thereport24.com
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৯ ফাল্গুন ১৪২৫,  ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪০

ব্যাংকের কর্মচারি শতকোটি টাকার মালিক!

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ০৪ ২৩:১৭:২১
ব্যাংকের কর্মচারি শতকোটি টাকার মালিক!

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : খন্দকার নজরুল ইসলাম আগ্রণী ব্যাংকের এটর্নি এসিস্যান্ট মানে আইন কর্মকর্তার সহকারী বা ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী । বেতন বছরে ২ দুই লাখ ২৬ হাজার টাকা মাত্র। কিন্তু তিনি এই চাকরি করে, ঢাকা শহরে তিনিটি বাড়ি, ২টি গাড়ি, একটি ইটভাটা, একটি ডেয়ারী ফার্মসহ প্রায় শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ব্যাংক সিবিএ প্রেসিডেন্ট হবার সুবাদে ভুয়া জমি দেখিয়ে ব্যাংক থেকে দশ কোটি টাকার ঋণও নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্তও শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন । কিন্তু দলীয় প্রভাব আর অর্থিক দাপটে অগ্রগতি হচ্ছে না, বরং ধামা চাপা দেবার অভিযোগ উঠেছে ।

অগ্রণী ব্যাংক কর্মচারী কল্যাণ সমিতির ১৯৯৮ সালে কার্যনির্বাহী সদস্য প্রথম ছিলেন তিনি । তখন তার পদবী ছিল সি এল ডি এ (কর্মচারী) সেই সময় এই অগ্রণী ব্যাংক কল্যাণ সমিতিটি ছিল জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের অর্ন্তভুক্ত । পরবর্তীতে ব্যাংকের কাগজ আত্নস্বাত তদন্তে দোষী হবার দায়ে তাকে ডিমোশন দিয়ে আইন কর্মকর্তার সহকারি করা হয় ।

২০০৮ সালে সরকার বদলের পর তিনি দল বদল করে সরকারি দল শ্রমিক লীগে যোগদান করেন। সরকারি দলের সমর্থন নিয়ে ২০০১২-২০১৩ অর্থ বছর থেকে তিনি শ্রমিকলীগ অর্ন্তভুক্ত অগ্রণী ব্যাংক কর্মচারী কল্যাণ সমিতি [সিবিএ রেজি: ১৮৮১] প্রেসিডিন্টে পদে অধিষ্ঠিত হন। তার পর থেকেই তিনি বেপরোয়া সামান্য ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী হলেও ব্যাংকে দুটি গাড়ি সিবিএ সভাপতি/ সাধারণ সম্পাদক ব্যবহার করে আসছেন।

ব্যাংকের কর্মকর্তা /কর্মকচারীদের পক্ষ হতে দুদক চেয়ারম্যান বরাবরে অগ্রণী ব্যাংক সিবিএ সভাপতি/ সাধারণ সম্পাদক ক্ষমতা অপব্যবহার করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয় ।

সেই অভিযোগে বলা হয় ,আরবার ডিজাইন এন্ড ডেভলপমেন্ট ৬৪ গ্রীন রোড়, ঢাকা ২ হাজার স্কয়ার ফিট ফ্লাট রয়েছে, যার ক্রয় মূল্য ৬ কোটি টাকা, সুবাস্ত ইডিফিশ ৫১/৫২ গ্রীন রোড় ১৫০০ স্কয়ার ফিটে ফ্লাট মূল্য তিন কোটি, টঙ্গি চেরাগআলী ৪ কাটা জমির উপর বাড়ির মূল্য এক কোটি ২০ লাখ, রাজবাড়ীর পাংশায় ২০ বিঘা জমির উপর ইটভাটার ব্যবসা মূল্য বিশ কোটি টাকা, একইস্থানে বালির ব্যবসায় বিনিয়োগ ৪ কোটি। এছাড়া বিভিন্নস্থানে বিপুল পরিমাণ জমির মালিক তার পরিবার। সিবিএর দাপট দেখিয়ে অগ্রণী ব্যাংক প্রধান কার্যালয় হতে এপিসোড এগ্রো লিমিটেড আলাদিপুর রাজবাড়ী সদরের নামে বিভিন্ন প্রকারের প্রায় দশ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই প্রকল্প ঋণের মাসিক কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করা না হলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না । এই প্রতিষ্ঠানের ২৫% অশীংদার খন্দকার নজরুল ইসলামের কন্যা নাইমা নীতি । অন্য তিন পরিচালক তার তিন ভাই যথাক্রমে আবুল কালাম আজাদ, মিজানুর রহমান ও জাহিদ হাসান সজল সর্ব পিতা মো: ওজিউল্লাহ মিয়া ।

ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড প্রধান কার্ষালয় হতে তার নিজ কন্যা নাইমা নীতি এবং তার তিন ভাইয়ের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাজবাড়ীর এপিসোড এগ্রো লিমিটেড নামে গত ১৫ মার্চ ২০১৭ তারিখে প্রথম চার কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋন মঞ্জুর করে। এপিসোড এগ্রো লিমিটেড বিএমআরইকল্পে ৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে ৫০:৫০ ঋণ ও ইক্যুইটি অনুপাতে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ মঞ্জুর করে । একই প্রকল্পের হাইপো ও প্লেজ ঋণ মিলে বর্তমানে দশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে ।

এই ঋণ নিয়ে প্রকল্পর যে মূল্য দেখানো হয়েছে বাস্তবতার সাথে তার মিল নাই । অনুরূপভাবে বিভিন্ন জমি যে মটগেজ রাখা হয়েছে তার বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েক গুন বেশী দেখিয়ে এই ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে। উপরুন্ত প্রজেক্ট ঋণের যে টাকা মাসিক কিস্তি করা রয়েছে, তাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। এক দিকে মটগেজ রাখা জমির মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি দেখিয়ে খন্দকার নজরুল ইসলাম চাপ প্রয়োগ করে এই ঋন নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে । আবার অন্য মালিকানাধীন জমিও ব্যাংকে মটগেজ রেখেছেন ।

সিবিএ প্রেসিডেন্ট খন্দকার নজরুল ইসলাম প্রভাব বিস্তার করে তার স্ত্রী নাজমা বেগমকে কর্মচারী থেকে বর্তমানে সিনিয়ার প্রিন্সিপাল অফিসারে পদোন্নতি দিয়েছেন। ব্যাংকের বিধি বিধান মত প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যে পদোন্নতি বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হয় । কিন্তু খন্দকার নজরুল ইসলামের স্ত্রী মিসেস নাজমা বেগম এবছর জানুয়ারী মাসের বৈঠক করে তাকে প্রিন্সিপাল অফিসার থেকে সিনিয়ার প্রিন্সিপাল অফিসারে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে । যা কার্ষকর করা হয়েছে ৩১/১২/২০১৮ হতে ।

উপ মহাব্যবস্থাপক মো: আব্দুর রাজ্জাক স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ এইচ আরসিডি ওডি/ ওডিএস-১/৩২/১৮ তারিখ ১৪.০১.২০১৯ তারিখে পত্রে বলা হয় আগামী ৫ কর্ম দিবসের মধ্যে নিয়মিত কর্মস্থলে যোগদান করার পর ৩১/১২/২০১৮ তারিখ হতে এ পদোন্নতি কার্ষকর হবে । নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে ব্যর্থ হলে তার পদোন্নতি বাতিল হবে । [ বর্তমান কর্মস্থল রিকনসিলেশন ডিভিশন, প্র: কার্যালয় ঢাকা থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, রিকনসিলেশন ডিভিশন ,প্র: কা: ঢাকা পদোন্নিতর প্রেক্ষিতে ।]

আলোচ্য ও রহস্যজনক বিষয় হলো ১৪ জানুয়ারী ১৯ পত্রে বলা হচ্ছে আগামী ৫ কর্ম দিবসে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করার পর ৩১/১২/২০১৮ হতে পদোন্নতি কার্যকর হবে । অথচ মিসেস নাজমা বেগম যে ব্যাচের কর্মকর্তা সে ব্যাচের তিনি ছিলেন সর্ব কনিষ্ঠ কর্মকর্তা । বিধি বর্হিভূত এই পদোন্নতি দিয়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে ।

ইতিপূর্বে ব্যাংকের অস্থায়ী কর্মচারীদের স্থায়ী করণ, এবং অগ্রণী ব্যাংকের অস্থায়ী মাঠ সহকারীদের স্থায়ী করার আশ্বাসে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খন্দকার নজরুল ইসলামের ভাই ও কন্যা মালিকানাধীন এগ্রো হিসাব নং ০২০০০০০৪২১২২৪৬ এবং খন্দকার নজরুল ইসলামের সঞ্চয়ী হিসাবে কোটি কোটি টাকা জমা হবার প্রমাণ ব্যাংক হতে পাওয়া বিবরণী হতে দেখা যায় । অগ্রণী ব্যাংক প্রিনসিপ্যাল অফিস খন্দকার নজরুল ইসলামের সঞ্চীয় হিসাব নং ০২০০০০০১১৩১৩২ শুধু ২০১৮ সালে হিসাবের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার লেন দেন করেছে বলে দেখা যায় । দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে এই হিসাবে অনলাইনের মাধ্যমে টাকা জমা হয় । গত বছর ২৮ জানুয়ারী একদিনে ক্যাশ জমা ৪ লাখ এবং ১৩ ফেব্রুয়ারী ক্যাশ জমা নগদ দশ লাখ টাকা । ২০ এপ্রিল ২০১৭ এক সাথে তার হিসাবে ২০ লাখ , ১৪ মে ১৭ দশ লাখ টাকা জমা দেয়া হয় । বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি মালা অনুযায়ী সঞ্চীয় হিসাবে নগত ৭ লাখ টাকা বেশী কেউ জমা দিলে তাকে টাকার উৎস ব্যাংকে জানাতে হয় এবং ব্যাংলাদেশ ব্যাংকে অবহিত করতে হয় । কিন্তু খন্দকার নজরুল ইসলাম সিবিএ প্রেসিডেন্ট হাওয়াই সব ধামা চাপা পড়ে গেছে ।

ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর দুর্ণীতি দমন কমিশন সমন্বিত কার্যালয় ফরিদপুর এর সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদ অগ্রণী ব্যাংক সিবিএ প্রেসিডেন্ড খন্দকার নজরুল ইসলামের নামে তদন্ত শুরু করেছেন। সিবিএ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযো্গ যে “ খন্দকার নজরুল ইসমলাম প্রেসিডেন্ট, সিবিএ অগ্রণী ব্যাংক লি: ঢাকা ও তার ভাই কন্যাদের নামে ব্যাংকে ভুয়া জমি দেখিয়ে ব্যাংক হতে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্নস্বাতসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ “।

দুদকের পক্ষ হতে সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের মহা ব্যাবস্থাপক বরাবরে পত্র দিয়ে ছয় জন ব্যাংক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছেন। যাদের তলব করা হয়েছে তারা হলেন মো: আখতারুল আলম, মহা ব্যবস্থাপক অগ্রণী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়, মো: আব্দুল করিম মিয়া সহকারী মহা ব্যবস্থাপক, মো: ইউসুফ খান সহকারী মহা ব্যবস্থাপক, সুধির রঞ্জন বিশ্বাস সহকারী মহাব্যবস্থাপক, একেএম দেলোয়ার হোসেন এসপিও/ ব্যবস্থাপক ও মো: মুরাদ হোসেন সিনিয়র অফিসার [বস্ত্র প্রকৌশলী ] অগ্রণী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়।

এ ব্যাপারে দুদকের সহকারী পরিচালক নাসির উদ্দিন আহমেদের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান তিনি ফরিদপুর থেকে বদলী হয়ে তিনি ঢাকা চলে এসেছেন। তবে তদন্ত এখনও চলছে । তিনি অনেক অনিয়ম প্রমান পেয়েছেন বলে জানান, তিনি প্রাথমিক ভাবে একটি রিপোর্টও জমা দিয়ে এসেছেন ।

ফরিদপুর দুদকের উপ পরিচারক আবুল কালাম আজাদ জানান, মামলার তদন্ত শেষ করার আগেই সহকারী পরিচালক বদলী হওয়াই নতুন তদন্ত কারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হবে । তিনি জানান , তদন্তকারী কর্মকর্তা বদলী হলেও তদন্ত ব্যাহত হবে না ।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদকে তলব অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো: আখতারুল আলম ও মহকারী মহা ব্যবস্থাপক মো: আ: করিম জানান, তারা দুদকের জিজ্ঞাসাবাদের জবাব দিয়ে এসেছেন। কোন জমি দিয়ে ঋন দিয়েছেন তা তাদের দেখানো হয়েছে । তারা বলেন জমির কাগজ সঠিক আছে কিনা তা যাচাই বাচাই করে ব্যাংক নিযুক্ত আইনজীবী । এখানে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কিছু করনীয় নাই ।

এ ব্যাপারে অগ্রণী ব্যাংক সিবিএ প্রেসিডেন্ট খন্দকার নজরুল ইসলামের সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি দুদকের তদন্তর কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, তার ইট ভাটার মধ্যবর্তী স্থানে এক জমির মালিক জমি দিতে চেয়েও এখন দিতে রাজি না হওয়াই সমস্যা হয়েছে । বলেন বাজার মূল্যর দ্বিগুন মূল্য তাকে দিতে রাজি হলেও তার চাহিদা পাচঁ গুন। তিনি বলেন ঐ জমির মালিক সব জায়গা অভিযোগ করে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এম পি সাবেক মন্ত্রী কেরামত আলী মধ্যস্ততায় বৈঠকও হয়েছে । তিনি দাবি করেন তার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপ্রপ্রচার চালাচ্ছে।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/ জানুয়ারি ০৪, ২০১৯)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert

অর্থ ও বাণিজ্য এর সর্বশেষ খবর

অর্থ ও বাণিজ্য - এর সব খবর