thereport24.com
ঢাকা, রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৬ ফাল্গুন ১৪২৪,  ২ জমাদিউস সানি ১৪৩৯
মোহাম্মদ বসিরুল হক সিনহা

অতিথি লেখক

ভ্যালেনটাইন'স ডের আজব ইতিহাস

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ ১৮:৫১:৩৯
ভ্যালেনটাইন'স ডের আজব ইতিহাস

ভ্যালেনটাইন'স ডে'তে চুম্বনের দ্বারা প্রেম ও রোমান্সের প্রতি আনুগত্যের প্রদর্শনী করা হয়। এর মাধ্যমে উদযাপন করা হয় দিনটি।

কিন্তু ক্যান্ডি বিতরণ ও কিউপিড সাজার এই উৎসবের রয়েছে এক কালো ও রক্তাক্ত ইতিহাস, যার বেশ খানিকটা তালগোল পাকানো।

এই পর্বের শুরুর দিনগুলি সম্পর্কে কেউ সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে চান না। তবে এর ইতিহাস বুঝতে হলে প্রাচীন রোম থেকে শুরু করতে হবে। সেখানে পুরুষের হাতে মহিলাদের পেটানোর উৎসবের আয়োজন করা হতো।

সেই জংলী বিকৃতবুদ্ধির রোমান জনগোষ্ঠী

প্রতি বছর ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি রোমানরা "লুপারক্যালিয়া" নামে এক কুরুচিপূর্ণ উৎসব পালন করতো। এই সময় পুরুষরা একটি ছাগল এবং একটি কুকুর জবেহ করে উৎসর্গ করতো। তারপর জবেহ হওয়া প্রাণীগুলোর পাকানো চামড়া দিয়ে তাদের 'নিজেদের বাছাই করে নেওয়া' মেয়েদের পেটাতো।

কলোরাডো ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রফেসর নোয়েল লেন্সকি জানাচ্ছেন, এই উৎসবের সময় রোমান রোমান্টিকরা "চরম মাতাল ও নগ্ন হয়ে থাকতো"। এই তিন দিন পুরুষের মার খাওয়ার আশায় তরুণী মেয়েরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। পুরুষের মার খেলে তাদের বাচ্চা পয়দা করার শক্তি জাগবে বলে তারা বিশ্বাস করতো!

এই নোংরা নির্মমতার মধ্যে 'ম্যাচমেকিং লটারি'ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। লটারিতে ছোকরা
নওজোয়ানরা একটি বোতলের ভেতর থেকে কোনো মেয়ের নাম বাছাই করে তুলে নিতো। তারপর, ওই জুটিকে উৎসবের তিন দিন একসাথে থাকতে হতো। ছেলেটি চাইলে ওই তিন দিনের পরেও মেয়েটিকে স্থায়ীভাবে রেখে দিতে পারতো!

এ কালের "মোহাব্বত দিবস" এর সাথেও প্রাচীন রোম এর নাম জড়িয়ে আছে। খৃস্টীয় তৃতীয় শতকের দু'টি আলাদা বছরে রোমান বাদশাহ দ্বিতীয় ক্লডিয়াস দু'জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। দণ্ডিত দু'জনেরই নাম ছিল "ভ্যালেন্টাইন"। দু'জনেরই মৃত্যুর তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। ধর্মবিশ্বাসের জন্য তাদের এই "শাহাদাত"কে সম্মানিত করার লক্ষ্যে এরপর থেকে ক্যাথলিক চার্চ প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি'র দিন "সেন্ট ভ্যালেন্টাইন'স ডে" পালন করা শুরু করে।

এরপর পঞ্চম শতকে পোপ প্রথম জেলাসিয়াস লুপারক্যালিয়ার সাথে "সেন্ট ভ্যালেন্টাইন'স ডেকে" মিলিয়ে তালগোল পাকিয়ে দিয়ে যান। অবশ্য তার আসল উদ্দেশ্য ছিল, "লুপারক্যালিয়া" উদযাপনের পৌত্তলিক ধর্মানুষ্ঠানগুলি ধাপে ধাপে রদ করে দেওয়া।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, এই উৎসবটির আসল অনুষ্ঠানিকতাগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন নাটকীয় অপব্যাখ্যা যোগ করা হতে থাকে। এক সময় এই উৎসবটি অপব্যাখ্যার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠলো।

লেন্সকি এ সম্পর্কে বলেছেন, "এটা এক রকম মাতাল আনন্দ উদযাপনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। কিন্তু খ্রিস্টানরা তার উপর কাপড় পড়িয়ে দিলো। তবে তারাও এই দিনটাকে "প্রজনন ও প্রেম" এর দিন হিসেবে উদযাপন করা বন্ধ করে দেয়নি।"

ওদিকে বছরের একই দিন নরমানরা পালন করতো "গ্যালাটিন'স ডে"। "গ্যালাটিন" শব্দের মানে হলো, "নারী প্রেমিক"। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডের সঙ্গে এই উৎসবকে মিলিয়ে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ থেকে যায়। কারণ শুনতে গেলে দুটোকেই অংশতঃ এক রকম বলে মনে হয়।

শেক্সপীয়ার ইন লাভ

বছর বছর এই পর্বটির সাথে যোগ করা হতে থাকলো হরেক রকম 'মিঠেল ও সুস্বাদু' উপাদান। চসার ও শেক্সপিয়ার তাদের লেখালেখি দিয়ে একে একটা রোমান্টিক ব্যাপার হিসেবে তুলে ধরলেন। প্রথমে ব্রিটেন ও পরে ইয়োরোপের অন্য দেশগুলোতে এর মোটামুটি এক ধরণের জনপ্রিয়তা পরে উঠলো। এই দিনে হাতে তৈরি কাগুজে কার্ড এর দেওয়া-নেওয়া মধ্যযুগের ইয়োরোপে পপুলার কালচারে পরিণত হয়। ফরাসী ভাষায় এই কার্ড এর নাম রাখা হয় "tokens-du-jour", মানে "দিনের নিদর্শন"।

অবশেষে এই ঐতিহ্য এসে পৌঁছলো "নিউ ওয়ার্ল্ড" বা আমেরিকায়। শিল্প বিপ্লবের কারণে ১৯ শতকে প্রচুর কারখানা স্থাপিত হলো। কারখানার তৈরি কার্ড বিক্রির ছিল শুরু হলো দেদারসে। ১৯১৩ সালে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে প্রথম ব্যাপক আকারে "হলমার্ক কার্ড" ছাপিয়ে বিক্রি করা শুরু হয়। সেই থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে কার্ড বিতরণের হিড়িক চলে আসছে।

বর্তমান জমানায় "ভ্যালেন্টাইন্স ডে" একটি বড় ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার গবেষণা ফার্ম "আইবিআইএস ওয়ার্ল্ড" এর হিসাব মোতাবেক, ২০১০ সালে ভ্যালেন্টাইন্স ডেতে ১৭৬০ কোটি ডলার মূল্যের কার্ড বিক্রি হয়েছিল। ২০১১ সালে এর বিক্রি ধরা হয়েছিল ১৮৬০ কোটি ডলার।

কিন্তু অনেকে বলছেন বাণিজ্যিকীকরণ এই দিনটিকে বরবাদ করে দিয়েছে।

রুটগর্স ইউনিভার্সিটি'তে কর্মরত সোশিওলজিস্ট হেলেন ফিশার বলছেন, "এর জন্য আমরা কেবল নিজেদেরকে দোষারোপ করতে পারি।"

তিনি আরো বলেন, "এটি রাজার হুকুমে অনুষ্ঠিত কোনো নাটক অভিনয়ের মত ব্যাপার নয়। যদি মানুষ হলমার্ক কার্ড কিনতে না চায়, তাহলে তা কেনা হবে না, এবং হলমার্কের ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে।"

সেই কারণেই ভ্যালেনটাইন ডের উদযাপন নানা উপায়ে চলে আসছে। অনেকে তাদের প্রিয়জনের জন্য ব্যাংক ভেঙে জেওর (জুয়েলারি) ও ফুল কিনবে। অন্যেরা "SAD" [Single Awareness Day] বা "একাকীত্ব সচেতনতা দিবস" উদযাপন করবে, নিজেকে নিজের উপহার দেওয়া চকোলেট চুষতে চুষতে একা খাওয়া-দাওয়া করবে।

কেউ কেউ সেই প্রাচীন রোমানদের মতো করেও এই দিন উদযাপন করবে।

(দ্য রিপোর্ট/এনটি/ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর



রে