thereport24.com
ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৫,  ৪ নভেম্বর ১৪৩৯

গল্প

পরবাস

২০১৭ ডিসেম্বর ১৭ ০৭:৪১:৪৪
পরবাস

আশান উজ জামান

বেয়াড়া শরীর। ফাঁক পেলেই শুতে চায়।
দুপুর গড়িয়েছে। এই একটু অবসর। চোখ লেগে আসে আসমার। শুধু শোয়ার অপেক্ষা। কিন্তু শরীরের নাম মহাশয়! তাকে আর যাই হোক পাত্তা দেয়া ঠিক না। দিলও না সে।
ছাদভরা কাপড়। টানা রোদ পড়ছে। রং চোষা রোদ। বেশিক্ষণ রাখা যাবে না কাপড়গুলো। শুকোলেই নামাতে হবে।
গা ঝাড়া দিয়ে উঠল তাই।
ছাদের কোণায় কোণায় খুঁটি। তাতে দড়ি বাঁধা। এপাশ থেকে ওপাশে। ওপাশ থেকে সেপাশে। ভেজা কাপড়গুলো ওতেই শোয়। রোদ পোহায়। তারপর শুকিয়ে যায়। তারপর ঘরে ফেরে। একমনে তারই আয়োজন করছিল আসমা। আর গুণগুণ করছিল। তখনই চোখ গেল নিচের দিকে। রাস্তায়। এক বৃদ্ধা হাঁটছেন। বুকটা ছাৎ করে উঠল। শাশুড়ির মতোই দেখতে। খেয়াল করে দেখল। এবং যা ভাবেনি তাই, শাশুড়ির মতো না, উনি ওর শাশুড়িই! অমনি চিৎকার জুড়ল সে। কিন্তু কাজ হলো না। ভ্রুক্ষেপই করল না মা।

বুকটা ভেঙে যাচ্ছে আসমার। কতদিন অপেক্ষা করেছে এই দিনের! কতরাত অপেক্ষায় ছিল সে! অথচ পেয়ে ধন আবার হারানো! না, তা হতে দেবে না। দৌড় লাগালো। দুই তলা। একতলা। একফালি উঠোন। তারপর গেট। খোলাই থাকে সবসময়। আজ কে যেন আটকে দিয়েছে। খুলতে একটু সময় লাগল। তারপরেই পথ। কিন্তু ফাঁকা যে সব! মায়ের চিহ্ন পর্যন্ত নেই! রাস্তাজুড়ে খা খা। যতদূর চোখ যায়। সামনে সোজাপথ। কিছুদূর গিয়ে বাঁক। ডানে ঘুর। তারপর বাঁয়ে। তারপর মোড়। বড় রাস্তা। অতদূর নিশ্চয় পৌঁছায়নি মা। এখনো সুযোগ আছে।
তাই থামল না আসমা। সাধ্যমত দৌড়ালো।


দুপাশের বাড়িগুলো পেছনে সরে যাচ্ছে। জল পিছিয়ে গিয়ে যেমন নৌকাকে এগিয়ে দেয়। বাড়িগুলোও তাই করছে। এগিয়ে দিচ্ছে আসমাকে। দিক। যেভাবেই হোক, যার সাহায্যেই হোক, মাকে আজ পেতেই হবে।
প্রতিদিন কেঁদেছে সে। মোনাজাত করেছে। যেন দেখা পায় শাশুড়ির। ক্ষমা চাইবে। পায় পড়বে। কতকিছু বলার আছে তার! বলবে।
ডাক শুনেছে আল্লা। মাকে পাঠিয়েছে তার কাছে। আর তাকে হারাবে না হেলায়। খুঁজে আজ পেতেই হবে।
২.
বিঘেটাক জমি। দুটো ফসল ফলে। অন্য সময় এটা সেটা লাগান মতির মা।
বাড়ির সামনেই মতির মুদি দোকান। তেলটা নুনটা ঝালটা চলে আসে।
দুজনের সংসার। রোদে মেঘে ভালোই চলে দিনসব। আলোয় কালোয় মন্দ ভালোয় কাটে রাত।
কিন্তু সে ভালোয় মন উঠল না মতির। বিদেশ যাবার জন্য পাগল হলো। পাগল হওয়া তো সহজ, মন চাইলেই হওয়া যায়। কিন্তু বিদেশ যাওয়া কি মুখের কথা? কত টাকা লাগে। কত আয়োজন।
অতসব জানে না মতি। তার বিদেশ যাওয়া চাই। ওপাড়ার মিলন গেছে একবছরও হয়নি। এর মধ্যেই দোতালা হাকিয়েছে। লিটন সর্দারের বউ যে আস্ত একটা চাতাল কিনে ফেলল, সেও তো বিদেশি টাকায়। কথা ঠিক। কিন্তু পাতাকুঁচি গ্রামের আলমও তো বিদেশেই গিয়েছিল। সে যে মাস না যেতেই লাশ হলো! মা বাপ যে মাটিও দিতে পারল না কবরে! তা যা হয় হবে। এই নুন আনতে পান্তা ফুরোনো ভাল্লাগে না। পান্তাও চায় সে, নুনও। একসাথে।
না পেরে রাজি হলেন মতির মা।
মাঠের জমিটা বিক্রি করা হবে। বন্ধক রাখা হবে ভিটেটা। যাবার খরচ মিটে যাবে। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে দোকানটা বড় করে দেবে মতি। একলা পেটে কষ্ট হবে না মা’র। এই হলো সাব্যস্ত।
সবকিছু ঠিকঠাক। মাস খানেক পর ফ্লাইট।
আসন্ন পুত্রবিরহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মতির মা। শোক ঘন হচ্ছে। পাতলা হচ্ছে চোখের জল। এমন অবস্থায় বউ নিয়ে বাড়ি ফিরল মতি!
গন্ডগ্রামে বিয়ে খেতে গিয়েছিল। কনের ছোটবোনকে মনে ধরল খুব। এতটাই যে বিয়ে না করে সে ফিরবে না। এভাবে কি বিয়ে হয়? দেখা নেই শোনা নেই। অচিন পাত্র। তার হাতে মেয়ে দেবে কেন বাপমা? মতির বন্ধুরা ছিল বলে রক্ষা। শফির খালাতো বোন। খালা খালুকে বুঝিয়ে সে-ই ব্যবস্থা করল।
মেনে নেবার কোন কারণ মতির মার ছিল না। ফেটে যাচ্ছিল বুকটা তার। এ দিনও দেখতে হলো!
মতির বাপের কথা মনে পড়ছিল। সে থাকলে আজ এমন হতো না। লোকটাকে নেয়ার সময় আল্লা তাকেও কেন নিল না? কাঁদছিলেন তিনি। আর স্বর ভাঁজছিলেন। ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়। মাথা নেড়ে সাঁয় দিচ্ছিল বাঁশেরা। মাথা নাড়ছিল কলাবাগান। তিরতির কাঁপছিল মজা কুয়োর পানি। ঘাই মেরে উঠেছিল একটা মাগুর। বা শোল। অথবা কোলাব্যাং। যেই হোক সে, বোঝা গেল মতির মার কষ্ট সেও বোঝে। উল্টোকথা শুধু মতির বন্ধুদের। নানাভাবে বোঝাচ্ছে তাকে। মেয়ে খুব ভালো। লক্ষী। কয় ক্লাশ পর্যন্ত নাকি পড়েছেও। বউ হিসেবে ভালো হবে। তাছাড়া মতি চলে গেলে একা হয়ে যাবে না মা! হাতে ধরতেও তো একজন লাগে। নাকি?
প্রতিবেশি দুএকজনও সুর মেলায়।


বুঝে, অথবা কোন বুঝ না পেয়ে, ঘরে এলেন মতির মা। বরণ করলেন বউকে। সুন্দরী না হলেও বউটা অসুন্দর না। পছন্দই হলো তার। রূপের চেয়ে বউয়ের গুণই পছন্দসই বেশি- বোঝা গেল দুদিন বাদেই।
দারুণ কাজের হাত মেয়েটার। একাই করে সব। হাত দিতেও দেয় না শাশুড়িকে।
যত্নআত্তির চোটে অস্থির লাগে তার। সারাজীবন অপরের জন্য খাটে যারা, তাদের জন্য কেউ করে না কিছু। করলেই তাকে মাথায় তুলে রাখতে ইচ্ছা হয়। মতির মারও সেই দশা। সকাল দুপুর কাছে ডাকেন বউকে। তেল দিয়ে দেন মাথায়। বেনী করে দেন। রঙিন রঙিন ফিতা বেঁধে দেন। লাল নীল হলুদ। হলুদ কমলা সবুজ। রঙিন চুল নিয়ে সারাবাড়ি ঘুরে বেড়ায় বউ। বাচ্চা মেয়েদের মতো। পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে শাশুড়ির। এত সুখ!
এই সুখ ফেলেই ছুটতে হলো মতিকে। বিদেশের পেলেন অপেক্ষায় ছিল তার। উড়াল দিল।
তার দুদিন আগে শহরে গেল মতি। মা আর বউকে নিয়ে। কেনাকাটা করল। শাড়ি জামাকাপড় বড় ব্যাগ টলি ইত্যাদি। তারপর মিরানী হোটেলে খেল তিনজনে। ভাত গোশত। মিষ্টি আর দই।
দইয়ের স্বাদ যেন মুখে লেগে আছে। আজো। আহ!
কী দিন গেছে! সত্যিই কি এমন ঘটেছিল? নাকি তার কল্পনা সব? গুলিয়ে ফেলেন মতির মা।
সারাদিন আজ কিছুই পড়েনি পেটে। পড়বে বলে মনেও হচ্ছে না। নাড়ি চোঁ চোঁ করছে।
দুপুর গড়িয়ে গেছে। এখন কি আর মিলবে কিছু?
শহরের সবকিছু কেমন কেমন। রোদের তলক বেশি। ছায়ার গায়েও তাপ। গ্রামের ছায়ার সাথে এর কোন তুলনাই হয় না। হাসফাঁস লাগে তাই।
টলতে টলতে হাঁটছেন মতির মা। মাথার উপর আগুন। আঁচ তার পায়েও। দুপাশের প্রাচীরগুলো যেন ছুটে আসছে তার দিকে। ইদানীং এমন হয় খিদে লাগলে। মনে হয় দেয়ালগুলো পিষে মারবে। পারতপক্ষে তাই তাকান না দেয়ালের দিকে।
গেটে গেটে দাঁড়ান। কলবেল বাজান। টিং টিং টুং টাং বাজে। শোনেন। কিন্তু বেরোয় না কেউ। মাফ চায় শুধু!
কত অবিশ্বাসী শহুরে মানুষ! কত স্বার্থপর! দুর্দিনে দোয়া করার জন্যই কেবল গেট খোলে। লোক খাওয়ায়। খরচ করে। সুদিনে ফিরেও তাকায় না ফকির ফাকরার দিকে।
একটা গেট অবশ্য খুলে গেল আজ। এবাড়ির লোক নিশ্চয় কষ্টে আছে।
কী সুন্দর বাড়ির ভিতরটা! ইয়া বড় বিল্ডিং! সামনে কত্ত জায়গা। পুরোটা জুড়েই গাছগাছালি। কামরাঙা লেবু জবা বরই আম। গাছের শেষ নেই। গেটের সামনেই ঝাকড়া মতো একটা গাছ। নাম জানেন না। ওর ছায়ায় বসলেন। তারপর গলা ছাড়লেন আবার।
স্বর যেন বা বেরোয় না। আটকে আসছে জিবটা। সংকোচ আর লজ্জায়। আর ক্ষুধায়। প্রতিবারই এমন হয়। কারও কাছে কিছু চাইতে গেলেই। মাটিতে মিশে যান তিনি। ভিক্ষাকে খুব অপছন্দ করতেন তার স্বামী। বক্কর মিয়া। খুব হাসিখুশি লোক ছিলেন লোকটা। দিনভর খাটতেন। আর পেটভরে খেতেন। খাওয়াতেনও। কত রঙের মানুষকে যে খাইয়েছেন! কতজনকে যে পথ করে দিয়েছেন রোজগারের! পাড়ার সাত্তার আলিকে আজ দেখে কে বলবে যে তার ভাত জুটত না? কে বলবে বাদ দেয়া জুতো জামায় দিন কাটাতো? তার স্বামীই তো ডেকে এনে টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন হাতে। সেই টাকা ক’টাই বেড়েবুড়ে আজ ওই পাহাড়।
স্বামী নেই। কিন্তু স্বামীর কথা আছে। স্বামীর পছন্দ অপছন্দ এখনো মেনে চলেন। শুধু এই ভিক্ষে করা ছাড়া। কপাল। সব কপাল। না হলে এমন কেন হবে তার?
ছেলে উড়াল দিল। মাস যায়। ছ’মাস যায়। খোঁজ নেই তার। চোরাই ভিসা। জেলে টেলে পচছে কিনা কে জানে।
দোকানে মাল নেই। খদ্দেরও নেই। লোকজন বাকি খেয়েছে। খেয়েই ভুলে গেছে। এদিকে হাঁড়ি চলে না মতির মার। একদানা চালও নেই ঘরে। দিন চলছে তরকারি খেয়ে। একবেলা সজনে শাক। আরবেলা বিচিকলা। কাঁঠালের ইচড়। কলার থোড়। মোচা। বুনো আমড়ার টক। কচুর শাক। তরকারির অভাব হয় না গ্রামে। কিন্তু ভাত?

বেচাকেনা নেই জেনেও দোকান খোলা হয়। প্রতিদিন। কেউ যদি পাওনা টাকা দিতে আসে! কিন্ত কারও দায় পড়েনি। কেউ আসেওনা। চেয়ে চেয়েই হয়রান হন শুধু। কাজ হয় না। দেবে দেবে করে। দেয় না। কী দিন যে এল!
বউটাও কেমন যেন হয়ে গেছে। লাজলজ্জার বালাই নেই। সারাদিন বসে থাকে দোকানে। জোয়ান ছেলেরা ভীড় করে। গল্প জমায়। সবচে’ বেশি কালু। অন্যরা থাকে দলবলে। সে থাকে একা। যখন কেউ থাকে না, তখন। কালুর সামনে আসমার হাসিও যেন ছড়ায় বেশি। একেবারে গ’লে গ’লে পড়ে! বর প’ড়ে আছে হাজার ক্রোশ দূরে। বেঁচে আছে কি না খোঁজ নেই। বউ আছে তার নাঙেদের নিয়ে। সহ্য হয় না। বারণ করেছেন। শোনে না।
তার মধ্যেই অসুখ হলো মতির মার।
বেঘোরে ঘুমোন। হুঁশ নেই। ফিরতে লাগল ছ’দিন।
চোখ খুলেই ম্যাজিক! বিছানার পাশে ওষুধের সারি। আপেল কমলা! নতুন শাড়ি। ভাত জোটে না, এসব আনল কে? অতিকষ্টে বের হলেন তিনি। নতুন শাড়ি শুকোচ্ছে আড়ায়! তার মানে গোসল করেছে বউ। সাতসকালে! তার সোনামানিক ফিরে এসেছে নাকি? ইয়া মাবুদ! এত পাপী বান্দার ডাকও তুমি শোনো! কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠেন। তারপর ডাকেন মতিকে। বউকে ডাকেন। সাড়া নেই। নড়তে পারছেন না। তবু দোকান পর্যন্ত গেলেন। ওই তো বউ। গল্প করছে! দোকান ভর্তি মাল। কীভাবে আসলো সব? কিছু বলে না বউ। শুধু হাসে।
এমনিতেই মেজাজ তিরিক্ষি। তায় বউর এই ঢং। রাগ চড়ে যায়। খুলে দেন মুখের লাগাম। চলতে থাকে গালির নহর।
বেগতিক দেখে দোকান বন্ধ করে বউ। বাড়ি ঢোকে। তারপর রহস্য ভাঙে। ধার নিয়েছে।
কে দিল?
কালু।
অমনি ফুঁসে ওঠেন মতির মা। এ তিনি জানতেন। কালুর সাথে এত ঢলাঢলি। এমনি এমনি তো আর কেউ টাকা দেয় না। ও ধার যে কিসের ধারে পাওয়া, তা তিনি বোঝেন। ওই পাপের ভাত ছোঁবেন না তিনি।
কিন্তু খিদের কাছে হার মানে না কে? ভাত তাই ছুঁতেই হয়।
কদিন ধরে ভালোই চলে। খাওয়া পরার কষ্ট কমে। কিন্তু ভাল্লাগে না তার। মতিটার খোঁজ পাননি তখনো।
আসমারও বাড় বেড়েছে।
ভালোমন্দ রান্না হলেই দিয়ে আসে কালুকে। কালুও দিয়ে যায় এটা সেটা। চোখে না হয় কমই দেখেন, কিন্তু দেখেন তো! এড়ানো যায় না তাই। প্রায়ই আসমা গোসল করে সকালে। কাপড় শুকোয় লুকিয়ে।
একরাতে যেন শব্দও পেয়েছেন ওঘর থেকে। কেমন যেন ঘেন্না লাগে তার। দুএকবার জিজ্ঞেস করেছেন। জবাব দেয় না বউ। গলা চড়ান তিনি। পাড়া মাথায় তোলেন। তার মাথায় বাজ পড়ে না কেন? মরণ হয় না কেন? এমন বউর হাতে খান তিনি! দোজখেও তো জায়গা হবে না তার।
এর মধ্যেই খোঁজ মিলল মতির। প্রথম ক’মাস পালিয়ে বেড়িয়েছে। মাসতিনেক হলো মিটে গেছে ঝামেলা। কাজ পেয়েছে। টাকাও পাঠিয়েছে। অনেক টাকা!
দুখের আঘাতে অসুস্থ্য হয়েছিলেন কদিন আগে। এবার হলেন সুখের ঘায়ে।
সুস্থ্য হয়ে দেখেন বউ নেই। ঘরে ছোপ ছোপ রক্ত। ইশ! বউটাকে কেউ মেরে ফেলল না তো! না। শোনা যায় কালুও নিখোঁজ! তার মানে বউ তার বেরিয়ে গেছে। তাহলে রক্ত কেন? হিসেব মেলে না।
অমিল হিসাব সহ্য হয় না মানুষের। না মিললেও তাই মিলিয়ে ছাড়ে।
সবাই বলে পালিয়েই গেছে আসমা। লোকের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য রক্ত ঝরানো!
অনেকগুলো টাকা রেখে দিয়েছিলেন তিনি। ছোট টিনের বাকশোটার ভিতরে। তালা দেয়া থাকত। ভাঙলে শব্দ হবে, তাই বাকশোটা নিয়েই গেছে!
এই ছিল বেশ্যাটার মনে? তার ছেলের টাকা দিয়ে নাঙ পুষেছে!
‘ও মাগী, তুই বেরোবিই যকন আগে বেরোলি নে ক্যান? গার রক্ত পানি করা টাকা। না খেয়ে না দেয়ে পাটালো বাছা আমার। সেই টাকা নিয়ে গেলি! তোর হাত নুলো হবে। কুষ্ট হবে তোর।’
সেই যে গেছে আর দেখা পাননি কোনো দিন।
কষ্ট বেড়েছে। খোরাক নেই। ঘরের চালে ফুটো। পানি পড়ে। একা মানুষ। রোগশোকে দমে গেছেন। বল নেই গায়। গোছাতে পারেন না কিছু। অথচ তার ছেলে টাকা পাঠায়! সে টাকা ভোগ করে বেরোনো বউ। ভুলটা মতিই করেছিল। একাউন্ট খুলেছিল বউর নামে। বউ বলতে ঘেন্না হয়। বেজন্মা। খানকি। না হলে এমন কেউ করে! এক ভাতারের টাকায় গড়ে আর ভাতারের ঘর!
একদিন ব্যাংকে গিয়েছিলেন।
সে এক কাণ্ড! তার ছেলের টাকা, তাকে দেবে না! ম্যানেজারটা কী শয়তান! বলে কি, যার একাউন্ট তাকে লাগবে। কত অনুনয় কত বিনয়। কাজে লাগল না।
তারপর একটা বুদ্ধি এল মাথায়। মাগিটা নিশ্চয় টাকা তুলতে আসে। তাকে পেলেই তো হলো!
তাই বসে থাকতেন। ব্যাংকের সামনে।
একদিন। দুদিন। একসপ্তা। দুসপ্তা।
না, দেখা মিলল না। ভাঙা মনে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু ঘরে ওঠা গেল না। বাড়ি আর তার নেই। বন্ধক রেখেছিলেন। ছাড়িয়ে নিতে পারেননি। সাত্তার আলির বাহুর জোর। দখল নিয়েছে।
সেদিন বৃষ্টি ছিল। তার দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল খড়ের চাল। চালটা ছেয়েছিলেন তার স্বামী। মনে আছে। আকাশ তারপর কতবার বদলে গেছে! শুকনো তাজা খড়গুলো বুড়ো হয়েছে, তার মতো। পচে গেছে। তার গা ধুয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। রং চায়ের মতো রং। স্বামীর মুখটা ভাসছিল চোখে। ভাসছিল মতির চেহারা। আর বুক জ্বলছিল। ক্ষোভে। স্রষ্টার প্রতি। এত নিষ্ঠুর কেন তিনি!
সেই যে ঘরছাড়া হলেন, আর ওমুখো হননি। ভিক্ষে ছাড়া উপায় নেই। পেটের দায়ে ঘোরেন। আর এখানে সেখানে ঘুমান। যেখানে রাত, সেখানে কাৎ।
সবকিছুর জন্য যে দায়ী, সে নিশ্চয় আরামে আছে। কোনো দিন দেখা পাননি তার। পেলে থেঁতলে দেবেন মুখটা মাগীর। ঝাল ডলে দেবেন কুঁচকিতে। তবে না পাওয়াই ভালো। খানকিটার মুখ দেখাও পাপ।
সেই পাপই হলো মতির মার। এই জ্বলন্ত দুপুরে।
প্রকাণ্ড বাসাটা তাকে খালি হাতে ফেরায়নি। একটা পলিথিন দিয়েছে। হলুদ নীল ডোরাকাটা। মাঝারি আকার। অর্ধেকটা জুড়ে খাবার। ভাতও হতে পারে, খিচুড়িও হতে পারে। তখনই খুলছিলেন খাবেন বলে। কিন্তু বসতে দিল না ওরা। না দিক। বাইরে কোথাও খেয়ে নেবেন।
বের হলেন। সেই চেনা রোদ। চেনা পথ।
চোখ রেখেছেন দুপাশে। ছায়া খুঁজছেন। পেলেই বসবেন। তখনই ডাকটা শুনলেন। গা করেননি প্রথমে। কিন্তু চেনা লাগল কণ্ঠটা। চারপাশে কেউ নেই। উপরে তাকাতেই ঘৃণা! তিনতলার ছাদ থেকে ডাকছে তার বউ! প্রথম দেখায় লাফিয়ে উঠেছিল হৃদপিণ্ড। দুর্যোগে আপন কাউকে দেখলে মানুষের মন যেমন লাফায়। কিন্তু পরক্ষণেই বিষিয়ে উঠল শরীরটা। চোখ ফিরিয়ে নিলেন। পাত্তা দিলেন না। হাঁটতে লাগলেন।
কিন্তু দৌড়ে আসছে খানকিটা! ধরে ফেলবে তো! কী করা?
পালানো দরকার। বেশিদূর যাওয়া হলো না। বয়স হয়েছে। পা উঠতে চায় না। নুয়ে পড়া শরীর। জোর খাটে না। তাই লুকোতে হলো। লুকিয়েই থাকবেন। প্রয়োজনে রাত পর্যন্ত। তবু ওই বেশ্যার মুখ দেখবেন না। কথা শুনবেন না। কোনো দিন না। ইহ জিন্দিগিতে না।
কিন্তু খুঁজতে খুঁজতে যদি চলে আসে অলক্ষিটা?
ভাবলেন কিছুক্ষণ।
তারপর হাত দিলেন ঝোলায়।


জীবনের অনেক রূপ তিনি দেখেছেন। কোনোটা কান্নার। কোনোটা উপভোগ করেছেন ঈদের চাঁদের মতো। আবার এড়িয়েও গেছেন কোনো কোনোটা। কিন্তু যে রূপে জীবন তার সহচর এখন, তা সহ্য হয় না আর। তাই কিনেছিলেন শিশিটা। বছরখানেক হবে। এরপর অনেকবার ভেবেছেন, ঢের হলো, আর না। এবার ক্ষান্তি হোক। কিন্তু খাওয়া হয়নি। খাওয়ার সাহসটাই হয়নি আসলে।
শিশিটা খয়েরি। ভেতরের জিনিসটা কেমন? কালো দেখাচ্ছে বাইরে থেকে। নীলও হতে পারে। ঠিক ঠাহর হচ্ছে না। তবু তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর ঢেলে দিলেন ডোরাকাটা পলিথিনে। হারিয়ে গেল তরলটুকু। মিশে গেল খিচুড়ির ফাঁক ফোঁকরে। শিরায় শিরায় লোভের বিষ নিয়ে চলা মানুষ মানুষের জন্য যেমন, এই খিচুড়ি এখন ঠিক তেমন। সর্বঘাতী।
চোখ ভিজে গেছে মতির মার। এত মায়া কেন তার জীবনের প্রতি? এত কষ্ট সত্ত্বেও!

৩.
জিব বের হয়ে আসছে আসমার। বুকের ভেতর কামারের হাপর। এত দৌড়েও যদিও লাভ হয়নি কোনো। মোড়ের মাথা পর্যন্ত এসেও পাওয়া যায়নি মাকে। ছাদ থেকে ওর নামতে নামতেই চলে গেল বুড়িটা? এতটা পথ পাড়ি দিয়ে! কীভাবে সম্ভব?
ঘটনা যখন ঘটে, স্বাভাবিকভাবেই ঘটে। কিন্তু প্রক্রিয়াটা মানুষের জানা থাকে না সবসময়। এই না জানাটা মানতে পারে না তারা। তাই ব্যাখ্যা দাঁড় করায় নিজের মতো। এভাবেই মানুষ ঠকায় নিজেকে। ঠকিয়েছে যুগে যুগে। আসমাও ঠকাল। নিশ্চয় রিকশা বা ভ্যান বা কিছুতে চেপে পালিয়েছে মা! এত ঘৃণা তাকে করেন তিনি! ঘৃণা ছাড়া আর কী-ই প্রাপ্য ছিল আসমার? যা করেছে, জানলে কি ওর ছায়াও মাড়াবে কেউ? তার মাশুলও তো কম দিল না। প্রায়শ্চিত্য কি হয়নি আজও? ভেবেছিল আজ পাপস্খলনের দিন। কিন্তু না, চাঁদনি রাতকে ভুল করে ভোর ভেবেছিল সে। ভুল ভাঙতেই বুঝেছে যত আলোকিতই হোক, রাত রাতই। নিজেকে অভিশাপ দিতে দিতে তাই ফিরতে থাকে সে। কিন্তু পা ওঠে না তার। বরং ডুবে যেতে চায় পথের চোরাবালিতে।
কত কথা বলবে বলে ঠিক করে রেখেছে। বলা হলো না। সেসব কথাই সাঁতার কাটছে বুকে। ভাসছে আর ডুবছে একের পর এক।
নিজেকে নিয়ে চিন্তা করত না ও। খারাপ লাগত মা’র জন্য। না খেয়ে থাকা। ছেঁড়া কাপড় জামা। তেল সাবান ছাড়া। এই বয়সে। সহ্য হয়? মেজাজ খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল। চিৎকার করত। গালাগালি দিত। কারণে অকারণে। গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে।

কিছুই বলত না আসমা। সম্ভব সবকিছু করে চালিয়ে নিচ্ছিল সংসারটা।
যা কিছু বেচার মতো ছিল, বেচলো। কানের দুটো মাকড়ি। হাঁস মুরগি ছাগল। ঝাড়ের বাঁশও। তারপর? কীভাবে চলবে? বাবামার অবস্থা ভালো না। বহু কষ্টে সংসার চলে। তাদের কাছে হাত পাতা আর না পাতা সমান।
এদিকে অসুখে পড়ল শাশুড়ি। ভাত না হলেও চলে। কিন্তু ওষুধ না খেলে? ঠিক করল ধার নেবে। দোকানটা চালু করা দরকার। ওষুধপাতি কিনতে হবে। পরার শাড়িও লাগবে বউশাশুড়ির। কিন্তু এ অবস্থায় তাকে ধার দেবে কে?
রাজী হলো কালু। তবে অত টাকা তো আর ঘরে থাকে না। ব্যাংক থেকে এনে দেবে।
তা হলে তো ভালোই। আসমাকে তো শহরেই যেতে হতো। একসাথেই যাবে না হয়। বাজার ঘাটের ব্যাপার। হাবুডুবু অবস্থা। পুরুষমানুষ সাথে থাকলে বরং ভালো।
রওনা হলো দুজন।
পৌঁছাতে দুপুর। কেনাকাটা শেষ হতে বিকেল। ফেরার গাড়িতে উঠল যখন, দিন তখন যায় যায়।
মেঘে মেঘে আকাশ কালো। বাতাস বইছে। বাড়ি যাবার আগে যেন ঝড় না ওঠে। দোয়া পড়ছিল আসমা।
হাতিপাড়া মোড়ে নামল বাস থেকে। এরপর হাঁটাপথ। কাঁচারাস্তা। একগ্রাম পরেই বাড়ি। সেখানেই অপেক্ষা করছিল ঝড়। আর বজ্রপাত। আর বৃষ্টি।
সে কী কাণ্ড! দাঁড়ানো যায় না। পা ফেলা যায় না। পিছলে পিছলে যায়। দুহাত ভর্তি মালামাল। নষ্ট হচ্ছে সব। আশ্রয় খুঁজতে হলো। বাগানবাড়ির স্কুল। রাস্তার পাশেই বিল্ডিংটা। জানলা দরজা ভাঙা। ঢোকা গেল।
সেখানেই আড়াই ঘণ্টা। পাকা।
অস্থির দোনমনা সময়।
মালপত্র রেখে মেঝেয় বসে পড়েছে আসমা। সামনেই কিছুদূরে কালু। দূরত্ব বেশি না। পরিস্থিতি বিবেচনায় বরং কাছেই।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আলো ঢুকছে জানলা দিয়ে। দরজা দিয়ে। টিনের চালের ছিদ্র দিয়ে। আর দূরত্ব মাপছে আসমা। কমলো না তো! মনে হচ্ছে এই বুঝিবা চলে এল কালু। চেয়ে বসল প্রতিদান। নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে। খোঁজখবর নেয়। বিপদে ছুটে আসে। কালু যে তার প্রতি দুর্বল, আসমা তা বোঝে। দিনে দিনে সেও কি দুর্বল হয়ে পড়েনি? না বলার সুযোগ তার নেই। চমৎকার মানুষ। সারাক্ষণ হাসে। আর হাসায়। শাশুড়ি যখন হিংস্র হয়ে ওঠে, কালুর হাসির দমকেই প্রাণ পায় আসমা। স্বামী কাছে নেই। অভাব জেঁকে বসেছে। শাশুড়িও খিটমিট খিটখিট করে। মন মানে না। শরীরও। বিয়ের পরই যার স্বামী গেছে, সেই বুঝবে তার জ্বালা। সেই জ্বালা যখন জ্বালায় খুব, ইচ্ছে হয় ছুটে যায় কালুর কাছে। তার বুকে মাথা রাখে। ডুকরে কেঁদে ওঠে। বলে এ জীবন তার ভাল্লাগছে না আর। হাসিমোড়া এক নতুন পৃথিবী চায়। কালুই যেটা দিতে পারে। কিন্তু বলা হয়নি। হয় না কোনো দিন। তবু, কালু কি কোনোভাবে বুঝতে পারেনি এই মায়া? টান? চোখ নাকি মনের কথা বলে। চোখ পড়তে না পারার মতো বোকা তো কালু না! দুর্বলতার সুযোগ যদি সে আজ নেয়! না বাবা, সে ভালো হবে না। ভালোয় ভালোয় ঝড়টা যাক।
সময় গড়িয়েছে। প্রতিফোটা বৃষ্টির মতো। বয়ে গেছে। আর অবাক হয়েছে আসমা। কতকিছু ভাবল সে। অথচ টু শব্দটি করল না কালু! এতবড় সুযোগ পেয়েও। এই উন্মত্ত সময়েও! অবাক কৃতজ্ঞতায় ভরে থাকে সে।


বাড়ি ফিরল রাতে। সঙ্গে এল বৃষ্টিভেজা আঁধার। আর কালুর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
কাল হলো সেটাই।
একদিন সুযোগ মতো ভুল করে বসল সে। ইচ্ছে করেই।
তারপর আরেকদিন। সন্ধ্যায়।
আরেকদিন। রাতে।
ব্যাপারটা এরপর স্বাভাবিক হয়ে গেল। এবং চেপে বসল আসমার উপর।
ফাঁক পেলেই চলে আসে কালু। তার আবদার মেটাতে হয়।
এভাবে আর কত? খটখটে মাঠে প্রথম বৃষ্টি ভালো লাগারই। কিন্তু তা যখন মাত্রা ছাড়ায়, ঢল নামে, ভাসিয়ে নেয় সবকিছু, তখন সেটা বিপর্যয়। সহ্য করা যায় না। কদিন যেতে হাঁফিয়ে উঠল আসমাও। অপরাধী হলো নিজের বিচারেই। পাপবোধ কুরে খাচ্ছে তাকে। ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে। কিন্তু কিছু করতেও পারছে না। নিষেধ করলেই ভয় দেখায় কালু। বলে দেবে!
সব হারিয়ে ফেলেছিল আসমা। সংসারটুকু হারাতে চায়নি। তাই মেনে নিত সব। নিতে হতো। কতবার ভেবেছে খুন করবে। কিংবা মেরে ফেলবে নিজেকে। পারেনি।
অথচ মাসদুয়েক পর খোঁজ মিলল মতির! টাকা এল! খোঁজটা কদিন আগে পেলে টাকাটা কদিন আগে এলে কী এমন ক্ষতি হতো? মাঝে মাঝে ভাবে।
ঝলমল করে উঠল দোকান। বিদেশি টাকায়। ঘর মেরামত হলো। কালুর টাকা শোধ হলো।
আর কিছু টাকা রেখে দিল আসমা। বাড়ি ছাড়ানোর জন্য।
সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছামতো শাসালো কালুকে। কঠিন করে নিষেধ করল। আসা তাতে কমলো, কিন্তু বন্ধ হলো না। কিছুদিন পর চাওয়া বদলাল কালু। আসমাকে তার লাগবে না আর। বিদেশ যাবে। টাকা জোগাড় হয়নি। বেশকিছু টাকা যে আসমা জমিয়েছে, তা সে জানে। সেটাই চায়। না দিলে কেলেঙ্কারি!
বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে অসুখে পড়ল শাশুড়ি। আবার। সাড়া নেই। প্রচণ্ড জ্বর। ভুল বকছে। তখন রাত। বেশ রাত। গা মুছে দিচ্ছিল আসমা। আর ঢুলছিল। হঠাৎ চমকে গেল নীরবতা। টোকা পড়ল দরজায়। আগের মতো।
বাইরে তখন জোছনার ঢেউ। আবছা আলো। দরজার ফাঁকে চোখ গলাতেই আগুন চড়ল মাথায়। কালু!
বটিটা শানানো হয়েছিল ক’দিন আগেই। দরজার কাছেই রাখা। তুলে নিল আসমা। তারপর দরজা খুলল। তারপর কোপ। গ্লানি আর অনুতাপ আর বিদ্রোহ জমে ছিল বুকে, একাকার হয়ে বসে গেল কালুর শরীরে। পড়ে থাকল সে।
কী করবে আসমা তখন?
সকালেই জানাজানি হবে। স্বামী তার বিদেশে। নাগর বানিয়েছে কালুকে। তাকে আবার খুন করেছে! থুতু দেবে সবাই। থানাপুলিশ হবে। এতকিছুর সামনে টিকবে কী করে সে? একে তো মেয়ে সে, তারউপর একা। তাই হাল ছাড়ল। ঘরও।
তখন বসন্ত। আমের বোলের গন্ধ তাকে ডাকল। শিমুল গাছের ন্যাড়া-মাথা-ডালগুলোয় লাল নিশান তাকে ডাকল। ডাকল তাকে ভাটই ফুলের সাদাহাসি। সব উপেক্ষা করতে হলো। তাড়া করছিল কলঙ্কিত রাত। কালো ছোপ ছোপ রক্ত। আর রক্তের চে’ গাঢ় লজ্জা।
পথ যত গ্রামেরই হোক, শহর সে চেনেই। তার পায়ে পা মিলিয়ে শহরে এল আসমা। খোলাপথ থেকে নেমে এল গলিতে।
সেই শুরু হলো তার একলা জীবন।
পেট চলেছে ছুটা বুয়ার কাজ করে। এ বাসায়। সে বাসায়।
মাসতিনেক হলো স্থায়ী হয়েছে এবাড়ি। বাড়িওয়ালারা চাকরি করে। সংসার পড়ে থাকে আসমার হাতেই। দায়িত্ব অনেক। নিষ্ঠার সাথে সেটা পালনও করছে সে।
একটু ফাঁক পেলেই আসমা জেরা করে নিজেকে। কেন সে গেল কালুর কাছে? স্বামী ফিরুক না ফিরুক, তার আশায় জীবন কাটানো যেত না? রইছন ফুবু কাটিয়েছে। সে পারল না কেন?
পারবে কী করে! মানুষ তো সে, যন্ত্র না। মানুষের মন থাকে। শরীর ডাকে। সে ডাক শুনতেই হয়। শুনেছিল। শরীর যখন মনকে ধরে নাচায়, মন তখন নাচার। চাইলেও না করা যায় না। করতে চাইলে জোর থাকা লাগে। সে জোর তার ছিল না।
নিজেকেই কৈফিয়ত দেয় আসমা।
তবু, আর ক’টা দিন কি সে ধৈর্য ধরতে পারত না? পারত না আরেকটু সৎ থাকতে? জিজ্ঞেস করে।
সহ্য কি কম করেছে? কষ্ট কি কম করেছে? আসার সময় একটা কড়িও নেয়নি। শহর বিভুঁইয়ে না খেয়ে মরেছে, তবু ব্যাংকে যায়নি কোনো দিন। এ কি তার সততা না?
ভাবে বটে, কিন্তু বুঝ পায় না।
অনুতাপে পোড়ে। লজ্জায় ডোবে।
একদিন তাই ফিরছিল গ্রামে।
ক্ষমা চাইবে। মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে। আশ্রয় চায় শাশুড়ির পায়ে।
কিন্তু ততদিনে সব শেষ। যাওয়ার পথেই শুনেছিল সব। তারপর আর ওমুখো হয়নি।
সেই থেকে মাকে খুঁজছে ও। হন্যে হয়ে খুঁজছে। বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে। মা’কে নিয়ে ফিরবে। বাড়িটা ছাড়াবে। খুব আশা করে ছিল। আজ হোক কাল হোক, দেখা নিশ্চয় হবে। হবেই।
কিন্তু এত কাছে এসেও হলো না।
রোদ পড়ে এসেছে। বাতাস নেই। সাথে মাটির ভাপ দালানের তাপ আর দুশ্চিন্তার চাপ। গুমোট ভাবটা বাড়ছেই। দমবন্ধ অবস্থা।
হাঁসফাঁস করছে আসমা। দুই বাড়ি পরেই ওর বাড়ি। স্বস্তি পেল দেখে। পাশের গলির দিকে চোখ যেতেই অবশ্য চিৎকার হয়ে বেরুলো স্বস্তিটা। গলির মুখে বনবরইয়ের ঝোঁপ। তার আড়ালেই বসে আছে মা!
অমনি ছুট দিল সে। কিন্তু শাশুড়ি তার অগ্নিমূর্তি। নিষেধ করছে কাছে যেতে। খিচুড়ির থলেটা দেখাচ্ছে, আর শাসাচ্ছে।
‘কাচে আসবিনে মাগি। খবদ্দার কাচে আসবিনে। আসলিই খেয়ে ফ্যালবো।’
অবাক লাগে আসমার। খিচুড়ি খাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে কেন মা? পাগল হয়ে গেল না তো!
এগিয়ে চলেছে সে। আর শাসিয়ে চলেছে মতির মা। হাতে খিচুড়ি। পায়ের কাছে ছোট্ট একটা শিশি। পড়ে আছে। খালি।

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে