thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

বিপাকে হাওর তীরের ৫ উপজেলার বানভাসী মানুষ

প্রকৃত কৃষকদের হাতে এখনও পৌঁছেনি ত্রাণ

২০১৭ মে ০২ ২০:১৪:৫৫
প্রকৃত কৃষকদের হাতে এখনও পৌঁছেনি ত্রাণ

সেলিম আহমেদ, মৌলভীবাজার : এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকি তীরের বানভাসী মানুষ শতভাগ বোরো ধান হারিয়ে পড়েছেন বিপাকে। হাওর তীরের ৫ উপজেলায় নেই কোন ন্যায্য মূল্যের দোকান। দু’দফা ত্রাণ বিতরণ হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। মঙ্গলবার পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি সরকারি সহায়তা বা ত্রাণ। ফলে হাওর তীরের কৃষককুল এখনও হতাশায় রয়েছেন।

হাকালুকি হাওর তীরের কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাওর তীরের কোন উপজেলায় ন্যায্যমূল্যের দোকান বা ওএমএস’র দোকান নেই। তাছাড়া চালের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। ফলে কৃষকরা পড়েছেন মহাবিপাকে। খুচরা বাজারে সর্বনিম্ন চালের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। এই দাম দিয়ে চাল কেনা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ৩০ এপ্রিল রবিবার সুনামগঞ্জ সফরকালে খাদ্যমন্ত্রীকে দুর্গত এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে ওএমএস এর দোকান খোলার নির্দেশ দেন। ইউনিয়নে তো দূরের কথা হাকালুকি হাওর তীরের কোন উপজেলায় ওএমএস এর দোকান নেই।

মঙ্গলবার সরেজমিনে হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের জাব্দা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক চিনু মিয়া জানান, ১২ কিয়ার (সাড়ে ৩ একরের বেশি) জমিতে বোরো ধান ক্ষেত করলাম। জমিতে কাঁচি নিয়ে নামতে পারিনি। শুনলাম সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে চাল ও নগদ অর্থ দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে তা নেই। চিনু মিয়ার কথা শেষ হবার আগে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা জড়ো হতে থাকেন। জাব্দা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা যেন গোটা হাওর তীরের বঞ্চিত কৃষকদের একই ফ্রেমে গাঁথা চিত্র।

প্রায় ২ একর আবাদ করেছেন দেলোয়ার আলী, সাড়ে ৩ একরের বেশি ক্ষেত করেছেন চেরাগ মিয়া, সাড়ে ৪ একর ক্ষেত করেছেন বারিছ মিয়া, ৩ একর ক্ষেত করেছেন কুটি মিয়া, দেড় একর ক্ষেত করেছেন লাল মিয়া, সাড়ে ৭ একর ক্ষেত করেছেন তাহির মিয়া, ২ একর ১০ শতক ক্ষেত করেছেন রাজা মিয়া, ২ একর ১০ শতক জমিতে ক্ষেত করেছেন ফজলু, ৩ একর ক্ষেত করেছেন আবুল মিয়া, আড়াই একর ক্ষেত করেছেন লিটন মিয়া, ২ একর ১০ শতক ক্ষেত করেছেন বাদশা মিয়া। তারা সবাই জানান, শুনেছি সরকারি সাহায্য (ত্রাণ) এসেছে। কিন্তু কারা পেল?- এমন প্রশ্ন তাদের। তারা ইউনিয়নে সাহায্য নেওয়ার জন্য যান না। ফলে তারা বঞ্চিতের তালিকায়। তাদের অভিযোগ, যারা সারা বছর সরকারি সাহায্য পায় তাদের যেন কপাল খুলেছে।

বরমচাল ইউনিয়নের কয়ছর উদ্দিন জানান, ২৬ কিয়ার অর্থাৎ ৯ একর ৮৮ শতক জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন। সবটাই ক্ষতি হয়েছে। কিছু পচা ধান তুলে তা থেকে যদি কিছু পাওয়া যায়, সেই আশায় পচা ধান ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। সরকারি সাহায্য বলতে তাকে ইউনিয়ন থেকে ২০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাড়িতে এনে ওজন করে দেখা যায় ১৭ কেজি ৪০ গ্রাম চাল হয়েছে। ৪ জনের সংসারে ১৭ কেজি চালে ২-৩ দিন না চললো। এরপর কি করবেন? এই ইউনিয়নের আলীনগর, মাধবপুর, উত্তর ভাগ, আকিল পুর, উছমানপুর এই এলাকার মানুষ বোরো চাষের উপর নির্ভরশীল। মূলত তারা বর্গাচাষী। বেলা সাড়ে বারোটায় বরমচাল ইউনিয়নে গেলে চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন সচিব কাউকে পাওয়া যায়নি।

ভাটেরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানান, হাকালুকি হাওর তীরের ভুকশিমইল ও ভাটেরা ইউনিয়ন শতভাগ বোরোর ক্ষতি হয়েছে। মাত্র ৯টন চাল তিনি বরাদ্দ পেয়েছেন। মাত্র ১০ কেজি করে ১৮ শ ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের মধ্যে ৯শ জনকে দিয়েছেন। দ্রুত ওএমএস চালুর দাবি জানান তিনি। দূর্গত মানুষকে পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী প্রদান ও হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে তারা আন্দোলনে নামছেন। ইউনিয়নের বেড়কুড়ি, শাহমীর, খামউরা, নওয়াগাঁও, শরীফপুর গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির দরিদ্র মানুষ, কৃষক ও জেলে মিলিয়ে ১৪শ জনকে সাড়ে ১৫ টন চাল ও ২২০ জনকে নগদ টাকা প্রদান করেছেন। তাঁর ইউনিয়নে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩ হাজার।

চেয়ারম্যানরা জানান, তাদের চেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত বরমচাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহবাব হোসেন চৌধুরী শাহজাহান ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছেন।

এ ব্যাপারে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, মৌলভীবাজার জেলায় ওএমএস এর দোকান নেই। দোকান চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখেছি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আজকের মিটিংয়ের পর তা বাস্তবায়ন হতে পারে। বিগত যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে, তা বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করার কথা। সেই নির্দেশনাও দেওয়া ছিলো। ত্রাণ বিতরণে কোন ধরনের গাফিলতি ও স্বজনপ্রীতি না হয়, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

(দ্য রিপোর্ট/এপি/এনআই/মে ০২, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর

জেলার খবর - এর সব খবর



রে