thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ নভেম্বর ২০১৮, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

অর্থাভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না শব্দসৈনিক সুব্রত সেনের

২০১৫ ডিসেম্বর ১০ ০০:২৩:৩২
অর্থাভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না শব্দসৈনিক সুব্রত সেনের

মুহম্মদ আকবর, দ্য রিপোর্ট : মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্নভাবে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন নানান শ্রেণী-পেশার মানুষ। সেই সময় কণ্ঠে বিপ্লবী সুর তুলে, গান লিখে কিংবা অভিনয় করে মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীরা। স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর পর বিভিন্ন পেশা ও ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা। এখন কেমন আছেন তারা? কীভাবে চলছে তাদের যাপিত জীবন? চলমান পরিস্থিতিতে সরকার ও জনগণের প্রতি তাদের প্রত্যাশা কী? এ সব বিষয় নিয়ে স্বাধীনতার মাসে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের মাসব্যাপী আয়োজন ‘বিজয়ের মাসে’।

এরই ধারাবাহিকতায় কথা হয় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী সুব্রত সেনগুপ্তের সঙ্গে।

কুশল বিনিময়ের শুরুতেই শিশুর মতো হু হু করে করে কেঁদে উঠলেন শব্দসৈনিক সুব্রত সেনগুপ্ত। বিছানায় শুয়ে ক্ষোভে, বেদনায় নিজের বুকের ওপর বার বার আঘাত করে উল্টো প্রশ্ন তার— ‘কেমন আছি আমি?’

কোনো উত্তর নেই। শুধুই শুনে যাওয়া আর সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে উপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়া। এর পর খানিকক্ষণ কথা নেই।

সুব্রত সেন জানালার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবতে লাগলেন! ভুলেই গেছেন যে, কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে গেছে। তার গা স্পর্শ করতেই সহজাত প্রশ্ন- ‘ও তুই এখনো আছিস?’ মাথা নেড়ে সায় দিতেই আবারও প্রশ্ন তার— ‘এই তোদের সরকার এমন কেন রে? আমার প্রতি কি তোদের সরকারের কোনো দায় নেই? কারও নেই?’ আবেগতাড়িত হয়ে বললেন— ‘বলিস তোদের সরকারকে শুধুই বেঁচে থাকতে চাই না, আরও কিছু দিতে চাই। অনেক ভাল কিছু দিতে চাই।’

অভিমানের পালা দীর্ঘ করে ‍পুনরায় বক্তব্য তার, ‘পত্রিকা খুললে দেখি কত মানুষকে সহায়তা করছে সরকার— এ সব মিথ্যা নয় তো?’ মাথা নেড়ে মিথ্যা নয় বলে সায় দিতেই— ‘কীভাবে বিশ্বাস করব বল। আমি সূর্য সেন ও ইলা মিত্রের পৌত্র, আমি মুক্তিযোদ্ধা, একজন দেশজ চেতনার গীতিকবি। তাহলে আমার দিকে কারও দৃষ্টি নেই কেন রে?’

কথা বলতে বলতে মাঝেমধ্যে গর্জে ওঠেন তিনি। কিন্তু শারীরিক অসহায়ত্বের কাছে হেরে যান। এক সময় কণ্ঠ থেমে আসে। তার পরও ক্ষোভ, অভিমান আর হতাশার সুরে তিনি বলে ওঠেন, ‘আমি বোধ হয় আর বাঁচব না রে। মানুষ মরে যায় এটাই নিয়ম। আমিও মরে যাব। তাই বলে আমার মতো স্বাধীন বাংলা বেতারের একজন শিল্পীকে চিকিৎসার অভাবে মারা যেতে হবে! জীবনের পড়ন্ত বেলায় যদি আমার এ রকম নির্মম পরিণতি হয়, তাহলে দেশের ক্রান্তিলগ্নে আর কি কেউ এগিয়ে আসবে?’

যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ততক্ষণ কেবলেই প্রশ্ন। কোনো উত্তর নেই। কে দেবে এত সব প্রশ্নের উত্তর? প্রশ্নের জবাব না পাওয়ার বেদনা আর শারীরিক জটিলতায় প্রতিদিনই কাতরাচ্ছেন সুব্রত সেন। যে টাকাকে মুখ্য ভাবেননি কোনো দিন সেই টাকাই তাকে হারিয়ে দিচ্ছে। শুধুই হার নয়, হয়তো মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যাবে তাকে।

চোখ মুছে মনোযোগ দেন এবং দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘জীবনটা তো অন্যের জন্যই বিলিয়ে দিতে চেয়েছি সারাজীবন। দিয়েছিও। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে নিয়তির কাছে হেরে যাচ্ছি। বড় স্বার্থপরের মতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এক যুগ ধরে কেবল নিজে সুস্থ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছি। শেষ পর্যন্ত সেখানেও বোধ হয় ব্যর্থ হচ্ছি।’

শুরুর কথা আর শেষ কথা মেলে না স্বনামধন্য এ শব্দসৈনিকের। এমন আচরণে বুঝতে বাকি নেই শরীরে কত ক্ষত আর যাতনা রয়েছে। কতটুকু আবেগ তাকে তাড়িত করছে। ঘরের সামনে ঘর। একটুও সবুজের দেখা মেলে না তার। তবুও বেঁচে আছেন। কাতরাচ্ছেন। প্রলাপ বকতে বকতে ঘুমিয়ে গেলে হয়তো কখনো স্বপ্নে দীপ্ত পায়ে হাঁটছেন আর গাইছেন ‘কারা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’

দু’জনের দু’রকমের ভাবনায় পৃথক হওয়ার আগেই অভাব আর দায়িত্ববোধের সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো সুব্রত সেনের স্ত্রী সঙ্গীতশিল্পী জলি সেনগুপ্তা চা নিয়ে আসেন। এরই মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন সুব্রত সেনগুপ্ত।

জলি সেনগুপ্তা বলেন, ‘মেরুদণ্ড, স্পাইনাল কড, বক্ষ, নিউরো সমস্যাসহ শারীরিক নানান জটিলতায় ভুগছেন সুব্রত। কিছুদিন ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আতিকুর রহমানের অধীনে কেবিন ব্লকের ২১৪ নম্বর রুমে। অর্থাভাবে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে আসতে হল।’

গান লেখা, চিত্রাঙ্কন এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে জীবন শুরু হয়েছিল ইলা মিত্রের এলাকার এই বিপ্লবীর। আত্মীয়তার সূত্রে তিনি ইলা মিত্র এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের নাতি। বিগত দিনের লালিত চেতনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।

‘একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ঢাকার সেগুনবাগিচায় ওস্তাদ বারীণ মজুমদার প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ তার ভেতরটাকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। ২৫ মার্চ রাতে পাকসেনারা ঢাকাসহ সারাদেশে খুন-জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে। এতে তার সহপাঠীসহ কয়েকজন শিক্ষক বিদ্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ২৬ মার্চ বিভিন্ন জায়গায় মানুষের লাশ দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি পাগলের বেশে বিভিন্ন জায়গার খবর ও বোমা বহন করতেন।’

এভাবে বেশ কিছুদিন ধরে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কায়দায় লড়েছেন। পরে যখন দেখলেন তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না, তখন ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কমলাপুর রেলস্টেশনে এসে দেখলেন একটি ট্রেন মানুষের রক্তে ভেজা এবং অসংখ্য মৃতদেহ। চোখের জল রাখতে না পেরে অনেক কষ্টে কসবা বর্ডার পার হয়ে ভারতের সোনামুড়ায় পৌঁছে আগরতলা শহরের কংগ্রেস ভবনে ওঠেন। কংগ্রেস ভবনে এসে অনেক পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হয়। সেখান থেকে বলা হয়, যে বিষয়ে যে পারদর্শী তাকে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তার আছে সুর, গান লেখার ক্ষমতা। স্বাধীন বাংলা বেতারে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। কলেজটিলায় পৌঁছানোর পর নৃত্য পরিচালক আজিজুল হকের সঙ্গে দেখা হল। তার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে কলকাতা ১৯ এর ৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে পৌঁছলেন।

সেখানে গান লেখা ও সুর করা হতো তার। সবাই মহড়া করে গানগুলো রেকর্ড করতেন। পরে সেগুলো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে প্রচারিত হতো। তিনি অনেক গান এবং কবিতাও লিখেছেন। তার লেখা ‘রক্ত চাই রক্ত চাই অত্যাচারীর রক্ত চাই’ গানটির সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম, ‘ছুটরে সবাই বাঁধ ভাঙা বান অগণিত গ্রাম মজুর কিষাণ’ গানটির সুর করেছিলেন অনুপ ভট্টাচার্য, ‘শোন জনতা গণজনতা’ গানটি সুর করেছিলেন সলিল চৌধুরী। শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর রয়েছে তার ১৬০টি গান। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সাড়ে ৪০০ গান।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এপি/এইচ/এজেড/ডিসেম্বর ০৯, ২০১৫)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

শিল্প ও সংস্কৃতি এর সর্বশেষ খবর

শিল্প ও সংস্কৃতি - এর সব খবর