thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

জেলহত্যার চল্লিশ বছর

চার জাতীয় নেতার পরিবারের স্মৃতিচারণ

২০১৫ নভেম্বর ০২ ২০:২৮:১৭
চার জাতীয় নেতার পরিবারের স্মৃতিচারণ

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে মাত্র কয়েক জনের একটি ঘাতক দল ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। একই বছরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ৮০ দিনের মধ্যে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং কামরুজ্জামান এই চক্রান্তের শিকার হন।

এবার জেল হত্যাকাণ্ডের ৪০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। জাতীয় চার নেতার পরিবারের কয়েকজন সদস্য দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন সেই দিন-সময়ের কথা।

তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে সিমিন হোসেন রিমি

বাংলাদেশের ইতিহাস এবং সিমিন হোসেন রিমির বেড়ে ওঠা যেন সমান্তরাল রেখা। বাংলাদেশ জন্মের দশ বছর আগে পৃথিবীতে তার আগমন। তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে হওয়ার কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে তার ।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের ঐতিহাসিক জেল হত্যার ঘটনায় সিমি হোসেন হারিয়েছেন তার বাবাকে। বাঙালী জাতি হারিয়েছে তার শ্রেষ্ঠদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের।

চল্লিশ বছর পর সেই দিনের কথা জানতে চাইলে সিমিন হোসেন রিমি দ্য রিপোর্টকে জানান, “আব্বু জেলে যাওয়ার পর থেকেই বলতেন আমাদের আর বাঁচিয়ে রাখবে না। এই আশঙ্কা করলেও তার মধ্যে কোনো ভীতি কাজ করতো না। আমি শেষবার আব্বার সঙ্গে দেখা করেছিলাম অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে। সেদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাইকে স্বপ্নে দেখলাম, বলছেন- তাজউদ্দীন তুমি আমার কাছে চলে এসো। তোমাকে ছাড়া আমার ভাল লাগে না’।”

এর দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাজউদ্দীন আহমদকে প্রিয় ‘মুজিব ভাই’য়ের কাছে পাঠিয়ে দেয় ঘাতকরা। ১৫ আগস্টের বিহ্বলতায় তাজউদ্দীন আহমদ তার পরিবারের কাছে বলেছিলেন, ‘আমি মুজিব ভাইয়ের পাশে থাকতে পারলে তার শরীরে কেউ আঁচড় দিতে সাহস পেতো না’। বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন ছিলেন হরিহর আত্মা। শেষ জীবনে কিছুদিনের বিচ্ছেদের পর মৃত্যু তাদের আবারও একত্রিত করেছে।

সিমি বলেন, ‘চার নভেম্বর আব্বুর লাশ বাড়ি আনার পর প্রথম কয়েক ঘন্টা আমি কাদঁতে পারিনি। তখন আমার বয়স ১৪। এমন দৃশ্য কীভাবে দেখছি (লাশের মুখ) তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। আগে তো আব্বু জেলে থাকলে বা অন্য কোনো সমস্যা হলে মুজিব কাকুসহ অন্যরা খোঁজ-খবর নিতেন।’

নভেম্বর মাস থেকে নতুন জীবন শুরু হয় জানিয়ে সিমিন হোসেন রিমি বলেন, ‘আমাদের বাসায় ভয়ে কেউ আসতেন না। নিচের তলাটি একটি স্কুলের কাছে ভাড়া ছিল। তারাও চলে গেল। চরম আর্থিক সমস্যার মধ্যে চলতে হয়েছে। খালি বাসা দেখে কেউ এসে যখন জানতো এটা তাজউদ্দীন আহমদের বাড়ি কেউ ভাড়া নিতে চাইতো না।’

‘শিশু-কিশোর বয়সে মানুষের ভাবনাহীন জীবন পার করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, আমাদের সময়টা সেভাবে কাটেনি। একদিকে যেমন যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, তেমনি জীবনযুদ্ধের সঙ্গে লড়তে হয়েছে সমানতালে।’

‘হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি হায়েনারা, আমাদের ঠিক মতো আব্বুর করবস্থানে যেতে দেয়নি কয়েক বছর। যাদের হাত দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে তাদের এই পরিণতি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর লোকজনও করতে পারে নি। স্বাধীন বাংলাদেশে তাই হয়েছে। এগুলোও কি বিশ্বাসযোগ্য বিষয় হতে পারে?’ প্রশ্ন রিমির।

সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম

বাংলাদেশের প্রথম উপ-রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সৈয়দ নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলে মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম পিতার হত্যাকাণ্ডের কথা জানতে পারেন ঘটনার কয়েকদিন পর।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাফায়েতুল বলেন, ‘আব্বাকে যখন জেলখানায় হত্যা করা হয় তখন আমি কুমিল্লা সেনানীবাসে কর্মরত। ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকেই আমাকে নিয়ে পরিবারের টেনশন ছিল। পারিবারিক কয়েকজন বন্ধুর (আব্বা-আম্মার পরিচিত) কারণে সেনাবাহিনীতে অনেক সমস্যার মধ্যেও কিছু মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। যখন বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে তখন কয়েকদিন লুকিয়ে থেকেছি।’

কবরস্থানে আর্মির নিয়ন্ত্রণ থাকায় নিজের বাবার লাশ দেখতে না পারা সাফায়েতুল ইসলাম ভালভাবে বাবার কবরটুকু জিয়ারত করতে পারেননি। এক পর্যায়ে কবরস্থানের প্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে বাবার কবর জিয়ারত করে আসতে পেরেছিলেন।

মোশতাক নিজে বেশ কয়েকবার সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে সরকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছিলেন। নজরুল ইসলাম সেসব প্রস্তাবকে পায়ে ঠেলে নিশ্চিত মৃত্যুর পথকেই বেছে নিয়েছিলেন। ‘এমন পিতার সন্তান হওয়া সত্যিই গর্বের’, যোগ করেন সাফায়েতুল ইসলাম।

নিজেদের পরিবারের প্রসঙ্গ এলে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে কোনোভাবেই আলাদা করতে পারেন না সাফায়েতুল।

তিনি বলেন, ‘দুই পরিবার হলেও রাজনীতির বাইরেও পারিবারিক সম্পর্কটা এমন ছিল যে, কেউ কাউকে ছাড়া নয়। এই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় ত্যাগ বঙ্গবন্ধুর। তিনিসহ তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই নেই। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকা তার দুই মেয়ের মধ্যে শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় তার সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। তাদের পরিবারের কাছে আমাদের অনেক ঋণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আব্বা নেতা হিসেবে সব সময়ই বঙ্গবন্ধুকে সম্মানের জায়গায় রেখে কথা বলতেন, সম্বোধন করতেন। কখনো কখনো মনে হয়, যদি সেই অনাকাঙ্ক্ষিত দিনগুলো বাংলাদেশের বুকে না আসতো, আজও হয়তো বেচেঁ থাকতেন তারা।’

এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম

জাতীয় চার নেতার সন্তানদের মধ্যে মন্ত্রিসভায় রয়েছেন দু’জন। তাদের একজন এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম। দায়িত্ব পালন করছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী হিসেবে। ছাত্রজীবন থেকে আওয়ামী রাজনীতি করে আসা নাসিম ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগেরও শীর্ষ নেতাদের একজন।

ভয়াল নভেম্বরের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকেই আমার উপর হুলিয়া জারি ছিল। গ্রেফতারের পরও আব্বাকে কোনোদিন দেখতে যেতে পারিনি, বিভিন্ন মাধ্যমে আব্বাসহ জাতীয় নেতাদের খোঁজ-খবর রাখতে পেরেছিলাম।’

‘ঢাকায় আমাদের কোনো বাসা ছিল না। আব্বা আত্মীয়ের বাসায় থেকে জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতেন। আব্বা যখন গ্রেফতার হয়ে জেলে ছিলেন তখন দুই থেকে তিনবার আম্মা দেখা করতে পেরেছিলেন।’

মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘তবে, খুনী মোশতাকের চক্রান্তে আব্বা কখনো পা রাখেননি। জেলখানায় থাকা অবস্থায় আব্বাকে মোশতাকের সরকারে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আব্বা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই ছিল তার আদর্শের রাজনীতি। জীবন গেলেও নিজেকে আদর্শচ্যুত করেননি।’

পিতার মৃত্যুর পর নিজেদের পারিবারিক দুরবস্থার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একে তো ঢাকায় আমাদের থাকার বাসা নেই, দ্বিতীয়ত তখন এম মনসুর আলীর পরিবার হিসেবে কেউ সহযোগিতা করলে তাদেরও বিপদ ছিল। এখন জাতীয় নেতার পরিবার হিসেবে কত সম্মান পাই। কিন্তু, তখনকার সময়টা ছিল ঠিক উল্টো।’

নাসিম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনকে অনুসরণ করে আব্বাও খুব সাধারণ জীবনযাপন করতেন। দেশের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার জীবনে বিলাসিতা গ্রহণ করেননি। ফলে আমরাও তেমন কোনো চাকচিক্যের মধ্যে বড় হইনি। সেই দিনগুলো কখনো ভোলা যাবে না।’

এ এইচ এম কামরুজ্জামানের ছেলে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন

জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানের দুই ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে খায়রুজ্জামান লিটন চতুর্থ। তার বাবার সঙ্গে শেষ স্মৃতির কথা জানাতে গিয়ে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, ‘আব্বা খুব রাশভারি মানুষ ছিলেন। তার সামনে আমরা সহজে উচ্চস্বরে হাসাহাসি করতাম না। তখন কলকাতায় পড়াশোনা করি। ১৯৭৫ সালের জুন-জুলাইয়ে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়িতে বেড়াতে এসেছি, ইলিশের মৌসুম। একদিন খেতে বসে হঠাৎ করেই আমাদের দুই ভাইকে ডেকে পাঠালেন। বললেন পাশে বসে খাওয়ার জন্য। এভাবে কয়েকদিন আমাদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করলেন আব্বা। এটা আমাদের জীবনের ব্যতিক্রম ঘটনা। কখনো ভাবতেই পারতাম না যে, আব্বা আমাদের এভাবে কাছে ডাকবেন, খেতে বলবেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে এমন আচরণের কথা এখন খুব মনে পড়ে।’

কামরুজ্জামানের গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি জানান, ‘ধানমণ্ডির একটি বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন আব্বা। সেখান থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নিয়ে যায়।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী পিতার স্মৃতিচারণ করে খায়রুজ্জামান বলেন, ‘১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে যেসব নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন তিনি।’

পিতার স্মৃতি বহন করা একটি ছবির বিবরণ দিয়ে লিটন বলেন, ‘কলকতার সল্টলেকে অসংখ্য পাইপের মধ্যে প্রচুর বাংলাদেশী শরণার্থীকে বাস করতে হয়েছে। ওই জায়গা পরিবদর্শন করতে যুক্তরাষ্ট্রের জন এফ কেনেডির ভাই এডওয়ার্ড কেনেডিকে নিয়ে গিয়েছিলেন আব্বা। সেই ছবি এখনও আমার কাছে আছে।’

খায়রুজ্জামান জানান, ‘শহীদ জাতীয় চার নেতার স্ত্রীদের মধ্যে শুধু আমার মা জাহানার জামান (কামরুজ্জামানের স্ত্রী) এখনো বেঁচে আছেন। আম্মার বয়স হয়েছে প্রায় ৮২ বছর। তার শেষ ইচ্ছা জেলহত্যা মামলার রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখে যাওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাকিদের শাস্তিও নিশ্চিত করা হোক। সেই সঙ্গে ওই দিনের (৩ নভেম্বরের) মূল হত্যাকারী রিসালদার মোসলেউদ্দিনকে ধরে এনে বাংলাদেশের মাটিতে ফাঁসি দেওয়াটা খুব দরকার বলে মনে করি।’

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এসআর/এএসটি/এনআই/নভেম্বর ০২,২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর