thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র ১৪২৪,  ২৭ নভেম্বর ১৪৩৮

দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে সময়

বাঁচার জন্য একটি করে টাকা চেয়েছেন আব্দুল জব্বার

২০১৭ আগস্ট ১১ ২২:০৫:১২
বাঁচার জন্য একটি করে টাকা চেয়েছেন আব্দুল জব্বার

সৈয়দ সফি
বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে প্রত্যেকটি সমাজে একই নামে রয়েছে শত-শত, হাজার মানুষ। তবে, নাম একই হলেও কারো সাথে কারো চেহারার মিল নেই। মিল নেই কাজ-কর্ম, চলন-বলনে। প্রত্যেকেরই শারিরীক গঠন তার সামাজিক অবস্থান ভিন্ন। তবে, একই নামে বহু মানুষ থাকলেও এমন কিছু নাম আছে, যে নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠে খুব চেনা একটি চেহারা। ঠিক তেমনী চেনা একটি চেহারার নাম আব্দুল জব্বার। বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বাংলা ভাষার মানুষের কাছে আব্দুল জব্বার মানেই প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী, কণ্ঠসৈনিক আব্দুল জব্বার। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক আব্দুল জব্বার। বাংলা সঙ্গীত জগতের কিংবদন্তি আব্দুল জব্বার।

আব্দুল জব্বার মানেই-
সালাম....সালাম হাজার সালাম.....
সকল শহীদ স্মরণে..................

মুজিব, বাইয়া যাও রে.......
নির্যাতিত দ্যাশের মাঝে জনগণের নাও রে..
মুজিব বাইয়া যাও রে.......................

মাগো ভাবনা কোনো, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে,
তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে লড়তে জানি, ....................

ওরে নীল দরিয়া, আমায় দেরে দে ছাড়িয়া.....

তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়..
দুখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়...


পৃথিবী তোমার কোমল মাটিতে কেন এতো সংঘাত..

পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি.....
তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছি.....

নীলুফার ইয়াসমিনের সঙ্গে দ্বৈতকন্ঠে-

এ আঁধার কখনো যাবে না মুছে আমার পৃথিবী থেকে....



কেবল ওপরের এই ক’টি গানই নয়, আব্দুল জব্বার তার ৭৮ বছর বয়সে আধুনিক, স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশাত্মবোধক, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্রে অজস্র গান গেয়েছেন। তার গাওয়া জনপ্রিয় গানের সংখ্যা হিসেব করে বলা যাবে না। তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য কালজয়ী গান। গানের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের কথা নতুন করে কিই বা বলার আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সময়ে গাওয়া তাঁর গানগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও প্রেরণা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কন্ঠসৈনিক আব্দুল জব্বারের অবদানের কাছে জাতি চিরঋণী হয়ে থাকবে। অথচ, কিংবদন্তি এই কন্ঠসৈনিক বর্তমানে রোগের সাথে যুদ্ধরত। নয় মাসের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়ী হলেও জীবন যুদ্ধে তিনি ঠেলে উঠতে পারবেন কি না সে কথা বলা কঠিন। কারণ গত তিন মাস ধরে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটেছে। চিকিৎসকের তথ্য মতে, আব্দুল জব্বারের দুটো কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া লিভার ও উচ্চ রক্তচাপের জটিলতায়ও ভুগছেন তিনি। এই মুহূর্তে তার চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া জরুরি হলেও বিদেশে নেয়ার রশদ তার নেই। তিনি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সাংবাদিকদের মাধ্যমে আব্দুল জব্বার দেশবাসীর কাছে আকুতি জানিয়ে বলেছেন, যখন লাইফ সাপোর্টে থাকব তখন অনেকে দেখতে আসবেন, মারা গেলে শহীদ মিনারে রাখা লাশে ফুল দেবেন, কিন্তু আমার এসব কিছুরই দরকার নেই। আমি আরও কিছুদিন এই সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই। এ জন্য আমার চিকিৎসার টাকা দরকার। পারলে সবাই একটি করে টাকা দিয়ে আমার চিকিৎসায় সহযোগিতা করুন। একজন খ্যাতিমান মানুষ কতোটা অসহায় হলে দেশবাসীর কাছে এমনভাবে সাহায্য চাইতে পারেন। সত্যিই ভাবতে কিছুটা অবাক লাগে, সঙ্গীত জগতের এক নায়ক যাকে মহানায়ক বলা হলেও ভুল হবে না সেই আব্দুল জব্বারকে চিকিৎসার জন্য যদি দেশবাসীর কাছে সাহায্য চাইতে হয় তা’হলে অন্যদের অবস্থা কি হবে।

দেশকে, দেশের মানুষকে তিনি তো কম দেননি। কম করেননি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ টাকা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগৎকেও কম সমৃদ্ধ করেননি তিনি।

বাংলাদেশের কিংবা বাংলা ভাষার এমন মানুষ খুব কম পাওয়া যাবে যার হৃদয়কে আব্দুল জব্বারের সঙ্গীত স্পর্শ করেনি। অথচ, সেই মানুষটাকে তার কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন জানানো বড় কষ্টের, বড়ই বেদনার।

এ ব্যাপারে গত ৯ আগস্ট বিকেলে আব্দুল জব্বারের ০১৭২০-১৭২৪৫৬ মোবাইলে কল দেয়া হলে তার পুত্র বাবুল কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, আংকেল দ্রুত সময় কমে আসছে। প্রতিদিন প্রচুর খরচ। আমরা পেরে উঠছি না। অনেকে এগিয়ে এলেও পর্যাপ্ত নয়। তাই, আব্দুল জব্বারকে কেউ সাহায্য করতে চাইলে ০১৭২০-১৭২৪৫৬ নম্বরে তার পুত্র কিংবা পরিবারের সাথে কথা বলে নিতে পারেন।

উল্লেখ্য, আব্দুল জব্বারের জন্ম ৭ নভেম্বর ১৯৩৮, কুষ্টিয়ায়। জব্বার ১৯৫৮ সাল থেকে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। তিনি ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের জন্য গান করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক হয়ে ওঠেন। ১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন চলচ্চিত্র সংগম-এর গানে কণ্ঠ দেন তিনি।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘একুশে পদক’ ও ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’। এছাড়াও পেয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ এবং ‘জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার’।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
মেল :[email protected]
ফেসবুক : https://www.facebook.com/

(দ্য রিপোর্ট/এজে/এনআই/আগস্ট ১১, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

শিল্প ও সংস্কৃতি এর সর্বশেষ খবর

শিল্প ও সংস্কৃতি - এর সব খবর



রে