thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫,  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
শরীফ নুরুল আম্বিয়া

কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল সমাজ বদলের বিপ্লবী প্রচেষ্টা

২০১৫ নভেম্বর ০৭ ০১:৫৩:২২
কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে নভেম্বরের অভ্যুত্থান ছিল সমাজ বদলের বিপ্লবী প্রচেষ্টা

৭ নভেম্বর ১৯৭৫, এখন থেকে ৩৯ বছর আগের ঘটনা, গণবাহিনীর নেতৃত্বে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ বদলের এক সাহসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা পরাজিত হয়েছিলো জেনারেল জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিবিপ্লবের হাতে, পরিণতি লাভ করেছিল পাকিস্তানী ধারার রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠায়। তাহেরের সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান পরিণত হয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস নামে, জিয়া রাজাকার মুক্তিযোদ্ধার সংহতির নামে ধর্মাশ্রয়ী ও রাজাকারদের রাজনীতির ময়দানে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

এই অভ্যুত্থানের প্রভাব হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী, রাজনীতিতে এর জের রয়েছে এখনো। এর জের আরও অনেক দিন থাকবে যতদিন সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সন্ত্রাসী ধারা দেশে সক্রিয় থাকবে। জিয়ার বদৌলতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত দল জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের অনেকে যুদ্ধাপরাধ করেছিল, তাদের নেতারা খুনী রাজাকার-আল বদর-আল শামস বাহিনীর নেতা ছিল, তাদের এখন বিচার ও দণ্ড হচ্ছে প্রত্যাশিতভাবে। কুখ্যাত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদীর রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। যারা বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখেন তাদের জন্য ৭ নভেম্বর এক শিক্ষণীয় মহান অভ্যুত্থান।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫, ঐ সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ঘোলাটে। ক্যান্টনমেন্টের সৈনিকদের মধ্যে ছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি, চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি ছিল সেখানে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে এর শুরু হয়েছিল। কয়েকজন মেজর র‍্যাঙ্কের অফিসারের উদ্যোগে সেনাশৃঙ্খলা ভেঙ্গে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে যে ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ড হয়েছিল তা সকলেরই জানা। ক্ষমতায় টিকে থাকার মতো জনপ্রিয়তা খন্দকার মোশতাকের ছিল না। আওয়ামী লীগের অনেকে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিপরিষদে যোগ দিলেও এবং অনেকে অপেক্ষা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্ব নেয়নি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে গঠিত জাসদ আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করলেও খন্দকার মোশতাককে উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল। ’৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং ঐ সময়ে রুশ-ভারত বিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ মোশতাকের পক্ষে থাকলেও তা যথেষ্ট ছিল না। মোশতাক অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জেলে নিলেন। আওয়ামী লীগ হয়ে পড়ল বিশৃঙ্খল; কেউ ভারতে, কেউ জেলে, কেউ মোশতাকের কেবিনেটে, বাইরে থাকলেও কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

জাসদ বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ বদলের রাজনীতি ও সংগ্রাম করছিল প্রতিষ্ঠাকাল থেকে। দেশে বাকশাল কায়েমের পর জাসদের বিপ্লবের প্রস্তুতিগত তাগিদ বেড়ে যায়। বাকশাল গঠনের পর রাজনৈতিক অধিকার সীমিত হলে জাতীয় পর্যায়ে গণবাহিনী গঠন করা হয়। এটা ছিল জাসদের সশস্ত্র সংগঠন। কর্নেল তাহের বীর-উত্তম ছিলেন গণবাহিনী প্রধান। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টরের একজন নির্ভীক সেক্টর কমান্ডার। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। সব সময় সামনে থেকে যুদ্ধ করতে পছন্দ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনীর আর্টিলারি শেলের আঘাতে তিনি আহত হন এবং তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। তিনি বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তিতে বিশ্বাস করতেন। তিনি জাসদ রাজনীতির সর্বচ্চ নীতি নির্ধারণী কমিটির সদস্য ছিলেন।

নভেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতির অতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ১৫ আগস্টের হত্যাকারীরা এবং তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্টে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা বলে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ ক্ষমতা দখল করতে চায়। খালেদ মোশারফ রুশ-ভারতের পক্ষের অফিসার বলে চিহ্নিত ছিল, সম্মানিত, কিন্তু ততটা জনপ্রিয় নয় এবং পরিস্থিতি তাঁর অনুকূলে ছিল না। তিনি ক্ষমতার স্বার্থে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের দেশ থেকে নিরাপদ নিষ্ক্রমণে সুযোগ করে দেন। কিন্তু ঐ খুনীরা দেশ ত্যাগের আগে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও ক্যাঃ মনসুর আলীদের হত্যা করে অত্যন্ত নির্মম ও বর্বরভাবে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের চার সিনিয়র নেতাকে সরিয়ে দিয়ে হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীরা পাকিস্তানী ধারার রাজনীতি ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করে।

৪ নভেম্বর খঃ মোশতাক খালেদ মোশারফকে মেজর জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। ৬ তারিখ বিচারপতি সায়েম খন্দকার মোশতাকের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন।

খালেদের ক্ষমতা দখলের পর ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকরা সশস্ত্র অবস্থায় মুখোমুখি ছিল ও পরিস্থিতি ছিল বিস্ফোরন্মুখ। জেনারেল জিয়াকে অন্তরীন করা হয়েছিলো। তিনি কর্নেল তাহেরের সাহায্য চাইলেন এবং এক সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তাহের এই সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, জিয়ার ওপর আস্থা রেখে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা অপেক্ষা ও অনুসন্ধান পর্যায়েই শেষ হয়ে যায়, কোন ফলাফল ছাড়া। ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে এই সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান হয়েছিলো, সৈনিকরা শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিল, উচ্চাভিলাষী সামরিক অফিসাররা কিছুটা ভিত হয়ে পড়েছিল।

তাহেরের অভ্যুত্থানের ভিত্তি ছিল সাধারণ সৈনিক ও জুনিয়র কমিশন্ড-নন কমিশন্ড অফিসাররা। ওদের মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে একটা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন তাহের। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেজর জলিল ও তাহেরের অধীনে যারা যুদ্ধ করেছিল এবং সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল তাদের কেন্দ্র করেই এই সংগঠন গড়ে উঠেছিলো। খালেদ মোশারফকে উচ্ছেদ, রাজবন্দীদের মুক্তি, বাকশাল বাদে সকল দল নিয়ে ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক জাতীয় সরকার গঠন, সৈনিকদের ১২ দফা বাস্তবায়ন.... এ সব ছিল অভ্যুত্থানের ঘোষিত লক্ষ। অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রস্তুত ছিল না জাসদ, সর্বোচ্চ কমিটি জিয়ার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তবে জাসদ শেষ পর্যন্ত তাহেরের সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়েছিল, কেননা তাহেরের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না।

কিন্তু জিয়া মুক্ত হওয়ার পর আর তাহেরের ডাকে সাড়া দেননি। তিনি তাহেরকে পাশকাটিয়ে অন্য সেনা অফিসারদের সঙ্গে মিলে অভ্যুত্থানকারী সৈনিকদের দমন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং অভ্যুত্থানকারী সৈনিকদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। রুশ-ভারত বিরোধী আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ জিয়াকে সমর্থন করে। পক্ষান্তরে তাহেরের অভ্যুত্থান তথা গণবাহিনী-জাসদের পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিলনা। স্বাভাবিকভাবে জিয়ার বেঈমানির পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাহেরের প্রচেষ্টা আর সফল হয়নি।

৭ নভেম্বর জলিল-রবের মুক্তি হলেও কয়েকদিন পর আবার তাদের গ্রেফতার করা হয়। কিছুদিন পর কর্নেল তাহেরকেও গ্রেফতার করে জেলে পাঠান হয়। ২১ জুন ১৯৭৬ তাহেরসহ জাসদ নেতাদের বিরুদ্ধে জেলগেটে সামরিক আদালত স্থাপন করে বিচার শুরু হয়। এ বিচার ছিল অস্বচ্ছ ও গোপন। বিচারের আগেই রায় নির্ধারণ করা ছিল।

শেষ বিচারে এটা প্রমাণিত সত্য যে জিয়ার ওপর আস্থা রাখা ঠিক ছিল না। জিয়ার বেঈমানির ফলে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সম্ভাবনাময় বিপ্লব যাত্রার শুরুতেই প্রতিবিপ্লবের হাতে পরাজিত হয়। জেনারেল জিয়া অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার জন্য ৭ নভেম্বরকে “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি” দিবস হিসাবে ঘোষণা করেন। জিয়ার ষড়যন্ত্রেই রাজাকাররা মন্ত্রী হয়েছে, অনেক বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছে এবং এই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। জিয়ার রাজনীতির ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বেগম জিয়া জামায়াত, হেফাজত ও অন্যান্য সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে মিলে যুদ্ধপরাধীদের মুক্ত করা, পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র করার লক্ষে আগ্রাসি ভূমিকা পালন করছেন এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য জঙ্গি সন্ত্রাস ও গুপ্ত হত্যার মত ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা যায়।

বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সকল শক্তির ৭ নভেম্বর থেকে শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু রয়েছে। লক্ষে স্থির থেকে যে কোন বিজয়ের জন্য দৃঢ়তা এবং একই সঙ্গে নমনীয়তা থাকার প্রয়োজন রয়েছে। অভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত অবশ্যই রাজনৈতিক হওয়া উচিত। শুধুমাত্র কর্মী ও সেনাসদস্যদের ওপর নির্ভর করে একটা অভ্যুত্থানের সাফল্য কামনা করা যায় না। জাসদের কোনো বিদেশী বন্ধু ছিল না। রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন আগের চাইতে এখন আরও বেশী গুরুত্ব বহন করে। দেশের কম্যুনিস্ট পার্টিগুলো এই বিপ্লবের বিরোধিতা করেছে। কয়েকজন ছাড়া ঐ সময়ে সকল বামপন্থী জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দিয়েছে।

অপর দিকে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিলো ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, সেই ষড়যন্ত্রের মূল হোতারা ৩ নভেম্বর জেলে চার নেতাকে হত্যা করে এবং সব শেষে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দিয়ে ঐ সময়ের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠার শেষ বাধাটিও অপসারণ করে।

৭ নভেম্বর তাহের সফল হয়নি, তবে আমাদের শিক্ষার জন্য অনেক কিছু রেখে গেছে। মহান মুক্তিসংগ্রামের উত্তরসূরিদের কাছে দায়িত্ব এসেছে, খালেদা-জামায়াত-হেফাজত রাজনৈতিক অক্ষ শক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উগ্র ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকে পরাস্ত করা এবং শান্তি সমৃদ্ধির লক্ষে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য সংগ্রাম করা ঐক্যবদ্ধভাবে।।

লেখক : শরীফ নুরুল আম্বিয়া, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

৭ নভেম্বর ২০১৫ এর সর্বশেষ খবর

৭ নভেম্বর ২০১৫ - এর সব খবর