thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬,  ১৬ মহররম 1441

সোহেল রহমান

কিছু কথা, কিছু স্মৃতি

২০১৪ ফেব্রুয়ারি ১৪ ১৩:৪৭:৫৮
কিছু কথা, কিছু স্মৃতি

‘প্রেম একবার-ই এসেছিল নীরবে …’ লতা মুঙ্গেশকরের এ বিখ্যাত গানটি শোনেননি এমন বাঙালি প্রেমিক কিংবা প্রেমিকা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রেমের সেই সনাতনী ধারাটি আর নেই। একাধিকবার প্রেমে পড়েছেন এমন নর-নারীর সংখ্যাই বরং এখন অনেক বেশি। কিন্তু মানুষ কেন একাধিকবার প্রেমে পড়ে– সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের কাছে হয়তো এর কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু প্রেম তো প্রেম-ই।

অনেক আগে কবি আল মাহমুদ এ বিষয়ে একবার লিখেছিলেন, ‘কয়েকটি নারীর মুখাবয়ব, কারো ভেজা চোখ, দীর্ঘ ক্ষীণকায়া কারো বেণী এবং আমার পক্ষ থেকে নিরূপায় অক্ষমতার কথা জেনেও আজীবন আমাকে ক্ষমা করে যাওয়ার ঔদার্যকেই আজকাল আমি প্রেম বলে জানি। … প্রেম করি কারো দুটি জলে ভেজা কালো চোখের পাঁপড়িকে, কারো নগ্ন বাহু ও কারো দীর্ঘ বেণীকে। … এক এক নারীর মধ্যে কবি দেখে তার হারানো পাঁজরেরই খণ্ড খণ্ড যোজনা।’

কবি-সাহিত্যিকদের কথা থাক। আমার এক বন্ধু প্রায়ই বলত, তার বুকের ভেতরটা একটা আর্ট গ্যালারি। এর মানে, এত মেয়ের সঙ্গে ওর অ্যাফেয়ার ছিল যে, তাদের প্রত্যেকের পোর্ট্রেট দিয়ে সে একটি আর্ট গ্যালারি বানিয়েছে।

এবার নিজের প্রসঙ্গে আসি। স্কুলে পড়ার সময় ‘আশা’ নামে এক বান্ধবী ছিল আমার। সবাই তাকে ক্ষ্যাপাতো আমার ‘বউ’ বলে। এ নিয়ে আশা কখনো আমাকে কিছু বলেনি বা রাগ করেনি; বরং এ নিয়ে কথা বলতে গেলে লাজে রাঙা হয়ে উঠত ওর মুখ। কিন্তু ওর এক বান্ধবী (শিমু) আমাদের সম্পর্কটাকে যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারত না।

আশার সঙ্গে বিকেলবেলাটা একসঙ্গে কাটাব কিংবা খেলব বলে আমি প্রতিদিনই টিফিন পিরিয়ডে ও ক্লাসের ফাঁকে স্কুলের হোমওয়ার্কগুলো সেরে রাখতাম। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে ব্যাগটা কোনোরকমে রেখেই দিতাম দৌড়। খেলার মধ্যে আশা সবসময় আমাকে ওর দলে নিতে চাইত। এ নিয়ে অন্যরা কখনো কোনো আপত্তি না করলেও শিমু সবার সামনেই এটা নিয়ে আশাকে খোঁচা মারত। জবাবে আশা কিছু বলত না, মাঝে মাঝে শুধু তাকাত আমার দিকে। আমি কিছু বলি কি না। আমি কোনো কথা বলতাম না, কারণ কিছু বললেই ঝগড়া বেধে যাবে। … শেষের দিকে ওদের সঙ্গে খেলাটা আমি বন্ধ করে দিই। এ নিয়ে আশা একদিন জানতেও চেয়েছিল আমার কাছে- ‘আচ্ছা, তুমি এখন খেলতে চাও না কেন আমাদের সঙ্গে?’ আমি বললাম, ‘দেখ না, এটা নিয়ে শিমু তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করে।’ আমার কথা শুনে সে হাসল।

একদিন কথায় কথায় আশা আমাকে বলল, ‘জানো, শিমু না তোমার সম্পর্কে অনেক আজে-বাজে কথা বলে।’

জবাবে আমি বললাম, ‘আমি কেমন –সেটা তো তুমি অন্তত শিমুর চেয়ে অনেক বেশি ও ভাল জানো, তাই না? আর তোমার-আমার সম্পর্ক যা-ই হোক, এতে শিমুর কী!’

আশা মেনে নিয়েছিল আমার যুক্তি। কিন্তু তারপরও ঠেকানো গেল না। আশাকে কেন্দ্র করে শিমুর সঙ্গে আমার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল একদিন। তারপর থেকে কথা বলা পুরোপুরি বন্ধ। আশা চাইলেও আমি আর কখনো কথা বলিনি ওর সঙ্গে। যদিও অনেক কষ্ট হতো । আর আমার এই একগুয়েমি আচরণ যে ওকে কতটা আহত করত, কথা না বললেও ওর চোখ দেখেই সেটা বুঝতে পারতাম আমি।

এর কিছুদিন পর ওরা ঢাকা ছেড়ে স্থায়ীভাবে চট্টগ্রাম চলে যায়। আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে, ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার দিন আশার সঙ্গে কথা বলব। কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য যে, ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখাটা হয়নি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আমি ঢাকাতেই আমার এক ফুপুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। বাসায় যেদিন ফিরলাম, সেদিন রিকশা থেকে নামতেই কয়েকজন দৌড়ে এসে বলল, ‘আশারা চলে গেছে।’

কথাটা শোনার পর মনে হলো- বুকটা বোধ হয় ফেটে যাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যেই ভিজে গেল চোখ। তাদের উদ্দেশে কোনোরকমে বললাম, ‘খুব ভালো হয়েছে।’

আশার সঙ্গে শেষ মুহূর্তে দেখা না হওয়াটা এখনো অসম্ভব পীড়া দেয় আমাকে। তো ওরা ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বন্ধুরা আমাকে এই বলে ক্ষ্যাপাতো যে, ‘আশা ছিল, ভালোবাসা ছিল ... ।’

আশার জন্য আমি কতো রাত যে চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছি... সেটা এখন ইতিহাস। এখনো চোখ বুঁজলে আমি তার মিষ্টি মুখখানা স্পষ্ট দেখতে পাই। দুইজনে কতদিন একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজেছি, বালি দিয়ে ঘর বানিয়েছি। আমি জানি না, আমাকে তার কখনো মনে পড়ে কি না। হয়তোবা পড়ে না। কারণ মেয়েরা সবকিছু অত সূক্ষ্মভাবে মনে রাখে না। কলেজে উঠে যখন শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ (প্রথম পর্ব) পড়লাম, তখন ‘রাজলক্ষ্মী’র আদলে সে যেন আমার স্মৃতিতে ফিরে এলো আবার নতুন করে।

প্রসঙ্গ ‘অপরিচিতা’ : ভিউকার্ড জমানোর নেশা ছিল খুব। মৌচাক মার্কেটের দোতলায় একটা দোকানে দেশি-বিদেশি সুন্দর সুন্দর ভিউকার্ড পাওয়া যেত। মাঝেমধ্যেই আমি যেতাম ওই দোকানটাতে। তখন মাত্র এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। একদিন বিকেলে মৌচাকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি। এমন সময় দেখলাম, অপূর্ব সুন্দরী এক কিশোরী নীচে নামছে। লাল রংয়ের জামা ও সাদা হ্যাটে প্রিন্সেস ডায়নার চেয়েও সুন্দর লাগছিল তাকে। তার সঙ্গে একজন মহিলা (এটা তার মা নাকি বড় বোন ঠিক বুঝতে পারলাম না) এবং একটি ছোট্ট মেয়েও ছিল। মেয়েটির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমি যে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলাম, এটা যেন আমি ভুলেই গেলাম। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম অপলক। আমার তাকানোর ভঙ্গি দেখে হেসেই দুই হাতে মুখ ঢাকল সে। মুহূর্তের জন্য সেও থমকে দাঁড়াল সিঁড়িতে। তার সঙ্গী তাকে ছেড়ে ইতোমধ্যেই কিছুটা এগিয়ে গেছে। আমার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর ধীর পায়ে নীচে নামতে শুরু করল। আমি তখনো স্থির দাঁড়িয়ে। আমার দৃষ্টি অনুসরণ করছিল তাকে। মেয়েটির সঙ্গী ভদ্রমহিলা তখন সিঁড়ির নীচে ফলের দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে ফল কিনছিলেন। সেখানে পৌঁছে সে ফিরে তাকাতেই আমার সঙ্গে আবার তার দৃষ্টিবিনিময় হলো। মুখে চাপা হাসি লেগেছিল। এরপর তারা যখন গাড়িতে উঠল, তখন যেন হুঁশ হলো আমার। আমি প্রায় দৌঁড়ে নামতে নামতেই গাড়ি চলে গেল অনেক দূর।

পুরো ঘটনাটাই হয়তো নেহায়েত এক ধরনের ছেলেমানুষি, কিন্তু আমার মনে হলো, বুকের হাড়গোড় সব যেন ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে, সমগ্র অস্তিত্বজুড়ে এক ধরনের হাহাকার।

ঠিক কতক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়েছিলাম- আমি জানি না। ঘণ্টা দেড়েক তো হবেই। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল, বাসায় ফিরব ভাবছি। ঠিক এমন সময়ই হঠাৎ সামনে দিয়ে একটি মোটরসাইকেল গেল- পেছনে বসা সেই কিশোরী। আমাকে দেখেই মুখে ভেংচি কাটল সে। এ জীবনে তার সঙ্গে আমার দেখা ওই একবার-ই। তারপর অনেক দিন মৌচাক মার্কেট এবং তার আশপাশের এলাকায় আমার সাধ্য অনুযায়ী আমি তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি, কিন্ত পাইনি।

‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’- এ ধরনের ফতোয়া কিংবা থিমের ওপর লেখা গল্প-উপন্যাস আমি ইতোমধ্যে কিছু কিছু পড়েছিলাম। কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস হয়নি। ওই মেয়েটিকে দেখার পর মনে হলো- এটা হতে পারে। মহাকবি দান্তের সঙ্গে বিয়েত্রিচের দেখা হয়েছিল মাত্র একবার।… এদিকে, মেয়েটিকে দেখার পর আমি যেন সম্পূর্ণ বদলে গেলাম। ‘কবি’ হয়ে উঠলাম এক রাতের মধ্যেই। যেহেতু মেয়েটির সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, কবিতাটির নাম দিয়েছিলাম তাই ‘অপরিচিতা’। খুব ছোট্ট পরিসরে হলেও কবিতাটি আমার যে পরিচিতি, প্রশংসা এবং আমার জন্য যে পরিমাণ ভালোবাসা এনে দিয়েছিল, সেটা ছিল আমার ধারণার বাইরে।

কাঁটাবিহীন গোলাপ : গোলাপের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আমার এক বন্ধু ফিয়াসের মাধ্যমে। গোলাপের মতোই দেখতে সুন্দর ছিল গোলাপ।

পরিচয় করিয়ে দিতেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল- ‘আমার নাম গোলাপ’। আমি আমার নাম বলতেই সে বলল- ‘হ্যাঁ, আপনার কথা অনেক শুনেছি আমার বান্ধবীর কাছে।’

বান্ধবীর ডেটিংয়ের দিনগুলোতে গোলাপ মাঝেমধ্যেই আসতো। আসার আগে জেনে নিত আমি থাকব কি না। ওরা ওদের মতো ডেটিং করত, আর আমরা গল্প করতাম। কত ধরনের গল্প, ঠাট্টা ইয়ার্কি কোনোকিছুতেই কারো বাধা ছিল না। তবে ওর একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে আমি যেমন কখনো কোনো কৌতুহল দেখাইনি, তেমনি সেও আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে কখনো কিছু জানতে চায়নি। ওর বান্ধবী একবার কথায় কথায় আমাকে বলেছিল যে, ওর একটা অ্যাফেয়ার ছিল। তবে ওদের সম্পর্কটা এখনো ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়নি। মাঝে মাঝে দেখা ও কথা হয়। গোলাপের ফ্যামিলি ওই ছেলেকে কখনো মেনে নেবে না। শোনার পর আমি কোনো মন্তব্য করিনি। শুধু গোলাপের জন্য খারাপ লেগেছিল। বেচারি! এত সুন্দর একটি মেয়ে, হাসি-খুশী সব সময়, দেখে বোঝার উপায় নেই যে, ওর ভেতরে একটা কষ্ট আছে।

তবে অন্য কারো সঙ্গে গোলাপের সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক আমাদের সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের রোমান্টিসিজম ছিল। বন্ধুরা বেশ ফাজলামো করত আমাদের নিয়ে। আর আমরাও এটা এনজয় করতাম। তবে মাঝে মাঝে গোলাপ খুব সিরিয়াস হয়ে উঠত, রেগে মেগে উঠে চলে যেতো।

একবার একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। সিগারেট ধরাচ্ছিলাম, গোলাপ বলল সেও সিগারেট খাবে। আমি আমার সিগারেটটা ওকে দিলাম। ও ধরিয়ে কয়েক টান দিয়েই কাশতে লাগল। তারপর আর টানবে না বলে ফিরিয়ে দিল আমাকে। আমি সিগারেটটা টানছি, এমন সময় আমার বন্ধু ফিয়াস এসে বসল আমার পাশে। একটু পর সে বলে উঠল, ‘আরে আপনার ঠোঁটে লিপস্টিক লাগলো কীভাবে? গোলাপের ঠোঁটের লিপস্টিক মনে হচ্ছে। হ্যাঁ রে, গোলাপ তোর ঠোঁটের লিপস্টিক সোহেল ভাইয়ের ঠোঁটে লাগলো কীভাবে? তোরা চুপিচুপি এতদূর…।’

গোলাপ প্রথমে ভেবেছিল, মিছেমিছি দুষ্টুমি করা হচ্ছে। সে দৌড়ে এলো, ফাজলামি করবি না, কোথায় লিপস্টিক দেখা।

আমি ততক্ষণে আঙ্গুল দিয়ে ঠোঁট মুছে ফেলেছি, আমার আঙ্গুলে লেগে আছে সেই দাগ। আমি বললাম, তুমি যখন সিগারেট টানছিলে, সম্ভবত তখন ফিল্টারে লিপস্টিক লেগেছে।

তারপর হঠাৎ করেই ও রেগে গেল। বলল, এ সিগারেট আপনি এক্ষুণি ফেলে দিন।

আমি বললাম, আরে তুমি এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? এ সিগোরেট তো প্রায় শেষ-ই।

তারপরও সে জেদ করছিল। আমি তাকালাম ওর বান্ধবীর দিকে। সে বলল, আরে আপনি ওর কথা শুনবেন কেন? আপনি পুরো সিগারেটটা তো খাবেন-ই, পারলে ফিল্টারটাও খাবেন। বলেই আমাকে লক্ষ্য করে চোখ টিপল।

গোলাপ বলল, ঠিক আছে, তোরা থাক, আমি চললাম। বলেই সে গট গট করে হাঁটা ধরল।

আমি ওর বান্ধবীকে বললাম, তোমার কাছে টিস্যু হবে?

জবাবে সে বলল, আরে আপনি আমার কাছে টিস্যু চাইছেন কেন? আপনার টিস্যু তো ওইখানে।’ বলেই গোলাপের দিকে ইঙ্গিত করল সে।

আমি গোলাপের কাছে গিয়ে টিস্যু চাইলে সে আমাকে টিস্যু দিল বটে, কিন্তু ওইদিন পুরোটা দিন সে আর আমার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি।

এ ঘটনার পর গোলাপের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। তারপর হঠাৎ একদিন দেখা হলো বাংলা একাডেমির বইমেলায়। সেদিন ওর সঙ্গে ছিল অন্য একটি মেয়ে। বললাম, এসো তোমাকে একটি বই কিনে দিই। কার লেখা বই তোমার পছন্দ?

সে বলল, আপনার পছন্দমতো কিনে দিন একটা। গোলাপের কথা শুনে আমার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। ভাবলাম, এমন সুন্দর মওকা আর পাওয়া যাবে না। ‘শেষ বিকেলের মেয়ে’ নামে জহির রায়হানের একটা চমৎকার রোমান্টিক উপন্যাস আছে। সেটাই কিনে দিলাম তাকে।

বইটা হাতে নিয়ে গোলাপ বলল, গিফট করলে তো কিছু লিখে দিতে হয়।

আমি বললাম, কী লিখব?

বলল, আপনার যা খুশি।

মনে আছে আমি লিখেছিলাম- ‘সুন্দর জিনিস দেখার একটা বেদনা থাকে। আর যে অনুভূতি এই বেদনাকে লালন করে, তার নাম ভালোবাসা।’

গোলাপ শুধু একবার চোখ বুলিয়ে লেখাটা পড়ল, কিন্তু কোনো মন্তব্য করেনি।

এর কিছুদিন পর আমার বন্ধুর সঙ্গে ওর বান্ধবীর বিয়ে হয়। বিয়ের অনুষ্ঠান ও গায়ে হলুদে অনেক দুষ্টুমি করলাম আমরা। বিশেষ করে হলুদের দিন ওকে হলুদ দেওয়ার চেষ্টা করতেই ও দৌড়ে গিয়ে অন্য একটি ঘরে ঢুকে পড়ে। পেছনে আমি। ভিডিও ফুটেজে এই দৃশ্যটি আছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের কোনো ফুটেজ ছিল না। তোমরা দুইজন ওই ঘরে কী করছিলাম- কেউ এ প্রশ্ন করলেই ভীষণ ক্ষেপে যেত গোলাপ।

এরপর গোলাপের সঙ্গে আমার আর তেমন যোগাযোগ ছিল না। বছর দুয়েক পর একদিন হঠাৎ করে সে হাজির হলো আমার এক ভাবীর বাসায়। এসেই বলল, আমাকে ওর খুব দরকার। সে আবার অমুক দিন আসবে। ভাবী যেন আমাকে খবর দিয়ে রাখে। আমার তখন বিয়ের কথা প্রায় চূড়ান্ত।

ভাবী বলল, তোমার বান্ধবী গোলাপ এসেছিল। একেবারে বোরকা-টোরকা পরে।

আমি বললাম, তাই নাকি? কী ব্যাপার?

ভাবী বললো, কি একটা চাকরির বিষয়ে তোমাকে ওর খুব দরকার।

গোলাপ এসেছিল। বাসায় যাতে ঢুকতে না হয়, আমি সেজন্য গলির মাথায় দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম রিকশা করে ও আসছে। কালো বোরকায় সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা, শুধু ওর টানা সুন্দর চোখ দুটো খোলা। চোখ দেখেই চিনে ফেললাম তাকে। হাতের ইশারা করতেই রিকশাটা থামল। আমি উঠে পড়লাম। জানতে চাইলাম, কোনদিকে যাবে?

বলল, আপনার যেখানে খুশি।

বললাম, রমনার দিকে যাবে?

বলল, চলেন যাই।

রিকশায় তেমন কথা বলিনি আমরা। শুধু বললাম, তোমার বোরকাটা খোলো। আমার অস্বস্তি হচ্ছে। রিকশায় বসেই খুলে ফেলল বোরকা।

রমনা রেস্টুরেন্টের এক কর্নারে গিয়ে বসলাম দুজনে। ফাঁকা রেস্টুরেন্ট। এই কথা সেই কথা কিন্তু কোনো কাজের কথা বলছে না। ওর অভিব্যক্তি দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, এতদিন পর সে চাকরির কোনো বিষয়ে কথা বলতে আসেনি। এমন কিছু বলতে চাইছে, যা অনেক গভীর কোনো বিষয়। কিন্তু বলতে পারছে না।

আমি ভাবছিলাম, সে যদি প্রপোজ করে ফেলে তাহলে সেটা রিফিউজ করাটা কঠিন হয়ে যাবে। তাই ও কিছু বলার আগেই আমি বললাম, আমার একটি সুখবর আছে।

সব শোনার পর ও শুধু বলতে লাগল, আপনি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করছেন কেন?

আমি বললাম, তাড়াতাড়ি কোথায়? আমার প্রায় সব বন্ধুই বিয়ে করে ফেলেছে।

তারপরও ও বলল, আপনি বলেন যে, আপনার নিজস্ব পছন্দ আছে।

আমি বললাম, কী বোকার মতো কথা বলছো। আমার কোনো নিজস্ব পছন্দ নেই বলার পরই আমার ফ্যামিলি এ প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এখন যদি বলি, আমার পছন্দ আছে, তাহলে আমাকে ঠ্যাঙাবে।

ও বলল, কোনোভাবেই কী এটা পেছানো যায় না?

আমি বললাম, না গোলাপ, এখন আর পেছানোর কোনো উপায় নেই।

এরপর টুকটাক কথা বলার পর সে বলল, আগামীকাল কি আপনার সঙ্গে দেখা হতে পারে?

আমি বললাম, কী বিষয়?

সে বলল, একটু দরকার আছে।

বললাম, সেটা এখনি বলো।

গোলাপ বলল, না, কালকেই বলব।

পরদিন গোলাপ আর আসেনি। ওর প্রসঙ্গটি এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু বিয়ের প্রায় ৫-৬ বছর পর ওর সঙ্গে হঠাৎ আবার দেখা হয়ে গেল একদিন মতিঝিলে। বলল, আমি এখানেই একটি অফিসে চাকরি করি।

সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি। আমি আমার ভিজিটিং কার্ডটা ওকে দিয়ে বললাম, ফোন করো।

মাঝে মাঝে টুকটাক কথা হতো। একদিন সন্ধ্যায় মতিঝিলের একটি রেস্টুরেন্টে অনেকদিন পর বসলাম দুজনে। অনেক কথার পর আমি বললাম, তুমি হয়তো আমার ওপর রাগ করেছ, কিন্তু বিশ্বাস করো, তুমি যখন এসেছিলে তখন আমার কিছুই করার ছিল না।

ও বলল, না, আমি আপনার ওপর রাগ করি নাই।

আমি বললাম, পরদিন তুমি আসো নাই কেন?

বলল, আমি সেদিন বাসা থেকে বের হতে পারিনি।

তারপর বলল, আমি ফোনে আপনাকে মিথ্যা কথা বলেছিলাম। আমি এখনো সিঙ্গেলই আছি।

আমি শুধু বললাম, কোনো বিশেষ কারণ বা কষ্ট…

শুনে ও হাসল। বলল, না, আসলে ব্যাটে-বলে মিলছে না।

সেদিন আমি ওকে রিকশায় পৌঁছে দিয়েছিলাম ওদের বাসায়। বাসার কাছাকাছি আসতেই আমি নেমে গেলাম। ও তার হাতটা বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। অনেকদিন পর আমি আবার তার হাতটা ধরলাম। মনে হলো, আমরা দুজন আগে যেমন ছিলাম, এখনো তেমনি আছি।

তারপর আরও কথা হয়েছে ফোনে। কিন্তু দেখা হয়নি আর। ও দেখা করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমিই এড়িয়ে গেছি।

আমি বললাম, তোমার সঙ্গে বেশি দেখা না হওয়াটা ভালো।

ও বলল, কেন ভয় পান নাকি?

আমি বললাম না, তা নয়। দুষ্টুমি করে বললাম, আসলে তুমি আমাকে আগে যেমন জেনে এসেছ, আমি এখন আর সেই মানুষটি নেই। এই যেমন ধর, আমি এখন আর কোনো ধরনের প্লেটোনিক লাভে বিশ্বাসী নই। আমি মনে করি, সত্যিকারের ভালোবাসায় মন ও শরীর দুটোই থাকা দরকার। প্লেটোনিক ভালোবাসায় এটা নেই বলে কষ্টটা অনেক বেশি। একমাত্র শারীরিক সান্নিধ্যই এই কষ্টটা কমিয়ে দিতে পারে। আর সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে এটা কোনো অন্যায় নয়।

জবাবে ও বলল, আমরা তো ওই পয়েন্টে কখনো যাইনি।

আমি বললাম, আমি তোমার কথা বলছি না। আমি আমার বর্তমান বিশ্বাসের কথা তোমাকে বলেছি।

এর বেশ কিছুদিন পর একদিন সন্ধ্যায় ও হঠাৎ করে ফোন দিল আমাকে। জানতে চাইল আমি কোথায়। বললাম, অফিসে।

একটু থেমে বলল, আজ আমার মনটা অনেক খুশি। সে জন্য আপনাকে ফোন দিলাম। আজ আপনি যা চাইবেন ঠিক তাই দেব আপনাকে।

প্রথমে মনে হলো, ও ফাজলামো করছে। পরে দেখলাম যে, না ও সিরিয়াস।

বললাম, তুমি বুঝে বলছো নাকি না বুঝে বলছো?

বলল, আপনি কি আমাকে ইমম্যাচিউরড মনে করেন?

আমি বললাম, না, তা কেন?

-তাহলে বলছেন না কেন?

আমি এক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। আমার সকল তাত্ত্বিক ভাবনাগুলো যেন খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। মনে হলো, আমি হেরে গেলাম ওর বিশ্বাস ও ভালোবাসার কাছে।

বললাম, না, কিছু চাই না। শুধু সত্যি করে একবার বল, আমাকে কতটা ভালোবাস?

জবাবে গোলাপ বলল, অ-নে-ক ভালোবাসি, অনেক অনেক ভালোবাসি।

আমি ফোন রেখে দিলাম। অনেকদিন পর আমার চোখ দুটো যেন ভিজে গেল।

লেখক : বিজনেস এডিটর, দ্য রিপোর্ট।

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

SMS Alert

ভালবাসার কথা এর সর্বশেষ খবর

ভালবাসার কথা - এর সব খবর