thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮, ৪ কার্তিক ১৪২৫,  ৮ সফর ১৪৪০
মোহাম্মদ বসিরুল হক সিনহা

অতিথি লেখক

ট্রাম্পের জেরুসালেম পরিকল্পনা : আঞ্চলিক সংঘাতের আগুনে ঘি!

২০১৭ ডিসেম্বর ১৮ ১৮:৪৪:৩৬
ট্রাম্পের জেরুসালেম পরিকল্পনা : আঞ্চলিক সংঘাতের আগুনে ঘি!

জেরুসালেমের মর্যাদার ব্যাপারে এতদিনের মার্কিন নীতি বদলে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলি দেশে মার্কিনীরা বহুদিন ধরে যে 'লুণ্ঠনমূলক প্রকল্প' বাস্তবায়ন করে চলেছে তার আরেকটি 'নিখুঁত নজির' তাদের প্রেসিডেন্টের নেয়া সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত। এই পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে ইসরায়েল কিছুটা উপকৃত হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটা বিশ্বব্যাপী মার্কিন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতিকে উগ্র ইহুদীরা দেখবে আল-আকসা মসজিদকে ধ্বংস করার জন্য 'সবুজ সংকেত' হিসাবে। তারা আশা করবে, আল-আকসা ধ্বংসের ব্যাপারে এগিয়ে গেলে বাকী দুনিয়া এটাকে একটি "ছোট স্থানীয় ব্যাপার" বলে উপেক্ষা করে যাবে। তাদের জন্য ভারতে, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর দ্বারা অমৃতসরের শিখ স্বর্ণমন্দিরকে ধ্বংস করা ও তারপর এ নিয়ে বাকী দুনিয়ার 'ভুলে যাওয়া'র বিষয়টি নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে। জেরুসালেম এর রাজনৈতিক মর্যাদার বিষয়টি ফিলিস্তিনিদের জন্য সবসময় একটি 'রেড লাইন' হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি সারা দুনিয়ার আরব এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীও ধর্মীয় কারণে ফিলিস্তিনীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে দায়বদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ফিলহাল বেশ কয়েকটি বড় সংকটের মোকাবেলা করছে। এই পরিস্থিতিতে জেরুসালেম নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত এখন ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আগুনে ঘি ঢালার মত ব্যাপার হয়ে দেখা দিতে পারে। এ কারণেই ট্রাম্পের জেরুসালেম পরিকল্পনা ঘোষণার পর, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর [স্টেট ডিপার্টমেন্ট] সারা বিশ্বের দূতাবাসকে নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে; সামনের দিনগুলিতে 'সম্ভাব্য সহিংসতা'র ব্যাপারেও হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছে।

ফিলিস্তিনী সরকারের ওপর কিছুদিন আগে থেকে জারী থাকা তীব্র চাপের মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের সর্বশেষ পদক্ষেপের ঘোষণাটি এলো। এর আগে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে গত ৫ ডিসেম্বর একটি বিল পাস্ হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনী সরকারকে আর্থিক সহায়তা স্থগিতের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এমন খবরও বের হয়েছে যে সৌদি নেতারা 'আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত নিরসনে'র লক্ষ্যে ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নিতে ফিলিস্তিনীদের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। অথচ এই প্রস্তাব ফিলিস্তিনের জাতীয় আশা-আকাঙ্খার প্রতি 'দুর্দান্ত বিদ্বেষমূলক' বলে দুনিয়ার সবাই মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে 'ইউএস ক্যাম্পেইন ফর প্যালেস্টিনিয়ান রাইটস' সংগঠনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ইউসুফ মুনাইয়ার বলেছেন, "শান্তি প্রক্রিয়া - সেটা যাই হোক এবং তাতে যা কিছু বাকি থাকুক না কেন - একটি সমঝোতার ওপর তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, জেরুসালেম সমেত নানা ইস্যুর চূড়ান্ত ফয়সালা করতে ভবিষ্যতে কিছু একটা করা হবে এ বিষয়ে দেয়া মার্কিন গ্যারান্টি।" "এখন দেখা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ভেড়ার গলা কাটার মত করে ফিলিস্তিনী গলার নিচে চাকু ঠেকিয়ে চুক্তি করার চেষ্টা করছে যা তাদের জন্য বিপজ্জনক হবে। এটা করতে গিয়ে তারা জেরুসালেমের মর্যাদার ইস্যু নিয়ে নানা ধরনের হুমকিও দিচ্ছে।"

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ব্রিটেনের দখলে থাকা ফিলিস্তিনকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে: একটি ইহুদী রাষ্ট্র, একটি আরব রাষ্ট্র ও জেরুসালেম। জেরুসালেমকে তখন "আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত শহর" হিসাবে ঘোষণা করার কথা ছিল। ইহুদী নেতারা পরিকল্পনা মেনে নেন। কিন্তু ফিলিস্তিনীদের ঘর-বাড়ী থেকে তাড়িয়ে উদ্বাস্তু বানিয়ে দেওয়ায় আরব দুনিয়া তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালে ইহুদীবাদীদের সাথে একতরফা বোঝাপড়ার পর ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায়। শুরু হয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইহুদীবাদীরা জেরুসালেমের পশ্চিমাংশ দখল করে নেয়। জর্দানী ও ফিলিস্তিনীরা অধিকার করে শহরের পূর্ব অংশ। ১৯৬৭ সালে পরবর্তী যুদ্ধের দ্বারা, ইসরায়েল পূর্ব জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে এবং পরবর্তীতে এটিকে তার রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের অংশ বলে ঘোষণা করে। এই ঘোষণা অবশ্য কখনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। পূর্ব জেরুসালেমে বরাবরই ফিলিস্তিনী জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা সম্পূর্ণ ইসরায়েলী নিয়ন্ত্রণে বসবাস করলেও ওই তথাকথিত রাষ্ট্রের কোনো ইলেকশনে ভোট দিতে পারেন না। ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ধারণাটি যে পুরোপুরি বাতিল হয়ে গেছে তা ২০০৬ সালে লেবাননে ও তারপর একাধিকবার গাজা'য় তাদের খুনী হামলা পরিচালনার পর সারা দুনিয়ার চোখে ধরা পড়ে গেছে। ওই দু'টি ঘটনা দেখার পর এই বিবেচনার সাথে শুধুমাত্র প্রচলিত মূলধারার বাইরের পর্যবেক্ষকরা'ই নন, বরং পশ্চিমা দেশগুলোর সবচেয়ে বিভ্রান্ত ব্যক্তিটিও একমত না হয়ে পারছেন না।

"রেসিজম" বা বর্ণবাদ সবসময় ইসরায়েল নামের তথাকথিত রাষ্ট্রের প্রাণপ্রবাহ ও জীবনধারা হয়ে থেকেছে। জায়োনিজম বা ইহুদীবাদ এই মৌলিক বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল যে ইহুদীদের এই ভূখন্ডের ওপর 'অধিকতর' রাষ্ট্রীয়, মানবিক ও প্রাকৃতিক অধিকার রয়েছে। এটাই তথাকথিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত বর্ণবাদী বুনিয়াদ যা যথার্থ গণতন্ত্র বা জনগণের সমতার সব সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। লেবানন এবং গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক নিপীড়ন তার প্রতিষ্ঠাকালীন রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের বিবর্তনের পরবর্তী ধাপ। এই মতাদর্শ এক জনগোষ্ঠীর "একচেটিয়া অধিকারবোধ" ও অন্যদের ওপর "ভুয়া শ্রেষ্ঠত্ববোধ" এর ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ' কারণেই আচরণ ও ভূখণ্ডের সীমারেখা সংক্রান্ত ব্যাপারে তারা কোনো আইনী ও নৈতিক সংযম অবলম্বন করতে পারে না। তাদের "অসীম অধিকার" উপভোগের জন্য দরকার "চিরসম্প্রসারণশীল" ভূখণ্ড ! "রেসিজম" বা বর্ণবাদ ইসরায়েলী-মার্কিন নিও কনসারভেটিভ [নয়া রক্ষণশীল] অক্ষশক্তির অস্থি-মজ্জায় মিশে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এরাই এখন পাগলা ঘোড়ার মত দাপাদাপি করছে। ২০০০ সাল থেকে জায়নিজমের অন্তর্নিহিত বর্ণবাদ বুশ প্রশাসনের নিও কনসারভেটিভদের বর্ণবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফিলোসফির মধ্যে এক "স্বাভাবিক মিত্র" খুঁজে পেয়েছে। সারা দুনিয়া জুড়ে ইসরায়েলী-মার্কিন যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, পৃথিবীর সব সংঘাতকে "জাতিগত সংঘাতে" রূপান্তরিত করা। ইংরেজিতে একে বলে “full ethnicization”। এই অভিমত দিয়েছেন মিশেল ওয়ারশাউস্কি। তিনি জেরুসালেম এর অল্টারনেটিভ ইনফরমেশন সেন্টার নামে একটি গ্রূপের সাথে কাজ করেন। তার মন্তব্য প্রচারিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ৩০ জুলাই তারিখে। ওয়ারশাউস্কি আরো বলেছিলেন, "যার [ফুল এথ্নিসাইজেশন] মধ্যে কোনও একটি নীতি, একটি সরকার বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নয়, কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর সাথে জড়িয়ে 'হুমকি' চিহ্নিত করা হবে।" .

এর মানে হলো, ইসরায়েলের বেলায়, সব অ-ইহুদী জনগোষ্ঠীর সাথে জড়িয়ে ওই 'হুমকি'কে চিহ্নিত করা হবে।

পূর্ব জেরুসালেমকে আইনী পদ্ধতিতে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করতে উৎসাহিত করা ও পরবর্তীতে তা নিয়ে যত রকমের অঘটন ঘটবে তার জন্য মার্কিনীদের সঠিকভাবেই অভিযুক্ত করা যাবে। এই কারণেই এর আগেকার মার্কিন প্রশাসন এই কাজটি করতে দ্বিধাবোধ করতো। এমনকি যখন তারা নিজস্ব শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ইহুদী-জায়োনিস্ট গোষ্ঠী'র সবচে' চরমপন্থী অংশটিকে তুলে এনেছিল তখন এই কাজটি করেনি। ওবামা প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার পক্ষ্যে ফাঁকা আওয়াজ দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে ওই পথে হাঁটেননি।

এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে সেই কাজটিই করা হলো। সেই ট্রাম্প ইহুদীবাদী স্বার্থের প্রতি যার প্রশাসনের রয়েছে ক্রীতদাসসুলভ আনুগত্য। একই সাথে এই লোকটি ওবামা'র ইরানের সাথে করা চুক্তিও বরবাদ করার চেষ্টা করছে। এদিকে, তাঁর সবচেয়ে জঘন্য অনুসারীদের অনেককে হামেশাই ইসরায়েলের বর্ণবাদী কর্মকান্ডের প্রতি ভক্তি-গদগদ হয়ে নিজেদেরকে 'সাদা জায়োনিস্ট' পরিচয় দিতে দেখা যায়। 'পলিটিক্যাল জায়োনিজম' বা রাজনৈতিক ইহুদীবাদ বিশ্ব প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তির পক্ষে প্রধান ও ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করছে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে