণীয় সাংগীতিক বিন্যাসও হয়তো গৌণ হয়ে যায়। স্পষ্ট বোঝা যায়, একরামের গন্তব্য অন্যত্র। তিনি পাহাড়ের যেপারে আমাদের নিয়ে যেতে চান, কোনও ভ্রমণকারী বা তীর্থযাত্রীর সেদিকে যাবার সংগতি নেই –

-----------------পাহাড়ের ঐপারে একটি অসুরের বাঁশি

-----------------কেবলই বাজত তার হাড্ডিসার গরুর পেছনে, মরা

-----------------ফসলের পেছনে, গর্ভবতী অসুরীর পেছনে

---এই অসুরের বাঁশিই ব্রাহ্মণ্যসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের ভারতীয় উত্তরাধিকার। সে-বাঁশি শোনাতে শোনাতে একসময় একরাম আমাদের উপহার দেন, ঘুমিয়ে পড়তে চাওয়া সময়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধমান কোনও ভাবী শূদ্রসৈন্যের মতো, একটি কাঁকড়াবিছে –

----------------স্যাঁতসেঁতে মাটিতেও তার

----------------বিস্মিত চিৎকার আজ বেঁকে যায়

----------------অথচ বেঁকে যাওয়া বিষাক্ত হূল আর দেখা যায় না

---এই বঙ্কিমতা, একরাম আমাদের ধরিয়ে দেন, ছড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় – আকাশের বাঁকা গড়নে, চাঁদের বাঁকা গতিপথে। এবং অবশেষে, এক মৌলিক উপলব্ধির জন্য একরামের কাছে অবধারিত ঋণী হতে হয় –

---------------সমস্ত খাদ্যই বাঁকা

----------------....

--------------কেননা, সমস্ত মুখই বাঁকা

---------------কোনও নিসর্গচিত্রী আমাদের এতদূর নিতে পারতেন কি না সন্দেহ!

----------------------------------বৈশাখ ১৩৯৬

গৌতম চৌধুরী : পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট কবি ও গদ্যকার।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে