thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫,  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০

সুদের হার কমলেও গতি নেই বিনিয়োগে

২০১৭ জুন ২২ ২১:৪৩:৩৯
সুদের হার কমলেও গতি নেই বিনিয়োগে

কয়েক বছর আগেও দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে সুদের উচ্চ হারকে দায়ী করতেন উদ্যোক্তারা। তাদের অভিযোগ ছিল, সুদের উচ্চ হারের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পখাতে ১৮-২০ শতাংশ সুদ দিয়ে ব্যবসা করা কঠিন। উচ্চ সুদের কারণে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। বিনিয়োগে গতি আনতে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই দাবি তোলা হতো।

বর্তমানে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে ব্যাংকের আমানতের সুদের হার। ব্যাংকের আমানতের সুদের হার নেমে এসেছে ৫ শতাংশেরও নিচে। আমানতের সুদের হারের পাশাপাশি কমেছে ঋণের সুদের হার। বর্তমানে ৯ থেকে ১১ শতাংশ সুদে পাওয়া যাচ্ছে শিল্পঋণ। সে হিসাবে আগের তুলনায় প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশ কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু সুদের হার কমলেও ঋণের চাহিদা বাড়ছে না এবং বিনিয়োগে গতি ফিরছে না।

ব্যাংকাররা জানান, সুদের হার কমলেও ঋণের চাহিদা নেই। চাহিদা না থাকার কারণে ব্যাংকে আমানতের পাহাড় জমছে। এ কারণে নতুন করে আমানত সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর কোনো উৎসাহ নেই।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে সুদের হার। চলতি বছরের এপ্রিল মাস শেষে ব্যাংকিং খাতের আমানতের গড় সুদের হার দাঁড়িয়েছে চার দশমিক ৯৭ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে আমানতে সুদের হার কখনো এত নিচে নামেনি। বিপরীতে ঋণের সুদহার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। মার্চে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক শুন্য ১ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। অপরদিকে, ২০১৬ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদহার ছিল ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর আগের বছর ২০১৫ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদ হার ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। আর ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোতে আমানতের গড় সুদ হার ছিল ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ঋণের গড় সুদ হার ছিল ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ। আর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ঋণের সুদহার ছিল ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ।

বিনিয়োগ পরিস্থিতি দেখলে দেখা যায়, পাঁচ বছর আগেও দেশে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশের ওপরে। অথচ এখন তা ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মেয়াদী শিল্প ঋণ বিতরণ হয়েছে ৩২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। যা আগের ছয় মাসে ছিল ৩৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে মেয়াদী ঋণ বিতরণ কমেছে ৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

সুদের হার কমলেও বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে না কেন—জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, ‘সুদের নিম্ন হারই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের জন্য বিদ্যমান অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর না হলে সুদের হার কমলেই বিনিয়োগ বাড়বে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘শুধু সুদের হার কম হওয়াই বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো সুবিধা, রাজনৈতিক পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইনক্লুসিভ পলিটিক্স অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের দেশে করপোরেট কর হার খুবই বেশি। অর্থমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি করের এ হার কমাননি। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এ হার কমানো দরকার।’

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক ঊর্ধ্বতন ভাইস প্রেসিডেন্ট সেকিল চৌধুরী বলেছেন, ‘সুদের হার কমলেও বিনিয়োগে তার কোনো প্রভাব নেই।’ এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, ‘স্বল্প সুদে ঋণ পেলেই তো হবে না, সেটা তো বিনিয়োগ করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য যে অবকাঠামোগত সমস্যা সেটি এখনও রয়ে গেছে। শিল্প কলকারখানার জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাসের সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া নীতিগত বিভিন্ন বিষয়ে ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণেও বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না।’

উদ্যোক্তাদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ অবকাঠামোর স্বল্পতা, নীতি গ্রহণে ধারাবাহিকতার অভাব, সঠিক নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর অভাব, শিল্পের জন্য জমির অভাব, বিনিয়োগ বোর্ডে প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে বাড়ছে না বিনিয়োগ।
এ ছাড়া সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগ থাকলেও স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না থাকায় বিনিয়োগে পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়লেও সঞ্চালন ব্যবস্থার যথাযথ উন্নতি না হওয়ায় শিল্প কারখানাগুলোয় এলাকাভেদে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। গ্যাসের নতুন সংযোগ তো মিলছেই না, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে সংযোগ থাকা কারখানাগুলোতেও।

(দ্য রিপোর্ট/এমকে/জেডটি/এনআই/জুন ২২, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর