thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪,  ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯

ক্যান্সার, অতপর ছুটি ...

২০১৭ অক্টোবর ০৪ ২৩:১৪:১৫
ক্যান্সার, অতপর ছুটি ...

বাহরাম খান : এই সময়ে ক্যান্সার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। প্রায় তিন হাজার বছর আগে এই রোগটি আবিষ্কৃত। ক্যান্সার নিয়ে ল্যাবরেটরিতে যত না গবেষণা হয়েছে তার চেয়েও বেশি গবেষণা হয়তো গত তিন দিনে বাংলাদেশের মানুষের মুখে হয়েছে।

ক্যান্সার সূত্রেই, ‘আই অ্যাম এ ডিসকো ডেন্সার। বিড়ি খাইলে হয় ক্যান্সার’ একটি লাইনের কথা মনে আসল । অনেক দিন পর লাইনটি মনে পড়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় এক বাইদানি মাথায় নেওয়া ঠুকরিতে থালা-বাসন বিক্রি করতে আসতেন আমাদের গ্রামে। তিনি সবার ভাবী হিসেবে পরিচিত, ডাকতাম ‘ডিসকে ভাবী’। অন্য অনেক বাইদানির চেয়ে তার পণ্যের বৈচিত্র বেশি। এ কারণে তিনি নিজের পণ্যকে ডিসকো অর্থাৎ আধুনিক পণ্য হিসেবে দাবি করতেন।

পণ্য বিক্রির ফাঁকে বিনোদ বিড়িতে দুর্দান্ত একটা টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোয়া ছাড়তেন আর ক্রেতা আকর্ষণের জন্য বড় গলায় হাক দিতেন, আই এম এ ডিসকো ডেন্সার, বিড়ি খাইলে হয় ক্যান্সার’। ক্যান্সার নামে মারাত্মক একটা রোগ আছে। সেই ডিসকো ভাবীর কল্যাণেই জানতে পেরেছিলাম।

ইংরেজি ক্যান্সার শব্দটির বাংলা অর্থ করা হয়- পচনশীল ক্ষত, ককর্ট রোগ ইত্যাদি। রোগটি আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই সারা বিশে^ হইচই পড়ে যায়। কারণ এই রোগের চিকিৎসা নেই। এখন আধুনিককালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে। ক্যান্সারেরও চিকিৎসা হয়, আবার অনেককে জীবন থেকে ছুটিও নিতে হয়। কর্মোদ্যোমী সাহসী মানুষেরা নিয়ম-কানুন মেনে ক্যান্সারকেও পরাজিত করতে পারেন। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগছে সমাজে যে ক্যান্সার বাসা বেধেঁছে সেই ক্যান্সার নিরাময়ের উপায় কী?

ব্ল্যাড ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, স্কিন ক্যান্সারসহ কয়েক প্রকার ক্যান্সারের কথা আমরা জানতে পারি। কিন্তু সমাজ দেহের ক্যান্সারের প্রকার অগুণিত। এই ক্যান্সার নিরাময়ের তো ওষুধ নেই যে, ছিটিয়ে দিলে মশার মত মরে যাবে। আসুন এক এক করে ক্যান্সার গণনা শুরু করি। যেহেতু অগুনিত প্রকার ক্যান্সার নিয়ে আমরা বাস করি, তাই অল্প কয়েকটির উদারহরণ দিয়ে শেষ করতে হবে।

সর্বশেষ ঘটনা। বিশ্বসুন্দরীরর প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে একটি প্রতিষ্ঠান ’বাংলাদেশ সুন্দরী’ বাছাই করার উদ্যোগ নিলেন। পুরুষ্কার ঘোষণার পরপরই বিতর্ক উঠল। বেশিরভাগ বিচারক গণমাধ্যমকে বললেন, তাদের দেওয়া নাম্বার অনুযায়ী সেরা সুন্দরী বাছাই করা হয়নি। তাহলে কিভাবে হয়েছে? প্রশ্নের উত্তর সচেতন মহল জানেন। দেখেন সামান্য একটি প্রতিযোগিতায় লোভ সংবরণ করা গেল না। এটাকে আমাদের চরিত্রে ক্যান্সার বললে কী ভুল হবে?

এই সময়ের আরেক আলোচিত বিষয় উল্টোপথে গাড়ি। মন্ত্রী ও সচিবের গাড়ি ধরল ট্রাফিক পুলিশ, যথারীতি জরিমানাও করলো। বাহবা পেল মিডিয়ার, সঙ্গে উপস্থিত জনতার করতালি। অর্ন্তদৃষ্টিতে দেখলে আমরা অন্য ঘটনা পাই। একজন সচিব পর পর দুই দিন উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে জরিমানা গুনেছেন। এটা তো তার আটচল্লিশ ঘন্টার জীবনের সামান্য একটি অংশের মহড়া। কিন্তু গত প্রায় ২৫-২৮ বছরের চাকরি জীবনে ওই সচিব কত উল্টো কাজ করে আমার দেশের প্রশাসনকে কলুষিত করে এসেছেন সেটা কী আমরা চিন্তা করতে পারি? এই প্রশাসনিক ক্যান্সার সারাবে কে?

বলি পুলিশের কথাই। পুলিশের কিছু মোটর সাইকেলের প্লেইটে লেখা থাকে একটা সঙ্কেত। পিএইচকিউ- . . . . নাম্বার। অর্থাৎ এটি পুলিশ হেড কোর্টারের গাড়ির সিরিয়াল নাম্বার। পুলিশ নিজেই রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালিয়ে অন্য আরেকটি ব্যক্তিগত গাড়ির রেজিস্ট্রেশন না থাকার জন্য জরিমানা করে তখন নৈতিক মানদণ্ড কী আর থাকে? আমার দেশের পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেমন জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করে তেমনি কন্ট্রাকচুয়াল সাত খুনও করে। নিজে আইন না মেনে যিনি আইনী ক্যান্সার প্রতিষ্ঠিত করতে চান তা কি বাস্তব সম্মত?

খুব সম্ভবত গত বিএনপি আমলের ঘটনার। স্বখ্যাত এক ডাক্তার নেতা লটারি খেলার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হলেন। তিনি আবার তিনবার ক্ষমতায় থাকা দলটির প্রধানের উপদেষ্টা পদেও রয়েছেন। সেই ব্যাক্তিটি জাতীয় একটি লটারী অনুষ্ঠানের ৪০ লাখ টাকার প্রথম পুরুস্কার পাওয়ার জন্য জালিয়াতি করেছিলেন। কোটি মানুষের নেতা ও কয়েকবার সরকার পরিচালনাকারী প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা যদি এরকম হয় তাহলে সেই সরকারটা কেমন চলেছে তা ব্যখ্যা করে বলতে হবে? যুক্তি তোলা যায়, কিছু দুষ্ট লোক তো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কোনো না কোনোভাবে যেতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ওইসব জালিয়াতি ঘটনার পরও যখন ওই ব্যক্তির পদ অটুট থেকে দলের মধ্যে দাপট আরও বাড়ে তাহলে? এই লোকটি তাহলে চিকিৎসক হিসেবে কী সেবা দিয়েছেন রোগীকে? হায় হায় এমন পেশাজীবত্বের ক্যান্সার বিশে^র আর কোথাও পাওয়া যাবে?

বছর পাঁচেক আগের ঘটনা। সাক্ষাৎকার নিতে গেলাম এক গুরুত্বপূর্ণ নেতার বাসায়। ড্রয়িং রুমে তার কয়েকজন অনুসারী আড্ডা দিচ্ছেন। কেউই জানেন না আামি সাংবাদিক। আড্ডাবাজদের সবাই সাবেক ছাত্রনেতা। ঠিকাদারি ব্যবসা করেন। তাদের মধ্যে এক নেতা তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্পে কিভাবে দুই কোটির টাকার বেশি লাভ করেছিলেন সেই গল্প বলছিলেন রসিয়ে রসিয়ে। সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের শাসানোর বিবরণও ছিল। এই রাজনৈতিক ক্যান্সারের গল্প সবার কাছেই একাধিক আছে। এগুলো আমরা কিভাবে সারাব?

এই সময়ের ক্ষমতার রাজনীতির অনেক বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বগুড়ার তুফান সরকার। বাসা থেকে ধরে নিজের বাসায় এনে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেই থামেননি। পরিবারসহ ধর্ষিতাকে শহর দেশ এমনকি দুনিয়া থেকেও সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আর তার এই কাজে সহযোগী হিসেবে পেয়েছেন নিজের ভাই, বোন ও স্ত্রীকে। মারহাবা ...। একে কী ক্যান্সার নাম দিব খুজেঁ পাচ্ছি না ।

ক্যান্সার বা কর্কট নামে একটি রাশিও গণনা করা হয়। রোগ এবং রাশির মধ্যে কী সম্পর্ক তা জানি না। তবে, রোগ এবং ক্ষমতার মধ্যে অনেক সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে ক্যান্সার রোগের মধ্যে। প্রাচীনকালের রাজারা অসুস্থ হলেও প্রজা এমনকি প্রাসাদের লোকেরাও জানতে পারত না। এতে নাকি রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশ হতো। কারণ দুর্বলতার সুযোগে ষড়যন্ত্রকারীরা নিজ কর্মে মেতে উঠত।

এই সময়ে বিদশে থাকা সাবেক এক প্রধানমন্ত্রীর রোগ নিয়েও পাল্টা-পাল্টি অনেক কথা হচ্ছে। কিন্তু আমরা শুধু ক্যান্সার নিয়েই কথা বললাম। আবারও মনে করিয়ে দেই, বিষয়টি ছিল বাংলাদেশ সমাজের ক্যান্সার ...বি. দ্র. অন্য কোনো বিশিষ্টজনের ক্যান্সার ও ছুটি গ্রহণের সঙ্গে এই লেখার কোনো সম্পর্ক নেই।

লেখক : সাংবাদিক

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/জেডটি/অক্টোবর ০৪, ২০১৭)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে