thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪,  ২৬ শাবান ১৪৩৮

ফকিরের আস্তানায় জোড়া খুনেও জেএমবি জড়িত

২০১৫ অক্টোবর ০৬ ১৭:৪২:১৮
ফকিরের আস্তানায় জোড়া খুনেও জেএমবি জড়িত

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রামে সব ধরনের জঙ্গি তৎপরতা দমনে সফলতা দাবি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সোমবার রাতে নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজ নগরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে নয়টি গ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ দেশী অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার এবং নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার দুপুরে সিএমপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করা হয়।

এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৪ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন বাংলাবাজার এলাকায় ল্যাংটা ফকির ও তার খাদেম খুনের ঘটনায় গ্রেফতার বাবু জড়িত ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। মাজার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ইসলামবিরোধী, ওই সব ইসলাম ও শরিয়তবিরোধীদের খুন করলে জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়— এমন বিশ্বাস ধারণ করে বাবু ফকিরের মাজারে একা প্রবেশ করে প্রথমে ঘুমন্ত ফকিরকে এবং পরে তার খাদেমকে খুন করে এবং গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলন শেষে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে দেওয়া বক্তব্যে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান ও গ্রেফতার অভিযানে নেতৃত্বদানকারী নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর ও দক্ষিণ) বাবুল আক্তার বলেন, চট্টগ্রামে আটক জঙ্গিদের সঙ্গে সম্প্রতি আলোচিত আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের সম্পৃক্ত আছে কি না— তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ তৎপরতার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা কোনো প্রভাবশালীর সহায়তা থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শহীদুর রহমান বলেন, অতীতে চট্টগ্রামে কোনো বড় ধরনের নাশকতা কিংবা জঙ্গিদের অপতৎপরতা চালানোর আগেই পুলিশ গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে জঙ্গি দমনে সাফল্য দেখিয়েছে। সর্বশেষ একটি ছিনতাইয়ের ঘটনার সূত্র ধরে সোমবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে নয়টি গ্রেনেড, পিস্তল ও ১১৫ রাউন্ড গুলিসহ পাঁচ জঙ্গিকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের নিয়ে মঙ্গলবার ভোরে নতুন জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালানোর সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে জেএমবি নেতা জাবেদ নিহত হয়। আহত হয় তিন পুলিশ সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে সংগঠিত হতে ফান্ড সংগ্রহের লক্ষ্যে ছিনতাই করতে গিয়ে কিছুদিন আগে নগরীর সদরঘাট এলাকায় প্রথম গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি। ওই ঘটনায় দুই জঙ্গি এবং ছিনতাইয়ের শিকার ব্যবসায়ী সত্যপ্রিয় নিহত হন। এর সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়েই চট্টগ্রামে জেএমবির আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়।

তিনি নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে জঙ্গিরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেও মহানগর পুলিশের কঠোর তৎপরতা ও নজরদারীর কারণে তারা কখনো সফল হতে পারেনি। আগামীতে চট্টগ্রামে সব ধরনের জঙ্গি তৎপরতা নিশ্চিহ্ন করা হবে।

চট্টগ্রামে আর কোনো জঙ্গি ঘাঁটি বা জেএমবি সদস্যের অবস্থানের তথ্য পুলিশের কাছে আছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এ ব্যাপারে তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে খুবসীমিত সংখ্যক মানুষ জড়িত। গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জেএমবিনেতা জাবেদ জীবিত থাকলে হয়তো আরও বেশকিছু তথ্য পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে নিহত হওয়ায় কিছু তথ্য হয়তো জানা সম্ভব হবে না। তবে এই দলের আরও চার সদস্য পুলিশের হেফাজতে থাকায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জঙ্গি তৎপড়তার বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাশ ভট্টাচার্য্য।

অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর ও দক্ষিণ) বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে ওই অভিযানে আরও অংশ নেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের এসআই সন্তোষ কুমার চাকমা, এসআই লিয়াকত আলী, এসআই ইলিয়াছ খান, এসআই শিবেন বিশ্বাস, এসআই রাজেস বড়ুয়া, এসআই রাসেল মিয়া, এসআই আফতাবসহ গোয়েন্দা পুলিশের দল।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, গ্রেফতার হওয়া চারজন পুলিশকে জানিয়েছে, তারা নিষিদ্ধঘোষিত জেএমবি সদস্য। তাদের মধ্যে জাবেদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্ফোরক বিভাগের প্রধান। ফুয়াদ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড, আদর্শগত কারণে এবং তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ২৪ সেপ্টেম্বর সদরঘাট থানাধীন শাহ করপোরেশনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করে সে। ছিনতাই কাজে মোট আট সদস্য অংশ নেয়। এর মধ্যে চারজন দুটি মোটরসাইকেলে অপারেশন টিম হিসেবে এবং অপর চারজন রেসকিউ টিম হিসেবে কাজ করে। ঘটনায় শাহ করপোরেশনের পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনতাইকালে তারা গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। গ্রেনেডের আঘাতে জেএমবির সদস্য রবিউল ও রফিক ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং শাহ করপোরেশনের ম্যানেজার সত্য গোপাল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফারদিন, পিয়াস, সজিব, হাবিব, কালাইয়া প্রকাশ মটু ও ফুয়াদ ওই অভিযানে অংশ নেয়।

গ্রেফতার জাবেদ (পরে নিহত) জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে স্বীকার করে যে, তাদের ব্যবহৃত আরও কিছু গ্রেনেড পরিবহন জনিত অসুবিধার কারণে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন কোয়াইশ এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সে তা বের করে দিতে পারবে। তাকে সঙ্গে নিয়ে মঙ্গলবার ভোরে গোয়েন্দা বিভাগের একটি টিম গ্রেনেড উদ্ধারে গেলে ওই স্থানে পৌঁছামাত্র অন্ধকার হতে জাবেদের পলাতক সহযোগীদের কেউ গ্রেনেড ছুড়ে মারে। এতে জাবেদ গুরুতর আহত হয় এবং তিন পুলিশ সদস্যও আহত হয়। আহত সবাইকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জাবেদকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত পুলিশ সদস্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

সোমবার রাতে জঙ্গি অস্তানা থেকে যে সব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে— হ্যান্ড গ্রেনেড আটটি, একটি পয়েন্ট টুটু বোরের পিস্তল, চারটি বিভিন্ন সাইজের খালি ম্যাগাজিন, একটি অক ২২ রাইফেলের বাট, ২২ বোরের ১১৫ রাউন্ড গুলি, একটি চাইনিজ কুড়াল, ১০টি স্টিলের টিপ ছোরা, ছোরা রাখার ১০টি বিভিন্ন সাইজের কাপড়ের প্রসেস কভার, সাতটি পলিথিনের প্যাকেট ভর্তি স্টিলের রিং (প্রতি প্যাকেটে ১৩৫টি করে সর্বমোট ৯৪৫টি), তিনটি পলিথিনের প্যাকেট ভর্তি সার্কিট বোর্ড (প্রতি প্যাকেটে ৩০০টি করে সর্বমোট ৯০০টি), তিনটি পলিথিনের প্যাকেট ভর্তি ক্যাপাসিটার ফিতা (প্রতি প্যাকেটে ৩০০টি করে মোট ৯০০টি ক্যাপাসিটার), তিনটি পলিথিনের প্যাকেটভর্তি টগল সুইচ (প্রতিটি প্যাকেটে ২৭৫টি করে সর্বমোট ৮২৫টি), তিনটি পলিথিনের প্যাকেট ভর্তি ডায়ট (রোধক) (প্রতি প্যাকেটে ৩০০টি করে মোট ৯০০টি), তিনটি পলিথিনের প্যাকেটভর্তি তারকাটা স্প্রিং (প্রতি প্যাকেটে ৩০টি করে মোট ৯০০টি), তিনটি পলিথিনের প্যাকেটভর্তি পিন (প্রতি প্যাকেটে ৩০০টি করে মোট ৯০০টি), আটটি প্লাস্টিকের বান্ডিলভর্তি আইসি (প্রতি বান্ডিলে ২৫টি করে মোট ২০০টি), আটটি বিভিন্ন সাইজের স্টিলের প্যানেল, ৬৪টি স্টিলের প্যানেলের টুকরা, নয়টি পলিব্যাগভর্তি স্টিলের বল বিয়ারিং (প্রতিটিতে ১৫০টি করে মোট ১৩৫০টি), একটি পলিব্যাগভর্তি লোহার পেরেক (১৫০টি), বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি তার সংযুক্ত সার্কিট ১০টি, ছোট ছোট তারের টুকরা (অনুমান ২০টি), ছিদ্রযুক্ত থ্রেড কাটা এও পাইপের মুখ দুটি, পলিব্যাগভর্তি নাটসহ স্ক্রু (অনুমান ১০০টি), দুই প্যাকেট ফলা, একটি পুরাতন কাটার, একটি নোস প্লাস, একটি মিটার বোর্ড (তারসহ), একটি ইলেক্ট্রিক আয়রন, স্ট্যান্ড ও মটরসহ ড্রিল মেশিন, একটি ছোট কাঁচি, একটি কালো কসটেপ, কসটেপ মোড়ানো পেন্সিল ব্যাটারি আটটি, ১১টি নিউজপ্রিন্ট মোড়ানো ডিনামাইটের বান্ডিল, একটি মাল্টিপ্লাগ, একটি কালো রংয়ের গ্লু গানের টেগার, একটি হাত ঘড়ি, মোবাইল ফোন তিনটি, জিহাদী বই ৬৯টি, মোটরসাইকেল ২টি ও বাইসাইকেল ২টি।

(দ্য রিপোর্ট/এমএআর/আরকে/অক্টোবর ০৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর

জেলার খবর - এর সব খবর



রে