thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ মার্চ ২০১৭, ১৪ চৈত্র ১৪২৩,  ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৩৮

‘লেখক হওয়ারই চেষ্টা করছি’

২০১৬ আগস্ট ৩০ ১৬:৫৯:০৭
‘লেখক হওয়ারই চেষ্টা করছি’

পাভেল রহমান, দ্য রিপোর্ট : বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় সাম্প্রতিক সময়ে একটা কথা খুব বেশি শোনা যায়, ‘নাট্যকার সংকট’। নতুন নাট্যকার তৈরি হচ্ছে না। তরুণ নাট্যকর্মীদের প্রায় সবাই অভিনয় করতেই বেশি আগ্রহী। ফলে নাট্যকার শূন্যতায় ভুগছে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন।

নাট্যকার সংকটের এই সময়েও আমাদের আলোর সন্ধান দিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েকজন তরুণ। তাদের মধ্যে অন্যতম রুবাইয়াৎ আহমেদ। যিনি নাট্যকার হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং লিখে চলেছেন একের পর এক নাটক। এরই মধ্যে তার লেখা বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ কর ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারী: শিল্প ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য অর্জন করেছেন পিএইচ.ডি ডিগ্রি। বর্তমানে কাজ করছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে।

সম্প্রতি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ভারতের ত্রিপুরায় এই নাট্যকারের লেখা তিনটি নতুন নাটক মঞ্চে এনেছে তিনটি নাট্যদল। মহাভারতের ক্ষুদ্র কাহিনী নিয়ে রুবাইয়াৎ আহমেদ রচিত আখ্যান ‘হিড়িম্বা’ চট্টগ্রামের নাট্যাধার প্রযোজনা করেছে। এটির নির্দেশনা দিয়েছেন মোস্তফা কামাল যাত্রা। ভারতের ত্রিপুরার নাট্যমঞ্চ নামের একটি দল তার লেখা ‘অমানিশা’ নাটকটি মঞ্চে এনেছে। এটির নির্দেশনা দিয়েছেন কলকাতার নির্দেশক শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঢাকার পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) তার লেখা ‘গহনযাত্রা’ নাটকটি মঞ্চে এনেছে। সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় নাটকটিতে একক অভিনয় করেছেন শামছি আরা সায়েকা।

এরই মধ্যে শ্রেষ্ঠ তরুণ লেখক হিসেবে ‘কমাশ্রী পদক ২০১২’ এবং জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০১৫ অর্জন করেছেন এই লেখক। লেখালেখি এবং নাট্যচর্চার নানা বিষয় নিয়ে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবাইয়াৎ আহমেদ। আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে দেওয়া হলো।

এই সময়ের ব্যস্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাই?

লেখালেখি আর পড়াশোনা ছাড়া এই মুহূর্তে অন্যকোনো ব্যস্ততা নেই। দীর্ঘদিন ধরে ‘দেহতরী’ নামে একটি উপাখ্যান অনেকদূর লিখে রেখেছিলাম, সেটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। এছাড়া উকিল মুন্সীকে নিয়ে অপর একটি আখ্যানের ছক শেষ করে অনেকদূর এগিয়েছি। আশা করছি এ বছরই এই দুটো শেষ করতে পারব।

এ বছরে আপনার লেখা একাধিক নাটক মঞ্চে এসেছে। নাটকগুলো প্রসঙ্গে বলুন?

আমার লেখা তিনটি নাটক এ বছর মঞ্চে এসেছে। সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) মঞ্চে এনেছে ‘গহনযাত্রা’ নামের আখ্যান। এতে একক অভিনয় করেছেন শামছি আরা সায়েকা। ‘অমানিশা’ নামের অপর একটি নাটক মঞ্চে এনেছে ভারতের ত্রিপুরার নাট্যমঞ্চ নামের একটি দল। নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন কলকাতার তরুণ নির্দেশক শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৭ আগস্ট মঞ্চে এসেছে ‘হিড়িম্বা’। চট্টগ্রামের নাট্যাধার নামের একটি দল এটি মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। এর নির্দেশনা দিয়েছেন মোস্তফা কামাল যাত্রা।

কোন প্রেক্ষাপটে এই নাটকগুলো লিখেছিলেন?

ধর্মীয় ক্ষুদ্র এক সম্প্রদায়ের উপর নেমে আসা পীড়ন-ধ্বংসের কাহিনী ‘গহনযাত্রা’। গণহত্যার শিকার সেই সম্প্রদায়ের এক নারীর মধ্যদিয়ে বিবৃত হয়েছে সমগ্র আখ্যান। তাতে সেই ধর্ম-সংস্কৃতির নানান অভিজ্ঞান ও বৈচিত্র্যের আভাস রয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে একজন মাত্র ব্যক্তির মধ্যদিয়ে এই যাত্রা কতটুকু সম্ভবপর? ব্যক্তি তো সমগ্রের অংশ, ফলে এককের ওপর নেমে আসা অমানবিক আচরণ আসলে সমগ্রকেই স্পর্শ করে। স্রষ্টার অংশ হতে এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃজন অর্থাৎ অদ্বৈত স্রষ্টা থেকেই বিশ্বের সবকিছু বিভাজিত হয়েছে, ‘দ্বৈত’ হয়েছে, এই অনুপম দর্শন গহনযাত্রায় ক্রিয়াশীল থাকায় একে বলা হয়েছে ‘দ্বৈত ও অদ্বৈতের আখ্যান’। একজন মানুষের জগৎবাস খুব বেশি দিনের তো নয়। অথচ সামান্য এই সময়কে কত না বিভেদের বেড়াজালে আটকে ফেলছি আমরা। সেই বেদনায় অশ্রুপাত আর মানবতার প্রতি আহ্বান এই রচনার মূলে। উগ্রপন্থার অবসানে বিভাজনলুপ্ত সর্বমানবের বাসযোগ্য হয়ে উঠুক আমাদের মায়াময় পৃথিবী, এই নাট্যের গন্তব্য সেই সুবর্ণ স্বপ্নের পানে।

আর মহাভারতের ক্ষুদ্র একটি কাহিনী অবলম্বনে ‘হিড়িম্বা’ নাটকটি প্রথম লিখেছিলাম ৮/৯ বছর আগে। এরপর এর পরিমর্জিত ও বর্ধিত রূপ ২০১৪ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। সাধারণ নেতিবাচক হিসেবে কাব্যে-পুরাণে কল্পিত রাক্ষস সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করা হয়। আমি দেখাতে চেয়েছি, শত অনাচার আর পাপের পরও মানব সম্প্রদায়ের মাঝে ‘কবি’ রয়েছে বলে তার অমিত প্রভাবশালী শব্দের শক্তিতে মানুষ শেষ পর্যন্ত মহিয়ান হয়ে ওঠে। রাক্ষস নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও মহত্বে উন্নীত হতে পারে না। কারণ তাদের মাঝে ‘কবি’ নেই। পাশাপাশি, সেই রাক্ষস যদি হয় নারী তবে তার অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে ওঠে। ভেবে দেখুন, মহাভারতে হিড়িম্বার যে সীমাহীন প্রেম আর ত্যাগ তার তুল্য আর কোনো চরিত্র কিন্তু নেই। অথচ এরপরও অপরাপর অনেক মানব নারী অসংখ্য ত্রুটি নিয়েও মহিমান্বিত হয়ে উঠেছেন, পূজ্য রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। এই বৈষম্যকেই তুলে ধরতে চেয়েছি ‘হিড়িম্বা’ নাটক কিংবা আখ্যানের মধ্যদিয়ে।

‘অমানিশা’ নাটকটি লিখেছি আমারই একটি ছোটগল্প ‘ক্ষণজন্মা আলো চিরন্তন অন্ধকার’ অবলম্বনে। একটি নামহীন নগরে সবাই উল্টো করে হাঁটে। তাতেই তারা অভ্যস্ত এবং তাই স্বাভাবিক বলে মনে করে। সেই নগরে সবকিছু নির্দিষ্ট করে দেয়া, ইতিহাস থেকে শুরু করে আচার-আচরণ সবই। এই নগরে কারো কোনো নাম নেই। সবাই পেশা অনুসারে শুধুমাত্র নম্বর বা ডিজিটে পরিচিত। নগরটিতে রয়েছে একটি কালো সুরঙ্গ। সেখানে কাউকে পাঠিয়ে দিলে আর ফেরত আসে না। সবাই জানে ওই সুরঙ্গ চলে গেছে মহানন্দলোকে, চিরপ্রশান্তির অঞ্চলে। নগরটিতে প্রতিবছর সেরা কৃতীমানকে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার হিসেবে কৃতীব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ওই সুরঙ্গে। এই নগরেই একজন কবি বাস করেন। সোজা হাঁটার দায়ে তার দুই পা কেটে নেওয়া হয়। তার উপর নজরদারি করার জন্য নিয়োগ করা হয় এক নারীকে। এই কবিই কেবল বুঝতে পারেন সবাই আসলে উল্টো পথে চলছে। তিনি বিষয়গুলো নিয়ে একটি বই লিখেন। বইটি আলোচিত হয় এবং বিক্রিও হয় প্রচুর। বইটিতে তিনি আসলে এই অচলায়তনের অনেক গুমোর ফাঁস করে দেন। নগর প্রশাসন প্রমাদ গোণে। তারা সব বই বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে ফেলে, প্রকাশক নিখোঁজ। নগর প্রশাসকও এক সময় বুঝতে পারেন, তিনি সিস্টেমের কাছে বন্দি হয়ে গেছেন। তারও নিজস্বতা বলে কিছু নেই। তিনি পরিকল্পনা করেন, নিজেকে ধ্বংস করার মধ্যদিয়ে এই নিয়মতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ছিন্ন করার। এবার নগর প্রশাসন কবিকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে। পুরস্কার হিসেবে কবিকে ঠেলে দেওয়া হয় সেই সুরঙ্গ মুখে। আর ঠিক সেই সময় কবির উপর নজরদারিতে নিয়োজিত নারী কবির বাজেয়াপ্ত হওয়া বই থেকে কয়েকছত্র উচ্চস্বরে পাঠ করে, যেন বা মন্ত্রের মতো। এরফলে চৈতন্য ফেরে নগরবাসীদের। তারা শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এটিই ‘অমানিশা’ নাটকের কাহিনী।

সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় প্রথমবার আপনার নাটক মঞ্চে এসেছে। এ প্রসঙ্গে যদি বলেন?

আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা নির্দেশক সুদীপ। ওর সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে ছিলো দীর্ঘদিনের। ‘গহনযাত্রা’ আমার সেই ইচ্ছেপূরণের নাটক। নিঃসন্দেহে আমি আনন্দিত।

থিয়েটারে নাট্যকার-নির্দেশক জুটি প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য শুনতে চাই?

জুটি সবক্ষেত্রেই ইতিবাচক। কারণ তাতে করে বোঝাপড়াটা ভালো হয়, কাজে গতি আসে এবং সেটি নান্দনিকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে সেলিম আল দীন-নাসির উদ্দীন ইউসুফ জুটির কথা চলে আসে স্বাভাবিকভাবেই। এই দুই মানুষের মেলবন্ধনে বাংলা মঞ্চনাটক অসামান্য উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। তবে জুটিবদ্ধতার বাইরে গিয়েও কাজ করা উচিত, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য, নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য, নতুন বিস্তৃতির জন্যও বটে।

‘গহনযাত্রা’ শামছি আরা সায়েকার প্রথম একক মঞ্চ অভিনয়। নাট্যকার হিসেবে অভিনেত্রী সায়েকা সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই?

সায়েকা অত্যন্ত পরিশ্রমী। ৩০ বছর ধরে মঞ্চনাটকে কাজ করছেন। নাচে পারদর্শী। সবচেয়ে বড় গুণ, সায়েকা লেগে থাকতে জানেন, চ্যালেঞ্জ নিতে জানেন। ‘গহনযাত্রা’ তার প্রথম একক মঞ্চাভিনয়। পুরোটাজুড়ে তাকেই দেখে দর্শক। অন্য কোনো অভিনয়শিল্পীর ন্যূনতম সহায়তা নেওয়া হয়নি। আমরা চেয়েছি এককের মূল যে বৈশিষ্ট্য সায়েকা যেন সেটা ধারণ করেন। আমার বিবেচনায় তাতে তিনি উৎরে গেছেন।

আপনার লেখা আর কোন নাটক কী শীঘ্রই মঞ্চে আসবে?

আমার দল ঢাকা থিয়েটারে নতুন নাটক আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দলনেতা নাসির উদ্দীন ইউসুফ ইতিমধ্যে আমার লেখা একটি আখ্যান পাঠ করে তার সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। এটি মঞ্চে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

আপনি তো মঞ্চে অভিনয়, নির্দেশনার সঙ্গেও যুক্ত। কোন কাজটিতে নিজেকে স্বচ্ছন্দ মনে হয়?

লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। লেখক হওয়ারই চেষ্টা করছি। আর কোনোকিছু হতে চাই না।

অল্প কথায় ঢাকার এই সময়ের নাট্যচর্চার সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে যদি বলেন?

ঢাকা ব্যস্ততার শহর। এখানে মানুষের সময়ের বড় অভাব। তারসঙ্গে দৈনন্দিন নাগরিক জীবন-জীবিকার সংকট তো রয়েছেই। এদেশীয় থিয়েটার এখনো কর্মী বা শিল্পীদের কাছে থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য ও আর্থিক সহায়তারহিত শ্রম এবং সময় দাবি করে। কিন্তু এভাবে আর খুব বেশিদিন চলবে বলে মনে হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অল্পবয়েসী তরুণ-তরুণীরা টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ করার স্বপ্ন থেকে থিয়েটারকে একটি সিঁড়ি বা মাধ্যম বলে মনে করেন। এটা দোষের নয়। এমন করে কেউ ভাবতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন, কোনো তরুণ কিংবা তরুণী টেলিভিশন মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর মঞ্চে কাজ করেন না। এতে আমাদের নাট্যচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ কারণেই, একজনকে তৈরি করতে একটি দলের ব্যক্তিদের অনেক শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু যখন তৈরি হয়ে যাওয়ার পর যখন ওই ব্যক্তির কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবাটুকু পাওয়া যায় না তখন এক ধরনের শূন্যতা বা ঘাটতির সৃষ্টি হয়। এটা আমাদের নাট্যচর্চার জন্য ক্ষতিকর। তবে পাশাপাশি আমাদের নাটকের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, এখনো সময় আছে, আপনারা সবাই মিলে চেষ্টা করলে এদেশের থিয়েটারকে পেশাদারিত্বের জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ আপনাদের সেই অবস্থান তৈরি হয়েছে, যে অবস্থান থেকে দাঁড়িয়ে দাবি জানালে সরকার থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠান সহায়তার হাত বাড়াবে। ঢাকাতেই এমন অনেক নাট্যশিল্পী রয়েছেন, মঞ্চ থেকে উপার্জন করতে পারলে তারা অন্যকোথাও নিজেদের ক্ষয় করতেন না। পাশাপাশি ঢাকাতে নাটক মঞ্চায়নের জন্য যথেষ্ঠ সংখ্যক মঞ্চ নেই। নাটক মঞ্চায়নের জন্য অনেক দলকে মাসের পর মাস কখনো কখনো বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তাতে মনোবল হারান কর্মীরা। আর একটি বিষয়। ঢাকার নির্দিষ্ট এলাকা ঘিরেই এখন মঞ্চনাটক হয়। এই বৃত্তটিও ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন। বিভিন্ন স্থানে নাটক মঞ্চায়নের উপযোগী মিলনায়তন জরুরি। তাতে ওই মিলনায়তনকে ঘিরে একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হবে এবং আশপাশের পরিবেশের উপর এটি প্রভাব ফেলবে। উগ্রপন্থা বিস্তারের এই সময়ে তা থেকে পরিত্রাণের জন্য যা ভীষণ জরুরি।

আর সম্ভাবনার কথা যদি বলি তবে এ কথা তো নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের মঞ্চনাটক এখন আন্তর্জাতিক মানের। তবে যে মানে এসে আমরা দাঁড়িয়েছি সেখানেই থেমে যাওয়া যাবে না। আরো এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের প্রজন্মের একঝাঁক তরুণ অসামান্য সব কাজ করছেন। এই বিষয়টি আশাবাদী করে তোলে। এই মেধাবী তারুণ্যের ডানায় ভর করে আগামীতে বহুদূর যাবে এই সমৃদ্ধ শিল্পমাধ্যমটি।

আপনার আগামী দিনের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে যদি বলেন?

লিখতে চাই অবিরত।

একনজরে রুবাইয়াৎ আহমেদ

জন্ম নেত্রকোণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে স্নাতকোত্তর শেষ করে ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নারী: শিল্প ও সমাজবাস্তবতার প্রেক্ষাপটে’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য লাভ করেছেন পিএইচ.ডি ডিগ্রি। সম্পৃক্ত রয়েছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র ‘বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’-এ জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক (সিনিয়র সাব-এডিটর) হিসেবে কর্মরত।

মহাভারতের ক্ষুদ্র কাহিনি নিয়ে রুবাইয়াৎ আহমেদ রচিত আখ্যান ‘হিড়িম্বা’ চট্টগ্রামের নাট্যাধার প্রযোজনা করেছে। এটির নির্দেশনা দিয়েছেন মোস্তফা কামাল যাত্রা। ভারতের ত্রিপুরার নাট্যমঞ্চ নামের একটি দল তার লেখা ‘অমানিশা’ নাটকটির নিয়মিত মঞ্চায়ন করছে। এটির নির্দেশনা দিয়েছেন কলকাতার নির্দেশক শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকার পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) তার লেখা ‘গহনযাত্রা’ নাটকটি মঞ্চে এনেছে। সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় নাটকটিতে একক অভিনয় করেছেন শামছি আরা সায়েকা।

আলব্যের ক্যামুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ঢাকা থিয়েটার মঞ্চে উপস্থাপন করেছে তাঁরই লেখা বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নাটক ‘আউটসাইডার’। ‘কায়া’ শীর্ষনামে উপন্যাসটির অনুবাদ ও নাট্যরূপ দিয়েছেন রুবাইয়াৎ আহমেদ। এর নির্দেশনা দিয়েছেন নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। এই নাটকটি ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমির সৃজনশীল পত্রিকা ‘উত্তরাধিকার’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

লন্ডনের বিশ্বখ্যাত শেক্সপিয়রস গ্লোব থিয়েটারে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় মঞ্চায়িত নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’র অনুবাদ ও রূপান্তর করেছেন তিনি। ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের অংশ হিসেবে আয়োজিত নাট্য অলিম্পিকে ৭ ও ৮ মে গ্লোব থিয়েটারে নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশিত ‘দ্য টেম্পেস্ট’ মঞ্চায়িত হয়ে প্রভূত প্রশংসা অর্জন করে। এই নাটক দিয়েই বাংলা একাডেমির নবনির্মিত অডিটরিয়ামের উদ্বোধন হয়। এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের সৈকত থেকে প্রথম কোন নাটক হিসেবে সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত নাটক হওয়ারও গৌরব অর্জন করে ‘দ্য টেম্পেস্ট’।

প্রথমবারের মতো ঢাকা থিয়েটার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। গল্পের মঞ্চভ্রমণ শীর্ষ নামে রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্পের নাট্যরূপ দিয়েছেন রুবাইয়াৎ। ২০১১ সালে ‘নষ্টনীড়’র নির্দেশনা দিয়েছেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঢাকা থিয়েটারের পথনাটক ‘জিয়ন্তকাল’র রচয়িতাও রুবাইয়াৎ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নব্যপাঁচালি আঙ্গিকে রচিত হয় এই নাটক। ২০১১ সালে নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন ওয়াসিম আহমেদ ও সামিউন জাহান দোলা। ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা ‘পঞ্চনারী আখ্যান’, ‘দ্য টেম্পেস্ট’ ও ‘ধাবমান’ নাটকের সহকারী নির্দেশক হিসেবেও কাজ করেছেন রুবাইয়াৎ আহমেদ।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের মুখপত্র ‘গ্রাম থিয়েটার’ এর সহযোগী সম্পাদক তিনি। অভিনয়শিল্পী শিমূল ইউসুফের ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মঞ্চকুসুম শিমূল ইউসুফ’ এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। নিজে সম্পাদনা করেন ‘দ্বৈত’ নামে একটি ছোটকাগজ। যৌথ সম্পাদনা করেছেন ‘গৌড়জন’ নামে অনিয়মিত একটি ছোটকাগজ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচিত চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’তে গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। সেলিম আল দীনের নাটক ‘কিত্তনখোলা’র টেলিভিশন ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য লিখেছেন। এই ধারাবাহিকটি বর্তমানে নির্মাণাধীন।

নাটক ছাড়াও গল্প, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১১টি। এগুলো হল- নির্বাচিত কবিতা (হ্যারল্ড পিন্টার ও ইসমাইল কাদারে, ২০০৬ সালে ক্রান্তিক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), বর্ণনাত্মক নাটক ‘বর্ণদূত’ (২০০৮ সালে গন্তব্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), অনুবাদ নাটক সংকলন ‘পঞ্চস্বর’ (২০০৯ সালে ভাষাচিত্র থেকে প্রকাশিত), গল্পগ্রন্থ ‘আত্মহনন কিংবা স্বপ্নপোড়ানো আখ্যান’ (২০১০ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), ছোটদের গল্প ‘আলসেকুঁড়ে’ (২০১১ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), সীমানা ছাড়িয়ে (অনুবাদ, ২০১২ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), জিয়ন্তকাল (মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বর্ণনাত্মক নাটক, ২০১২ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), হিড়িম্বা (মহাভারতের ক্ষুদ্র কাহিনি নিয়ে রচিত বর্ণনাত্মক নাটক, ২০১৪ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), তারেক মাসুদ (গবেষণা, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত), রঙমহাল (বর্ণনাত্মক নাটক, ২০১৫ সালে ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত), একজন সাব-এডিটরের কতিপয় ছেঁড়াখোঁড়া দিন (উপন্যাস, ২০১৬ সালে কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত)

এছাড়া বিভিন্ন জার্নাল, সাহিত্যসাময়িকী ও ছোটকাগজে অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ, অনুবাদ ও চলচ্চিত্র ও নাট্য বিষয়ক লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

এ পর্যন্ত নির্দেশনা দিয়েছেন ৯টি নাটকে। এগুলো হল- ইতি পত্রমিতা (মূল: সেলিম আল দীন, ঢাকা থিয়েটার), আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা (মূল: লুইজি ব্রায়ান্ট, তারেক মাসুদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র)। স্বপ্নমঙ্গল (রচনা: আবদুল্লাহেল মাহমুদ, মহুয়া থিয়েটার, নেত্রকোণা)। চাকা (রচনা: সেলিম আল দীন, মহুয়া থিয়েটার নেত্রকোণা)। হেড্ডা গ্যাবলার (রচনা: হেনরিক ইবসেন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পরীক্ষা প্রযোজনা)। আট বছর আগের একদিন (কবিতা: জীবনানন্দ দাশ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পরীক্ষা প্রযোজনা)। ক্যাম্পে (কবিতা: জীবনান্দ দাশ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পরীক্ষা প্রযোজনা)। ক্যালিগুলা (রচনা: আলব্যের ক্যামু, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পরীক্ষা প্রযোজনা)। নিমজ্জন (রচনা: সেলিম আল দীন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পরীক্ষা প্রযোজনা)।

এ ছাড়া নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অনেক প্রযোজনায় অভিনয়ও করেছেন। ঢাকা থিয়েটার ছাড়াও তাঁর নাটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ ও বিভিন্ন নাট্য সংগঠন মঞ্চায়ন করছে।

সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি হিসেবে রুবাইয়াৎ আহমেদ পেয়েছেন ‘কমাশ্রী পদক ২০১২’(শ্রেষ্ঠ তরুণ লেখক হিসেবে), ‘জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০১৫’।

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/এফএস/আগস্ট ২৯, ২০১৬)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জলসা ঘর এর সর্বশেষ খবর

জলসা ঘর - এর সব খবর



রে