thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫,  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

সত্যিই কী ডায়াবেটিস নিরাময় সম্ভব?

২০১৫ নভেম্বর ১২ ২০:৫২:৩৩
সত্যিই কী ডায়াবেটিস নিরাময় সম্ভব?

বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ১৪ নভেম্বর। সারা বিশ্বের মতো দেশেও নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস ২০১৫’ পালন করা হবে। এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- ‘স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করি, ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকি’। দিবসটি উপলক্ষ্যে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের লেখা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবে। এরই অংশ হিসেবে প্রকাশিত হলো : সত্যিই কী ডায়াবেটিস নিরাময় সম্ভব?

আমরা যুগ যুগ ধরে শুনে আসছি যে ডায়াবেটিস একবার ধরলে আমরণ সঙ্গ ছাড়ে না। অনেক হয়েছে, আর না।

ডায়াবেটিসের রোগী পঞ্চাশ বছর বয়সী আরতির বরাবরই বেশ ভারি শরীর ছিল। বহু বছর ধরে তাঁকে ইনসুলিনের ইনজেকশন নিতে হচ্ছিল। ক্রমাগত ব্লাডসুগার ও হাই ব্লাডপ্রেশারজনিত বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হতে হতে আর এই ওষুধ ও ইনজেকশন সর্বস্ব জীবনযাপন করতে করতে তিনি রীতিমত তিক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। পেশায় শিক্ষিকা আরতি নিয়মিত ইন্টারনেটে অন্য উপায় খুঁজতে শুরু করেন। প্রায় প্রতিটি ওয়েবসাইট গ্যাসট্রিক বাইপাস সার্জারির দরুন সফলতার বিবরণ দিয়ে তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। বেলভিউ ক্লিনিকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা ওর ওপর এই সার্জারি প্রয়োগ করি। আরতির ব্লাডসুগার, যা সবসময় ৩০০’র উপর থাকত, অপারেশনের সঙ্গে সঙ্গেই কমতে শুরু করে ও কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। অপারেশনের দু’দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর, আরতি এক সপ্তাহের মধ্যেই নিজের কাজে যোগ দেন। এখন আর তাঁর ব্লাডসুগার নিয়ে কোনো টেনশন নেই। উচ্ছ্বসিত আরতি জানালেন, তাঁর সহকর্মীরা ভীষণ উৎসুক তাঁর এই ওজন ও ব্লাডসুগার কমিয়ে ফেলার রহস্য জানার জন্য।

১৯৯৪ সালে ওয়াল্টার পোরিস নামে আমেরিকান এক চিকিৎসক তাঁর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যার শিরোনাম ছিল (Who would have thought it? An operation is the cure for Type II Diabetes Mellitus!) এই লেখায় তিনি দেখান যে, গ্যাসট্রিক বাইপাস সার্জারি করিয়ে ডায়াবেটিসের রোগীদের প্রায় ৯০ শতাংশ আরোগ্য লাভ করেছেন। এই অপারেশনের পর বহু বছর পর্যন্ত ব্লাডসুগারের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে। এর পর থেকেই এই ধরনের সার্জারি, যাকে মেটাবলিক সার্জারি বা ব্যারিয়াট্রিক সার্জারিও বলা হয়, পৃথিবী জুড়ে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এই গ্যাসট্রিক বাইপাসে কী করা হয়?

আমরা পাকস্থলীকে (Stomach) স্টেপ্ল করে একটি ছোট থলির আকার দিই। আমরা যে খাবার খাই, সেটা খাদ্যনালীর মধ্যে দিয়ে এসে এখানে জমে। কিন্তু সেটা বেরিয়ে যাওয়ার জন্যও তো একটা রাস্তা চাই। তাই আমরা ক্ষুদ্রান্ত্রকে (Smal Intestine) তুলে পাকস্থলীর এই ছোট থলির সঙ্গে একটা রাস্তা (Channel) করে দিই। ফলে খাবারটা পাকস্থলীর আর ক্ষুদ্রান্ত্রের বেশির ভাগটাকে পাশকাটিয়ে পৌস্টিক নালীতে এসে পড়ে।

এই অপারেশন কীভাবে কাজ করে?

এই অপারেশনটি পাকস্থলীর খাদ্যগ্রহণ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়; প্রায় এক আউন্সেরও কম পরিমাণ ফ্লুইড ধারণের ক্ষমতা থেকে যায়। ফলে খাওয়ার পর উৎপন্ন হওয়া ব্লাড গ্লুকোজের মাত্রাও কমে যায়; অর্থাৎ কম পরিমাণ খাওয়া, ফলে কম পরিমাণ শরীরে লাগা আর কম পরিমাণ ওজন বাড়ে।

এই অপারেশনের ফলে যেটা হয় তা হল হজম না হওয়া খাবার গিয়ে পৌস্টিক নালীতে জমা হয়, যার ফলে ইনক্রেটিন্স নামক হরমোন নির্গত হয়। এই ইনক্রেটিন্স ব্লাডসুগারের মাত্রা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে আর ডায়াবেটিস মেলিটাসের সবথেকে বড় কারণ, অর্থাৎ প্যানক্রিয়াটিক হরমোনের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

এটা তো এখন সবাই জানে নগর জীবনে ডায়াবেটিসের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হল ওবেসিটি বা অত্যধিক ওজন বেড়ে যাওয়া। ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিসের রোগীরা কমবেশি ওবেসিটির শিকার। এ যাবৎ চিকিৎসকরা ডায়াবেটিসের মোকাবিলা করতে ডায়েট কন্ট্রোল, ব্যায়াম ইত্যাদি করে ওজন নিয়ন্ত্রণ করার ও ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিতেন। কিন্তু তার ফল সম্বন্ধে আর আলোচনায় যাব না।

যদিও আরও বেশি মাত্রায় রোগীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই নতুন সার্জারি সম্বন্ধে জানাচ্ছেন, তবুও সচেতনতার মাত্রা এখনও অনেক কম। এখনও অনেকের ধারণা আছে যে, এই সার্জারিতে বোধহয় শরীর থেকে মাংস কেটে বাদ দেওয়া হয়! তবে আশার কথা এই যে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে আসছে। ১৯ বছরের যোগেশ শর্মার ওজন ছিল ১৬৮ কেজি। সে নিজেই তার বাবা-মাকে রাজি করিয়ে আমার কাছে আসে ওবেসিটি ও ডায়াবেটিসের হাত থেকে মুক্তি পেতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই নতুন ধারার উপর ভরসা রেখে শর্মা পরিবার সুফল পেয়েছেন। তবু কেন জানি না এখনও বহু মানুষ সার্জারি শব্দটিকেই ভয় পান। রোগে ভুগে জীবন শেষ হয়ে গেলেও, তাঁরা সার্জনের কাছে যাবেন না।

৫৭ বছরের রুচিতা দোশীর মত বহু মানুষ স্পইন সার্জারি করে পস্তাচ্ছেন। রুচিতার মতে, এখন মনে হয়, আগে যদি ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি করাতাম। ওবেসিটির জন্য আমার আর্থারাইটিস ও স্পাইনের রোগ দেখা দিয়েছিল, যার চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমার ৩ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন আমার ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির জন্য ডায়ালিসিস চলছে। তাই কোনো অপারশেনই করানো যাবে না। বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রুচিতা জেনেছেন যে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ডায়াবেটিসের সার্জারি আগে করালে, পরবর্তীকালে এই সব জটিলতার শিকার হয়ে তাকে এতো খরচ করতে হত না। তাহলে আপনি আপনার ওবেসিটি ও ডায়াবেটিসের জন্য কি করছেন?

**** এই লেখাটিতে শুধু মাত্র Type II Deabetes Mellitus নিয়ে আলোচনা করা হল।

লেখক
ডা. শাহজাদা সেলিম
এমবিবিএস, এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম), এমএসিই (ইউএসএ)
সহকারী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীন রোড, ঢাকা
ফোন : ৮১২৪৯৯০, ৮১২৯৬৬৭,
Email : selimshahjada@gmail.com

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর