thereport24.com
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ১১ বৈশাখ ১৪২৫,  ৭ শাবান ১৪৩৯
রেজাউল করিম লাবলু

অতিথি লেখক

ওয়ান ইলেভেনের অজানা কথা-৫

রাজনীতিবিদদের স্বজনদের নজিরবিহীন নির্যাতন

২০১৭ ডিসেম্বর ২৬ ২২:১৩:১৩
রাজনীতিবিদদের স্বজনদের নজিরবিহীন নির্যাতন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যেখানেই সামরিক অভ্যূত্থান হয়েছে, সেখানেই রাজনীতিবিদদের আটকের ঘটনা ঘটেছে। পূর্ববতী সরকারের মন্ত্রী-এমপি-প্রভাবশালীদের আটক করেছেন সেনা কর্মকর্তারা। কিন্তু তাদের পরিবারের সদস্যদের আটক কিংবা হয়রানীর নজির নেই। একমাত্র ব্যক্তিক্রম বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী মধ্যম সারির কিছু সদস্যদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। সৌভাগ্যক্রমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় তারা বেঁচে গিয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা অভ্যূত্থান হলেও সেনা সদস্যরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হননি। বরং তারা পেছনে থেকে বেসামরিক সরকারকে দায়িত্ব দেন দেশ পরিচালনার জন্য। ওয়ান-ইলেভেনের সেনা সমর্থিত বেসামরিক সরকার শুধু রাজনীতিবিদদেরই নন, তাদের স্ত্রী-সন্তান-স্বজনদের গ্রেফতার করেছিল।

ওয়ান-ইলেভেনে গ্রেফতার হয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি তার লেখা ‘জরুরী আইনের সরকারের দুই বছর’ বইটিতে লিখেছেন, ‘জরুরী সরকারের শাসনের ১ বছরের সময়কালে তাকে ও তার বড় ছেলে খন্দকার মাহবুব হোসেনকে তাদের গুলশানের বাড়ি থেকে যৌথবাহিনী আটক করে। পাইকারি হারে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত ও আত্মগোপনকারী রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে অথবা দেশ ত্যাগে বাধ্য হন। আমার গ্রেফতারের পর স্ত্রী বিলকিস আকতার হোসেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন। আমার জন্য নিয়োজিত টাস্কফোর্সের প্রধান মেজর ফরহাদ বেশ কয়েকবার বাসায় গিয়ে আমার স্ত্রীর খোঁজ করেন। এতে সন্দেহ আরও বৃদ্ধি পায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় তাদের ওপর বোঝা হয়ে আত্মগোপনের জীবন যে কত দূর্বিষহ, অপমানকর ও গ্লানির তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না। রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার বিষয়ে সরকার যা-ই করুক না কেন, আমার জন্য পরিবারের সদস্যরা এত নির্যাতিত ও অপমানিত হয়েছে তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বৃটিশ ঔপনিবেশ আমল ও পাকিস্তানের স্বৈরাচারী আমলেও রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের প্রতি এ ধরণের আচরণের নজির নেই। গ্রেফতার হওয়া অন্যান্য নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছিল। দেশে আত্মগোপন করাও নিরাপদ মনে না করে যাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তারা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।’

বিএনপির যেসব নেতা গ্রেফতার হন :

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমান,ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকো, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মরহুম এম সাইফুর রহমান ও তার ছেলে নাসের রহমান, তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মরহুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মরহুম আ স ম হান্নান শাহ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আমান উল্লাহ আমান, ও তার স্ত্রী সাবেরা আমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মো. নাছির উদ্দিন ও তার ছেলে মীর হেলাল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তার স্ত্রী ও কন্যা, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মরহুম ফজলুর রহমান পটল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক উপমন্ত্রী অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদা, সাবেক এমপি মোসাদ্দেক আলী ফালু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক এমপি ও শিল্পপতি আবুল হাশেম, বরিশালের মেয়র মজিবর রহমান সারোয়ার, রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, খুলনার মেয়র তৈয়বুর রহমান সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, ছাত্রদলের সভাপতি আজিজুল বারী হেলালসহ বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

