thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫,  ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০

কোরআনের হারিয়ে যাওয়া দুই শহর-শেষ

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ০৪ ০০:৩০:৪৩
কোরআনের হারিয়ে যাওয়া দুই শহর-শেষ

কানিজ ফাতেমা

“আর তোমরা স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদেরকে আদ জাতির পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং এমনভাবে তোমাদেরকে ভূপৃষ্ঠে বাসস্থান দিয়েছেন যে, তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছ।”(সূরা আল আ’রাফঃ৭৪)
এর আগের পর্বে আমরা বর্তমান জর্দান ও মদীনার সামুদ জাতি সম্পর্কে জেনেছি আর এখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন যে আদ জাতিকে তিনি ধ্বংস করে সামুদ জাতিকে পৃথিবীতে স্থলাভিষিক্ত করেছেন!
কারা ছিলো এই আদ জাতি , কীইবা ঘটেছিলো তাদের ভাগ্যে! তাই সামুদ জাতিকে বুঝতে হলে আদ জাতি সম্বন্ধেও জানতে হবে!

নূহ(আ.)র ছিলো তিন ছেলে। এরা হলেন-শাম, হাম ও ইয়াফিথ আর শামের বংশধরর থেকেই উদ্ভব হয়েছে আজকের আরব জাতির (Semitic race)! এই শামেরই এক বংশধর ইরামের দুই ছেলে থেকে বংশবিস্তার করেছে কোরানে বর্ণিত দুই জাতির যথা আদ ও সামুদ জাতি!

আদ জাতির বসবাস ছিলো আজকের দক্ষিণ আরবে,বর্তমান জর্দানের আম্মান থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত আর তাদের প্রতি প্রেরিত নবীর নাম ছিলো হূদ(আ.),হূদ (আ.)র নামে কোরআনে একটি সম্পূর্ণ সূরাই নাযিল হয়েছে; সূরা হূদ,নং ১১!বর্তমান ইয়েমেনের হাজরামৌত(Hadhramaut) শহরের পার্শ্ববর্তী এক অঞ্চলে তাঁর কবরও রয়েছে।


কোরানের ২৬নং সূরা আশ শু’আরায় আল্লাহ রব্বুল আলামীন আদ জাতির জীবন-যাপন ও পরিনতির এক সারমর্ম প্রদান করেছেন, আল্লাহ বলেন, ‘আদ সম্প্রদায় রাসূলদেরকে অস্বীকার করেছিলো (১২৩)যখন তাদের ভাই হূদ তাদেরকে বললেন, তোমরা কি ভয় কর না? (১২৪)আমি তো তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসুল!(১২৫)’
‘তোমরা কি প্রত্যেক উচ্চস্থানে অনর্থক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছ? আর তোমরা বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করছ, যেন তোমরা অনন্তকাল বাস করবে।‘(১২৮)
‘আর তোমরা ভয় কর তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে সাহায্য করেছেন সেসব বস্তু দিয়ে যা তোমরা জানো(১৩২) বাগ বাগিচা ও ঝরনাসমূহ দিয়ে (১৩৪)অতঃপর তারা তাকে অস্বীকার করল এবং আমি তাদেরকে ধবংস করলাম!’(১৩৯)

কোরানের আর কিছু আয়াত থেকে আমরা আদ জাতির অনন্য দুটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে পারি যেমন-
“আপনি কি লক্ষ্য করেননি, আপনার রব কেমন ব্যবহার করেছিলেন আদ বংশের সাথে, যারা ছিলো ইরাম গোত্রভুক্ত, যাদের দেহাবয়ব ছিলো সুউচ্চ স্তম্ভের মত!যাদের সদৃশ সারা বিশ্বের জনপদসমূহে কোন মানুষ সৃষ্ট হয় নি!”(আয়াত ৬-৮,৮৯: সূরা আলফাজর)

১। শারীরিক উচ্চতায় তারা ছিলো পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা জাতি; (৬৯:) “...আল্লাহ তোমাদেরকে নুহের কওমের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছেন এবং দৈহিক গঠনে তোমাদেরকে অধিক প্রশস্ততা দান করেছেন!...।”

২। তারা সুউচ্চ সব খিলান/স্তম্ভ সমৃদ্ধ স্থাপনা নির্মাণে পারদর্শী ছিলো!
কোরআন মতে উচ্চতা ও নির্মাণ পারদর্শীতায় পৃথিবীর আর কোনো জাতি কক্ষণই তাদের মত ছিলোনা আর উচ্চতা কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতেও তাদের মত আর কেউ হবে না!

