thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ ২০১৭, ১৬ চৈত্র ১৪২৩,  ১ জুলাই ১৪৩৮
লুৎফর রহমান সোহাগ

দ্য রিপোর্ট

ডিজিটাল প্রিন্টে হুমকিতে হাতে আঁকা রিকশাচিত্র

২০১৫ অক্টোবর ০৬ ১৮:০৫:৪৯
ডিজিটাল প্রিন্টে হুমকিতে হাতে আঁকা রিকশাচিত্র

ঢাকার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ রিকশা। বৈচিত্র্যময় চিত্রের কারণে অযান্ত্রিক এ যানের আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। প্রকৃতি, মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মীয় প্রতীক, স্থাপত্য, চলচ্চিত্র— সব মিলিয়ে রিকশাচিত্র সমসাময়িক ঢাকার মানুষের রুচিবোধের চলন্ত প্রদর্শনী।

সাধারণের কাছে এই রিকশাচিত্রের শিল্পগুণ তেমন মর্যাদা না পেলেও লন্ডনের মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ড, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, জাপানের ফুকুয়োকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়াম, জার্মানীর মিউনিখ ও নেপালে বাংলাদেশের রিকশাচিত্রের প্রদর্শনীর পাশাপাশি সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে রিকশায় ডিজিটাল প্রিন্টের ছবি ব্যবহার করায় হাতে আঁকা রিকশাচিত্রের পরিমাণ কমছে। চাহিদা কমায় এর কারিগররাও ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। ফলে সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছেন বাংলাদেশের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যাওয়া এ শিল্প ও তার শিল্পীরা।

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়— ১৮৭০ সালের দিকে জাপানে রিকশার প্রথম প্রচলন ঘটে। বিশ শতকের প্রথমভাগে অবিভক্ত বাংলায় প্রথম রিকশার প্রচলন ঘটে কলকাতায়। ১৯১৯ সালের দিকে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রামে রিকশা এলেও ঢাকায় তার দেখা মেলে ত্রিশের দশকে। আর বাহারী ও শৌখিন পরিবহন হিসেবে ঢাকায় রিকশার আগমন ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর এবং তখন থেকেই সূত্রপাত রিকশাচিত্রের, পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে যা এ অঞ্চলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

রিকশার পেছন দিকের নিম্নভাগে রিকশাচিত্রই মূলত ঢাকার রিকশার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া হুডসহ নানান স্থানেও দেখা যায় লতাপাতার কাজ আর নানান আলপনা। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও জনসম্পৃক্ত এ শিল্পে বাঙালীর সংস্কৃতির ছোঁয়া এবং বিষয়বস্তুর স্বকীয়তা দেখা যায়।

ষাটের দশকে চলচ্চিত্র তারকাদের প্রতিকৃতি, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও সত্তরের দশকের পর বর্ধিত ঢাকার কাল্পনিক দৃশ্য রিকশাচিত্রের প্রধান উপজীব্য ছিল। এ ছাড়া গ্রামীণ জনজীবন, প্রাকৃতিক দৃশ্য, মিথ বা ধর্মীয় কিংবদন্তি, স্মৃতিসৌধ, সংসদ ভবন, শহীদ মিনার, তাজমহল, সিনেমার দৃশ্য, রাস্তা ও পশুপাখির ছবি রিকশাচিত্রকে করেছে বৈচিত্র্যময়। এ সব চিত্রে কারিগরদের নিজস্ব কল্পনাশক্তির যেমন প্রকাশ ঘটেছে তেমনি বাংলার সামাজিক প্রভাবেরও সম্মিলন ঘটেছে।

পালকী ও ঘোড়ারগাড়িকে হটিয়ে রিকশা ঢাকার প্রধান যানবাহনে পরিণত হলে নগরীর সূত্রাপুর, বংশাল, বকশীবাজার, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তানসহ বেশকিছু এলাকায় রিকশাচিত্র কারিগরদের কদর বেশ বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে হাতে আঁকা চিত্রের বিকল্প হিসেবে ডিজিটাল প্রিন্টের ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পেশাগত দিক দিয়ে হুমকির মুখে পড়েছেন কারিগররা। দিন দিন চাহিদা কমায় অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন অন্য পেশায়।

বংশালের এমনই দুই কারিগর হাছান আলী ও কালাম মিয়ার সঙ্গে বুধবার কথা বলে জানা যায়, তারা বর্তমানে সবজি ব্যবসায় জড়িত। তবে অর্ডার এলে কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা রিকশাচিত্র অঙ্কন করেন।

হাছান আলী বলেন, ‘ডিজিটাল প্রিন্ট কম খরচে দ্রুত হওয়ায় হাতে আঁকা রিকশাচিত্রের চাহিদা কমেছে। তবে হাতে আঁকা রিকশাচিত্রের সৌন্দর্য ডিজিটাল প্রিন্ট থেকে অনেক উন্নত।’

রিকশাচিত্র কারিগর কালাম মিয়া বলেন, ‘চাহিদা কম, তাই অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু ডিজিটাল প্রিন্ট না, অটোরিকশার চাহিদা বাড়ায় নতুন রিকশার পরিমাণও কমছে। এ ছাড়া এখন ঢাকায় বসতি ও যানজট অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে সৌন্দর্য অনুভূতি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে অনেক রিকশা মালিকই চিত্রের প্রতি তেমন আর গুরুত্ব দেন না। তাই এ শিল্প কতদিন রাজধানীতে টিকে থাকে, সেটাই দেখার বিষয়।’

এদিকে ফার্মগেট এলাকায় কয়েকজন রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের রিকশার চিত্র তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়ী থেকে কিনেছেন গাড়ির মালিকরা। প্রতিটি গাড়িতেই ডিজিটাল প্রিন্টের চিত্র দেখা গেছে।

(দ্য রিপোর্ট/এলআরএস/এপি/এমডি/আইজেকে/এজেড/অক্টোবর ০৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে