thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪,  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
সিরাজুল ইসলাম

তেহরান থেকে

সাদ হারিরির পদত্যাগ : আসলেই কী ইরান দায়ী?

২০১৭ নভেম্বর ০৫ ২০:২৪:১৬
সাদ হারিরির পদত্যাগ : আসলেই কী ইরান দায়ী?

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং লেবাননের ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহকে দায়ী করে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরি পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের সময় তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, লেবাননসহ কয়েকটি দেশে ইরান ‘ভয় ও ধ্বংসের’ বীজ বপন করেছে। তিনি তার বাবার হত্যার কথা উল্লেখ করে আরো বলেন, শহীদ রফিক আল-হারিরির হত্যাকাণ্ডের সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, এখন আমরা ঠিক সেই পরিস্থিতিতে বাস করছি। আমি বুঝতে পারছি, আমাকে হত্যার জন্য কোন ধরনের ছক তৈরি করা হচ্ছে।

মজার বিষয় হচ্ছে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে এক টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন। সাদ হারিরি হচ্ছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন সৌদি আরবে গিয়ে। কেন তিনি এ কাজ করলেন সেই রহস্যের কোনো কূল কিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় সাদ হারিরির নিজের দলের সংসদ সদস্যারা পর্যন্ত হতভম্ব হয়েছেন। তবে বিবিসি বলছে, সৌদি রাজ পরিবারের সঙ্গে সাদ হারিরির পরিবারের আলাদা ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং গত কয়েক দিনে তিনি কয়েকবার সৌদি আরব সফর করেছেন।

১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে সাদ হারিরি জন্মগ্রহণ করেছিলেন সৌদি আরবে এবং তিনি সেখানেই বেড়ে ওঠেন। পরে তিনি সৌদি আরবভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় নির্মাণ কোম্পানি ‘সৌদি ওগের’এর প্রধান হিসেবে ব্যবসা দেখভাল করেন। ২০০৫ সালে বাবা রফিক হারিরি নিহত হলে তিনি একেবারেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া লেবাননের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ২০০৯ সলে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। লেবাননের সংবিধান অনুসারে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নি সম্প্রদায় থেকে। সেই সুবাদে তিনি ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

পদত্যাগের আগে শুক্রবার সাদ হারিরি রাজধানী বৈরুতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সেই বৈঠকে সাদ হারিরি বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া উগ্র ও তাকফিরি সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার জন্য প্রতিরোধ সংগ্রামের বিকল্প নেই। ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলী আকবর বেলায়েতি।

সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘটনাটি নিয়ে এ মুহূর্তে বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে চলছে নানা বিশ্লেষণ। কারণ সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘটনা এমন সময় ঘটলো যখন সিরিয়া ও ইরাকে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএ’র পতন বলা চলে হয়েই গেছে। কেন সাদ হারিরি পদত্যাগ করেছেন তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু ঘটনাবলী ও প্রাসঙ্গিক বিষয় বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তবে তার আগে দেখা যাক- যে ইরানকে মূল দায়ী করে তিনি পদত্যাগ করেছেন সেই ইরান বিষয়টি সম্পর্কে কী বলছে।

ইরানের বক্তব্য :

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির বক্তব্যকে ইরান একেবারেই পাত্তা দেয় নি, বরং চূড়ান্তভাবে নাকচ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি বলেছেন, সাদ হারিরির পদত্যাগ সৌদি আরব, আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের ষড়যন্ত্রের ফসল।

বাহরাম কাসেমি আরো বলেছেন, তাদের কারণেই মূলত সাদ হারিরি ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন এবং এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে- লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়া।

বাহরাম কাসেমি বলেন, মি. হারিরির আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা এবং অন্য একটি দেশ থেকে সে ঘোষণা দেয়া খুবই দুঃখ ও আশ্চর্যজনক তবে এতে পরিষ্কার ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি আঞ্চলিক কুচক্রি মহলের হয়ে খেলছেন।” বাহরাম কাসেমি বলেন, “এ খেলায় আরব কিংবা মুসলমানরা কেউ জিতবে না বরং জিতবে ইহুদিবাদী ইসরাইল যে কিনা এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর ভেতরে ও বাইরে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে।

ইরানের এ মুখপাত্র বলেন, সাদ হারিরি এমন সময় পদত্যাগ করলেন যখন উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে চূড়ান্ত পতনের মুখে রয়েছে এবং যখন মার্কিন ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের হাতে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পুনর্গঠন জরুরি।

বাহরাম কাসেমি বলেন, ইরান বিশ্বাস করে যে, লেবাননের ধৈর্যশীল জনগণ তাদের দেশ নিয়ে নতুন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেবেন। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সবসময় আঞ্চলিক দেশগুলোর শান্তি ও নিরাপত্তা সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে ভাবে এবং তেহরান মনে করে এসব দেশের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে ইরানের স্বার্থ জড়িত। এ কারণেই ইরান এ অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা, অস্থিতিশীলতা, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে এত বেশি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।

বাহরাম কাসেমি বলেন, ইরান ও লেবাননের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র সবসময় লেবাননের স্বাধীনতা, স্থিতিশীলতা ও শান্তির প্রতি সম্মান দেখায়। অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে লেবানন সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতে ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি ঘোষণা দেন।

এর আগে, ইরানের সংসদ স্পিকারের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান বলেছেন, সাদ হারিরির পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর এবং এ সিদ্ধান্ত ইহুদিবাদী ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করবে। সাদ হারিরির পদত্যাগের পর ইরানের আল-আলম টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, এটি একটি চটজলদি পদক্ষেপ। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের পরাজয়ের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে খণ্ড-বিখণ্ড করার পরিকল্পনাসহ মার্কিন ও ইসরাইলি নানা ষড়যন্ত্রের ব্যর্থতার সঙ্গে এ পদত্যাগের সম্পর্ক রয়েছে।

আবদুল্লাহিয়ান আরো বলেছেন, সাদ হারিরির পদত্যাগের কারণে লেবাননে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে এবং এতে লাভ হবে দখলদার ইসরাইলের।

বিশ্লেষকদের মত :

সাদ হারিরিরি পদত্যাগের বিষয়ে আল-জাজিরা টেলিভিশনকে লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামাল ওয়াযনে বলেছেন, যেকোনোভাবেই দেখা হোক না কেন এটা একটা আকস্মিক ক্যু।” তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “সম্ভবত সাদ হারিরি সৌদি চাপের মুখে ভেঙে পড়েছেন যা মোটেই লেবাননের স্থিতিশীলতার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

কামাল ওয়াযনে বলছেন, লেবাননে সবকিছুই ঠিক ছিল। সেখানে নির্বাচন আসন্ন। সবাই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছেন কিন্তু সৌদি আরব থেকে একটি ফোন এল এবং সবকিছু বদলে গেল।

কামাল ওয়াযনে বলছেন, এটা ঘটলো এমন সময় যখন লেবাননের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে বলে জল্পনা চলছে, কিছু হুমকি আসছে ইসরাইল থেকে এবং সৌদি থেকে নানা উসকানি চলছে। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী মনে হয় সৌদি চাপের কাছে নতিস্বীকার করেছেন এবং সৌদি আরব থেকেই তিনি তার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এটা লেবাননের স্থিতিশীলতার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক আরব সেন্টারের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ হার্ব আল-জাজিরাকে বলেছেন, রিয়াদে বসে পদত্যাগের ঘোষণার মধ্যে মূলত এই ইঙ্গিত ফুটে ওঠে যে, তার সরকার কিংবা দেশের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

ইমাদ হার্ব আরো বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে হিজবুল্লাহ লেবানন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এখন সিরিয়ায় দামেস্ক সরকারের পাশাপাশি হিজবুল্লাহ বিজয়ী হতে চলেছে। এটা নিশ্চয় সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘটনায় প্রভাব ফেলেছে। আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি হয়ত জীবনের ভয় পাচ্ছেন।

সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘটনাকে লেবাননের দ্রুজ অ্যান্ড দ্যা প্রোগ্রেসিভ সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা ওয়াহিদ জামব্লাত বলছেন, সাদ হারিরির এ পদত্যাগের ঘটনা দেশের রাজনীতিতে খুবই বাজে প্রভাব ফেলবে। তিনি বলছেন, এটা হচ্ছে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সর্বশেষ প্রমাণ।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হোসেইন শেয়খুল ইসলাম এক টুইটার পোস্টে বলেন, হারির পদত্যাগের পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী হচ্ছেন ট্রাম্প এবং সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান।

সাদ হারিরি লেবাননের হিজবুল্লাহকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- হিজবুল্লাহকে ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিক সবরকমের সহযোগিতা দেয় প্রকাশ্যে এবং এ নিয়ে দু পক্ষের মধ্যে কোনো গোপন কিছু নেই। লেবানন যখন ১৯৮০’র দিকে ইসরাইলের দখলে ছিল তখন ইরান নানা চেষ্টায় হিজবুল্লাহ গড়ে তোলে এবং এই হিজবুল্লাহর সশস্ত্র লড়াইয়ের মুখে ১৯৯২ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনারা সরে যেতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি ২০০৬ সালে ইসরাইলের পূর্ণ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ ৩৪ দিন লড়াই করেছে এবং ইসরাইলি বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়; যেখানে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মাত্র ৬ দিনে পুরো আরব বিশ্ব ইসরাইলের কাছে পরাজিত হয় সেখানে হিজবুল্লাহ ৩৪ দিন লড়াই করে এবং জাতিসংঘ নিরাপাত্তা পরিষদে শান্তি প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে ওই যুদ্ধের বিরতি হয়।

যে হিজবুল্লাহ দেশের জন্য এতকিছু করেছে কেন সাদ হারিরি সেই শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন?

এ প্রশ্নের জবাবে অনেকেই বলছেন, সৌদি আরবের চাপের কারণে সাদ হারিরি আকস্মিকভাবে এমন অবস্থান নিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে এবং সিরিয়া ও ইরাকে সৌদি সমর্থিত উগ্রবাদীরা চূড়ান্ত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ইয়েমেনে অনেকটা চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া দুবছর আগে রিয়াদ যে সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল নানা কারণে তা আলোর মুখ দেখে নি। সপ্তাহ খানেক আগে রিয়াদে নতুন এক সম্মেলন হয়েছে যেখান থেকে সামরিক জোট গঠনের বিষয়ে নতুন তৎপরতা শুরু হয়েছে। এরপরই সৌদি সফরে গিয়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। যদি বিষয়টি এমন হয় তাহলে তা মুসলিম বিশ্বে জন্য অনেক বেশি আশংকার কারণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে