thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ জুন ২০১৭, ৮ আষাঢ় ১৪২৪,  ২৬ রমজান ১৪৩৮

ঢাবির বহিষ্কৃত অধ্যাপক ও কিছুকথা

২০১৭ মার্চ ০৯ ১৫:৫৯:৩৯
ঢাবির বহিষ্কৃত অধ্যাপক ও কিছুকথা

অবশেষে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার লিখিত চিঠি পেয়েছেন অধ্যাপক রিয়াজুল হক। তিনি বিগত ১১ বছর ধরে উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগে জেন্ডার এন্ড ডেভলপমেন্ট কোর্সটি পড়াচ্ছেন। বিষয়টিতে তিনি যে সব টপিকস পড়িয়েছেন, তাতে অপ্রাসঙ্গিক কোন ছবি ব্যবহার করেননি বলে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয়েছে। এছাড়া তার ব্যবহৃত ছবিগুলো আমি ফেইসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আগেও দেখেছি।

অধ্যাপক রিয়াজুলের বিরুদ্ধে যারা অভিযোগ করেছেন তারা সান্ধ্যকালীন কোর্সের এবং সবার বয়স ৩০-৫০ এর মধ্যে। তারা বিবাহিতও। অধ্যাপক রিয়াজুল দীর্ঘ দিন ধরে কোর্সটি পড়িয়ে আসছেন। নিয়মিত ব্যাচে অর্থাৎ অনার্স লেভেলে যারা তার এই কোর্সটি পড়ছেন তারা কেউ কখনো অভিযোগ করেনি। বাইরে থেকে সান্ধ্যকালীন কোর্স করতে এসে তারা অশ্লিলতার অভিযোগ তুললেন। নিয়মিত ব্যাচের অনেকেই বলেছেন অধ্যাপক রিয়াজুল শিক্ষার্থীদের সাথে ভাল আচরণ করেন এবং অনেক শিক্ষার্থীকে তিনি আপনি বলেও সম্বোধন করেন। তার কোর্সটি জেন্ডার বিষায়ক হওয়ায় তাকে নানা সময়ে বিভিন্ন ঘটনা থেকে উদাহরণ টানতে হয়।

তবে এরই মধ্যে অধ্যাপক রিয়াজুল যা দেখিয়েছেন এবং যা পড়িয়েছেন তা কোর্সের সাথে সম্পৃক্ত এবং তাতে অশ্লীলতার কিছু নেই বলে মতামত দিয়েছেন জেন্ডার গবেষক অধ্যাপক সাদেকা হালিম। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের তাদের কোর্সের কারণে যেসব বিষয় পড়তে হয়, তা পড়াতে যেয়ে যদি কোন অধ্যাপক চাকরিচ্যুত হন তবে ওই বিষয়টি পড়াতে অনান্য অধ্যাপকরা চাপ অনুভব করবেন এবং তারা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেবেন না বা কোর্সটি ব্যাখ্যা করবেন না। জেন্ডার গবেষক অধ্যাপক তানিয়া হকও বলেছেন, কোর্সটি পড়াতে গেলে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক চিত্র দেখানোর প্রয়োজন পড়ে, এখানে অশ্লিলতার কিছু নেই। জানা এবং বুঝার জন্যই এটা দেখানো হয়ে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে এসে যদি কোর্স কন্টেন্টের জন্য কোন শিক্ষার্থীর এত্ত আপত্তি থাকে তবে তাকে এ শিক্ষা না নেওয়াই উচিত। রক্ষণশীল মনোভাব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা আর না করা সমান কথা।

ওই কোর্সে ব্যবহার করা চিত্রগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য অশ্লিলতার পর্যায়ে পড়তে পাড়ে এমন ছবিগুলোর মধ্যে একটি হল প্যান্ট পরিহিত একজন শারিরীক ভঙ্গিমায় তার লিঙ্গ প্রদর্শন করছেন এবং আরেকটি হল লাক্স চ্যানেল আইতে প্রচারীত অনুষ্ঠানের একটি স্থীর চিত্র। এ দুটো ছবি সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। এবার লক্ষ্য করুন ছবি দুটো আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। যে ছবি সারা বাংলাদেশ দেখতে পারে সে ছবি ঢাবির শ্রেণি কক্ষে কেন আলোচিত হতে পারবে না?

কোর্স শেষ হয়ে গেছে ডিসেম্বরে। ফল পেয়েছে জানুয়ারিতে। নতুন কোর্সে ক্লাশও শুরু হয়ে গেছে, এমন সময় মনে পড়ল আগের কোর্সটি অশ্লীল ছিল! কোর্সে যদি অধ্যাপক রিয়াজুল ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্লীল কিছু যুক্ত করে থাকেন (কোর্স আলোচনার বাইরে যেয়ে) তবে কোর্স চলাকালীন বা কোর্স শেষ হওয়ার পরপরই কেন অভিযোগ আসলো না? ওই কোর্সে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা কেন কৃতজ্ঞতা স্বরূপ অধ্যাপক রিয়াজুলকে বাংলাদেশ ব্যাংক লোগো এবং রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি সম্বলিত রৌপ্য মুদ্রার ক্রেস্ট উপহার দিলেন?

কোর্সে অংশ নিয়েছে মোট ১৫জন। তাদের মধ্য থেকে তিন জন যদি অভিযোগ করেও থাকে (সেটা যে সময়ই করুক) তবে বাকি ১২জন অধ্যাপক রিয়াজুলের উপর সন্তুষ্ট এবং তারা তার কোর্স থেকে অনেক অজানা কিছু শিখেছেন বলে দাবিও করেছেন। তিন জনের ঠুনকো অভিযোগেই অধ্যাপককে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হল? লিখিত অভিযোগ করা হলে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু ইউসুফ কেন তাকে লিখিত নোটিশ দিয়ে সতর্ক করেননি? বহিষ্কার হওয়ার আগে কেন জানতে পারলেন না তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ এনে বিভাগের চেয়ারম্যান নিজের মত করে তদন্ত করে সিন্ডিকেট সভায় পাঠিয়ে দিলেন এবং তা উল্থাপন করার পর তদন্তের স্বার্থে তিনি সাময়িক বহিষ্কৃত হলেন। বহিষ্কার হওয়ার এক সপ্তাহ পরেও এখনো পর্যন্ত কেন কর্তৃপক্ষ থেকে লিখিত আকারে তাকে জানানো হচ্ছে না 'কে বা কার কি অভিযোগ করেছে এবং অভিযোগে কি বলা হয়েছে'?

বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জানা গেছে, উন্নয়ন অধ্যায়ন ফান্ডে প্রতি বছর মোটা অঙ্কের টাকা আসে এবং সে ফান্ড দেখাশুনা করেন পদাধিকার বলে বিভাগের চেয়ারম্যান। বিভাগের সিনিয়রিটি অনুযায়ী অধ্যাপক রিয়াজুলের পরবর্তী বিভাগীয় চেয়ারম্যান হওয়ার কথা। তাকে চেয়ারম্যান পদে আসীন হতে না দেয়া এবং ওই পদের জন্য তাকে অযোগ্য ঘোষণা করতেই নাকি ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পাতা হয়েছে। এ অভিযোগটি বর্তমানে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

যার পরবর্তীতে বিভাগের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা তিনি যদি গণমাধ্যমের খবরে হঠাৎ করে জানতে পারেন তকে বহিষ্কার করা হয়েছে তখন তার অবস্থা কি দাড়ায়? যতটুকু জানতে পেরেছি তিনি ব্যক্তিগতজীবনে একজন প্রাকটিসী মুসলিম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। তার বাবা কুমিল্লার (মৃত) মোজাম্মেল হক এক জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

অধ্যাপক রিয়াজুল এখনো বিবাহ করেননি। তার ঘরে অসুস্থ তিনটি বোন, দু'জন ক্যানসার আক্রান্ত এবং অপরজন হাইপ্রেসারের রোগী। ভাইয়ের বিরুদ্ধে এমন সংবাদ তাদের বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এরই মধ্যে অধ্যাপক রিয়াজুলের বেতন আটকে গেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্লগ এবং বাঁশেরকেল্লায় লেখালেখি হওয়ায় নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি বাসার বাইরে বের হতে পারছেন না।

আমরা একজন অধ্যাপককে (তাকে না জানিয়েই) বহিষ্কার করলাম। গণমাধ্যমে তাকে একজন যৌনতার দায়ে বা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক হিসেবে চিহ্নিত করা হল অথচ সে জানতেই পারলো না তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কি? আর এরই মাঝে তার পরিচিতজন, আত্বীয় স্বজন, সাবেক শিক্ষার্থী, বন্ধুমহল, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার এবং তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তাকে একজন কুরুচি সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। তার ইজ্জতের বারোটা বাজানোর পর ব্লগ এবং বাঁশেরকেল্লার হুমকির মুখে পড়ে তিনি গৃহবন্দী। এমন অবস্থায় তার অসুস্থ বোনের ক্ষতি হয়ে গেলে তার দায়ভার কে নেবে? গণমাধ্যম নাকি প্রশাসন?

সহকর্মীর বিপদের সময় খুব কমসহকর্মীই মুখ খোলেন। পরিচিত মানুষের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠলে পরিচিত চেহারাগুলোও কেমন যেন অপরিচিত হয়ে যায়। তাদের কণ্ঠস্বর বদলে যায়, বদলে যায় কথা বলার ভাষ্যও। অধ্যাপক রিয়াজুলের বহিষ্কারাদেশ নিয়ে প্রতিবেদন করতে যেয়ে, অধ্যাপক রিয়াজুল কিছু মানুষের তথ্য দিয়েছিলেন, যারা তার ঘটনার এবং কোর্সের পক্ষে কথা বলবেন বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। কিন্তু তারা অধ্যাপক রিয়াজুলকে চিনেন না বলেই মনে হয়েছে। কথা বলতে তাদের অনেক সংকোচ।

অথচ অধ্যাপক রিয়াজুল যাদের কথা উল্লেখ করেননি, তাদের মতামত নিতে যেয়েই বরং সাহসী উচ্চারণ শুনতে পেয়েছি। শক্ত অবস্থান নিয়ে যারা বলেছেন, "বাই নেমে কমেন্ট ছাপাতে পারেন"। উন্নয়ন অধ্যায়ন বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী অধ্যাপক রিয়াজুলকে সমর্থন করে কথা বলেছে। আবার অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তারা এত্ত ভিত যে এই লেখাটি পড়তেও তারা ভয় পাবেন! পাছে ভুলে লাইক অপশনে চাপ পড়ে যায়!!

আমার এ লেখা অধ্যাপক রিয়াজুলকে উদ্দেশ্য করে নয়। বরং ঐ সমস্ত সাহসী মানুষগুলোর জন্য যারা দুঃসময়ে পরিচিত মানুষের পাশে দাড়ান। সাহস করে সত্য বলেন। স্যালুট আপনাদেরকে।

এম.এস.আই খান

গণমাধ্যম কর্মী ও ঢাবি শিক্ষার্থী

[email protected]

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

মুক্তমত এর সর্বশেষ খবর

মুক্তমত - এর সব খবর



রে