thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫,  ৮ মহররম ১৪৪০

চালান রিকশা, বুকে তার ম্যারাডোনা-মেসি

২০১৫ নভেম্বর ০৯ ০৩:০৮:০৬
চালান রিকশা, বুকে তার ম্যারাডোনা-মেসি

লুৎফর রহমান সোহাগ, দ্য রিপোর্ট : রবিবার রাত সোয়া ৮টা, কিংবা সাড়ে ৮টা। রাজধানীর দিলকুশা এলাকায় অবতারণা হল এক বিচিত্র দৃশ্যের। হঠাৎ কৃষি ভবনের সামনের রাস্তায় এসে উপস্থিত এক রিকশাচালক। তার পরনে রয়েছে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের ঐতিহাসিক নীল-সাদা স্ট্রাইপের জার্সি। রিকশা থামিযে প্যাসেঞ্জার খোঁজা বাদ দিয়ে তিনি হাঁকডাক দিতে শুরু করলেন, ‘মামারা, বাকি আর এক ঘণ্টা। মেসির দলের খেলা।’

প্রথম দৃষ্টিতে তাকে ক্ষ্যাপাটে কোনো ব্যক্তি বলেই প্রতীয়মান হল। ব্যাপার কী, তা দেখতে একটু একটু করে ভিড় জমে গেল সেখানে। কিন্তু না, রিকশাচালক সাহাবুদ্দিন কোনো ক্ষ্যাপাটে মানুষ নন। তিনি ক্রীড়াপ্রেমী। তার বুকে রয়েছে ম্যারাডোনা কিংবা মেসির জন্য গভীর ভালবাসা। রয়েছে মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্যও অকৃত্রিম প্রেম। তাই তো তার রিকশার সামনে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। নিচেই একটি ছোট্ট প্লাকার্ডে লেখা— বার্সেলোনা বনাম ভিয়ারিয়াল, সময় রাত ৯টা, সৌজন্য : মেসি।

সৌজেন্য : মেসি! এই মেসিটা আবার কে? জিজ্ঞেস করতেই সাহাবুদ্দিনের উত্তর, ‘এই মেসি আমি নিজেই!’ কেন তিনি মেসি? এবার সাহাবুদ্দিনের উত্তর, ‘কারণ আমি ম্যারাডোনার ভক্ত। আর মেসি ম্যারাডোনার ১০ নম্বর জার্সি পরে। তাই আমি মেসিরও ভক্ত। আর্জেন্টিনার ভক্ত।’

তবে কেবল ম্যারাডোনা-মেসির ভক্তই নন, অন্যদেরও খেলা দেখেন সাহাবুদ্দিন। লিওনেল মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পর্তুগিজ তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোরও খেলা দেখেন তিনি। রোনালদোকেও তার ভাল লাগে। তবে সম্প্রতি মেসির চেয়ে নিজেকে সেরা দাবি করেছেন রোনালদো। এই খবর জানা আছে সাহাবুদ্দিনের। এভাবে রোনালদোর নিজেকে সেরা দাবি করার বিষয়টি ভাল লাগেনি তার। আবার ইনজুরির কারণে মেসি যে বর্তমানে মাঠের বাইরে রয়েছেন, এ জন্যও খানিকটা মন খারাপ এই মধ্য বয়সী রিকশাচালকের।

তবে খেলাপ্রেমী সাহাবুদ্দিন রাতের ম্যাচগুলো মিস করেন না। অন্তত রাত ২-৩টা পর্যন্ত জেগে থেকে খেলা দেখেন তিনি। অন্যদেরও খেলা দেখতে উৎসাহী করেন তিনি।

রবিবার রাতে স্প্যানিশ লা লিগা ফুটবলে মেসির ক্লাব বার্সেলোনা ও ভিয়ারিয়ালের খেলা ছিল। সেই কথাই সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছিলেন রিকশাচালক সাহাবুদ্দিন।

শুধু মেসি-ম্যারাডোনা-আর্জেন্টিনা কিংবা ফুটবলের ভক্ত নন, ক্রিকেটেরও ভক্ত সাহাবুদ্দিন। তাই তো বাংলাদেশের কোনো খেলা থাকলে তার আগের দিন এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় সবাইকে সেই বিষয়ে অবগত করে চলেন তিনি। বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের আগের দিনও তেমনটাই করেছিলেন সাহাবুদ্দিন।

ক্রীড়াপ্রেমী সাহাবুদ্দিন জানালেন ১৯৭৪ সাল থেকে ঢাকায় রয়েছেন তিনি। গ্রামের বাড়ি শেরপুর। তার বর্তমান বয়স ৪৪ বছর। রিকশা চালিয়েই জীবন-জীবিকার সংস্থান করতে হয় তাকে। ১৯৮৬ সালে কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনার খেলা দেখেছিলেন টেলিভিশনে। তখন থেকেই ম্যারাডোনা তার বুকে স্থান করে নিয়েছেন। সঙ্গে সেখানে লেখা হয়েছে আর্জেন্টিনার নামও।

সাহাবুদ্দিন থাকেন রাজধানীর মুগদাপাড়া এলাকায়। স্ত্রী, এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান নিয়ে তার সংসার। বাসাভাড়া দিতে হয় মাসে ৪ হাজার টাকা। সঙ্গে রয়েছে সংসার চালানোর ব্যয়, পুত্র-কন্যার পড়ালেখার খরচও। এসবই রিকশা চালিয়ে উপার্জন করেন তিনি। এ জন্য দিনে এক বেলা রিকশা চালান। আর সময়-সুযোগ মতো নিজেকে সঁপে দেন খেলার ভুবনে।

সাহাবুদ্দিনের ছেলে নবম শ্রেণীতে পড়ালেখা করে। বাবার মতো সেও খেলার ভক্ত। তবে মেসি বা আর্জেন্টিনার নয়, ছেলে ব্রাজিলের ভক্ত। তার পছন্দের খেলোয়াড় নেইমার। তবে এ নিয়ে কোনো দুঃখ নেই সাহাবুদ্দিনের।

কিঞ্চিত পড়ালেখা জানেন সাহাবুদ্দিন। তাই তো প্রতিদিন পত্রিকার পাতা থেকে (কখনো কখনো টেলিভিশনের সংবাদ থেকে) জেনে নেন কবে কোথায় কোন খেলা রয়েছে। আর্জেন্টিনার আগামী কয়েকটি ম্যাচের ফিকশ্চার তার মুখস্ত। মুখিয়ে রয়েছেন বিশ্বকাপ ২০১৮ ফুটবলের বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচ (১৩ নভেম্বর) দেখার জন্য।

নিষ্ঠুর বাস্তবতা, দারিদ্র্যের কষাঘাত কিংবা জীবনের নির্মমতা কেড়ে নিতে পারে মানুষের অনেক কিছুই; তবে কেড়ে নিতে পারে না তার বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভালবাসা। রিকশাচালক সাহাবুদ্দিন যেন সে কথাই প্রমাণ করে চলেছেন বছরের পর বছর। এই ইট-পাথরের শহরে প্রতিনিয়ত তিনি বুকে বয়ে নিয়ে চলেছেন খেলার প্রতি প্রেম, ম্যারাডোনা-মেসিদের জন্য ভালবাসা। একদিন হয়তো পথ চলার ফাঁকে আপনিও দেখা পেয়ে যেতে পারেন এই ভিন্ন স্বভাবের রিকশা চালকটিকে; হয়তো দেখবেন তিনি চেঁচিয়ে বলছেন, ‘মামার, আর ঘণ্টাখানেক বাকি; মেসির দলের খেলা।’

(দ্য রিপোর্ট/এলআরএস/জেডটি/নভেম্বর ০৯, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

খুঁজে ফেরা এর সর্বশেষ খবর

খুঁজে ফেরা - এর সব খবর



রে