thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪,  ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯
সিরাজুল ইসলাম

তেহরান থেকে

কেন সৌদি আরব এমন করছে?

২০১৭ নভেম্বর ১৯ ২২:২০:৩৫
কেন সৌদি আরব এমন করছে?

মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জনমনে এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নটি হচ্ছে-কেন সৌদি আরব এমনআচরণ করছে? বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে ?

প্রশ্ন উঠছে- কেন প্রতিবেশী কাতার,লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ার সঙ্গে এভাবে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে সৌদি সরকার? মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে সৌদি আরব কি সত্যিই ইসরাইলের সঙ্গে জোট বাধছে?

বলার অপেক্ষা রাখে না- আরব বিশ্ব তথা গোটা মধ্যপ্রাচ্য চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে সময় পার করছে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে সৌদি আরব –সে কথা না বললেও চলে। একদিকে সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে দেশের ভেতরে এমনকি রাজপরিবারের সদস্য ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে; তেমনি প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চড়াও হচ্ছে। আর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে পারলে তো ‘গলাটিপে’ হত্যা করে। বলতে দ্বিধা নেই- সৌদি আরবের এসব আচরণ একটাও তার পক্ষে যাচ্ছে না;সবই যাচ্ছে তার স্বার্থের বিপরীতে। এমনকি, সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকারের এসব কর্মকাণ্ডের জন্য রিয়াদ চরম পরিণতির মুখে পড়তে পারে। কিন্তু কে বোঝাবে সে কথা‘দুরন্ত ষাঁড়’কে!

সৌদি আরব এই যে মুসলিম স্বার্থ-বিরোধী আচরণকরছে তার পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। আজকের লেখায় সেইসব কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করব।

এক-

ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়া পর দেশটিকে সরাসরি শত্রুর কাতারে ফেলেছে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইসরাইলএবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা। ইরানকে সেই একই কাতারে ফেলেছে সৌদি আরবও। অথচ, ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত উপরের প্রত্যেকটি দেশের সঙ্গে তৎকালীন রেজা শাহ সরকারের সুসম্পর্ক ছিল এবং তখন শিয়া মাজহাব কোনা সমস্যা ছিল না। ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেশ। সে প্রভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানই ছিল

নেতৃত্বের আসনে এবং আরবদেশগুলো সবাই ইরানকে সমীহ করে চলত।

রেজা শাহের এক স্ত্রী ছিলেন আরব দেশ মিশরের রাজকুমারি যার নাম ছিল দিলাওয়ার ফাওজিয়া। মজার বিষয় হচ্ছে রেজা শাহ নিজেওছিলেন শিয়া মাজাহাবের লোক। কিন্তু তখন

সৌদি আরব কিংবা অন্য কোনো আরব দেশ ইরানকে শিয়া মাজহাবের অনুসারি বলে শত্রু হিসেবে দেখে নি। আর ইসরাইলের সঙ্গে ছিল অর্থনৈতিকও সামরিক সম্পর্কসহ সব

রকমের সম্পর্ক। আমেরিকার সঙ্গেও সেই একই রকমের রমরমা সম্পর্ক ছিল।

বিপ্লবের আগে আমেরিকাই ইরানের পরমাণু স্থাপনা তৈরি করে দিতে চেয়েছিল।শুধু তাই নয়, বিপ্লব সফল হওয়ার বছর খানেক আগে ইরানকে প্রায় দেড়শ এফ-১৬ জঙ্গি বিমান দেয়ার জন্য চুক্তি করেছিল মার্কিন সরকার। এ বাবদ অর্থও দিয়েছিল রেজা শাহের সরকার।কিন্তু যখন ইসলামি বিপ্লব সফল হলো তখন থেকে সৌদি আরবসহ প্রায় সমস্ত আরব দেশ (সিরিয়া বাদে) শত্রুতা শুরু করল। আর ইসরাইল, আমেরিকা

ও ব্রিটেন ইরানের বিপ্লব নস্যাৎ করে দেয়ার জন্য সব রকমের ষড়যন্ত্র শুরু করে। সেই সময় সৌদি আরবকে দিয়ে ইরানকে মুসলিম বিশ্বে শিয়া প্রধান দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আমেরিকা, ইসরাইল ও তার মিত্ররা। ইরানের বিপ্লবকে তারা ‘শিয়া বিপ্লব’ বলে প্রচার করতে থাকে। এ কাজে সৌদি আরব নেতৃত্ব দেয়।

পবিত্র মক্কা ও মদিনার কর্তৃত্ব তাদের হাতে থাকায় মুসলিম বিশ্বে সহজেই সে প্রভাব কাজে লাগাতে পারে সৌদি আরব। এ কাজে তারা তেল বিক্রির বিপুল অর্থ খরচ করে। ইরানের বিপ্লব সৌদি আরবসহ কোনো মুসলিম দেশের জন্যই ক্ষতির কারণ ছিল না; প্রধান ক্ষতির কারণ ছিল আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্র এবং ইসরাইলের জন্য।কিন্তু সৌদি আরবকে নানা ভয় দেখিয়ে কৌশলে সৌদি আরবের মাধ্যমে ইরানভীতি ও শিয়া-বিদ্বেষ ছড়িয়ে আমেরিকা তার স্বার্থ হাসিল করার পথ বেছে নেয় এবং সৌদি আরব সেই ফাঁদে পা দেয়। সেখান থেকেই আধুনিককালে ইরানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো সৌদি আরব যা নিতান্তই আমরিকা ও ইসরাইলের স্বার্থে যাচ্ছে। অথচ নাম দেয়া হয়েছে- শিয়া সুন্নির দ্বন্দ্ব। কিন্তু বাস্তবতা

হচ্ছে- এটা শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব নয় বরং এটা মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব; কিছুটা আদর্শের দ্বন্দ্ব।।

কিন্তু সে কথা বুঝতে দিতে চায় না তারা, সেজন্য সৌদি আরবকে সামনে রেখে ব্যবহার করছে। আর সৌদি আরব অন্ধের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অবস্থা দূর করার জন্য ইরান ইসলামি ঐক্যসপ্তাহ পর্যন্ত ঘোষণা করেছে কিন্তু সেই ঐক্যের দিকে যায় নি সৌদি আরব। বরং দিন দিনে অনৈক্যকে চরম অবস্থায় নেয়া হয়েছে। মূলত এই শত্রুতার পেছনে রয়েছে মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থ। সৌদি আরবকে ব্যবহার করে

তারা সেই স্বার্থ নিশ্চিত রেখেছে বহুদিন ধরে।

দুই-

ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর সারা বিশ্বে যে বার্তাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তা হচ্ছে-আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করেও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোযায়। বেঁচে থাকা যায় আত্মসম্মান নিয়ে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদগুলোর ওপর মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর যে একচেটিয়া আধিপত্য এবং দখল দারিত্ব ছিল, ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর তা হুমকির মুখে পড়ে। আমেরিকা তখন ঠিকই বুঝতে

পেরেছিল যে, এই বিপ্লব টিকে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে তার তেল-স্বার্থ চরমভাবে বাধার মুখে পড়বে। অতএব, বিপ্লবের প্রাথমিক অবস্থাতে তা শেষ করে দেয়ার জন্য ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দামকে কাজে লাগায় এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। ১৯৮০ সালে সাদ্দাম সাতিল আরবে নিজের

কর্তৃত্বের বাহুল্য দাবি তুলে ইরানের ওপর আগ্রাসন চালায় এবং প্রতিবেশী দুটি মুসলিম দেশ দীর্ঘ আট বছর প্রাণঘাতীযুদ্ধ করে। শেষ পর্যন্ত ইরানের তীব্র প্রতিরোধের মুখে কোনো লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয় সাদ্দাম।

এই যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ -তা চপিয়ে দিয়েও ইরানের বিপ্লবকে নস্যাৎ করা যায় নি বরং দিন দিন ইরান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একদিন যে ইরাক সরকার প্রতিবেশী ইরানের ওপর আগ্রাসন চালিয়েছিল সেই ইরাক এখন সরাসরি ইরানের প্রভাব-বলয়ে এবং সাদ্দাম করুণ পরিণতি বরণ করেছে। ইরাক ইস্যুতেও আমেরিকা, ইসরাইল ও পশ্চিমা কূটচক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ইরাক-ইরান যুদ্ধে অর্থের বিরাট বড় যোগানদাতা ছিল সৌদি আরব এবং কুয়েত। সেই কুয়েতের ওপরই পরবর্তীকালে সাদ্দাম আগ্রাসন চালায় এবং ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ ২৫ বছর সম্পর্ক ছিল না সৌদি আরবের। এসব ঘটনার ফলাফল ইরানের ইসলামি সরকারের ঝুলিতে গেছে,

অন্যদিকে শুধুই ক্ষিপ্ত হয়েছে আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক দোসররা।

তিন.

ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর তার ঢেউ লাগার কথা ছিল প্রধানত আরব বিশ্বে। কারণ আরব বিশ্বের প্রায় সব দেশেই রাজতান্ত্রিক অথবা স্বৈরতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। এসব দেশের জনগণ মুক্তি চায় কিন্তু সেই পরিবেশ তারা তৈরি করতে পারে নি কিংবা নানাভাবে দমন-পীড়ন চালিয়ে পরিবেশ তৈরি করতে দেয়া হয় নি। আরব দেশগুলোতে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে এবং যেসব রাজা-বাদশাহ ও তাদের পরিবার যুগ যুগ ধরে দেশের সম্পদ ও জনগণকে শোষণ করে আসছে তাদের সে সুযোগ থাকবে না। ফলে গদি দখলে রাখতে মরিয়া এসব সরকার। সেই সুযোগ নিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ; তারা রাজতান্ত্রিক সরকারগুলোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা দেয়-বিনিময়ে চায় তেল সম্পদ। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় টিকে আছে আরবরাজ-বাদশাহরা। ইরানে বিপ্লব সফল হওয়ার পর যেহেতু আরব রাজা-বাদশাহদের গদি হুমকির মুখে পড়ে সে কারণে ক্ষমতা ধরে রাখা জন্য মার্কিন মন্ত্রণাতেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গড়ে তোলা হয় তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলোর জোট উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি।কিন্তু এই জোট শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বড় কোনো সফলতা অর্জন করতে পারে নি। জোটের পক্ষ থেকে যত কর্মসূচি বা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা বরং ইরানকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করেছে। শেষ পর্য্ত এ জোট এখন মৃত্যুর মুখে। গত ৫ জুন জিসিসি’র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী দেশ কাতারের ওপর সর্বাত্মক অবরোধ দিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন কয়েকটি দেশ দোহাকে ইরানের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং ইরানও সে সুযোগ লুফে নিয়েছে। খাদ্যসামগ্রী ও জরুরি পণ্য নিয়ে ইরান কাতারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলে কার্যত ভেঙে গেছে ইরান-বিরোধী উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি। এ কাজে তুরস্ককেও পাশে পেয়েছে ইরান। একইভাবে সৌদি উদ্যোগে যে আরব লীগ গঠন করা হয়েছিল তাও এখন প্রকৃত অর্থে অকার্যকর।

চার.

২০১১ সালে তিউনিশিয়ায় বিপ্লবের মাধ্যমে আরব বিশ্বে পরিবর্তনের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল তাতে সৌদি আরবসহ পুরো আরব বিশ্বে রাজতন্ত্রের পতনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল যা পশ্চিমা জগতে আরব বসন্ত নামে পরিচিতি পেয়েছে। সে

সময় কৌশলে আমেরিকা আন্দোলনের গতি থামিয়ে দিতে সিরিয়ায় গোলযোগ সৃষ্টি করে এবং ব্রিটেন, ইসরাইল, সৌদি আরব, কাতার,সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করায়। মুসলিম ব্রাদারহুডকে ক্ষমতায় বসানোর মিথ্যা পরিকল্পনা প্রচার করে। এজন্য আরব ও পশ্চিমা জগত থেকে হাজার হাজার সন্ত্রাসীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিয়ে সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছে এবং তাদের পেছনে এসব দেশ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের

আরবদেশগুলো হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা এমনকি আমরিকা ও ইসরাইলের সেনারা ছদ্মবেশে সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছে।সিরিয়ার আসাদ সরকার হচ্ছে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এছাড়া, আসাদ সরকার হচ্ছে লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাস এবং জিহাদ আন্দোলনের প্রধান আঞ্চলিক সাহায্যকারী। ইসরাইলের দোরগোড়ায় সিরিয়ার অবস্থান। দেশটি সামরিক দিক দিয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল এবংইসরাইল-বিরোধী প্রতিরোধের প্রথম ফ্রন্ট হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে সিরিয়ায় সেই আরব বসন্তের ঢেউ নিয়ে থামিয়ে দেয়া হয়। যে আরব বসন্ত ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আন্দোলন, সেই আরব বসন্তকে পরিণত করা হয় কথিত জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে।

পরবর্তীতে সে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ইরাকেও বিস্তার ঘটানো হয়। কিন্তু বিষয়টি ইরান প্রথমেই বুঝতে পেরেছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। পরবর্তীতে কৌশলগত কারণে রাশিয়ার সহায়তা নিয়েছে সিরিয়া সরকার। ওদিকে, লেবাননের হিজবুল্লাহ আন্দোলন সিরিয়ার সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এখন সৌদি-মার্কিন-ইসরাইলি মিশন চূড়ান্তভাব ব্যর্থ হতে চলেছে। ইরাক ও সিরিয়া এখন উগ্র আইএএস সন্ত্রাসীদের হাত থেকে প্রায় মুক্ত।

ইরাক এরইমধ্যে ঘোষণা করেছে সিরিয়া সীমান্তবর্তী রাওয়া শহর মুক্ত করার মধ্যদিয়ে ইরাকে আইএস’র কথিত খেলাফতের অবসান হয়েছে।এই যে সিরিয়া ও ইরাকে ব্যর্থতা -এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এই পরিকল্পনার আওতায় ছিল বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা এবং আমেরিকার হাতে ছিল ‘নিউ মিডলইস্ট প্ল্যান’। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধের কারণে তার সবই ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি বলয়ের ব্যর্থতা ঢাকতে তারা সবাই মিলে এখন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে এবং তারই অংশ হিসেবে সৌদি আরবকে দিয়ে নতুন নতুন নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে।

পাশাপাশি সৌদি আরব ও আমেরিকা এ আশংকাও করছে যে, সিরিয়ায় নিয়ে যে আরব বসন্তের ঢেউ থামানো হয়েছিল তা এখন খোদ সৌদি আরবের দিকে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারই কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে সৌদি রাজপরিবারের লোকজনকে আটক করার ঘটনায়।

পাঁচ.

আরব বসন্তের ঢেউ লেগেছিল ইয়েমেনেও। তখনকার শাসক আলী আব্দুল্লাহ সালেহ ছিলেন সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তার ৩২ বছরের শাসনের অবসানের জন্য জনগণ যখন ফুঁসে উঠেছিল তখন সৌদিআরব সালেহকে রক্ষার জন্য সবরকমের পদক্ষেপ নিয়েছে। এমনকি বোমা হামলায় আলী আবদুল্লাহ সালেহ আহত হলে সৌদি আরবে তাকে চিকিৎসা করানো হয়।

মনে রাখা দরকার- আলী আবদুল্লাহসালেহ কিন্তু নিজে মাজহাবগত দিক দিয়ে একজন শিয়া মুসলমান এবং এই শিয়া শাসককে যুগযুগ ধরে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া সৌদি আরবের জন্য কখনই সমস্যা হয় নি। কিন্তু পরবর্তীতে সালেহ দেশে ফিরে ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পরে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখাদিলে আলী আবদুল্লাহ সালেহ হুথিদের পক্ষ নেন। ইয়েমেনে শুরু হয় মানসুর হাদির পতন আন্দোলন এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। তখনই আলী আবদুল্লাহ সালেহকে শিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং শুরু হয় শিয়াদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে হাদির কাছে ফিরিয়ে দেয়ার নামে বেসামরিক মানুষের ওপর সৌদি গণহত্যা। সৌদি আরব অনেকগুলো আরব দেশকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকার মতোই ‘গণতান্ত্রিক যুদ্ধ’ শুরু করে এবং ধারণা করেছিল যে,স্বল্প দিনের মধ্যে সে মিশন শেষ করা যাবে। কিন্তু হুথি যোদ্ধা ও সালেহ অনুগত সেনারা সৌদি পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছে। আড়াই বছরের বেশি সময়

পার হলেও ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো কূল-কিনারা করতে পারে নি সৌদি আরব। বরং দিন দিন ইয়েমেনের যোদ্ধারা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এতে সৌদি সম্পদ ও সামরিক শক্তির ক্ষয় হচ্ছে অনেক বেশি। সৌদি আরব সবসময় অভিযোগ করে আসছে ইরান সাহায্য দিচ্ছে হুথি আন্দোলনকে। ফলে সর্বাত্মক অবরোধ দিয়েছে ইয়েমেনের ওপর। তারপরও দুর্বল করা যাচ্ছে না হুথিদের।

এখানেও বলা হচ্ছে- ইয়েমেনের যুদ্ধ চলছে মূলত শিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্বের জন্য। কিন্তু আসল সত্য হচ্ছে এটাওশিয়া-সুন্নির কোনো দ্বন্দ্ব নং বরং সৌদি আরব ও মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জগতের স্বার্থে লড়াই। সে লড়াই চালাচ্ছে প্রধানত ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন। সৌদি আগ্রাসনে মারা যাচ্ছে ইয়েমেনের শিয়া-সুন্নি সবাই। ইয়েমেনের লড়াইয়ের পেছনে মূল যে ইস্যু রয়েছে তা হচ্ছে- এডেন উপসাগরের বাব আল-মান্দেব

প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। উত্তরে পারস্য উপসাগরে ইরানের হাতে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। দক্ষিণে এডেন উপসাগরে বাবআল-মান্দেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে গেলে আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্রদেরজন্য সমস্যা হবে বলেই তারা মনে করে। ফলে বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ যাতে হুথিদের হাতে না যায় সেজন্য ইয়েমেনে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে হুথি আন্দোলনকে নির্মূল করতে চায় সৌদি আরব। তবে, পরিস্থিতি দেখে একথা বলা যায়- মার্কিন পরিকল্পনায়

চলমান সৌদি আগ্রাসনও ব্যর্থ হচ্ছে। হুথিদের প্রতি ইরানের নৈতিক সমর্থন রয়েছে। ফলে তারা এখন ইরানকে টার্গেট করেছে।

ছয়.

ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন ও জার্মানির যে পরমাণু চুক্তি হয়েছে ইরানের জন্য তা কূটনৈতিক দিক দিয়ে বিরাট বিজয়। ইসরাইল ও সৌদি আরব চেয়েছিল এ চুক্তি যেন না হয়।তারা মূলত চেয়েছিল ইরানের পরমাণু স্থাপনা চিরদিনের জন্য গুঁড়িয়ে দেয়া হবে এবং পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনার বিষয়ে ইরানের কোনো অধিকার থাকবে না। কিন্তু, পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে ইরানের অধিকার মেনে নেয়া হয়েছে এবং ইরান পরমাণু কর্মসূচি

অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল বাজারে ইরান তার আগের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। এর কোনোটাই সৌদি আরব ও ইসরাইলের পছন্দ নয়। এছাড়া, পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে ইরানের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও যোগ্যতার বিরাট প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই রকম নজির স্থাপিত হয়েছে সিরিয়া যুদ্ধে। ইরান নিজে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও এ সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর দেশে পরিণত হয়েছে।

সাত.

মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ঘটনাবলীতে আসলে পরাজয়ের তিলক জুটেছে আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদি আরবের কপালে। কিন্তু তারা দেখাতে চায়- তারা পরাজিত হয় নি।

তা না হলে আমেরিকার পরাশক্তির মর্যাদা থাকে না; ইসরাইলের থাকে না আঞ্চলিক বড় সামরিক শক্তির মর্যাদা আর আরব বিশ্ব ও মুসলিম জাহানে সৌদি আরবের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব থাকে না। এছাড়া,মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ঘটনাবলীতে সৌদি আরব এখন আগ্রাসী শক্তি হিসেব চিহ্নিত,পক্ষান্তরে মজলুম জনতার ত্রাণকারী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে ইরান। ফলে ত্রিশক্তির এ চক্র নতুন ফন্দি-ফিকির করে ইরানকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিতে চায়। তারা ইরানকে যুদ্ধে জড়িয়ে দিয়ে নিজেদের কাতারে নামাতে চায় এবং ইরানের কূটনৈতিক সফলতাগুলো মুছে ফেলতে চায়। ইরানকে পরিচিত করতে চায় যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে।

ইরানের সমস্ত কার্যক্রম ও প্রতিরোধ আন্দোলন ছিল মূলত নিপীড়িত-শোষিত মানুষের কল্যাণে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদী শক্তির আধিপত্যের অবসান ঘটানো। কিন্তু সৌদি আরবকে ভুল বুঝিয়ে আমেরিকা, ইসরাইল ও পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজেদেরকে বন্ধু ও ইরানকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরেছে।

গণভিত্তিহীন শাসকগোষ্ঠীর যেহেতু প্রাণবায়ু এসবশক্তির হাতে সে কারণে তারা তাদের কোনো পরিকল্পনা ও কথার বাইরে যেতে পারে না বরং সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেরা নিরাপদ বোধ করে। দিনের পর দিন এইসব অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে সৌদি আরব ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।পক্ষান্তরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান দিনে দিনে আঞ্চলিক বড় শক্তি হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সৌদি আরব ইরাককে দিয়ে কিংবা আইএস সন্ত্রাসীদের সাহায্যে ইরান ও মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও সাম্প্রতিক ব্যর্থতায় অনেকটা উন্মাদ হয়ে উঠেছে। এ কারণে সৌদি আরব এখন নিজেই মাঠে নেমেছে এবং সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। আমার মতে- এটা তার পতনের চূড়ান্ত লক্ষণ।কারণ পাহাড়ের শীর্ষদেশে ওঠার পর শুধুই নিচেই নামার প্রশ্ন থাকে। উপরে ওঠার আর সুযোগ নেই। সৌদি আরব ইয়েমেনে আগ্রাসন চালিয়ে সেই শীর্ষদেশে উঠে গেছে; এখন তার পতনের প্রশ্ন। হিজবুল্লাহকে দমনের নামে লেবাননে যদি সামরিক হস্তক্ষেপ করে তাহলে সৌদি আরবের সেই পতন কেবলই ত্বরান্বিত হবে।

লেখক:সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে