thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭, ৫ মাঘ ১৪২৩,  ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮
মাহমুদুল হাসান

দ্য রিপোর্ট

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের তিন বছর

আস্থায় আওয়ামী লীগ, কোণঠাসা বিএনপি

২০১৭ জানুয়ারি ০৪ ২২:০০:৫৮
আস্থায় আওয়ামী লীগ, কোণঠাসা বিএনপি

শক্তিশালী নেতৃত্ব ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচন করে ক্ষমতায় এলেও জনগণকে আস্থায় নিয়ে দেশ পরিচালনার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে দলটি।

অন্যদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে রাজনীতির মাঠে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সরকারের ব্যর্থতাকে কাজে লাগিয়ে সেভাবে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। সেই সুযোগে ঘর গুছিয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে একাদশ নির্বাচনেও প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ।

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। যার মানে হচ্ছে, এখানে যত অর্থই ঢালা হবে, তলা না থাকায় কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। সেই দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গত বছরের আগস্টে ঢাকা সফরে এসে বলে গেছেন, বাঙালি জাতির মেধা, পরিশ্রম আর একাগ্রতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে একসঙ্গে কাজ করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তার আগে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কৌশিক বসু ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশের অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা বিরল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

হেনরি কিসিঞ্জারসহ সব সমালোচকদের ভবিষ্যদ্বাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করে বাঙালি জাতি সোনার বাংলা গড়ে তুলেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের কাছে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।

এ সব অর্জন কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে নিয়ে এসে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়েছেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দিয়েও সফল হতে পারেনি বিএনপি। ওই নির্বাচনের বর্ষপূর্তি পালন করতে গিয়ে উল্টো চাপে পড়ে দলটি। টানা ৯২ দিন গুলশানে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পরেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ওই সময় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন খালদা জিয়া। সেই অবরোধ কর্মসূচি অনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়নি এখনও। তবে এর কার্যকরিতা হারিয়েছে অনেক আগেই। গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশ কর্মসূচি পালন এ বছর রাজধানীতে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেনি বিএনপি। বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ দিন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতে হাজিরা দিতে যাবেন। ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে ৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী ‍উদ্যানে সমাবেশ করতে চায় তারা।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দলটির কেন্দ্র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা এবং অঙ্গ দলগুলোর নেতাকর্মীদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনকে নিজেদের দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রক্তারক্তিতে অভিযোগ থাকলেও বিএনপি কোনো সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বক্তব্য, বিবৃতির মাধ্যমে অভিযোগ দিয়েই দায় সেরেছে তারা।

শুধু তাই নয়, অভিযোগে আছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর উপ-নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনের কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি করে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়। সে চিত্র প্রতিবেদন মিডিয়াতে প্রকাশ পায়। সবশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচনও বর্জন করে বিএনপি। এসব ইস্যুও কাজে লাগাতে পারেনি বিএনপি। তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণের সব চেষ্টাই করে আওয়ামী লীগ। গত বছর ২২ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন নির্বাচনের ‘শান্তিপূর্ণ’ ভোট গ্রহণের মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব এই বার্তা পৌঁছে দেয় আওয়ামী লীগ। নাসিক নির্বাচন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি এমন অভিযোগ তুলে উল্টো চাপে পরে বিএনপি।

দেশে অন্যতম প্রধান এই রাজনৈতিক দল দুটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় গত বছর। গত বছর ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের ২০তম কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়। কাউন্সিলের এক সপ্তাহ না পেরুতেই তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিএনপি ১৯ মার্চ একটি সফল কাউন্সিল সম্পন্ন করতে পারলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে তিন মাসেরও বেশি সময় নেয়। দল গোছাতেই বছর পর করে দেয় তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল ( অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে আছে। ৫ জানুয়ারি ১৫৩ জন বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছে। ওই নির্বাচনকে কোন নির্বাচন বলা যাবে না। গণতান্ত্রিক ধারায় এ নির্বাচন হয়নি। জেলা পরিষদও স্থানীয় নির্বাচনগুলোও জনগণ দেখেছে। এসব নিয়ে জনগণের মনে প্রশ্ন আছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। নতুন ইসি গঠন নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। জনগণ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি তুলেছে।’

জনগণের দাবি বিএনপি কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দাবি শেষ হয়ে যাইনি। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। এটা ঠিক আন্দোলন ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু আমরা বসে নেই। আন্দোলনকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে দুর্ভাগ্যবশত বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। তাদের ধারণা ছিল আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ফলে তারা নির্বাচনে আসেনি। পরবর্তীতে দেখা গেছে, দেশি-বিদেশি মিডিয়াসহ সাধারণ ভোটাররাও বলেছে নির্বাচন বিএনপির অংশগ্রহণ না করাটা ভুল ছিল। সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ বিএনপির সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধী দলে থেকে জনগণের জন্য কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারতো। জনগণ তাদের কাছ থেকে এটাই আশা করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর তারা নিজেরাও উপলব্ধি করতে পেরেছে, নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা তাদের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। বিএনপিকে আমরা সাধুবাদ জানাই, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। তারা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর ফলে বিএনপি সাংগঠনিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে ৫ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় অসমাপ্ত জবানবন্দি দিতে আদালতে যাবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হবেন বলে দ্য রিপোর্টকে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপরসনের আইনজীবী অ্যাডভোটেক সানাউল্লাহ মিয়া।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অপরদিকে বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দুই দলের কর্মসূচিকে ঘিরে নেতারা পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ৫ জানুয়ারি এ দেশের জনগণ বিএনপিকে মাঠে নামতে দেবে না। অপরদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ৫ জানুয়ারি বিএনপি মাঠে কর্মসূচি পালন করবেই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের তিন বছর পূর্তি ও গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালন করবে। এজন্য দেশব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের মাঠে থেকে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিন সারাদেশে কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি ঢাকা মহানগরে দুটি সমাবেশ হবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের উদ্যোগে রাসেল স্কয়ারে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৫ জানুয়ারি সারাদেশে মহানগর ওজেলায় জেলায় কালো পতাকা ও কালোব্যাজ ধারণের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দিনটিতে দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের কালোপতাকা উত্তোলন ও কালোব্যাজ ধারণের নির্দেশ দিয়েছে বিএনপি।

ফখরুল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ৫ জানুয়ারি কালোপতাকা মিছিল করার জন্য দলেরনেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালন উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগামী ৭ জানুয়ারি সমাবেশের জন্য পুলিশ ও গণপূর্ত বিভাগের কাছে অনুমতি চেয়েছে বিএনপি।

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যেত। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা গণতন্ত্র রক্ষা করেছি। এ কারণেই বিএনপি আজ কথা বলতে পারছে। কর্মসূচি পালন করতে পারছে। ওইদিন নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তারা ভুল করেছে। নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি যেভাবে জ্বালাও-পোড়াও করেছে, যেভাবে মানুষ হত্যা করেছে- তাতে দেশের জনগণ আগামীদিনে তাদের এ ধরনের কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেবে না।

(দ্য রিপোর্ট/এমএইচ/এপি/জানুয়ারি ০৪, ২০১৭)


পাঠকের মতামত:

SMS Alert

রাজনীতি এর সর্বশেষ খবর

রাজনীতি - এর সব খবর



রে