thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৩,  ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮
রানা হানিফ

দ্য রিপোর্ট

নিশ্চিত রাজস্ব হারাচ্ছে সিটি করপোরেশন-২

রাজস্বের বড় উৎস হতে পারে হকারদের বৈধতা

২০১৫ অক্টোবর ০৪ ২১:০২:২১
রাজস্বের বড় উৎস হতে পারে হকারদের বৈধতা

রাজধানীর ফুটপাত দখল করে জীবিকা নির্বাহ করছে প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার হকার। ক্ষুদ্র পুঁজি বিনিয়োগকারী এ সব ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের চোখে অবৈধ। অথচ পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতে হয় তাদের। নিম্ন আয়ের এ সব হকাররা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও বড় ধরনের অবদান রাখছে বলে মনে করেন নগর বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি এক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাসিক ও সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট চাঁদার বাইরে রাজধানীর হকারদের প্রতিদিন গড়ে ৩২ টাকা করে পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদা দিতে হয়। ওই হিসাবে রাজধানীর হকারদের কাছ থেকে দৈনিক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে প্রায় এক কোটি টাকা আর বার্ষিক এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন শ’ কোটি টাকা।

রাজধানীতে ফুটপাত ও সড়কের পাশে এ সব হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের বৈধতা দিয়ে সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনতে পারলে করপোরেশনের জন্য বড় রাজস্বের খাত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধুমাত্র পরিকল্পনা গ্রহণ ও যথাযথ সিদ্ধান্তের অভাবেই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এই রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করেন তারা।

রাজধানীর জাতীয় রাজস্ব ভবনের প্রধান ফটকের সামনে ফুটপাতের উপর চা-পান-সিগারেটের ব্যবসা করেন কিশোরগঞ্জের লোকমান হোসেন। রাজস্ব ভবনের প্রধান ফটকের পাশে দোকান পেতে প্রায় দুই লাখ টাকা অগ্রিম জামানত দিতে হয়েছে স্থানীয় এক রাজনীতিককে। তা ছাড়া প্রতি সপ্তাহে ওই রাজনীতিককে এক হাজার ২০০ টাকা করে ভাড়াও দিতে হয়। আর স্থানীয় থানা থেকে ‘হপ্তাহ’ বাবদ তার কাছ থেকে আদায় করা হয় সাত শ’ টাকা। আর প্রতিদিন আরও ৫০ টাকা দিতে হয় কালেক্টরকে।

লোকমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা তিন ভাই মিলে এখানে দু’টো দোকান চালাই, একটা এখানে (রাজস্ব ভবনের সামনে) আরেকটা ১২ তলার (ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়) সামনে একটা। দু’টো দোকানের জন্য আমাদের মোট ৪ লাখ টাকা এ্যাডভান্স দিতে হয়েছে। সপ্তাহে ভাড়া এক হাজার ২০০ টাকা।’

কাকে এ্যাডভান্স দিতে হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এইখানকার একজন লিডার আছেন, আওয়ামী লীগ করেন। এইখানকার সবগুলো দোকান উনিই দেখেন। তাকেই এ্যাডভান্স দিতে হয়।’

অন্য কাউকে কত টাকা দিতে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘থানায় হপ্তাহ দিতে হয় সাত শ’ টাকা। আর প্রতিদিন কালেক্টরকে দিতে হয় ৫০ টাকা।’

কালেক্টর কে?—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই আরকি, রাজনীতি করেন। কোনো ঝামেলা-টামেলা হলে তিনি দেখেন। এমনকি রাতে পাহারা ব্যবস্থা করেন তিনি।’

সিটি করপোরেশন থেকে কোনো চাপ থাকে কিনা— এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই হকার বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মাইকিং করে যায় ফুটপাত ক্লিয়ার করার জন্য। এরপর একদিন এসে সব ভেঙ্গে দেয়। অবশ্য আমরা আগে থেকে সব মালামাল সরিয়ে ফেলি। ভাঙ্গার দিন দোকান করা হয় না। পর দিন আবার দোকান বসাই।’

২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ড ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সারাদেশে হকারের সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার। এর মধ্যে শুধুমাত্র রাজধানীতে হকারের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার। মাসিক ও সাপ্তাহিক চাঁদার বাইরে এ সব হকারকে পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের দৈনিক গড়ে ৩২ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। এ সব হকারের দৈনিক আয় সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। গড়ে ৫০০ টাকা দৈনিক আয় ধরলে শুধুমাত্র রাজধানীর হকাররা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের এ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা ও এই গবেষণার প্রধান সমন্বয়কারী মো. মাহরুফ রহমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা ২০১৩ সালে রাজধানীসহ সারাদেশের হকারদের ওপর একটা জরিপ চালাই। আমাদের এই জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে হকারের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার। অবশ্য প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশী হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হকারদের সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি, প্রতিদিন গড়ে একজন হকারকে ৩২ টাকা করে পুলিশ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদা দিতে হয়। ওই হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন হকারদের কাছে থেকে প্রায় এক কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়। বছরে এই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন শ’ থেকে চার শ’ কোটি টাকা।’

মো. মাহরুফ রহমান বলেন, ‘দৈনিক গড়ে ৫০০ টাকা করে এ সব হকারের আয় হলে বছরে তা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা অবদান রাখে। নিম্ন আয়ের এ সব হকার উচ্ছেদ না করে তাদের যদি সিটি করপোরেশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে আসতে পারে তাহলে করপোরেশনের জন্য রাজস্ব আয়ের নতুন একটি খাত তৈরী হতে পারে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবীব দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘রাজধানীর হকারদের উচ্ছেদের ব্যাপারে সিটি করপোরেশন যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা হল এক প্রকার আইওয়াশ। কোনো দিনই তারা রাজধানী থেকে হকার উচ্ছেদ করতে পারবে না। কারণ বড় বড় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা ফুটপাত দখল করে হকার বসায়। হয়ত সাময়িক হকার উচ্ছেদের নামে সিটি করপোরেশন কিছু একটা করতে পারবে, কিন্তু দেখা যাবে পর দিন যা তা-ই।’

ইকবাল হাবীব আরও বলেন, ‘নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে আমি হকার উচ্ছেদের পক্ষে নয়। কারণ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও হকারের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকক শহরের বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে অফিস ছুটির পর হকার মার্কেট শুরু হয়। সেখানে সাধারণ মানুষ কেনা-কাটা করে, বিনোদনের জন্য আসে। সেখানেও ফুটপাত ও রাস্তার পাশেই হকারদের বসানো হয়। আর ওইখানকার নগর সরকারই এই ব্যবস্থা করে।’

ইকবাল হাবীব আরও বলেন, ‘আমরা জানি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ না। সরকারি ও বেসরকারি অনুদানের ওপর তাদের নির্ভর করতে হয়। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব খাত থেকে যে রাজস্ব আদায় হয় তার ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ। সিটি করপোরেশন যদি তার রাজস্ব আদায়ের পরিধি না বাড়ায় তাহলে এক সময় দেখা যাবে বেতন-ভাতার জন্যও তাদের সরকারের কাছে হাত পাততে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফুটপাতে কোনো হকার বিনা পয়সায় ব্যবসা করতে পারছে এমন নজীর কেউ দেখাতে পারবে না। যে হকারটা বাসের মধ্যে কলম-পেন্সিল বিক্রি করছে তাকেও কাউকে না কাউকে টাকা দিতে হয়। কোটি কোটি টাকার হকারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজী চলছে রাজধানীতে। রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিটি করপোরেশন যদি তার রাজস্ব আয়ের ব্যাপারে আন্তরিক হয়, তাহলে শুধুমাত্র ফুটপাতের হকারদের কাছে থেকে বছরে শত কোটি টাকার উপরে রাজস্ব আদায় সম্ভব।’

এই বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মোস্তফা কামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ফুটপাত সম্পত্তি বিভাগের অধীনে আর সিটি করপোরেশনের আইনে যে সব খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি চিহ্নিত আছে সেখানে ফুটপাতের হকারের বিষয়টি উল্লেখ নেই। তাই চাইলেই সিটি করপোরেশন ফুটপাতের হকারদের নিজস্ব ম্যানেজমেন্টের মধ্যে আনতে পারছে না। তাদের ওপর ট্যাক্সের মধ্যেও আনতে পারছে না। এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ফুটপাত সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগের অধীনে। ফুটপাত যদি অবৈধভাবে দখল হয় তাহলে সম্পত্তি বিভাগই তা উচ্ছেদ করবে। সিটি করপোরেশনের যে সব সম্পত্তি রয়েছে তার মধ্যে ফুটপাত ও সড়কগুলোও আছে। আমরা আসলে আমাদের সম্পদগুলো দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করি। এখান থেকে রাজস্ব আদায় করি না। রাজস্ব সংক্রান্ত সবকিছু রাজস্ব বিভাগ দেখে। যেমন ধরুন, সিটি করপোরেশনের পাবলিক টয়লেট করপোরেশনে নিজস্ব সম্পত্তি হলেও তা সম্পত্তি বিভাগের অধীনে না। কারণ এখন থেকে রাজস্ব আসে, তাই এগুলো রাজস্ব বিভাগের অধীনে। এখন যদি ফুটপাতের হকারদের করপোরেশনের ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হয় তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা আমরা জানি যে ফুটপাত কখনই আমরা শতভাগ মুক্ত রাখতে পারব না। এখন অনেকেই বলছেন ফুটপাত আমাদের আয়ের উৎস হতে পারে। কিন্তু এ সব বিষয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।’

(দ্য রিপোর্ট/আরএইচ/আইজেকে/সা/এইচএসএম/অক্টোবর ০৪, ২০১৫)


পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে