thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫,  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

সাক্ষাতকারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাহজাদা সেলিম

জেনেটিকের সাথে ডায়াবেটিসের পরিবেশগত কারণও আছে

২০১৫ নভেম্বর ১৪ ১৬:৫১:১৩
জেনেটিকের সাথে ডায়াবেটিসের পরিবেশগত কারণও আছে

আজ ১৪ নভেম্বর বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করি, ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকি’। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (IDF-International Diabetics Federation)-এর উদ্যোগে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ ডায়াবেটিস সংক্রান্ত সকল আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে এতে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিকস সমিতি দিবসটি পালনের প্রধান অংশীদার। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)সহ মেডিকেল কলেজসমূহের এ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দিবসটি উদযাপন করে আসছে।

ডায়াবেটিস দিবস উপলক্ষে ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিষয়ে দ্য রিপোর্টে টুয়েন্টিফোর ডটকমের মুখোমুখি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাদা সেলিম। সাক্ষাতকার নিয়েছেন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক প্রশান্ত মিত্র।

এবারের ডায়াবেটিস দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়টি সম্পর্কে বলুন…

‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও ডায়াবেটিস’ কথাটি অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রতিপাদ্য বিষয়। কেননা, ডায়াবেটিস বিপাক সংক্রান্ত রোগ (মেটাবলিক ডিজিস) রোগ হলেও এটি জীবনযাপনের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত। ডায়াবেটিস হবার জেনেটিক কারণ যেমন আছে, তেমনি অনেক প্রবলভাবে সক্রিয় পরিবেশগত কারণও আছে। এমনকি এটিও প্রায় সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, যাদের পূর্বপুরুষদের ডায়াবেটিস ছিল না, তাদেরও অনেকে কমবেশি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ জীবদ্দশায় কোনো এক সময়ে তারা ডায়াবেটিসের রোগী হিসেবে শনাক্ত হতে পারেন। এখানেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সাথে ডায়াবেটিস হবার নিবিড় সম্পর্কটা।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বলতে কী বুঝাতে চাইছেন?

স্বাস্থ্যকর জীবন একটি সামগ্রিক দর্শন। কেননা, প্রতিটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন আলাদা রকম হয়। কিন্তু সকলকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। আমরা সংক্ষেপে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বলতে বুঝাচ্ছি—

১) উচ্চতা অনুসারে নিরাপদ দৈহিক ওজন অর্জন বজায় রাখা।

২) বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক প্রাত্যহিক শারীরিক শ্রম সম্পাদন।

৩) ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য পরিহার করা।

৪) উপকারী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।

৫) সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করা।

৬) চিনি ও লবণের আধিক্য বর্জন করা।

৭) ধূমপান ও তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন না করা।

৮) খাদ্য গ্রহণের সমতা স্থাপন।

এগুলো ডায়াবেটিস প্রতিরোধের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে। আবার যাদের ডায়াবেটিস হয়েছে তাদের ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের বিকল্প নেই। ডায়াবেটিস চিকিৎসার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার উপর এবং এটি ‘ডায়েটিং’ নয় বরং পরিপূর্ণভাবে সুষম খাবার। যা ডায়াবেটিস রোগীর বয়স, কাজের ধরন, দৈহিক ওজন, ডায়াবেটিসজনিত জটিল রোগের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি এবং তাদের তীব্রতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে ডাক্তার রোগীর জন্য ঠিক করে দিবেন।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সঠিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা কতটা জরুরী?

যারা ডায়াবেটিসের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ভালোভাবে বুঝতে পারে না, মেনে চলতে পারে না বা উদাসীন তাদের পক্ষে ডায়াবেটিস কন্ট্রোল করার সামর্থ্য অর্জন হবে না এবং দ্রুত ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় নিপতিত হতে থাকবেন। শুধু তা-ই নয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে অনুসরণ না করার কারণে কারো কারো ডায়াবেটিস কন্ট্রোল না হওয়া অবস্থাতেই পুনঃ পুনঃ হাইপোগ্লাইসোমিয়া হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে যা অতিশয় মারাত্মক।

বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা

২০১৩ সাল পর্যন্ত IDF-এর হিসাব মতে, পৃথিবীতে ডায়াবেটিসের মহামারিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মোট ৩৮২ মিলিয়ন। যা ২০৩৫ সালে ৫৯২ মিলিয়নে পৌঁছার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ৬.৪ মিলিয়ন ডায়াবেটিসের রোগী ছিল। যা ২০৩৫ সালে ১৬ মিলিয়নে পৌঁছবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখানে মোট রোগীর ৪৬ শতাংশ আবার অশনাক্তই রয়ে গেছে।

আবার ডায়াবেটিসে প্রাদুর্ভাব উন্নত দেশসমূহের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে বেশী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহ— বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে সারা পৃথিবীর ডায়াবেটিস রোগীর বিরাট অংশের অবস্থান। কিন্তু পৃথিবীর দেশসমূহের মধ্যে তুকেলাউ, মাইক্রোনেশিয়া, মার্শাল আইল্যান্ড, কিরিবাতিতে ভয়ঙ্কর হারে ডায়াবেটিসের রোগীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব (মোট জনসংখ্যার ২৪ শতাংশ) ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কুয়েত-কাতারের অবস্থান কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের ঝুঁকি বিশেষ মনযোগ আকর্ষণের দাবি রাখে। কারণ এ দেশগুলোতে দ্রুত টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার বয়স নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যা দেশগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো বটেই, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাই এ সব দেশের নেতৃবৃন্দকে এখনই সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন?

বাংলাদেশের করণীয় দিকসমূহ হচ্ছে—

১) স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিশেষ কারে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পদ্ধতিগুলো নিয়ে সহজবোধ্য আলোচনা করা উচিত।

২) রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় নিয়মিতভাবে ডায়াবেটিস বিষয়ক আলোচনা হওয়া উচিত।

৩) বিষয়টিকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে না ভেবে সামগ্রিক জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে, সে অনুসারে অর্থ বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৪) সরকারি সকল হাসপাতালে বিশেষভাবে ডায়াবেটিস চিকিৎসাকে গুরুত্ব দিতে হবে। (বর্তমানে যা প্রায় অনুপস্থিত)

৫) ন্যূনতম পক্ষে ঢাকায় ডায়াবেটিস চিকিৎসার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকা জরুরী।

৬) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৭) নগরায়ন ব্যবস্থাপনায় নগরবাসীদের হাঁটাহাঁটির পর্যাপ্ত স্থান, সুপরিসর ফুটপাত ও সাইকেল চালানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে নগরবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

৮) সারাদেশের মানুষকেই সুস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণে অভ্যাস তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ থাকতে হবে।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

স্বাস্থ্য এর সর্বশেষ খবর

স্বাস্থ্য - এর সব খবর