thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫,  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

এখনো বাবার হত্যার বিচার হলো না : মাহজাবিন খালেদ

২০১৫ নভেম্বর ০৭ ০০:৫৯:২৭
এখনো বাবার হত্যার বিচার হলো না : মাহজাবিন খালেদ

মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও ‘কে-ফোর্স’-এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। বীরত্বের জন্য বীরউত্তম উপাধি পান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। ক্ষমতা দখলের মাত্র ৩ দিন পর ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন। খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমের বড় মেয়ে মাহজাবিন খালেদ দ্য রিপোর্টের কাছে তুলে ধরেছেন সেই সব দিনগুলোর কথা। তার বয়ানে উঠে আসা কথাগুলো গ্রন্থনা করেছেন দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক আমানউল্লাহ আমান

মাহজাবিন খালেদ বলেন, ৭ তারিখে কী হয়েছে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। তখন গুলশানে আমার নানীর বাসায় ছিলাম। ৮ তারিখে অনেকেই বলাবলি করছিল বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তা-ও আমরা বিশ্বাস করিনি। ৯ তারিখে জানতে পারলাম সিএমএইচে বাবার মৃতদেহ রাখা আছে। তখন কেউ বাবার মৃতদেহ আনতে যাবে না। কারণ তখন সবাই ক্যাণ্টনমেন্টে যেতেই ভয় পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে আমার আম্মার এক চাচা (নামটা এখন মনে পড়ছে না) সিএমএইচে গিয়ে মৃতদেহ নিয়ে এলেন। গোসল করানো হলো। তার পর ক্যাণ্টনমেন্টের পাশের নেভি হেডকোয়ার্টার গোরস্তানে দাফন করা হল।

তখন আমার বয়স মাত্র ৮ বছর। আমি ক্যান্টনমেন্টের শহীদ আনোয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। আমার ছোট বোনটি তখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। একেবারে ছোট বোনটির বয়স ছিল ১ বছর। আমার বাবা ছাড়া আমাদের পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম মানুষ ছিল না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তখন। ঢাকায় আমাদের কোনো বাড়িঘর ছিল না। আমরা তিন বোন আর আম্মা মামার বাসায় থাকতাম। মামার বাসায় থেকেই পড়াশোনা করতে হয়েছে।

১৯৭১ সালে বাবা যখন যুদ্ধে গেলেন তখন আমাদের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় একবার লুট হল। ’৭৫-এর ওই ঘটনার পর আমার এক নানী আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন। উনি পরে আম্মাকে জানালেন, আমাদের বাসায় কোনোকিছু নেই। সবকিছু লুট হয়ে গেছে। আম্মা বলল, আমরা আর কোনোদিন ক্যাণ্টনমেন্টে যাব না। নভেম্বর মাসে সেই যে স্কুল ছেড়ে এলাম আর স্কুলে যেতে পারিনি। শহীদ আনোয়ার বালিকা বিদ্যালয়ে আর যাওয়া হল না। আমরা তখন হলিক্রস স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম। হলিক্রসে এসে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম।

আমার মা রাগ-অভিমান থেকে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। উনি সবকিছু থেকে দূরে সরেছিলেন। আম্মা সেনাবাহিনী কিংবা আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে চাননি। আমাদের পড়াশোনা করানো থেকে শুরু করে আজকের এই জায়গা পর্যন্ত অনেক কষ্টেই নিয়ে এসেছেন। আম্মা সেলাইয়ের কাজ জানতেন। সেলাই করে তখন কাপড়ও বিক্রি করেছেন। সেই টাকায় আমাদের স্কুলের বেতনের টাকা পরিশোধ করতেন।

ঈদের আগে সবার মধ্যে একটা আনন্দ দেখতে পেতাম। সবাই নতুন জামা পরবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে যাবে। কিন্তু আমাদের কোনো ঈদে এটা হতো না। ঈদের আগের দিনও চিন্তা করতাম আম্মা জামাটার সেলাই শেষ করতে পারবেন কি-না? ঈদের দিন নতুন জামাটা পরতে পারব কি-না? ঈদের দিন মনে হতো কোথায় যাব? বাবা তো নেই। বাবা থাকলে বাবার সঙ্গে বাইরে যেতে পারতাম। কোথায় যাব? কার সঙ্গে যাব? ১৬ ডিসেম্বর বাবার জন্য দুটি আনন্দ ছিল। একটি হচ্ছে বিজয় দিবস, অন্যটি আমার জন্মদিন। কিন্তু ’৭৫-এর পর আর কোনোদিন এ রকম আনন্দ আসেনি।

আমার বাবা সারাদিন শুধু মানুষের কথাই ভাবতেন। এত দেশপ্রেম ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতার পর মুক্তিযোদ্ধারাই দেশপ্রেমিক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এলেই খালেদ মোশাররফের নাম আসে।

বাবার মতো দেশপ্রেম, মানুষকে ভালবাসার গুণ আমি হয়তো জীবনেও অর্জন করতে পারব না। কিন্তু আমি দেশের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করতে চাই। আমি হয়তো পুরো বাংলাদেশের জন্য পারব না। কিন্তু আমার এলাকা জামালপুর-ইসলামপুরের জন্যই করি। যদি আগামীতে সুযোগ পাই আরও করার চেষ্টা করব।

যুদ্ধপরবর্তী সময় বাবাকে তো কাছেই পেতাম না। সেনাবাহিনীর কাজ নিয়ে উনি ব্যস্ত থাকতেন। সপ্তাহের শনি বা রবিবার নানীর বাসায় ঘুরতে আসতাম। আমার বাবা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। উনি নতুন গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করতেন। বাবার সঙ্গে গাড়িতে করে সাভারের দিকে ঘুরতে যেতাম।

অনেক কথাই ছিল যা বাবাকে বলতে পারিনি। বলার সময় হওয়ার আগেই বাবাকে হত্যা করা হল। আমি যখন কারও কাছে শুনি বাবার সঙ্গে মেয়ের খুব ক্লোজ সম্পর্ক থাকে, বাবার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করে। তখন আমার খুব খারাপ লাগে। এখন মাঝেমধ্যে যখন রাজনৈতিক ঝামেলায় পড়ি তখন মনে হয়, যদি বাবা থাকতেন তাহলে বাবার সঙ্গে বিষয়গুলো বলা যেত। আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়া যেত। একটা ভাল কাজের কথা যদি বলতে পারতাম বাবা অনেক খুশি হতেন। আমি সংসদ সদস্য হয়েছি, এটা জানলে আমার বাবার চেয়ে কেউ বেশি খুশি হতেন না। দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য কাজ করছি- এই কথাগুলোই বাবাকে বলা হল না।

এতগুলো বছর চলে গেল, কিন্তু এখনো বাবার হত্যার বিচার হলো না। এই কাজটাই হয়তো আমার বাকি রয়ে গেল। সব কাজই হচ্ছে। কিন্তু এই কাজটাই আমি এখনো করতে পারলাম না। কিন্তু আমি আশা করি হবে। আমি মনে করি বর্তমান সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ৭ নভেম্বর হত্যার বিচার হবে না কেন? আমি তো মনে করি, জিয়াউর রহমানের আমলে যে ২০-২২টি অভ্যুত্থান হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লোকজনকে একে একে হত্যা করা হয়েছে, তাদের সবারই বিচার হওয়া উচিত। বিচার হবে। এই বিচার না হলে আমাদের প্রজন্ম কী শিখবে? কী জানবে? মিথ্যার ওপর চললে কোনোদিন উন্নয়ন হবে না। সত্য কথা জেনে সামনে চলতে হবে।

(দ্য রিপোর্ট/এইউএ/এসআর/এজেড/নভেম্বর ০৭, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

৭ নভেম্বর ২০১৫ এর সর্বশেষ খবর

৭ নভেম্বর ২০১৫ - এর সব খবর