সামুদ জাতিও (the Nabataeans) তাদের পূর্বপুরুষের মত পাথর কেটে স্থাপত্য নির্মাণে পারদর্শী ছিলো, তবে পার্থক্য হলো তারা এজন্য পাহাড়কে বেছে নিয়েছিলো!খেয়াল করে দেখবেন পেত্রা আর মাদায়েন সালেহ দুই জায়গার স্থাপত্যই আকারে বিশাল, যেন এই এদের বাসিন্দা ও কারিগররা ছিলো সব দানবাকৃতির!ধারণা করাই যায় যে সামুদ জাতিও আদ জাতির মত আকারে অত বিশাল না হলেও, যেহেতু আল্লাহ তাদের মত আর কাউকেই সৃষ্টি করেননি, এদের উচ্চতা খুব একটা কমও ছিলো না!

কুরআনে আদ জাতি(people of Aad) এবং ইরামের (স্তম্ভের নগরী ইরাম/Iram of the Pillars)লোক দুইভাবেই তাদেরকে ডাকা হয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো ইরাম নগরী ও তাদের নবী হূদ (আ.)র কথা শুধু কোরানেই পাওয়া যায়!যারা মনে করেন,কোরআন মুহাম্মদ (সা.) বাইবেল ও তাওরাত থেকে নকল করে লিখেছিলেন তাদের জন্য ইরাম নগরীর কথা কিছুটা অস্বস্তিকর,কারন তাওরাত বা জাবুরে(বাইবেলে) এর কোনই উল্লেখ নেই,রাসূল (সা.) কি তবে কল্পনার থেকে এই কাহিনী বানিয়েছেন!

১৯৭৪-৭৫ সালে সিরিয়ার প্রাচিন নগরী এবলা (Ebla)এ খনন কাজের সময় কাদা মাটির ফলক (Tablet) আবিষ্কার করা হয় যা ৪০০০ এবং খ্রীস্টপূর্ব ২০০০-২২৫০ বছরের পুরনো!এই কাদা মাটির ফলকগুলো আবিষ্কার করেন ইতালির আর্কিওলজিস্ট Paulo Matthiae এবং তার দল।বর্তমানে এগুলো সিরিয়ার জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

এই ট্যাবলেটগুলোতে ইরাম নগরীর নাম লেখা আছে যা থেকে বোঝা যায় প্রাচীন ইরাম নগরীর সাথে এবলা নগরীর বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিলো এবং ইরাম নামে সত্যিই ব্যবসা বাণিজ্যে সমৃদ্ধ এক শহর ছিলো।ট্যাবলেট গুলোতে অন্যান্য নবীদের নামও এসেছে তাই খ্রিস্টান গবেষকরা এর সাথে বাইবেলের যোগসূত্র খুঁজতে লেগে যান, পরে অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেন যে এখানে এমন এক শহরের নামও এসেছে যার কথা এতদিন পর্যন্ত শুধুমাত্র কোরানেই ছিলো আর সেই শহরের নাম হলো ইরাম এবং অবশ্যই রাসুল (সা.) এই আবিষ্কারের সময় বেঁচে ছিলেন না যে তা জেনে কোরআনে সংযুক্ত করবেন! (Iram-The Lost City/free-minds.org)



আরবরা কিন্তু এই কাহিনী জানতো আদিকাল থেকেই, আরব্য রজনীর শাদ্দাদ আর তার বেহেশত তেমনই এক কাহিনী, যেখানে আদ কনিষ্ঠ পূত্র শাদ্দাদ তৈরী করেন এক বেহেশতের যেখানে সোনা, রূপায় তৈরী বিশাল বিশাল স্তম্ভের প্রাসাদ, উদ্যান, ফোয়ারাযুক্ত টলটলে পানির হ্রদ। প্রাচীন কোন বইপত্রেও এই শহরের সরাসরি নাম পাওয়া যায় না, তবে ফটিয়াস(Photios;the patriarch) আগাথারশাইডস(Agatharchides; প্রাচীন গ্রীক ইতিহাস ও ভূত্ত্ববিদ)ও অন্যান্য গ্রীক হস্তলিখিত নথি ঘেটে দক্ষিণ আরবের এক জনপদের কথা খুঁজে পান যারা কিনা অনেক পিলার তৈরী করে ছিলো যা ছিলো স্বর্ণ দিয়ে আবৃত বা রূপা দিয়ে তৈরী, আর পিলারের মাঝখানের জায়গাগুলি ছিলো আশ্চর্য হয়ে দেখে থাকার মত।’

এত জ্ঞান,শক্তি,পারদর্শীতা,অঢেল ধন সম্পত্তি,সোনা-রুপা,বিশাল সৈন্য বাহিনী ,দীর্ঘ জীবনকাল নিয়েও তারা দেব দেবীর পূজারী পৌত্তলিক,হূদ (আ.)র বার বার আহবানেও তারা তাদের পূর্বপুরুষের অনুসৃত ধর্ম ছাড়তে অস্বীকার করে। এক আল্লাহর অস্তিত্বের সত্যের চেয়ে ঐতিহ্য পালনই বড় হয়ে দাঁড়ালো, ধর্মের চেয়ে ট্রাডিশনকে বেশী গুরুত্ব দেবার চল অবশ্য দুনিয়াতে এখনো বিদ্যমান। এক আল্লাহর সাথে শিরকের পাশাপাশি যোগ হয়ে ছিল তাদের মানুষের সাথে অন্যায় অবিচার,আদ জাতির সমাজে সবলেরা দূর্বলের উপর যা খুশী করার অবাধ স্বাধীনতা ছিলো, আপনি যদি দুর্বল হন তবে সেখানে ন্যায় বিচারের কোন আশা ছিলো না।

এছাড়া খনন করে বা অন্য কোন ভাবে ইরাম নগরীর কোনো অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি যদিও আল্লাহ কোরাআনে স্পষ্ট বলেছেন যে এই নগরী পথের পাশেই অবস্থিত।তবে কী কোরআন এখানে কোন ভুল করলো?
৪৬ :সূরা আল আহকাফে আল্লাহ বলেন, “(২১)আর আপনি উল্লেখ করুন আদ সম্প্রদায়ের ভাই হূদের কথা।যখন তিনি আহকাফবাসী স্বীয় কওমকে সতর্ক করলেন-তার পূর্বে ও পরে অনেক সতর্ককারী তো অতীত হয়েছে-তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কার ইবাদত কর না; আমি তোমাদের উপর এক ভীষণ দিবসের আযাবের আশংকা করছি।’

আরবী আহকাফ শব্দ হিকফ শব্দের বহুবচন যার অর্থ বালির পাহাড় বা বালিয়াড়ি (sand dunes), ইয়েমেনের হাজরামাউত নগরীর বাইরেই রয়েছে এক বিশাল মরুভূমি যার রয়েছে মাইলের পর মাইল জুড়ে শুধু বালিয়াড়ি, আর কিছুই না।এই মরুভূমির বর্তমান নাম আর রাব আল খালি বা বিশাল শূন্য এলাকা। এই মরুভূমির বালি ভীষণ মিহি, শত বছর এই জায়গায় থেকেও কেউ এই এলাকার কিছুই চিনতে পারবে না কারণ সারাক্ষণই এর বালিয়াড়িগুলো পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন আকার ধারণ করছে। এই আশ্চর্য শূণ্য মরুভূমি নিয়ে বৃটিশ লেখক জন ফিলবির একটি বিখ্যাত বেস্টসেলিং বইও রয়েছে, নাম দ্যা এম্পটি কোয়ার্টার। বইটি অ্যামাজনে কিনতে পাওয়া যায়।


স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী এই সুবিশাল বালিয়াড়ির নীচেই ঢাকা পড়ে আছে আদ জাতির ইরাম নগরী, এজন্যই আল্লাহ রব্বুল আলামিন এই সূরার নামই রেখেছেন আল আহকাফ। পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শাস্তি হিসেবে নেমে আসা সাত রাত ও আট দিন ধরে চলা প্রলয়ঙ্করী, প্রকান্ড ঝড় ঝঞ্ঝাময় খোদায়ী আযাবের সময় হূদ (আ.)তাঁর সামান্য কিছু অনুসারীদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী নিরাপদ শহরে আশ্রয় নেন,সেটিই আজকের হাজরেমাউত শহর। আযাবের অনেকদিন পর্যন্ত তাদের বাড়ি ঘর মানব শুন্য হয়ে পড়েছিলো,কেউ তার পাশ দিয়ে হেটে গেলে মনে হতো যেন এখানে কেউ কোনদিন বসবাস করেনি।

‘যা তিনি তাদের উপর প্রবাহিত করেছিলেন সাত রাত আট দিন অবিরামভাবে,তখন (দেখলে) তুমি উক্ত সম্প্রদায়কে দেখতে , তারা সেখানে লুটিয়ে পড়ে আছে সারশূণ্য খেজুঁর গাছের কান্ডের ন্যায়’ (সুরা আল হা-ক্ক্বাহ :৬-৭)
এখানে কোরান খেজুর গাছের লম্বা কান্ড দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে থাকা তাদের প্রাণহীন দীর্ঘ দেহের প্রতি ইংগিত করেছে(তাফসীরে আহসানুল বায়ান)। গযব আসার আগে এই শহর কোন মরুভূমি ছিলো না, এটি অনেক পরে মরুভূমিতে পরিনত হয়।বর্তমানেও আমরা হয়তো এই পথের পাশ দিয়েই হেটে যাই, কিন্তু দেখতে পাইনা।

‘তারপর তুমি কি তাদের জন্য কোন অবশিষ্ট কিছু দেখতে পাও?’ (সুরা আল হা-ক্ক্বাহ,আয়াত-৮)

অনেকেই ওমানের উবার (Uber)কে হারিয়ে যাওয়া ইরাম নগরী হিসেবে মনে করেন কিন্তু উবার শহরের খুঁজে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ খুবই সামান্য, পিলারের উচ্চতাও কোরআনের বর্ণনার তুলনায় খুবই সাধারণ,তাছাড়া আদ সম্প্রদায়ের বসবাস ছিলো আজকের ইয়েমেনে, বর্তমান ওমানে নয়। একে মরুভূমির আটলান্টিসও বলা হয়।প্লেটোর আটলান্টিস (Atlantis)নগরী ছিলো সমুদ্রের মাঝখানে এক সমৃদ্ধ নগরী আর ইরাম মরুভূমির বুকে, দুই শহরের কোনটারই আজ আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না।

আর আমি ধ্বংস করেছিলাম আদ ও সামূদকেও, তাদের বাড়িঘর থেকেই তা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। শয়তান তাদের কাজকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিলো এবং তাদেরকে সৎ পথ থেকে বিরত রেখেছিলো, অথচ তারা ছিল জ্ঞানবান বিচক্ষণ লোক।(২৯ সূরা আনকাবূ্‌ত,আয়াত-৩৮)



তথ্যপঞ্জি:
১।তাফহীমুল কোরআন-১৪,পৃ.১৯৮
২।তাফসীরে আহসানুল বায়ান
৩।Philby,The Empty Quarter,1986.


(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ফেব্রুয়ারি ০৪,২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

ধর্ম এর সর্বশেষ খবর

ধর্ম - এর সব খবর