আওয়ামী লীগের যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন :

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মরহুম আব্দুল জলিল, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে মোহাম্মাদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রতিমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, সিলেটের মেয়র বদরুদ্দিন আহম্মদ কামরান, সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার, সাবেক এমপি আ হ ম মোস্তফা কামাল, সাবেক এমপি রফিকুল আনোয়ার (সোনা রফিক), সাবেক এমপি শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়, জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ওয়ান-ইলেভেনের সরকার দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার করেছিলো। ওয়ান-ইলেভেনের সরকার সম্পর্কে তার বক্তব্য নেতিবাচক। তার বক্তব্য, ‘ওয়ান-ইলেভেনের পেছনে ছিল ফ্যান্টাসিতে ভোগা কিছু সামরিক কর্মকর্তাদের অনৈতিক কর্মকান্ড। ড্রইং রুমের রাজনীতিকে তারা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আসলে তা যে সম্ভব নয় তা তারা পরে বুঝতে পেরেছিলেন। ততোদিনে দেশ, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেলেন। একজন রাজনীতিবিদ অন্যায় করলে সরকার তাকে শাস্তি দিতে পারে। কিন্তু সরকার একজন রাজনীতিবিদের পরিবারকে হয়রানী করতে পারে না। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনের সরকার তা করেছিল।’ অবশ্য ওয়ান-ইলেভেনের পর তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাকে ওয়ান-ইলেভেনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাকে শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় প্রথম দিকে রাখা হয়েছিলো। তাকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। যৌথবাহিনীর সদস্যরা জানতে চেয়েছিলেন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় ?

আটক করার পর কোথায় নেয়া হয়েছিলো জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ‘আটকের পর দুই চোখ কালো কাপড়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। এরপর গাড়ীতে করে বিজিবির পিলখানায় নেয়া হয়েছিলো। সেখান থেকে কারাগারে নেয়া হয়। কারাগার থেকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিউমার্কেট থানায় নেয়া হয়। সেখানে টাস্কফোর্সের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন।’

ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে তার সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু সময় ছিল কম। তাই তিনি রংপুর কারাগারে বসে মনে যা ছিলো সে মোতাবেক সম্পদের হিসাব তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিলো না। পরে তার স্ত্রী ব্যারিস্টার সিগমা হুদা তাকে সহযোগিতা করেছেন। নাজমুল হুদারও অভিযোগ ওয়ান-ইলেভেনে তার পরিবারকে হেনস্থা করা হয়েছিলো। যদিও বিষয়টি ঠিক করেনি তৎকালীন সরকার।

আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা সৈয়দ আবুল হোসেন ওয়ান-ইলেভেনে আটক হননি। সে সময় তিনি পালিয়ে বেড়িয়েছেন। তার লেখা বই ‘আমার কথা’র একটি পর্বে তিনি 'ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসহ স্মৃতি’ নিয়ে লিখেছেন। বইটিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়ঙ্কর কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মূলত এটি ছিল নতুন আদলে গড়া সামরিক শাসনের এক দুর্বিষহ অধ্যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য এ সময় যে অত্যাচার-অবিচার এবং দুর্নীতি করেছে- তা পৃথিবীর আর কোথাও হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি দুর্যোগপূর্ণ সময়। এ সময় বাংলাদেশকে একটি সংকটকাল অতিক্রম করতে হয়েছে। অপরাজনীতি দিয়ে রাজনীতি বন্ধের অপচেষ্টা করা হয়েছে। নতুন রাজনীতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। টোপ দিয়ে রাজনীতিক ব্যক্তিদের দলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ থেকে আমিও বাদ যাইনি। ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় আমাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ সময় গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমাকে নতুন দল গঠনে ভূমিকা পালনে বাধ্য করার চেষ্টা করে। আমি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেছি, আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুগত নই- এ ধরনের একটি জাল চিঠিও বের করা হয়, আমাকে ফাঁদে ফেলানোর জন্য। তখন আমি ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বলি, “বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আমাকে রাজনীতিতে এনেছেন, যতদিন বেঁচে থাকবো- তাঁর সাথে থাকব।” ফলে বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিক নেতার সঙ্গে সন্দেহভাজন দুর্নীতির তালিকার দ্বিতীয় দফায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জন্মকাল থেকে ওয়ান-ইলেভেন পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে নামে-বেনামে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগসহ বিএনপির ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৭ মেয়াদের তদন্ত করা সব বিষয়ে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগ আনা হয় বিএনপির সময় তৈরি শ্বেতপত্রের অন্তর্ভুক্ত মিথ্যা বিষয়গুলোর ওপরও। এসব অভিযোগ তদন্তে একাধিক টিম কাজ করে। দীর্ঘ তদন্তে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই। সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি পাই। বিষয়টি পত্র দিয়ে দুদক আমাকে জানিয়ে দেয়।

প্রত্যেক সামরিক সরকারের বৈশিষ্ট্য অভিন্ন। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল ও তার ব্যবহারকে সাধারণ জনগণের কাছে প্রিয় করে তোলার জন্য, দুর্নীতি প্রতিরোধের নামে কিছু ধনী ও প্রভাবশালী লোকের ওপর অত্যাচার করা পৃথিবীর প্রত্যেক সামরিক সরকারের অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে : অস্ত্রের মাধ্যমে জনগণের মনে ভীতি সঞ্চার করা। ওয়ান-ইলেভেনের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুটোই সার্থকভাবে করে যাচ্ছিল। নানা শঙ্কার মাঝেও আমি ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আমার মনে সবসময় একটা প্রবল আস্থা কাজ করে- আমি কোনো অন্যায় করি না, তাই আমার কোনো ভয় নেই। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন আমাকে শিক্ষা দিল যে, পাশবতার কাছে ন্যায়-অন্যায় আর ভালো-মন্দের কোনো বাছ-বিচার নেই।

তপন চৌধুরীকে সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা করার কয়েকদিন আগে আমার কাছে একটি ফোন এলো। ফোন ধরেই আমি হতবাক। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড প্রভাবশালী এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফোন। তিনি আমাকে দুটি প্রস্তাব দিলেন। কোনো প্রস্তাবের জন্যই আমি প্রস্তুত ছিলাম না। দুটো প্রস্তাবই আমাকে বিমর্ষ করে দেয়।

প্রথম প্রস্তাব ছিল- আমাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা করা। বললেন, “আপনাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করা হবে।” দায়িত্ব কত দিনের তার কোনো সীমা নেই- আমাকে লোভাতুর করে তোলার জন্য এটিও বলা হয়েছে। আমি অনেকক্ষণ ধরে তার কথা বিনয়ের সঙ্গে শুনে বললাম : আমি আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। আমার পক্ষে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়া শোভনীয় হবে না। এটি আপনাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। আমার উত্তরে তিনি খুশি হতে পারেননি। প্রথমে সরাসরি কিছু না বললেও, কণ্ঠের বিরক্তি এটাই প্রকাশ করল। এরপর তিনি নতুন প্রস্তাব দিলেন-এটি আরও মারাত্মক। বললেন : দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে দেওয়ার জন্য একটি রাজনীতিক দল গঠন করা হবে। আপনাকে সে দলে একটা গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদান করা হবে। আপনি বৃহত্তর ফরিদপুরের অধিবাসী এবং এলাকার জনপ্রিয় জননেতা। শেখ হাসিনাকে মাইনাস করার পর নতুন দলকে সহায়তা করার জন্য আপনাকে আমাদের প্রয়োজন। আপনি একজন ভালো মানুষ, সৎ মানুষ। আমরা আপনার মতো ভালো মানুষ দিয়ে দলটি গঠন করতে চাই।

দুটো প্রস্তাবই নিঃসন্দেহে অনেকের কাছে লোভনীয় হতো। কিন্তু আমার কাছে তা ছিল বিব্রতকর, অনাকাঙ্ক্ষিত ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। কারণ আমি ছিলাম সতত দলের প্রতি এবং নেত্রীর প্রতি অনুগত। তাই আমি দুটো প্রস্তাবই সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করি। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তিনি আমার ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হন : “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাইকমান্ডের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য আপনাকে কিন্তু চরম খেসারত দিতে হবে।”

এমন প্রতিক্রিয়ার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম। তাদের কার্যকলাপ ইতোমধ্যে পুরো দেশকে ত্রাসের রাজ্যে পরিণত করেছিল। এর কয়েকদিন পর দুর্নীতিবাজদের দ্বিতীয় তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করে সাংবাদিকদের প্রদান করা হয়। দুদক যথারীতি আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে।

ওয়ান-ইলেভেনের দিনগুলো ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে মারাত্মক কষ্টের দুর্বিষহ স্মৃতি। সামরিক বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করার জন্য হন্যে হয়ে খোঁজা শুরু করে। আমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল- আমাকে আটক করে নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইলিং করা এবং প্রস্তাবে রাজি করানো।

সে সময় গ্রেফতার এড়াতে এখান থেকে ওখানে ছুটে বেড়িয়েছি। দিনের পর দিন একা একটি নির্জন কক্ষে কাটিয়েছি। শঙ্কা ও ভয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথাও ভুলে গিয়েছিলাম। বাতাসে পর্দা নড়ার শব্দে শিউরে উঠেছি। চুল ও দাঁড়ি-মোচ কাটার জন্য সেলুনে পর্যন্ত যেতে পারিনি। কোনো আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে পর্যন্ত যেতে পারতাম না। যদি কেউ দেখে ফেলে। দীর্ঘ দেড় বছরের অধিক কোনো আত্মীয়-স্বজনকে দেখিনি। সারারাত ঘুমাতে পারতাম না, বসে বসে কাঁদতাম। যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নিতে নৃশংস অত্যাচার করবে। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করে বানোয়াট বিবৃতিতে স্বাক্ষর নেবে। শুধু আমি কেন, আমার বড়ভাই আবুল কাশেম, ভাগ্নে এবং অন্যান্য অনেক আত্মীয়-স্বজনও ওয়ান-ইলেভেনের সময় নরক-যন্ত্রণার মতো কষ্টে দিনাতিপাত করেছে। আমার বড় ভাই গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পালিয়ে বেড়িয়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন। তার দু’টো কিডনি নষ্ট হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন (ইন্না.... রাজেউন)। আমাকে ধরার জন্য আমার বড় বোনের এক ছেলেকে ধরে নিয়ে এমন অত্যাচার করেছে যে- সে অসুস্থতা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি আমার সহধর্মিণীর ভাই-বোনদের বাসায়ও তল্লাশি করেছে এবং তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। আমার জীবনে এটি বড় দুঃসহ ঘটনা।

সামরিক বাহিনীর লোকজন দীর্ঘ আট ঘণ্টা ধরে আমার বাড়ি তল্লাশি করেছে, তল্লাশির নামে বাড়ির জিনিসপত্র ভাংচুর করেছে। সেসময় আমার সহধর্মিণী ছাড়া বাড়িতে আর কেউ ছিল না। সে ছিল এক ভয়াবহ অবস্থা। তদন্তের নামে, দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে রাজনীতিক স্বার্থ হাসিল, ব্ল্যাকমেইলিং ও অর্থ আদায়ের যে নৃশংস প্রহসন তত্ত্বাবধায়ক সরকার করে চলেছিল- তেমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর আছে কিনা আমার জানা নেই। এই অত্যাচারের কুশীলবরা একদিন এর পরিণাম ভোগ করবে, আল্লাহ তাদের বিচার করবেন।

আমার দুই কন্যা রুবাইয়াত, যাকে আমরা আনজুম বলে ডাকি, এবং ইফ্ফাত, যাকে আমরা দুলি বলে ডাকি- তাদেরও এসময় অনেক বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। বিড়ম্বনা এড়াতে তাদেরকেও দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে।’

কাউকে মাহাথির, কাউকে হামিদ কারজাই বানাতে চেয়েছিল যৌথবাহিনী :

ওয়ান-ইলেভেনের সরকার সংশ্লিষ্টরা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকে আফগাস্তিনের হামিদ কারজাইয়ের মতো বানাতে চেয়েছিলেন। কাউকে আবার মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মাদের মতো প্রধানমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন। এভাবে টোপ দেয়া হয়েছিলো। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে যৌথবাহিনীর সদস্যরা মালয়েশিয়ার মাহাথির বানানোর প্রস্তাব করেছিলো। বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মরহুম আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের সরকার সংশ্লিষ্টরা।

পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসন ও বাংলাদেশে প্রথম সামরিক হস্তক্ষেপ :

১৯৫৮ সনের অক্টোবরে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা এক ঘোষণাবলে দেশে সামরিক শাসন জারী করেন এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এভাবে দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারী হয়। ইস্কান্দার মির্জার সামরিক আইন ঘোষণার ২১ দিন পর তাকে অপসারণ করে জেনারেল আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপ শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী প্রথম সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল ১৯৭৫ সালে। ১৫ই অগাস্ট কয়েকজন মধ্যম সারির সেনা অফিসারের নেতৃত্বে এক অভ্যূত্থানে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন বাকশালেরই কিছু নেতাকে নিয়ে সরকার গঠন করা হয়েছিল।

রিমান্ডে নির্যাতন ও স্বীকোরোক্তি আদায় :

১১ জানুয়ারি ২০০৭-এ জরুরী আইন জারির পর যৌথবাহিনী গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের আগে শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের একটি তালিকা তৈরি করে তালিকা ধরে ধরে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর সরাসরি জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে স্বীকোরোক্তি আদায়ের জন্য অবর্ণনীয় মানসিক ও শারিরীক নির্যাতন চালানো হয়। পরে থানায় গ্রেফতার দেখিয়ে পুনরায় রিমান্ডে নিয়ে একই কায়দায় স্বীকোরোক্তি আদায়ের খবর অহরহ পত্রিকায় শিরোনাম লাভ করেছে। যৌথবাহিনী সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে বহুদিন নিখোঁজ রেখে দেয়। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে নির্যাতন করে পরবর্তী কোন একসময়ে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে থানার মাধ্যমে আদালতে হাজির করার ঘটনাও অনেক ঘটেছে। শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীই নয়, তাদের আত্মীয়-স্বজন, ব্যবসায়ী, সরকারি চাকুরীজীবি, শিক্ষক-ছাত্রকে তখন গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়।

নির্যাতনের ধরণ :

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের রচিত বই Bangladesh: emergency and aftermath-এ তার রিমান্ডের তিক্ত অভিজ্ঞতা বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বই থেকে তার গ্রেফতার, রিমান্ড ও কারাগারের প্রেরণের অংশটি হুবহু তুলে ধরেছেন বিএনপির অপর স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার লেখা ‘জরুরী আইনের সরকারের দুই বছর (২০০৭-২০০৮)’ গ্রন্থে। সেখান থেকে চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

১২ এপ্রিল, ২০০৭ রাত ১১টার সময় যৌথবাহিনীর প্রায় ২০জন সদস্য সিভিল পোশাকে তার গুলশানের বাসভবনে প্রবেশ করেন। এর আগে বাড়ির চারদিকে ইউনিফর্মধারী ও সিভিল পোশাকে যৌথবাহিনীর বহু সদস্য ঘিরে ফেলে। যৌথবাহিনী সারারাত তার বাসভবনের সকলের কক্ষে ব্যাপক তল্লাশী চালায়। তাদের ইচ্ছামতো প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র, দলিল, পাসপোর্ট, ব্যাংক একাউন্টের তথ্যাদি ও ব্যাংকের চেকবইসহ অন্যান্য জিনিসপত্র জব্দ করে। পরদিন ১৩এপ্রিল সকাল সাড়ে সাতটায় যৌথবাহিনীর মেজর রেদোয়ান তাকে গ্রেফতারের কথা অবহিত করেন। মওদুদ আহমদ ছোটো সুটকেসে প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়, ওষুধ নিয়ে প্রস্তুত হন। সকাল সাড়ে ৯টায় তাকে কালো গ্লাসের একটি জীপে তুলে কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেধে দেয়া হয়। এরপর তাকে অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। মওদুদ আহমদ পরবর্তী সময়ে বুঝতে পারেন তাকে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলের টর্চার চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাকে সেখানে একটি স্যাঁতসেতে ছোট অন্ধকার কক্ষে নিয়ে চোখ খুলে দেয়া হয়। তখন তিনি দেখতে পান যে, কক্ষে একটি খালি পুরনো চৌকি ও প্রস্রাব করার জন্য কক্ষের এক কোণে একটি পাত্র ছাড়া আর কিছু নেই। কিছু সময় পরে অন্ধকার কক্ষের লোহার দরজার তালা খুলে দু’জন সিলিভ পোশাকে কক্ষে প্রবেশ করেন এবং চোখ বেধে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপরের তলায় টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই কক্ষে চোখ বাধা অবস্থায় তাকে একটা টুলে বসতে দেয়া হয়। বুটের আওয়াজ শুনে তিনি বুঝতে পারেন যে, যারা জিজ্ঞাসাবাদ করবে তারা এসে টেবিলের ওপর পাশে বসেছে। এ সময় পাশের কক্ষ থেকে কোন ব্যক্তিকে পেটানো এবং তার আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিলো। তরুণ সেনা কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মওদুদকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি চিৎকারের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন কিনা ? অপর একজন টেবিল চাপড়িয়ে বলেন, “এ অবস্থা আপনারও হতে পারে।” কোন প্রসঙ্গ ছাড়াই তারা ঢালাও ভাবে রাজনৈতিক নেতাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালি ও মন্তব্য করেন এবং বলতে থাকেন রাজনীতিবিদরা দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মওদুদ আহমদকে ব্যক্তিগতভাবে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকার সময় কি পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন ও কোথায় কোথায় সে টাকা রেখেছেন তা ভালোভাবে বলে দেয়ার জন্য তাকে বলা হয়। সেনা কর্মকর্তারা আরও বলেন, যদি সহজে সব স্বীকার করে স্টেটমেন্ট না দেন, তাহলে অন্যদের যেভাবে কথা বের করতে হয়েছে, সেই পদ্ধতি ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন তারা। এভাবে এদিন তিন দফা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে ওপরের তলার একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। তৃতীয়দফা জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে একটি চেয়ার দেয়া হয়। এ সময় কিছু সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা টেবিলের অপর পাশে এসে বসেছেন। মওদুদ আহমদকে তারা জানান, রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তারা আলাপ করবেন। তারা জানান, রাজনীতি থেকে দুই নেত্রীকে বিদায় করে চলমান রাজনৈতিক অপকৃষ্টি থেকে মুক্ত করে দেশকে উন্নতি ও শান্তির পথে এগিয়ে নিতে হবে। রাজনীতিবিদরা যেহেতু এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে তাই সেনাবাহিনীকেই এই মহান দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। সরাসরি সামরিক শাসন জারি না করে সিভিলিয়ান খোলশে কিভাবে তা সম্পাদন করা যায় সে ব্যাপারে তারা তার পরামর্শ চান। সিভিল ও মিলিটারি উভয় সরকারে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে বলে প্রশংসা করে মওদুদ আহমদের কাছ থেকে বাস্তব ও আন্তরিক সমাধান সম্পর্কে তারা জানতে চান। চোখ বন্ধ অবস্থায়ই তিনি তার বিভিন্ন বইয়ের উল্লেখ করে তার একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা তার মতামতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

পরের দিন ১৪ এপ্রিল সকালে তাকে কক্ষ থেকে বের করে একটি নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত টয়লেট এবং বারান্দায় একটি বেসিন দেখিয়ে তাকে ফ্রেশ হয়ে টর্চার সেলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে দুইজন সিভিলিয়ান ব্যক্তি এসে জানিয়ে যায়। পরে দুই চোখ বেধে তাকে টর্চার সেলে নেয়া হয়। সেখানে কিছু কর্মকর্তা উপস্থিত হয়ে মওদুদ আহমদের গুপ্ত সম্পদ কোথায় কিভাবে আছে তা গত রাতে ভেবে রেখেছেন কিনা তা জানতে চান। তিনি আগের রাতে যা বলেছেন তার অতিরিক্ত কিছু বলার নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন। এরপর সেনা কর্মকর্তারা চলে গেলে সিভিলিয়ান দুই ব্যক্তি তার চোখের বাধন খুলে দেন। এর আগে চোখ বাধা থাকায় টর্চার সেলের পরিবেশ তিনি দেখতে পাননি। তবে চোখ খুলে দেয়ার পর সেলের পরিবেশ দেখে তার গা শিউরে ওঠে। কক্ষে বিভিন্ন সাইজের লাঠি, চেইন, লোহার রড, বিভিন্ন ধরণের ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি এবং মাথার উপর উচ্চ ভোল্টেজের বাতিসহ মানুষকে টর্চার করার বিভিন্ন সরঞ্জাম তিনি দেখতে পান। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে এক ব্যক্তি দুই কাধে দুটি ক্যামেরা (স্টিল ও মুভি) নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। বিভিন্ন কর্ণার থেকে স্টিল ক্যামেরায় ছবি তোলার পর মুভি ক্যামেরায়ও তাদের ইচ্ছেমতো ছবি তুলে নেয়। এরপর এক সিভিলিয়ান ব্যক্তি এসে তাকে এক প্রস্থ টাইপ করা কাগজ দিয়ে বলেন, এই কাগজে সই করার পর তাকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে। কোর্টে পাঠানোর কথা শুনে বাধ্য হয়ে তিনি কাগজে সই করে দেন। এই কাগজে শুধু লেখা ছিল, তাদের হেফাজতে থাকার সময় তার প্রতি ভাল আচরণ করা হয়েছে। কিন্তু এই দিনের (১৪এপ্রিল) পত্রিকায় লাল অক্ষরে শিরোনামে মওদুদ আহমদের স্বীকোরোক্তি হিসেবে অনেক কল্পকাহিনী প্রকাশিত হয়। তার বাড়িতে বিদেশি মদ, রিলিফের জন্য দেয়া কাপড়চোপড়, বিশাল গুপ্ত সম্পদ এবং বিদেশে সম্পদের বিষয়ে তিনি গত রাতে জিজ্ঞাসাবাদে সব কিছু স্বীকার করেছেন বলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলের বরাত দিয়ে সকল পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। অথচ তিনি রাতে জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোন তথ্য দেননি।

১৪ এপ্রিল সকালে চোখ বেধে মওদুদ আহমদকে প্রিজন ভ্যানে করে ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫/বি ধারা মোতাবেক দায়েরকৃত মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪দিনের রিমান্ড দেয়া হয়। রিমান্ডের প্রথম রাত থেকে তাকে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কথামতো তিনি যা করেননি, সেই সব অপকর্মের কথা স্বীকার করতে হবে। তা না হলে পাশের কক্ষে এক ব্যক্তিকে স্বীকোরোক্তি আদায়ে যেভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে তাও প্রয়োজনে করা হবে বলে তাকে শাসানো হয়। পাশের কক্ষ থেকে আর্তচিৎকার তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। এদিনও তার কথায় সেনা কর্মকর্তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ১৫এপ্রিল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। ১৬এপ্রিল সকালে চোখ বেধে একই কায়দায় তাকে টর্চার সেলে নেয়া হয়। এইদিনে বিদেশে অবস্থানরত মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা মওদুদ সম্পর্কে বিভিন্ন অবান্তর ও অপ্রীতিকর প্রশ্নবানে তাকে জর্জরিত করা হয়। স্ত্রী সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে মওদুদ আহমদের প্রদত্ত জবাবে সেনা কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

১৭ এপ্রিল সকালে চোখ বেধে মওদুদ আহমদকে দ্বিতলে অবস্থিত একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার চোখ খুলে দেয়া হয়। তিনি তার সামনে এক ব্যক্তিকে মুভি ক্যামেরা নিয়ে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষমান দেখতে পান। একটি টাইপ করা স্টেটমেন্ট মওদুদ আহমদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পাঠ করার নির্দেশ দেয়া হয়। যেন মনে হয় স্বেচ্ছায় তার স্বীকোরোক্তি মুভি ক্যামেরায় রেকর্ড করছেন। লিখিত স্টেটমেন্টের বিষয়বস্তু দেখে তা ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পাঠ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি লিখিত স্টেটমেন্টের অনেক অংশ সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করেন। তার আপত্তির মুখে বিবৃতিটি কিছুটা কাটছাট করে দ্বিতীয় কপি তাকে দেয়া হয়। কিন্তু তার মধ্যেও অনেক বিষয়ে আপত্তি করলে তা সামান্য পরিবর্তন করে তৃতীয় কপি হাতে মওদুদ আহমদকে বলা হয়, এই বিবৃতি ক্যামেরার সামনে পড়তে হবে। নতুবা তাকে কোর্টে হাজির করে পুনরায় রিমান্ডে এনে অন্যদের মতোন পদ্ধতি ব্যবহার করে স্বীকোরোক্তি আদায় করা হবে। দুই দফায় ৫দিনের রিমান্ডে ব্যারিস্টার মওদুদ টর্চার সেলে সেনা কর্মকর্তাদের কথামতো স্বীকোরোক্তি আদায় করতে লাটিপেটা, পা বেধে উল্টো করে ঝুলিয়ে, দুই হাত বেধে লটকিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে গায়ে সেঁকা দেয়া, ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসানো এবং বৈদ্যুাতিক শকসহ বিভিন্ন নির্যাতনের বিষয়ে অবহিত হয়েছেন। নির্যাতনের এ সকল পদ্ধতি ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আর্তচিৎকারও তিনি শুনেছেন। এমনি পরিস্থিতিতে তাকে যদি এখানে আবারও রিমান্ডে আনা হয়, তাহলে তার মৃত্যু অবধারিত। এই ভেবে চরম আত্ম অবমাননা ও অপমানের মধ্য দিয়ে বিবৃতির তৃতীয় কপিটি মুভি ক্যামেরার সামনে পড়ে রেকর্ড করতে বাধ্য হন। তৃতীয়দফা রিমান্ডে আসার ভয়ে ভীত হয়ে তার ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সেনা কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো তৈরি করা স্বীকোরোক্তি রেকর্ড করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর তাকে চোখ বেধে প্রিজন ভ্যানে পুনরায় আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

লেখক: সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে