thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৭, ৯ মাঘ ১৪২৩,  ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮
নাজমুল সাঈদ

দ্য রিপোর্ট

আইএস : পুলিশের আগের বক্তব্যে বিভ্রান্তিতে সরকার

২০১৫ অক্টোবর ০৬ ১৯:৩০:২৪
আইএস : পুলিশের আগের বক্তব্যে বিভ্রান্তিতে সরকার

গত কয়েক মাসে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে কমপক্ষে দশজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর এ সব ব্যক্তিকে ‘আইএস সদস্য’ বলেও দাবি করে আইনশৃংখলা বাহিনী। যদিও দেশে আইএস-এর কোনো অস্তিত্বই এখনো মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাম্প্রতিক সময়ে বলেছেন যে, বাংলাদেশে আইএস-এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

ফলে পুলিশের এমন ‘অতি উৎসাহী’ ভূমিকায় বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে সরকারকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ইতালিয়ান নাগরিক ও রংপুরে জাপানী নাগরিক খুনের ঘটনায় আইএস প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, বিদেশী খুনের সাথে আইএস জড়িত। যদিও ওয়েবসাইটটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাইটটির পরিচালক ইসরায়েলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট বলে জানা গেছে।

অতীতে আইএস নিয়ে ‘অতি উৎসাহী’ বক্তব্য দিলেও পিছু হটেছে পুলিশ। উল্টো গণমাধ্যমের কাছে এখন পুলিশ দাবি করছে, এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তারা দেননি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুনতাসীরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আইএস সদস্য আটক করা হয়েছে, আমরা কখনোই এমন দাবি করিনি। আমরা বলেছি, আইএসের সদস্য সন্দেহে আটক করেছি। সদস্য সংগ্রহের সময় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘আইএসের সদস্য হতে হলে আগ্রহীকে সরাসরি সিরিয়ায় যেতে হবে এবং আইএসের প্রধানের বায়াত পেলেই সদস্য হতে পারবেন।’

একই দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ও জঙ্গি বিশ্লেষক মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন। দ্য রিপোর্টকে তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের আগে আটক করেছি, তাদের আইএস সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তাদের সরাসরি আইএস সদস্য দাবি করা হয়নি।’

ছানোয়ার হোসেন বলেন, ‘তবে বাংলাদেশের অনেকে আইএসকে সমর্থন করেন। সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন।’

পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা এমন দাবি করলেও, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে গ্রেফতার কয়েক যুবককে ‘আইএস সদস্য’ বলেও দাবি করা হয়।

কী ছিল পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে?
চলতি বছরের ২৫ মে ডিবি’র জনসংযোগ বিভাগ গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস-এর ০২ সদস্য গ্রেফতার।’ বিজ্ঞপ্তির স্মারক নং-এম এন্ডপিআর/ডিএমপি।

পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির হেডলাইনে আইএস-এর কথা বলা হলেও, প্রথম অনুচ্ছেদে গ্রেফতার দুই ব্যক্তির পরিচয় ‘জেএমবি’ হিসেবে বলা হয়। অথচ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘দেশের গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে উৎখাতের মাধ্যমে আইএস কর্তৃক নির্দেশিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বিভিন্নভাবে প্রচারের মাধ্যমে গোপনে অর্থ ও কর্মী সংগ্রহ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মাধ্যমে দেশের আইনশৃংখলার অবনতি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করে হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠন আইএস এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে ও সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে আসছিল। আইএস এর নিকট হতে অর্থ ও মারাত্মক অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং বিস্ফোরক দ্রব্যের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা করত। ক্ষতিসাধন, হুমকি সৃষ্টি ও খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।’

একই বছরের ৮ জুন ডিবি কার্যালয় থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস-এর ০১ সদস্য গ্রেফতার।’ বিজ্ঞপ্তির স্মারক নং-এম এন্ডপিআর/ডিএমপি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ডিএমপি’র গোয়েন্দা ও অপরাধতথ্য বিভাগ গত ০৭/০৬/২০১৫ খ্রী: রবিবার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস এর ০১ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতের নাম ফিদা মুনতাসির সাকের।’

পুলিশের বক্তব্যেই বিভ্রান্তির সৃষ্টি
বিশ্লেষকদের দাবি— বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রম না থাকলেও আইএসকে ঘিরে পুলিশ বিভিন্ন সময় যে অতি উৎসাহী বক্তব্য দিয়েছে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। পুলিশ ‘আইএস’ সন্দেহে আটক অব্যাহত রাখলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই। ফলে এতে কিছুটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘৩ অক্টোবরও আইএস সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে পুলিশ আটক করেছে। পুলিশ বলছে, তারা আইএসের সঙ্গে জড়িত। আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই। এতে তো আমি নিজেই বিভ্রান্ত। এটা নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত করার মতো কথা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় না, দেশে আইএসের উত্থান হয়েছে। বাংলাদেশে ঘটনা ঘটিয়ে তাদের লাভটা কী? তাদের তো একটা প্যাটার্ন আছে। তারা ছোটোখাটো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। তাদের সঙ্গে পুরো ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড যুদ্ধ করছে। তারা একটি স্টেটও বানিয়েছে। তাদের প্রায় ৪০ হাজার যোদ্ধা বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করছে। তাহলে বাংলাদেশে দু’জনকে হত্যা করে তাদের লাভটা কী? এ ছাড়া এটা প্রচারও করা হচ্ছে না। আইএস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকলে— তাহলে তাদের নিজের ওয়েবসাইটেই প্রকাশ করত। কিন্তু তারা তা করেনি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউই আইএসের পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি আইএসের সদস্য হতে চায়, তাহলে তাকে আইএস প্রধান আবুবক্কর আল বাগদাদীর কাছে বায়াত (আনুগত্যের শপথ) নিতে হয়। আমার মনে হয় না, বাংলাদেশের কেউ বাগদাদীর কাছে বায়াত নিয়েছেন।’

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার গুলশানে ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজারকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপ নামের একটি ওয়েবসাইটে আইএস হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করা হয়। এরপরই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে আইএস। যদিও এ দাবির সত্যতা খুঁজে পায়নি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

ইতালিয়ান নাগরিক খুন হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় শনিবার সকালেও রংপুরে জাপানী নাগরিক হোসি কোনিওকে একইভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের দায়ও আইএস স্বীকার করেছে বলে সাইট ইনটেলিজেন্স গ্রুপ নামের একটি ওয়েবসাইট দাবি করেছে। এটিও যাচাই-বাছাই করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘জঙ্গি সংগঠন আইএসের কোনো অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। ঢাকায় ইতালীর নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যার সঙ্গে আইএস জড়িত থাকার সত্যতা পাওয়া যায়নি।’

যুক্তরাষ্ট্র সফর পরবর্তী সম্মেলনে একই কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তিনি বলেছেন, ‘দেশে আইএসের কোনো তৎপরতা নেই।’

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যমে শাখার পরিচালক মুফতি মোহাম্মদ খান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কখনোই আইএস সদস্য আটক করা হয়নি। যাদের আটক করা হয়েছে, তারা আইএসে যোগদানের চেষ্টা করেছে। এ অপরাধে তাদের আটক করা হয়েছে।’

বাংলাদেশে আইএস রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বস। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা নেই। আমিও তাদের সঙ্গে একমত। আসলে বাংলাদেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়নি।’

(দ্য রিপোর্ট/এনএস/এএসটি/আরকে/অক্টোবর ০৬, ২০১৫)


পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে