thereport24.com
ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫,  ৬ নভেম্বর ১৪৩৯

‘সরমআলীরভুবন’,থেমেগেল ‘মহারণ’

২০১৮ মার্চ ০৪ ০৩:৫১:৪১
‘সরমআলীরভুবন’,থেমেগেল ‘মহারণ’

সফিকুলগাজী

‘সরম আলী ভুবন’ ভেঙে ‘বদলি বসত’ এ বাসা বেঁধেছে আজ।’সুখ সন্ধানে যাও’-এর অভিযাত্রী আজ ‘প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি’র ‘বায়ু তরঙ্গে’ ডানা মেলে দিয়েছে ।
জী হ্যাঁ আমি এমন এক মানুষের কথা বলছি যাঁর নাম সোহারাব হোসেন। উত্তর ২৪ পরগনার বর্তমানে মাটিয়া থানার সাংবেরিয়া গ্রামে ১৯৬৬সালের ২৫ নভেম্বর যাঁর আত্মকথন সমগ্র প্রকৃতি জগতে ‘বায়ু তরঙ্গ’এর বাজনা বাজিয়ে দিয়েছিল।আব্বু রুস্তম আলীর কাছে আরো দিদিদের মতো তাঁরও লেখা পড়াই হতে খড়ি। ডানপিঠে ছেলেটা সারাদিন এমাঠে ওমাঠে ঘুরে বেড়াতেন যাদুর সন্ধানে।মা আমেনা খাতুন বলতেন “বড্ড বিচ্ছু হয়েছিস রে ,পড়া শুনা না করে সারাদিন শুধু ঘুরে বেড়ানো ।”কিন্তু না সেদিনের ডান পিঠে ছেলেটা যতক্ষন পড়ার জগতে থাকতেন সব যেন ‘বৃষ্টির নামতা’ হয়ে ধরা দিতে থাকতো তাঁর স্মৃতির পাতায়।
গ্রামের পাঠশালা কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ধান্যাকুড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। শিক্ষক কালিপদ মন্ডল মহাশয় পেলেন হাতের কাছে এক রত্ন। খালি ঘসা-মাজার অপেক্ষা। লেগে পড়লেন সেই কাজে। ধান্যাকুড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের মান রাখলেন তিনি।কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হলেন বসিরহাট কলেজে বাংলা অনার্স নিয়ে। এখানেই অধ্যাপক মানস মজুমদারের স্নেহ ভাজন হয়ে উঠলেন ছেলেটা।না,তখন আর ডানপিঠে নন,বরং বাধ্য,শান্ত মেধাবী ছাত্র।

অধ্যাপক বললেন “তোমাকে বড়ো হতে হবে,মানুষ হতে হবে। তুমি পারবে তোমার মধ্যেই আছে বাংলা ভাষার আঁতুরঘর।”পারলেন। বাংলা সাম্মানিক বিষয়ে প্রথম হয়ে পাড়ি দিলেন কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানেও শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হননি। এখানে ১৯৮৮সালে তিনি ‘দৈনিক বর্তমান ‘সংবাদ পত্রে চাকরি করতেন।এরপর ১৯৯১সালে তিনি মাস্টার ডিগ্রিতে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের মান রাখলেন,মান রাখলেন আব্বু-আম্মু ও আত্মীয় স্বজনের। গ্রামের মানুষের আশা পূরণ করলেন।
ছোট গল্পের উপরে পি এইচ ডি করার পর পুরোপুরি কর্ম জীবনে পদার্পণ।ধান্যকুড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং বসিরহাট কলেজে কিছুদিনের জন্য শিক্ষকতা করেন।তারপর ১৯৯৬সালে কলকাতা আনন্দ মোহন কলেজের প্রফেসর নিযুক্ত হন।

গ্রামের এই কৃতী সন্তানের লেখনী কিন্তু থেমে থাকেনি।সপ্তম শ্রেণী থেকে লেখার হাতে খড়ি যাঁর উচ্চ মাধ্যমিকে পাকা লেখক হয়ে উঠলেন তিনি।তাঁর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গ্রামীণ আত্মজ কথা ‘ভেজা তুলোর নৌকা’ই নদিপথ পাড়ি দিতে লাগলো।গ্রামীণ সাধারণ চাষা-ভূষা, শ্রমিক, প্রান্তিক স্তরের দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের আঁতের কথা তিনি টেনে বার করলেন, তাদের আটপৌরে ভাষাকে করলেন তাঁর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ভাষা।একে একে জন্ম দিলেন ‘সরম আলীর ভুবন’, ‘সহবাস পরবাস’, ‘ মাঠ যাদু জানে’, ‘বদলি বসত’, ‘হায়েনা মানুষ’, ‘মহারণ’, ‘গাঙ্গ -বাঘিনী’, ”আইনা যুদ্ধ’ভেজা তুলোর নৌকা’ ,’বৃষ্টির নামতা’ ,’সঙ্গ -বিসঙ্গ’ এর মতো ১২টি উপন্যাস,৯টি গল্পগ্রন্থ, এবং ৩টি কাব্যগ্রন্থ।


তাঁর কর্মজীবনে বাঁক এসেছিল ২০০৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের সভাপতি থাকাকালীন।এই সময় লেখা -লেখির গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে এসেছিল।তিনি বুঝলেন এ জীবন তাঁর নয়। সরে এলেন, ধরলেন কলম,এরপর আর থেমে থাকেননি।আবার গড়গড়িয়ে চলতে থাকল লেখার স্রোত।
তাঁর কর্ম জীবনের আর এক বৈচিত্র্যময় দিক ছাত্র-প্রীতি‌। ছাত্র-ছাত্রীদের বরাবরই তিনি স্নেহের চোখে দেখতেন।বলতেন –“ভেঙে পড়িস না,দেখবি বিফলতার মূলেই সফলতার চাবি।সেটা বিশ্বাস করতে পারলেই দাঁড়াতে পারবি।”হ্যাঁ তাঁর আদর্শে আজ অনেকেই দাঁড়িয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তে প্রান্তে বিভিন্ন জেলা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর নিজ হাতে তৈরি অসংখ্য ছাত্রকুল। যারা আজ প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক। আজ ‘মহারণ’ থেমে যাওয়ার দিনে তাই স্বশ্রদ্ধ চিত্তে তাঁর প্রতি রইলো হৃদয় ভেজা আর্তি– ‘সরম আলীর ভুবন’ভেঙে ‘বদলি বসতে’ ‘সুখ সন্ধানে যাও’ তুমি।

লেখক: বসিরহাট থেকে প্রকাশিত বেঙ্গল রিপোর্টের সাংবাদিক

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সাহিত্য এর সর্বশেষ খবর

সাহিত্য - এর সব খবর



রে