thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫,  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০
মাহমুদুল হাসান

দ্য রিপোর্ট

৭ নভেম্বর : বিপ্লবে তিন কৃতী সৈনিক

২০১৫ নভেম্বর ০৭ ০৮:২২:৫৪
৭ নভেম্বর : বিপ্লবে তিন কৃতী সৈনিক

৭ নভেম্বর। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচিত হয় বহুমুখী ধারা। আর এ ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের তিন কৃতী সৈনিকের নাম। আবু তাহের, জিয়াউর রহমান ও খালেদ মোশাররফ। তিনজনই অত্যন্ত উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল নক্ষত্রের মতোই। এই তিনজন মুক্তিযোদ্ধার কৃতিত্ব ও যুদ্ধবিধ্বস্ত নতুন দেশটির পটভূমিকায় সৃষ্টি হয়েছে ৭ নভেম্বরের অধ্যায়। এ অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথে এক সুস্পষ্ট মাইলফলক। সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনার এক সূচক।

কর্নেল তাহের, মেজর জিয়াউর রহমান ও ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের স্ব-স্ব ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। তবে এই দিনে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন প্রয়োজন। কেননা মুক্তিযুদ্ধকে আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠতম অর্জন বলে বিবেচনা করি তারা ছিলেন সেই মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী।

ইতিহাস বলে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ তার জয়যাত্রা শুরু করলেও মাঝপথে গতিরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্বাসনে সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। খণ্ড-ছিন্ন অনৈক্যে ভরা জাতীয় জীবন নতুনভাবে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির সূচনা হয় ওই সময় থেকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্তাবলী যেমন— বহুদল, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সংবাদপত্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ যেভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল, নতুনভাবে আবারও মাথা না নোয়ানোর সংকল্প লাভ করে ৭ নভেম্বরের পর। এই আন্দোলনে সৈনিক ও জনতার মধ্যে এতদিন পর্যন্ত যে অনতিক্রম্য ব্যবধান বিদ্যমান ছিল তা-ও অপসারিত হয়।

জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে সিপাহী জনতার সম্মিলিত উচ্চকণ্ঠ সমগ্র সমাজকে সচেতন করে তোলে। এই বিপ্লবের ভূমিকায় ছিলেন কর্নেল আবু তাহের। প্রথমে সামরিক বাহিনীকে ‘শ্রেণীহীন’ করে গড়ে তুলে, তাকে তীব্রভাবে ‘সচেতন’ এবং ‘শাণিত’ করে তারই মাধ্যমে বাংলাদেশে শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের পরিকল্পনা ছিল তার। এই লক্ষ্যে ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোয় বহুসংখ্যক বিপ্লবী সংস্থা গঠিত হয়েছিল। তার এ পরিকল্পনার অংশীদার ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)।

কর্নেল তাহের ছিলেন জাসদের গণবাহিনীর প্রধান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একবার হাতে এলে শ্রেণীহীন সমাজ গঠন সহজতর হয়ে উঠবে এই বিশ্বাস নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিলেন। জিয়াউর রহমান এই বিপ্লবের সূচনায় ছিলেন না। ছিলেন না এর সমাপ্তি পর্বেও। কিন্তু এই বিপ্লবের উত্তাল তরঙ্গে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্চ বেদিতে চলে এলেন, যদিও ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ঢাকা ব্রিগেডের কিছু সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। সে সময় জিয়াউর রহমানকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দী করা হয়। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ নিজেকে স্বঘোষিত সেনাপ্রধান দাবি করেন এবং সংসদ ভেঙ্গে দেন।

কর্নেল তাহের ও তার দল জাসদ পূর্ব থেকেই ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামের দুটি প্রশিক্ষিত বাহিনী গঠন করেন। এ দুটি বাহিনীর কমান্ড ইন চিফ ছিলেন কর্নেল তাহের স্বয়ং। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি হিসেবে ৫ নভেম্বর সেনানিবাসগুলোতে উসকানিমূলক লিফলেট প্রচার করা হয়।

সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে ৬ নভেম্বর মধ্য রাতেই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়। সেইদিন লাখ লাখ মানুষ বিজয়ের আনন্দে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। তারা সেনা সদস্যদের সাথে আলিঙ্গন করে। জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

কর্নেল তাহেরের প্রভাবেই কিছু সিপাহী ৭ নভেম্বরে অনেক সেনা অফিসারকে হত্যা করেছিল এমন অভিযোগ তোলা হয়। তাই পরবর্তীকালে সেনা অফিসারদের হত্যার দায়ে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই সেনা আদালতের রায়ে কর্নেল তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

কর্নেল তাহের এবং জাসদের নেতারা তখনকার সামাজিক চেতনায় যে দুটি ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল, সে সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। সামাজিক পুনর্গঠনের চেতনায় তারা এত বেশী উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন যে তারই পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা যেভাবে সমান্তরাল প্রভাবিত হয়ে সাধারণ জনগণ এমন কি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা রচিত হয়েছিল, সেই বাহিনীর সাধারণ সিপাহীদের মন-মানসিকতাকেও প্রভাবিত করেছিল গভীরভাবে, তারা সে সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না।

স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের জন্ম যে প্রক্রিয়ায় হয়েছিল বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনার তীরঘেঁষে, বাংলাদেশের জন্ম কিন্ত সেভাবে হয়নি। বাংলাদেশের প্রাণ পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে। তাই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ‘আমরা দেশ’ ‘আমাদের জাতি’ ‘আমাদের রাষ্ট্র’ ‘আমাদের বাংলাদেশ’ ইত্যাদি শব্দ উচ্চারিত হয়েছে নতুন ব্যঞ্জনায়, নতুন বোধিতে নতুন দ্যোতনায়। যেহেতু এক গণযুদ্ধের ফসল হল বাংলাদেশের স্বাধীনতা, যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের পূর্বেই এই ভূখণ্ডে জাতীয়তাবোধ সুদৃঢ় হয়েছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে জাতি রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, তাই আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন চেতনা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জাতীয়তাবাদী গণচেতনাও বিকশিত হয়েছে তেমনি প্রবল পরাক্রমে।

লেখক : সাংবাদিক

(দ্য রিপোর্ট/এনআই/এসআর/আইজেকে/অক্টোবর ০৬, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

৭ নভেম্বর ২০১৫ এর সর্বশেষ খবর

৭ নভেম্বর ২০১৫ - এর সব খবর