thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬,  ১৪ রমজান ১৪৪০

কেন আমি ভিকারুননিসা স্কুলের নাম পরিবর্তনের বিপক্ষে

২০১৮ ডিসেম্বর ২০ ০১:৩৫:০৫
কেন আমি ভিকারুননিসা স্কুলের নাম পরিবর্তনের বিপক্ষে

বিধান রিবেরু

কথায় কথায় নাম পরিবর্তনের খাসলত ভালো নয়। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এমন জিনিসের। কারণ নামের সাথে শুধু বিশেষ্য নয়, একটি জনপদের নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বাপর ধরা থাকে। যেমন ধরুন ঢাকার মগবাজার এলাকাটি। সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগীজদের সাথে মিলে আরাকানের মগরা বাংলায় ব্যাপক লুটপাট, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা দক্ষিণাঞ্চল থেকে এগুতে এগুতে বর্তমানের ঢাকা পর্যন্ত চলে আসে। এখানে ঘাঁটিও গাড়ে। মগদের ঘাঁটি থেকেই মগবাজার কথাটি এসেছে। এখন মগরা তো আমাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, তাই বলে কি মগবাজার নামটি উঠিয়ে দিতে হবে? তারপর ধরুন কাকরাইল নামটি। উনিশ শতকে ঢাকায় ইংরেজ কমিশনার ছিলেন মিস্টার ককরেল। তার নাম থেকে কাকরাইল নামটি এসেছে। ব্রিটিশরা তো আমাদের দাবিয়ে রেখেছিল প্রায় ২শ বছর, তাই বলে কি নামটি পাল্টে ফেলতে হবে? এরকম আরো ভুরিভুরি উদাহরণ দেয়া যাবে।

এখন ভিকারুননিসা নূন কে ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানি গভর্নর ফিরোজ খান নূনের স্ত্রী। এই ফিরোজ খান পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন ৫০ থেকে ৫৩ সাল পর্যন্ত। এরপর ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের ৭ম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ৫৮ সালে ইস্কান্দার মীর্জা সামরিক আইন জারি করলে তিনি আর প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকেননি।

অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে, ষাট ও সত্তরের দশকে, এই লোক বিরোধিতা করেছেন বা সক্রিয় ছিলেন তেমন কোন নথিপত্র নেই। থাকুক বা না থাকুক, আমার যুক্তি হলো নাম তো একটি ইতিহাসকে ধারণ করে। ভিকারুননিসার নামের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি এই স্কুলটি স্বাধীনতার আগে থেকে, ৬৬ বছর ধরে শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রেখে আসছে। মেয়েদের জন্য স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভিকারুননিসা। তিনি পাকিস্তানি ছিলেন না, ছিলেন অস্ট্রিয়ান নাগরিক। কাজেই স্বাধীনতার চেতনা দিয়েও ভিকারুননিসাকে বাঁধা যাবে না। তাছাড়া এরইমধ্যে লাখলাখ মেয়ে স্কুলটি থেকেই স্কুলের নামটি নিয়ে পাশ করে বেরিয়েছে।

নাম পাল্টে ফেলার সংস্কৃতির চক্করে পড়ে আমাদের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদ দিবসকে এখন ডাকতে শুরু করেছি মাতৃভাষা দিবস। যেন বায়ান্নতে কেউ রক্ত দেয়নি ভাষার জন্য। এটা আত্মঘাতী প্রবণতা। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি শাসক ও সেনাবাহিনীর কথা আমরা ঘৃণা ভরেই স্মরণ করি। কিন্তু সেই ইতিহাসের সঙ্গে ভিকারুননিসা স্কুলটির কোন সংঘর্ষ নেই। যদি সংঘর্ষ থাকতো তাহলে গত ৫০ বছরেই সেটা সুরাহা হতো। আর নাম বদলালে কি এই বৈষম্য মূলক শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে যাবে?

সম্প্রতি অরিত্রী নামের একটি শিশুর মর্মান্তিক আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মুছে ফেলতে হবে, এটা মেনে নেয়া যায় না। ইচ্ছা হলো জায়গার নাম পাল্টালাম, আমার নাম পাল্টালাম, আমার বাপের নাম পাল্টালাম, এগুলো আত্মঘাতী চর্চা। নাম শুধু নাম নয়, নামের ভেতর ডিনোটেশন যেমন থাকে, তেমনি থাকে কোনোটেশন। মানুষের স্মৃতি ও আবেগ জড়িয়ে থাকে নামের সাথে।

এত কথা লিখলাম, তারপরও জানি কিছুই হবে না। নাম হয় তো পাল্টে যাবে। শুধু এটুকুই বলি হুজুগের মাথায় সবকিছু পাল্টে দেয়া ভালো লক্ষণ নয়।

লেখক: চলচ্চিত্র গবেষক

সূত্র: লেখকের ফেবু থেকে

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

সংবাদ পর্যালোচনা এর সর্বশেষ খবর

সংবাদ পর্যালোচনা - এর সব খবর