thereport24.com
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫,  ১১ মহররম ১৪৪০

পরিচয় গোপন করেছে দুই ‘ধর্ষক’

২০১৭ মে ০৮ ২৩:২৫:০৩
পরিচয় গোপন করেছে দুই ‘ধর্ষক’

রাজধানীর বনানীতে দ্য রেইন ট্রি হোটেলে সংঘটিত দুই তরুণীকে (২৩) ধর্ষণ মামলার প্রধান তিন আসামির মধ্যে দুজনের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের অনুসন্ধানে দুই তরুণের ভিন্ন পরিচয় পাওয়া গেছে।

মামলার প্রথম আসামি সাফাত আহমেদের (২৬) বাবা দিলদার আহমেদ আপন জুয়েলার্সের মালিক এই তথ্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কল্যাণে সবাই জেনেছেন। তবে দ্বিতীয় আসামি নাঈম আশরাফ (৩০) সবার কাছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে বলে দাবি করলেও সেটি ভুয়া পরিচয়। প্রকৃতপক্ষে নাঈম আশরাফ হচ্ছেন মোহাম্মদ নাসিমের ছেলের বন্ধু। তৃতীয় আসামি যার মাধ্যমে অভিযুক্ত ধর্ষকদের সঙ্গে ভিকটিমদের পরিচয় হয়েছে বলে জানা গেছে, সেই সাদমান সাকিফ (২৪) নিজেকে গুলশানের তেজগাঁও লিংক রোডে রহমান রেগনাম সেন্টারে পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে বলে দাবি করেছেন। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে তিনি ইভেন্টম্যানেজমেন্ট কোম্পানি রেগনাম গ্রুপের পরিচালক। তার বাবা মো. হোসাইন জনি রেগনাম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ধর্ষিতাদের কাছে নিজের পরিচয় গোপন করে সম্পর্ক করে সাদমান।

অভিযুক্ত আসামি সাফাত আহমেদ

আসামি সাফাতের বাবা দিলদার আহমেদ আপন জুয়েলার্সের মালিক। সাফাতের প্রথম স্ত্রী বেসরকারি একটি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকা ছিলেন। কিন্তু এ বিয়ে তার পরিবার মেনে নেয়নি। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ওরফে লামিয়া আশা (২৫)। ফারিয়ার বাবার নাম মাহবুব আলম। তিনি ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় বসবাস করেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর পরিবারের পছন্দে সাফাত দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

অভিযুক্ত সাফাতের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ দ্য রিপোর্টের কাছে দাবি করেছেন, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এমন কাজ করেছেন তার ছেলের সাবেক স্ত্রী। কারণ, তাদের বিয়ে পরিবার থেকে মেনে নেওয়া হয়নি। দুই বছর আগে বিয়ের পর সেই মেয়ের নানা ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য দেখে সাফাত তাকে তালাক দেয়। দু’মাস আগে ওই মেয়ের সঙ্গে সাফাতের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সেই মেয়েটি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই ষড়যন্ত্র করেছে। সাফাত এর সঙ্গে জড়িত না, সে ব্লাকমেইলের শিকার। সাফাত যদি অপরাধ করে থাকে তাহলে তার শাস্তি হবে, কিন্তু সে নিরপরাধ হলে যারা এই অপচেষ্টা করেছে তাদের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করা হবে।

অভিযুক্ত আসামি নাঈম আশরাফ

নাঈম আশরাফ নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের এক বড় নেতার ছেলে বলে দাবি করে। কিন্তু জানা গেছে যে ক্ষমতাসীন দলের এক বড় নেতার ছেলের নাম ব্যবহার করে তিনি পরিচয় দেন; আসলে তিনি ওই নেতার ছেলের বন্ধু। দ্য রেইন ট্রি হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে নাঈম ওই পরিচয়ই ব্যবহার করে। ওই রেস্টুরেন্ট সূত্রে জানা যায়, নাঈম ভাড়া নেওয়ার সময় যে ভিজিটিং কার্ড ও মোবাইল নম্বর দেয় তা দেখে তারা এই ধারণা করেন। নাঈম ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে জড়িত। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান তিনি আয়োজন করে দিতেন। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজের সূত্র ধরেই সাদমান সাকিফের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাঈমের কর্মস্থলের একটি সূত্রে জানা যায়, ক্ষমতাসীন দলের বড় নেতা বলেও সে নিজেকে অনেক জায়গায় দাবি করে। বিশেষ করে কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়াও সিরাজগঞ্জের ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও এমপিদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে এসে কনসার্ট করে যাওয়া গায়িকা ও অভিনেত্রীদের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন তিনি। তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় মিডিয়ার ভিন্ন ভিন্ন মেয়ের সম্পর্ক থাকার গুঞ্জন রয়েছে।

ঘটনার রাতে নাঈম সবকিছু করেছে, সেই সবচেয়ে বেশি নোংরামি করেছে। আর নাঈমের দেখাদেখি সাফাতও তাই করেছে বলে অভিযোগ করেছে ভিকটিমরাও।

অভিযুক্ত আসামি সাদমান সাকিফ

মামলার তিন নম্বর আসামি সাদমান পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে নন। তার বাবা মো. হোসাইন জনি রেগনাম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শুধু তাই নয়, সাকিফ নিজেও ওই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টরদের একজন। তার বাবা হোসাইন জনি একসময় জাতীয় পার্টির ছাত্র সমাজ করতেন, পরে যুবদলের রাজনীতিও করেছেন। তবে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। যদিও ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সাদমান সাকিফ পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিকের ছেলে।

এ প্রসঙ্গে পিকাসো রেস্টুরেন্টের অ্যাডমিন ও এইচআরের দায়িত্বে থাকা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজার সুমন দ্য রিপোর্টকে জানিয়েছেন, একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে সাদমান পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে। কিন্তু এটা সত্যি নয়। সাকিফ রেগনাম গ্রুপের মালিকের ছেলে। গুলশানের তেজগাঁও লিংক রোডে রহমান রেগনাম সেন্টারের লেভেল ১২-১৩ ও রুফটপ ভাড়া নিয়ে পিকাসো রেস্টুরেন্ট তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। রেগনাম গ্রুপের সঙ্গে পিকাসো রেস্টুরেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই। পিকাসো রেস্টুরেন্টের মালিক মাসুদ উদ্দিনের ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন।

ভুক্তভোগী তরুণীরাও জানায়, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতে গিয়ে বন্ধু সাদমান সাকিফের মাধ্যমে ওদের (অভিযুক্ত অপর দুই তরুণ) সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ঘটনার দিন পূর্ব পরিচিত সাদমান সাকিফ ওদের ধর্ষকদের সঙ্গে পরিকল্পনা করেই ভিকটিমদের ওখানে নিয়ে যায়। পরে সাদমান একবার রুমে এসে ভিকটিমদের অবস্থাও দেখে যায়।

এ সব তথ্য জানার পর সাদমান সাকিফের পরিচয় নিশ্চিত হতে রেগনাম গ্রুপের ওয়েবসাইটে গেলে গ্রাহকদের উদ্দেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসাইন জনি এবং ডিরেক্টর সাদমান সাকিফের দেওয়া বার্তা চোখে পড়ে।

অপরদিকে, পিকাসোর মালিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন ওয়ান-ইলেভেনের সময় গঠন করা 'গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি'র প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। এরপর দীর্ঘ ছয় বছর তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে দেশে এসে পিকাসো নামের এই পাঁচ তারকা মানের আন্তর্জাতিক চেইন রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে আলবাব মাসুদ অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন ও পড়াশোনা করেন। বড় মেয়ে তাসনুভা জেরিন কানাডার ওন্টারিওতে থাকেন। আর মাসুদ উদ্দিন তার স্ত্রী জেসমিন মাসুদ ও ছোট মেয়ে তাসনিয়া মাসুদকে নিয়ে রাজধানীর ডিওএইচএসের ফ্ল্যাটে থাকছেন।

এদিকে, ধর্ষণের আলমত প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ দ্য রিপোর্টকে জানিয়েছেন, দুই ভিকটিমকে আমরা পেয়েছি। ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তিনটি করে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষাগুলো হলো- মাইক্রোবায়োলজি, রেডিওলজি ও ডিএনএ। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দিতে পারবো। যেহেতু তারা বলছেন ধর্ষণের ঘটনাটি প্রায় দেড় মাস আগের। তাই এতোদিন পর ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সোহেল মাহমুদ ছাড়া কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন— কবির সোহেল, মমতাজ আরা, নিলুফার ইয়াসমিন ও কবিতা সাহা।

মামলার আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (ডিসি, মিডিয়া) মো. মাসুদুর রহমান দ্য রিপোর্টকে জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। একই সঙ্গে অভিযুক্তরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন সেজন্য তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিমানবন্দরে একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সোমবার (৮ মে) বনানী থানা থেকে এই নির্দেশনা গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার বরাবর পাঠানো হয়। সেখান থেকে ইমিগ্রেশনে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।

তদন্তে মানবাধিকার কমিশনের সদস্যের কমিটি

এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। তদন্তের অংশ হিসেবে কমিশন ইতোমধ্যে ওই দুই তরুণীর সঙ্গে সেদিনের ঘটনা নিয়ে কথাও বলেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহানা সাঈদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনায় ধর্ষক প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ মামলা নিতে দেরি করেছে এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের ভিত্তিতে কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক ঘটনাটিকে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন এবং ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় কমিশন অভিযোগ আমলে নিয়েছে। দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান ৫ সদস্য বিশিষ্ট তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. নজরুল ইসলামকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এবং কমিশনের অবৈতনিক সদস্য নুরুন নাহার ওসমানী, এনামুল হক চৌধুরী, অভিযোগ ও তদন্তের পরিচালক মো. শরীফ উদ্দীন ও সহকারী পরিচালক এম রবিউল ইসলামকে সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি, গুলশান) আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, হোটেল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ একমাসের ফুটেজ সংরক্ষণ করে থাকে বলে আমাদের জানিয়েছে। তাই ধর্ষণের ঘটনার দিনের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

অভিযান শুরু করেছে ডিবি

ডিএমপির গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (ডিবি) উপ-কমিশনার (ডিসি, উত্তর) শেখ নাজমুল আলম বলেছেন, ‘এরই মধ্যে ডিবির কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়ে গেছে। পুলিশের ক্রাইম টিমের পাশাপাশি আমরাও কাজ করছি। বনানীর ধর্ষণের ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছে। এরা যতই প্রভাবশালী হোক তারা মামলার আসামি। মামলার আসামিদের কোনো ধরনর ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের গ্রেফতারের জন্য যা যা করা প্রয়োজন তাই করা হবে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘মামলার তদন্তের স্বার্থে আসামিরা কোথায় আছে তা বলা যাচ্ছে না। তাদের ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। আরও কিছু তথ্য আমাদের জানা দরকার সেগুলো আমরা থানা থেকে নেব। ডিবি পুলিশ তাদের মতোই কাজ করবে। তারা (আসামিরা) বাইরে পালিয়ে গেছে কিনা এমন কিছু জানা নেই। তবে তারা যাতে বাইরে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

(দ্য রিপোর্ট/এমএসআর/জেডটি/এনআই/মে ০৮, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে