thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৬ রবিউস সানি ১৪৪০

আদম সুরত থেকে রানওয়ে : অসমাপ্ত কাগজের ফুল

২০১৬ আগস্ট ১৩ ০৯:২৩:৪৪
আদম সুরত থেকে রানওয়ে : অসমাপ্ত কাগজের ফুল

পাভেল রহমান, দ্য রিপোর্ট : সমাজ-সংস্কৃতি আর মানুষের গল্প তুলে ধরেছেন সেলুলয়েডের ফ্রেমে। গড়ে তুলেছেন তরুণদের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্ল্যাটফর্ম। অসংখ্য তরুণের মাঝে সৃজনের বীজ বপন করেছেন। তিনি নন্দিত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গতিধারা পাল্টে দেওয়া এক ম্যাজিক হিরো। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র।

২০০৩ সালে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না ইউরোপের ৪০টি প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিকভাবে প্রদর্শিত হয়েছিল। বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ কান চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে মাটির ময়না পুরস্কৃত হয়েছিল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানাভাবে এদেশের চলচ্চিত্রকে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে গেছেন তারেক মাসুদ।

আদম সুরত (১৯৮৯), মুক্তির গান (১৯৯৫), মুক্তির কথা (১৯৯৮), মাটির ময়না (২০০২), অন্তর্যাত্রা (২০০৬), নরসুন্দর (২০০৮) ও রানওয়ে (২০১০) ছবিগুলো নির্মাণের মধ্য দিয়ে এদেশের চলচ্চিত্রে ভিন্ন এক ধারার যোগ করেন এই চলচ্চিত্রকার। তার বেশির ভাগ চলচ্চিত্র কেবল কাহিনী-কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, এগুলোর মধ্যে সমকালীন সমাজব্যবস্থার নানা প্রসঙ্গ যেমন মানবজীবন, লোকসংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি, রাষ্ট্র, জগত প্রভৃতি সম্পর্কে তাঁর ভাবনাও স্থান করে নিত।

আদম সুরত

শিল্পী এস এম সুলতানের ওপর তারেক মাসুদ তৈরি করেছিলেন তথ্যচিত্র আদম সুরত (১৯৮২-১৯৮৯)। ১৯৮২ সালে এ তথ্যচিত্রটি নির্মাণের মধ্য দিয়ে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছরে নির্মাণ করেছেন এ তথ্যচিত্রটি। ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর ২২ বছর পর ঢাকায় ছবিটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি উৎসব ছাড়া ছবিটির তেমন কোনো প্রদর্শনী হয়নি। ছবিটি তৈরি হয়েছিল ১৬ মিলিমিটার প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণেই ছবিটি প্রদর্শন করা সম্ভব হয়নি। কয়েক বছর আগে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের যৌথ উদ্যোগে ছবিটি ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়।

আদম সুরতনির্মাণের পর ১৯৯০ সালে তারেক মাসুদ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। শুরু হয় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র চর্চার নতুন অভিযান।

মুক্তির গান

যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পর মার্কিন নাগরিক লিয়ার লেভিনের সঙ্গে ঘটনাচক্রে তারেক মাসুদের দেখা হয়। লেভিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৬ মিমি ক্যামেরায় প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো ফুটেজ ধারণ করেছিলেন, যার অধিকাংশই অব্যবহৃত থেকে যায়। তাঁর কাছ থেকে তারেক যেসব অব্যবহৃত ফুটেজ পান, সেই ফুটেজ ও অন্যান্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করা ফুটেজ দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর পরিশ্রম করে নির্মাণ করেন মুক্তির গান প্রামাণ্যচিত্রটি। ক্যাথরিন মাসুদ ছিলেন সহনির্মাতা।

মুক্তির কথা

মুক্তির গান নির্মাণের নেপথ্য গল্প নিয়ে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেন মুক্তির কথা নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র।মুক্তির গান-এ শরণার্থী শিবির, মুক্তাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাফেরা, সংস্কৃতিকর্মীদের গান, এগুলো এসেছে। মুক্তির গান দেখানোর পর মানুষের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া, সেগুলো মুক্তির কথায় এসেছে। মুক্তির গান-এ যাঁরা শরণার্থী শিবির এবং মুক্তাঞ্চলে ছিলেন, তাঁদের কথা এসেছে। মুক্তির কথায় মানুষ অসহায় অবস্থা থেকে প্রতিরোধকারী যোদ্ধায় কীভাবে পরিণত হয়েছিল, সে কথা এসেছে।

মাটির ময়না

প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তারেক নিজেকে দক্ষ নির্মাতা হিসেবে তৈরি করেছেন। মুক্তির গান এবং মুক্তির কথা নির্মাণের মধ্য দিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, বিশেষ করে দার্শনিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে—সেসবের একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর পরবর্তীকালের চলচ্চিত্রগুলোতে। মাটির ময়নায় তারেক মাসুদ নিজেরই জীবনের গল্প বলেছেন। তাঁর মাদ্রাসার জীবন, পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরেছেন সেলুলয়েডের ফ্রেমে। এ ছবিটির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরেন তারেক মাসুদ। ২০০২ সালে প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয় ছবিটি। ২০০৩ সালে ইউরোপের ৪০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু যে বছর মাটির ময়না কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে একই বছর বাংলাদেশ সরকার ছবিটিকে নিষিদ্ধ করে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এটি কলঙ্ক হিসেবেই যুক্ত থাকবে। পরবর্তী সময়ে ছবিটির উপর রাষ্ট্রীয় নিশেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর অনেকগুলো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হিসেবে অংশ নেয় মাটির ময়না। এ ছবিটির মধ্য দিয়েই ইউরোপে প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক প্রদর্শনী শুরু হয়।

অন্তর্যাত্রা

‘আত্মপরিচয়’ প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে আবর্তিত অন্তর্যাত্রার কাহিনী। এতে জাতিসত্তা, ব্যক্তি, সমাজ ও বংশপরিচয়ের সূত্রগুলো ধরার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। এর কাহিনী-কাঠামোর একাংশে ষাট-সত্তর-আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তৎকালীন তরুণ সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী একটি অংশকে ধরা হয়েছে রফিক ও শিরিনের প্রেম ও বিয়ের মধ্য দিয়ে—‘তাদের নিজেদের পছন্দেই বিয়ে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁরা একই সঙ্গে পড়েছেন। প্রগতিশীল রাজনীতি আর সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে তাঁরা বেড়ে উঠেছেন। রফিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী আর শিরিন ব্যস্ত গ্রুপ-থিয়েটার আর গান নিয়ে। রফিক গান ভালোবাসে, আর সে কারণেই ভালোবাসে শিরিনকে। সেই ভালো লাগা অবশেষে গড়ায় বিয়েতে। রফিকের অগ্রসর চিন্তা আর দৃষ্টিভঙ্গি শিরিনকে আকৃষ্ট করে তার প্রতি। ভালোবাসা সংসারে রূপ নিলে সম্পর্কের বাস্তবতা ক্রমে পাল্টাতে থাকে।’ রফিক ক্রমেই সবকিছু থেকে সরে এসে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে বাঁচতে চায়। দুজনের ব্যক্তিত্বের সংঘাত পরবর্তীকালে সম্পর্কের ছেদ অবধি। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ অন্তর্যাত্রা ছবিটি নির্মাণ করেছেন ২০০৬ সালে।

নরসুন্দর

নরসুন্দর একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ দুজন মিলে ২০০৮ সালে এটি নির্মাণ করেছেন। তারেক নরসুন্দর নির্মাণ করেছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস্ রিসার্চ তথা ‘রামরু’ নামক একটা সংস্থার অর্থে, যারা অভিবাসী-আটকে পড়া উদ্বাস্তু মানুষ প্রভৃতি ইস্যু নিয়ে কাজ করে। তারেক মাসুদের বিবেচনায় মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত একটা পলিটিক্যাল থ্রিলার নরসুন্দর। নরসুন্দর-এর গল্পে দেখা যায় যে মুক্তিযুদ্ধের সময় একজন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর মা-বাবাকে দেখতে আসেন, আর্মি খবর পেয়ে যায়, তাঁকে ধরতে আসে, তিনি পালান। তাঁকে না পেয়ে তাঁর মা-বাবাকে অত্যাচার করে। তিনি পালিয়ে গিয়ে ওঠেন এক সেলুনে। সেলুনে ওঠার সময় বিহারিরা দেখে তাঁর দাড়িটাড়ি হয়ে গেছে, তিনি খুব ভীতসন্ত্রস্ত, তাড়া খাওয়া খরগোশের মতো কাঁপছেন। ছেলেটি দাড়ি কামাতে বসে পড়ে। বিহারিরা যারা সেলুনের মালিক বা চুল কাটে, তারা কিন্তু বুঝে ফেলেছে যে ছেলেটি মুক্তিযোদ্ধাই হবে। কিন্তু তারা সেলুনে আর্মি এলেও ছেলেটিকে ধরিয়ে দেয় না।

রানওয়ে

তারেক মাসুদ পরিচালিত রানওয়ে ছবিটি নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০০৮ সালের অক্টোবরে, আর তা শেষ হয় ২০০৯ সালের এপ্রিলে। ক্যাথরিন মাসুদ প্রযোজিত কাহিনীচিত্রটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে জঙ্গীবাদ ও ২০০৫-২০০৬ সালে সংগঠিত কিছু আন্তর্জাতিক ঘটনা। তারেক মাসুদ পরিচালিত রানওয়ে ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে প্রথম মুক্তি পায় সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর বেতিলের স্বপ্নপুরী সিনেমা হলে। রানওয়ের উদ্বোধনী প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১০ সালের গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান মিলনায়তনে। রানওয়ে ছবির বেশির ভাগ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নতুন শিল্পী। যাদের মধ্যে রুহুল চরিত্রে ফজলুল হক, রহিমা চরিত্রে রাবেয়া আক্তার মনি, আরিফ চরিত্রে আলী আহসান অভিনয় করেন। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নাজমুল হুদা বাচ্চু, মোসলেম উদ্দিন, নাসরিন আক্তার ও রিকিতা নন্দিনী শিমু। অতিথি শিল্পী হিসেবে একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে লিখিত চিত্রনাট্যের গল্প ও সংলাপ লিখেছেন তারেক মাসুদ। ছবিটির চিত্রায়নে ছিলেন নির্মাতার দীর্ঘদিনের সহকর্মী বন্ধু মিশুক মুনীর। শব্দগ্রহণ করেছেন মাসরুর রহমান, শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন শহীদ আহমেদ মিঠু, ছবিটি সম্পাদনা করেছেন ক্যাথরিন মাসুদ। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের সংগীত পরিচালনায় মূল আবহ সুর করেছেন তানভীর আলম সজীব এবং এর ডলবি ডিজিটাল শব্দ মিশ্রণের কাজটি করেছেন নিউইয়র্কের প্রখ্যাত শব্দগ্রাহক অ্যালেক্স নয়েজ।

অসমাপ্ত কাগজের ফুল

তারেক মাসুদের স্বপ্নের প্রজেক্ট ছিল কাগজের ফুল। রানওয়ে নির্মাণের আগে থেকেই কাগজের ফুল নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। শুটিংয়ের জন্য কলকাতায় একটি পুরাতন বাড়ি খোঁজার জন্যই ঘুরে বেড়িয়েছেন তিন মাস। বাংলাদেশেরও নানা জায়গায় কাগজের ফুল সিনেমার জন্য লোকেশন খুঁজছিলেন তারেক। মানিকগঞ্জে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মারা যান এই গুণী নির্মাতা। সেদিন কাগজের ফুল সিনেমার লোকেশন দেখে ঢাকায় ফিরছিলেন তারেক, ক্যাথরিন, মিশুক মুনীরসহ অন্যরা। সেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন তারেক, মিশুকসহ পাঁচজন চলচ্চিত্রকর্মী। দুর্ঘটনায় আহত হন ক্যাথরিন মাসুদ, ঢালি আল মামুনসহ অনেকে। তারেকের মৃত্যুর পর কাগজের ফুল নির্মাণের ঘোষণা দেন ক্যাথরিন মাসুদ। দ্য রিপোর্টকে দেওয়া সাক্ষাতকারে গত বছর ক্যাথরিন বলেন, 'আমরা কাগজের ফুল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছি। মাঝে তারেকের অসমাপ্ত আরও কিছু কাজ শেষ করার চেষ্টা করছি।' তারেক মাসুদের অসমাপ্ত 'কাগজের ফুল' চলচ্চিত্র নির্মিত হবে, জানান ক্যাথরিন।

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/এসএম/এনআই/আগস্ট ১৩, ২০১৬)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর